বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জনজীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

এক সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই নীহারুল ইসলাম গল্প লেখেন। সে ভূগোলের মানুষের নিপীড়ন, শোষণ বঞ্চনা দেখে কলম তুলে নেওয়া ছাড়া অন্য উপায় তাঁর জানা নেই। ‘নদীপাড়ের গল্প’ নদী ভাঙনকে কেন্দ্র করে মানুষের সমস্যা ও বর্ডার বন্ধ থাকলে মানুষের রোজগার কীভাবে বন্ধ হয়ে যায় তা দেখি। এনায়ৎ, সাদেক, গোফুর, কুদরতরা বর্ডারে চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু এপারে প্লেগ দেখা দেওয়ায় বর্ডার বন্ধ। তবে গোরু পরাপার চলছে। কেননা এপারে সংখ্যাগুরু হিন্দুর কাছে গোরু দেবতার বাহন, তাই গোরু কোন জীবানুর বাহন করে নিয়ে যেতে পারে না। সামাজিক নিস্পেষণ থেকে নীহারুল কখনও ব্যঙ্গহাসিও হাসেন। কিন্তু সে বাণী নীরবে বেজে ওঠে। বর্ডার বন্ধ থাকায় এঁরা মাছ ধরছে। মাছ আগেও ধরত কিন্তু তখন অবসর বিনোদনের জন্য কিন্তু আজ মাছ ধরা ছাড়া উপায় নেই। ফলে নদীতীরে মাছ ধরতে গিয়ে গোফুর, সাদেক, এনায়েতরা নানা গল্প করে চলে। সে গল্পের মধ্য দিয়েই নীহারুল এই প্রান্তিক মুসলিম মানুষগুলির বিপন্নতার চিত্র আঁকেন। সাদেকের দোকান ছিল কিন্তু তা নদী কেড়ে নিয়েছে, স্ত্রী জারিনার সামান্য পায়ের তোড়ার সখ সে আজও পূরণ করতে পারেনি। এইসব দরিদ্র মানুষগুলির চাওয়া-পাওয়া বড় ছোটো ছোটো, তবে জীবনের দুঃখ, বিপন্নতা প্রবল। আর সেই সেই বিপন্ন জীবনের এক মরমি কথাকার নীহারুল ইসলাম। 

            ধর্মীয় কুসংস্কার মানুষের স্বাভাবিক বিকাশকে কীভাবে বিপন্ন করে দিচ্ছে তা ফুটে উঠেছে ‘জোবেদাভাবির গল্প’ এ। কিবরিয়া জীবনের আনন্দ নিয়েই জোবেদাভাবির সঙ্গে অবৈধ প্রণয়ে মিলেছিল। কেননা জোবেদাভাবির স্বামী ইসরাইল যৌন জীবনে পূর্ণতা দিতে পারেনি । ফলে জোবেদা নিজের ইচ্ছা চরিতার্থের জন্য বেঁছে নিয়েছিল কিবরিয়াকে। কিন্তু একদিন কিবরিয়া পড়তে গিয়ে মসজিদের মাইকের ঘোষণা থেকে শুনতে পায় –“একজন পুরুষ পরস্ত্রীকে করে নিজেকে অপরাধী ভাবতে শুরু করে। এবং হুজুর ( সঃ ) এর কাছে গিয়ে নিজের পাপের কথা স্বীকার করে। হুজুর তখন তাকে বলেন, নামাজ কায়েম করো। নিশ্চয়ই উত্তম কর্ম অপকর্মকে মিটিয়ে দেয়।“ ( ট্যাকের মাঠে মাধবী অপেরা, সৃষ্টিসুখ সংস্করণ ২০১৬, পৃ. ৭৫ ) এই বাণীই কিবরিয়ার ভিতরে এক মনস্তত্ত্বের বীজ বপন করে। তবে কিবরিয়া এতদিন যা করেছে তা অন্যায় ! আর পাপের ভয়ের জন্য তাঁর চোখে জল আসে। সে বুঝতে পারে না আজ কী করবে ? আজ জোবেদাভাবির ওপর রাগ হয়, কেন তাঁকে দিয়ে একাজ করিয়েছে। ফলে আজ সে জোবেদার কাছে গিয়েছে এই পাপ থেকে পরিত্রাণের উপায় খোঁজার জন্য। একজন গল্পকার তো এখনই ধর্ম সংস্কারের কাছে নিজের লেখক সত্তাকে বিসর্জন দেবেন না । আর নীহারুল তো নয়ই। তাই ধর্মের ঊর্ধ্বে মানবিকতার জয়গান তিনি যেমন গান তেমনি জীবনের যে স্বাভাবিক বিকাশ সেই চিত্র আঁকেন। নীহারুলের নায়করা ধর্মের কাছে কখনই বলি হতে পারেনা। এর জন্য কোন দর্শন আয়ত্ত করতে হয় না, জীবনের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিরই জয়গান গেয়ে যান। তাই আজও কিবরিয়া ধর্মীয় সংস্কারের ঊর্ধ্বে যৌনতার স্বাদ পেয়েছে –

“কিবরিয়া বেশিক্ষণ তাকাতে পারে ন। দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। আর চঞ্চল কিবরিয়ার এই লাজুক স্বভাবটা জোবেদাভাবির খুব পছন্দ হয়। জোবেদাভাবি তাই অন আলুধালু বেশে বারান্দা ছেড়ে আঙিনায় নেমে আসে। তারপর নিজের আঁচল খসা বুকের মধ্যে চেপে ধরে কিবরিয়ার কচি মাথাটি। আর কিবরিয়া সব রকম প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, সব ঘৃণা, সব রাগও। সে কেমন অবশ হয়ে যায় যেন। আর ঠিক তখনই মসজিদের মাইক আবার গর্জে ওঠে,’বেরাদানে এসলাম…’’(তদেব, পৃ. ৭৬ )

প্রত্যহিক জীবনের ছোট ছোট সুখ দুঃখগুলিকে সামনে রেখেই নীহারুল গল্পের আখ্যান গড়ে তোলেন। আসলে গ্রামের মানুষ ছোটো ছোটো ঘটনাগুলি নিয়েও জটলা করতে ছাড়ে না। আর সেইসব ঘটনার দর্শক লেখক। ‘মামলা গোস্ত কা’ গল্পে সামান্য মাংসের দাম নিয়ে বৃহত্তর জীবনের ছবি এঁকেছেন। যেখানে রাজনীতি থেকে দালাল চক্র, গ্রামের কৃষি ব্যবস্থা ও স্বার্থসিদ্ধি মানুষের নানা প্রকার অভিলাস দেখতে পাই। কাসেম একদিন মাংস নিয়েছিল আব্দুলের কাছ থেকে। তবে আব্দুল কিন্তু মাংস বিক্রেতা নয়। নিজের হালের গোরু অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় তা কেটে  মাংস বিক্রি করেছিল। এই মাংসের দাম পেত আব্দুল। ফলে একদিন চায়ের দোকানে বাচসা বাধে। অথচ কাসেম আগেই টাকা শোধ করেছিল ভিন্ন উপায়ে। একদিন সে আব্দুলের ভাই খাইরুলের জমিতে মুজরি খেটেছিল। সেই টাকা সে আব্দুলকে দিতে বলেছিল, তেমনি খাইরুল আবার আব্দুলের কাছে ডিজেলের দাম পেত বলে সেই টাকা কেটে নিয়েছে। সেই সঙ্গে আছে গ্রাম্য রাজনীতির প্রসঙ্গ। গ্রামের প্রধান জব্বরের বড় প্রিয় কাসেম। সে প্রতিদিন জব্বরকে বাড়ি দিয়ে এসে বাড়ি ফেরে। আজ জব্বরের জন্য অপেক্ষা  করেছে, এমনকি স্টেশনেও খোঁজ নিতে গেছে, না পেয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। খেতে বসে মাংস দেখে আনন্দিত হয়েছে কিন্তু যখন শোনে এই মাংস সন্ধ্যা বেলায় জব্বর নিজে এসে দিয়ে গেছে । আজ এই মাংসকে মনে হয়েছে শত্রু, সে তা ফেলে দিয়েছে। ঘটনার কেন্দ্রে মাংসকে রেখে লেখক জীবনের বহুমাত্রিক বিন্যাসের খোঁজে অগ্রসর হয়েছে। আসলে কাসেমরা দরিদ্র সহজ-সরল বলেই নানাভাবে বঞ্চিত হতে হয়। বারবার শ্রেণিশত্রুর হাতে অত্যাচারিত হতে হয়। মুনাফা ভোগ করে জব্বররা আর এই জব্বরদের জন্য নিজেদের জীবন বাজি রাখতে হয় কাসেমদের। এই জীবনযুদ্ধের ইতিবৃত্ত নীহারুলের হাতে চমৎকার ভাবে রূপায়িত হয়। আর সে জীবন মুসলিম প্রান্তিক জীবন- তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

            সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় ভাবনা থেকে কিছু মানুষ বেরিয়ে আসছে ঠিকই কিন্তু রক্ষণশীল কিছু মানুষ তা ভালোভাবে নেয়নি। সমাজের মাথায় বসে আছে কিছু ধর্মীয় ব্যক্তি, যারা চিরকাল মানুষকে ভুল পথে চালাতে চেয়েছিল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে কিছু মানুষ নিজেই এক প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই গোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যক্তি মানুষের দ্বন্দ্ব নীহারুলের গল্পে বহু ক্ষেত্রেই দেখি। ‘আলটপকা মরিচ’ গল্পে মরিচ সেখ তেমন এক ব্যক্তি, যে সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে নিজেই এক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছিল। আর তা সম্ভব হয়েছিল বিত্তবান বলেই।  সে রোজা নামজ কিছুই পালন করেনা, এমনকি মৌলবি, মৌলানা দেখলে গালাগাল দেয়। তেমনি সমস্ত বিষয়েই তাঁর নিজস্ব মত আছে। ডাক্তাররা ধান্দাবাজ বলে সে ডাক্তার দেখায় না, এমনকি পিতা দ্বিতীয় বিবাহ করলে সে তা মেনে নিতে পারেনি, ফলে মাতার নামে বদনাম ছড়াতেও সে ভয় পায় না। তেমনি কন্যার জন্য পাত্র পছন্দ না হলে সে মুখের ওপরই বলতে পারে –“ই ছেল্যা আমার জামাই হবার উপযুক্ত লয় গো। এত কালো যে মহিষকেও হার মানাবে।“ (তদেব, পৃ. ৩১ ) প্রথম থেকেই সে রুগ্ন হয়ে চলেছিল তবুও তাঁর দম্ভ ছিল। কিন্তু ঘরের কড়িকাঠ দেখে সে যখন নিজের বয়স হিসাব করেছে তখনই এক মৃত্যুচেতনা গ্রাস করেছে। আজ মরিচ সেখ সংসারের যাবতীয় নিয়ম মেনে নিয়েছে। যৌবনের মরিচ থেকে বৃদ্ধ হওয়ার দিকে এগিয়ে যাওয়াতেই গল্পের পরিণতি ঘটেছে। আসলে গল্পও তো এক পরিণতির দিকে যাত্রা। সেই যাত্রাপথে বহু খণ্ড দৃশ্য থাকে, তবে লেখককে একসময় যাত্রা শেষ করতে হয়। এই পরিণতি বিভিন্ন লেখক বিভিন্ন ভাবে ঘটান। কেউ আকস্মিক, কেউ ডিটেলিং এ, কেউ সম্পূর্ণ করে। নীহারুল এখানে চরিত্রের সম্পূর্ণ বিকাশ ঘটিয়ে গল্পের সমাপ্তিতে উপস্থিত হয়েছেন। রবীন্দ্র কথিত সংজ্ঞা মাথায় রেখে আজ আর লেখক গল্প লেখেন না। উত্তর আধুনিক যুগের লেখক নিজেই এক গল্পের গঠন গড়ে তোলেন, যেখানে তিনি নিজেই রাজাধিরাজ। এক উত্তর আধুনিক মনন নিয়েই নীহারুলের গল্পপাঠ আজ বিশেষ জরুরি।

    ‘পরিবর্তিত প্রতিশোধ’ গল্পে এক মুসলিম নারীর জীবনযন্ত্রণার আখ্যান রচনা করেছেন লেখক। এ সমাজ নারীকে নানাভাবে ভোগ করতে চায়। সেই শোষণের হাত থেকে বাঁচতে নারীকে নানাভাবে লড়াই করতে হয়, কেউ পরাজিত কেউবা জয়ী। তবে জয় পরাজয় নয় এই শোষণই হল একমাত্র সত্য। আর সেই শোষণের চিত্র ফুটিয়ে তোলাই একজন লেখকের প্রকৃত কাজ। থুপচাট্টিরা অত্যাচারিত হয়েছে, ধর্ষিত হয়েছে, স্বামী হারিয়েছে, যৌবনের ঔদ্ধততায় সন্তানকে অস্বীকার করতে চেয়েছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত জননীসত্তাকে টিকিয়ে রেখেছে। গর্ভে কার ভ্রুণ রয়েছে সেটা বড় কথা নয় একজন নারী জননী হিসাবে তাঁকে ধারণ করেছে এটাই আজ বড় কথা। তাই নীহারুলের হাতে গড়া থুপচাট্টিরা বেঁচেছে, বাঁচার স্বপ্ন দেখেছে।  এই যন্ত্রণাবিদ্ধস্ত সময়ে একজন দরিদ্র বিধবা মুসলিম যুবতী নারী হিসাবে বাঁচা খুব বেশি সুখের নয়, তবুও বাঁচতে হবে সন্তানের মুখ চেয়ে। তেমনি ‘ডাহিন’ গল্পে পুরাতন ধ্যান ধারনাকে সামনে রেখে রাজনৈতিক সুবিধা কীভাবে সিদ্ধিলাভ হয় তা দেখিয়েছেন। এ গল্পের দুটি দিক। একদিকে পুরাতন বিশ্বাস অন্যদিকে ভোটের রাজনীতি। এই রাজনীতির খেলায় প্রাণ দিতে হয়েছে ইমরান নামক এক যুবককে। এই ইমরান এক আত্মভোলা যুবক। কেন বৃষ্টি হচ্ছে না এ প্রসঙ্গে সে বলেছিল ডাহিনের উৎপাত। ইতিমধ্যেই ভোটে দাঁড়ায় আজিজ সেখ। আজিজের ইচ্ছা ছিল ভোটে ইমরানকে ব্যবহার করবে। কিন্তু ভোটে ইমরানের কোন উৎসাহ ছিল না। ফলে আজিজ সেখ চক্রান্ত করে গ্রামের বুড়ি দাই –মাকে ডাইন বলে প্রচার করে দেয়। এমনকি ইমরানকেও খুন করায় লোক দিয়ে। কেননা ইমরান বিরোধী পক্ষে থাকলে ভোটে জেতা অসম্ভব। স্বার্থ সিদ্ধির জন্য মানুষ কোন পর্যায় থেকে কোন পর্যায়ে নামতে পারে তা লেখক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। বর্তমান সময়ে স্বার্থসিদ্ধির রাজনীতি এক কঙ্কালসার পরিস্তিতে দাঁড়িয়ে, আর নীহারুল এ গল্প আজ থেকে তিন দশক আগেই লিখে ফেলেছেন।  

                        ‘গ্রামীণ উপাখ্যান’ গল্পে প্রান্তিক মুসলিম গোষ্ঠীবদ্ধ জীনের পরিচয় আছে। একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রামের মানুষ কীভাবে জটলা করে লেখক তাই দেখিয়েছেন। সামিম হাজীর বোবা ছেলে আতিব বহুদিন আগে হারিয়ে গিয়েছিল। আজ সকালে গ্রামে এক বোবা ছেলে এসেছে। এই ছেলেকে সুবহানের মনে হয়েছে আতিব। ফলে গ্রামের মানুষের উৎসাহ আরও প্রবল হয়। সবাই ভুলে যায় কৃষিকাজের কথা। এমনকি সেই বোবা ছেলে আজ সামিম হাজীর বাড়ি পৌঁছে গেছে, এই পাগলের পিছনে চলেছে গোটা গ্রামের মুসলিম কৃষকরা। সামিম হাজীর দুই ছেলে এই পাগলকে দেখেছে তবে অস্বীকার করেনি আবার ভাই বলে স্বীকারও করেনি। কিন্তু মাতা হেজান আসতেই সমস্ত সন্দেহ দূর হয়েছে। আসলে মাতার সঙ্গে সন্তানের এক নাড়ির সম্পর্ক। তাই সবাই চিনতে ভুল করলেও মাতা কখনও  করে না, আর সেই জীবনসত্যেই লেখক কাহিনির অন্তিমে পৌঁছে যান।

                        একজন লেখক তো পরিবর্তিত জীবনস্রোতেরই গল্প লিখবেন। জীবনের প্রবাহিত স্রোতে যে ছোটো ছোটো পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে তা ধরার চেষ্টা করেবন। আর সেই পরিবর্তন মুসলিম জীবনে প্রবলভাবে দেখা যায়। কেননা ধর্মীয় সংস্কার থেকে আধুনিক জীবনস্রোতে নবীন প্রজন্ম প্রবেশ করতেই পুরাতন ধ্যান ধারণা বিসর্জন দিয়ে নবীন জীবনের খোঁজে তারা এগিয়ে গেছে। ফলে প্রবীণের সঙ্গে নবীনের দ্বন্দ্ব ক্রমশ বিরাট আকার নিচ্ছে। তারাশঙ্করের ঘরানাই নীহারুলরা এঁকেছেন মুসলিম জীবনকে কেন্দ্র করে। আসলে জীবনের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনই সত্য, তাই পুরাতন তার বিশ্বাস নিয়ে বিদায় নিতে বাধ্য হয়। ‘ট্যাকের মাঠে মাধবী অপেরা’ গল্পে লেখক সেই পরিবর্তিত জীবনের ভাষ্য বপন করেন। মুসলিম জীবনের নবীন প্রজন্ম আজ আয়োজন করেছে পঞ্চরসের। সেখানে সমস্ত নবীন প্রজন্মই উৎসাহ নিয়ে অংশ গ্রহণ করতে চায় কিন্তু প্রবীণ তার ধ্যান ধারণা নিয়ে বসে আছে। সুরত মিঞার ছেলে এক্রাম এই পঞ্চরসের প্রধান উদ্যোক্তা। এই এক্রামের সঙ্গেই বিবাহ ঠিক হয়েছে ওসমান মিঞার কন্যার। গতকাল পঞ্চরস শুনে কোন রাখালই ওসমানের বাড়িতে যেমন কাজে আসেনি তেমনি আসেনি সুরত মিঞার বাড়িতে। ফলে সকালে সুরত মিঞা নিজেই মাঠে গেছেন। আর আজ সকালে ওসমান মিঞা কন্যার বিবাহের কথা নিয়ে বিহাই বাড়ি এলে শোনেন সুরত মাঠে গেছে। এই ট্যাকের মাঠে সুরতের জমি আছে। তবে ওসমান গিয়ে খুঁজে পায়নি, বরং তাঁকে বিপদের মুখে পড়তে হয়েছে। পুকুরে এক উন্মুক্ত নারীকে দেখে নিজেকেই আড়াল খুঁজতে হয়েছে। তখনই বেজে উঠেছে পঞ্চরসের মাইক। যা কানের ভিতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করেছে ওসমানের।

    নীহারুল ইসলাম সহজ সরল ভাবেই গল্পে প্রবেশ করেন। গল্পকে কখনই জটিল করে তোলেন না। আর সে জীবনবোধের জন্য ভাষাকেও সহজ ভাবে গড়ে তোলেন। গ্রামীণ মুসলিমদের জীবনের সুখ-দুংখ, আনন্দ-বেদনাই নীহারুলের গল্পবিশ্বের মূল বিষয়। আর ভৌগোলিক পটভূমি হিসাবে বেঁছে নিয়েছেন মুর্শিদাবাদের প্রান্ত অঞ্চলের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলি। গল্পের শৈলী বা আখ্যানের নতুনত্ব নিয়ে তিনি বিশেষ ভাবিত নন। যেখানে বিপন্নতার পর বিপন্নতা নীহারুল সেখানে আখ্যানের খোঁজে না গিয়ে চোখের সামনে ঘটে চলা মানুষের বিপন্নতাগুলিকেই ধরেছেন। এমনকি গল্পের পরিণতিও ঘটেছে স্বাভাবিক ভাবে । এ বিষয়ে তিনি নিজেই জানিয়েছেন –“গল্পের পরিণতি আগে  থেকে কিছু ভাবি না। লিখতে লিখতে পরিণতি এসে যায়। আমার বেশিরভাগ গল্পের ক্ষেত্রেই সেটা হয়।“ (কী লিখি কেন লিখি , তদেব, পৃ. ১৭৩ ) তিনি নিজের ভূগোলে থেকে সেখানকার মানুষদের সমস্যাগুলিকে ধরেছেন, সেগুলিকেই কালের প্রবাহে সর্বজনীন পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন –এটাইবা কম কি ! মুসলিম মিথ, লোকাচার বিশ্বাস –সংস্কারের দ্বন্দ্ব, প্রথা-প্রথাভাঙা, কর্ম-কর্মহীনতা নিয়ে তিনি গল্পের আখ্যান গড়ে তোলেন। মুসলিম জীবনের ভিতরে চোরাস্রোতে যে পরিবর্তনের আভাস ঘটে চলেছে ক্রমাগত তা অঙ্কন করেন। নীহারুলের ভাষাটা স্বচ্ছ। মনস্তত্ত্বের আশ্চর্য পরিবর্তন চিহ্নিত করলেও গল্পের টেকনিক বা স্টাইল নিয়ে তিনি ভাবিত নন। জীবনের সত্য যেভাবে উঠে এসেছে তাই  তিনি বুনে চলেছেন। ধর্মীয় জীবন ও ধর্মান্ধ সমাজের মধ্যেও তিনি আদর্শ নায়কের পরিকল্পনা করেন, বহমান জীবনের ওপরের স্তরকে অতিক্রম করে গভীরে যে জীবনসত্য তার আভাস দিয়ে যায় নীহারুলের নায়করা।

35