Categories
crime

হদিশ মিলল পাখি পাচার চক্রের, ব্যবসা কয়েক কোটি টাকার

ওয়েবডেস্ক, মার্চ ৩২,২০২১: উত্তর কলকাতার গ্যালিফ স্ট্রিটে বসে প্রতি রবিবার পাখির বাজার ৷ তাকে ঘিরে রয়েছে কয়েক কোটি টাকার মুনাফা করা সক্রিয় আন্তর্জাতিক পাখি চোরাচালান চক্র । এমন ই চাঞ্চল্যকর তথ্য কোনো দিনই জানতে পারতেন না গোয়েন্দারাও , যদি উত্তরপ্রদেশের উননাও থেকে হাজি মহম্মদ ফরিদ ধরা না পড়ত৷ তাকে জেরা করেই জানা গিয়েছে, কলকাতা এবং সংলগ্ন উত্তর ২৪ পরগনায় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় এই পাখি চোরাকারবার চক্র৷ দমদম বিমানবন্দর দিয়ে গত বেশ কয়েক বছর ধরে দিল্লি তো বটেই, চিন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং দুবাইতে পাখি পাঠানোর ব্যবসার বাড়বাড়ন্ত হয়েছে৷ এই চোরাচালান চক্রের হদিশ পাওয়ার পর পুলিশকর্তারা এটা ভেবে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছেন এটা দেখে যে বিমানবন্দর ব্যবহার করলেও, চক্রের পাণ্ডারা এত দিন ধরা পড়েনি৷
তবে এ বার সেই চক্র ঠেকানোর ব্যবস্থা হচ্ছে৷ ফরিদকে জেরা করে পাচার চক্রের মাথাদের হদিশ মিলেছে৷ কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের সাহায্য নিতে কিছু দিনের মধ্যেই উত্তরপ্রদেশ এসটিএফের কর্তারা শহরে আসছেন৷ যৌথ অভিযান চলবে কলকাতা ও শহরতলিতে৷ উত্তরপ্রদেশ এসটিএফের বরিষ্ঠ আধিকারিক পি কে মিশ্র জানিয়েছেন, ‘ছোট্ট অথচ সুন্দর করে সাজানো বাক্সের ভেতর ওষুধ দিয়ে এমন ভাবে পাখিগুলো রাখা হত, যাতে নিঝুম হয়ে থাকলেও সেগুলো বেঁচেবর্তে থাকে৷ তার পর বিমানপথে সেগুলো পাঠানো হত বাইরে৷’ অনেক ক্ষেত্রে আবার ক্যুরিয়ারের মাধ্যমে এমন ভাবে পাখি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে তাদের অক্সিজেনের অভাব না হয়৷ গত পাঁচ বছর ধরে কলকাতাকে কেন্দ্র করে কয়েক কোটি টাকা মুনাফা করেছে এই চক্র৷ কলকাতা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার রাজীব মিশ্র জানিয়েছেন, ‘ওঁরা এখানে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে চাইলে আমরা অবশ্যই সাহায্য করব৷’

চোরাচালান চক্রের পাণ্ডারা প্রত্যেকেই পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা৷ এদের মধ্যে মহম্মদ কাদেরের বাড়ি তপসিয়ায় এবং মহম্মদ জাহিদ ও বাচ্চুর বাড়ি উত্তর চব্বিশ পরগনার বসিরহাট মহকুমার শাকচুড়া গ্রামে৷ কলকাতার গ্যালিফ স্ট্রিট এবং শহরতলির বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে এই চক্রের দালালরা বিভিন্ন দামি পাখির খোঁজ করত৷ গ্যালিফ স্ট্রিটের পাখিবাজারে যাঁরা পাখি বিক্রির জন্য আসেন, তাঁদের মোটা টাকার টোপ দেওয়া হত৷ দিল্লি-সহ বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো ছিল এদের এজেন্ট৷ তারা মোটা টাকার বিনিময়ে বিদেশের অর্ডার ধরে দিত৷ গত দু’ বছরে প্রায় দেড় কোটি টাকার পাখি এ ভাবে বাইরে পাঠানো হয়েছে৷
ধৃত ফরিদের কাছ থেকে প্রচুর দামি পাখি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে৷ জেরায় সে স্বীকার করেছে, শুধুমাত্র বিদেশে নয় বিহার, গুজরাট এবং মুম্বইতেও বিভিন্ন সময় পাখি সরবরাহ করা হয়েছে৷

গত বছরের আগস্ট ও অক্টোবর মাসে ,যথাক্রমে উত্তর ২৪ পরগনার আংরাইল ও তেঁতুলবেড়িয়া সীমান্ত থেকে বিএসএফের হাত থেকে উদ্ধার হয়েছিল ‘কিল বিলড টাউকান’ নামের এক বিরল প্রজাতির পাখি। গোয়েন্দারা জানতে পারেন, এগুলি কলকাতায় নিয়ে আসার কথা ছিল।

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি আলিপুর চিড়িয়াখানায় খাঁচা থেকে চুরি যায় তিনটি ‘কিল বিলড টাউকান’। সম্প্রতি একটি পাখির ঠোঁটজোড়া উদ্ধার হয়েছে খাঁচার কাছেই একটি গাছের তলা থেকে , ফলে সেই পাখিটির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। বাকি দু’টি পাখি চোরাপথে পাচার করা হয়েছে কিনা এমন সম্ভাবনা গোয়েন্দারা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। বাংলাদেশ থেকে আসা পাখি পাচারকারীরা কাদের হাতে চোরাই পাখি তুলে দেয় তাদের পরিচয় ও বিবরণ জানতে পারলে টাউকানের হদিশ মিলতে পারে বলে ধারণা গোয়েন্দাদের।

অন্যদিকে , বিএসএফের গোয়েন্দা সূত্র থেকে জানা গেছে , গত বছরের জানুয়ারি থেকে এখনও পর্যন্ত উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে প্রায় ৮৮০টি বিরল ও বিদেশি পাখি উদ্ধার করা হয়েছে। রবিবার ৬টি কাকাতুয়া পাচার করতে গিয়ে বিএসএফের গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়ে এক পাচারকারী। তাকে জেরা করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। তাঁদের মতে, এই তথ্য অনুযায়ী কলকাতার পাখি পাচারকারীদের সন্ধান মিলতে পারে। সেই সূত্র ধরেই পৌঁছনো যেতে পারে চিড়িয়াখানা থেকে চুরি যাওয়া টাউকানের কাছে।

উত্তর ২৪ পরগনার ঘোজাডাঙা এলাকা থেকে বিএসএফের গোয়েন্দারা একটি স্কুটি আটক করে , ইলিয়াস হোসেন গাজিকে গ্রেফতার করে । সে উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট থানা এলাকার পানিতারের ঘোজাডাঙার মাজিদপাড়ার বাসিন্দা। জেরার মুখে সে বিএসএফের গোয়েন্দাদের জানিয়েছে, ” গত পাঁচ বছর ধরে পাখি পাচারের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার ডুমরার বাসিন্দা পাখি পাচারচক্রের পাণ্ডা হারুনের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ ও রয়েছে , দাদা নাসিরুদ্দিন গাজিও এই কারবারের সঙ্গে জড়িত ” । এছাড়াও পাখি পাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ঘোজাডাঙার বাসিন্দা শাহাবউদ্দিন মণ্ডল, রাজু মণ্ডল, রেহান মণ্ডল বলে জানায় ইলিয়াস। সে আরও বলে , ” পানিতরের নিখিলপাড়ার বাসিন্দা রেহান মণ্ডলই বিরল পাখি কলকাতায় পাচার করে “। রেহানের কাছে বাংলাদেশের সিমকার্ড থাকে বলে জানায় সে। গোয়েন্দাদের ধারণা ওই ব্যক্তিকে ধরতে পারলে টাউকানের খোঁজ মিলতে পারে।

এদিকে, গত নভেম্বরে রঙ্গিপোতা সীমান্ত থেকে পাখি-সহ গ্রেপ্তার হয়েছে বাংলাদেশের চুয়াডাঙার আজমত মুসারিফ। বাংলাদেশের আজমতের বিরুদ্ধে লাগু হয়েছে বিদেশি আইনও। টাউকানের রহস্য সমাধানে তাকেও জেরা করতে চান গোয়েন্দারা।

43

Leave a Reply