সাধন দাস

দুধ মেরে ক্ষীর হয়। গ্রাম শুকিয়ে শহর। শহর গুটিয়ে রইস এলাকা। সেখানে নদী বয়, মৃদুমন্দ বায়ু। বিস্তীর্ণ বালুচরে বিস্তৃত আকাশ। সূর্য, চন্দ্র, তারাদের উত্‍সব লেগেই থাকে। মাটির তারারা সেখানে ঝাঁকঝাঁক বাস করেন।

ঝাঁ চকচকে রাস্তা। ভিক্ষা নিষিদ্ধ। পথের কোণে আমি আর মা থাকি। সাঁ সাঁ গাড়ি ধায়। খটাখট ঘোড়া, মশমশ বাবু।

মা ঘরে সেলাই করে। হাত জোরা থাকে। তাই দুয়োর খুলে রাখে। যদি কেউ আসে। মাথা নিচু। সেলাই মেসিনের শব্দ হয়। মা কথা বলে না। মাঝে মাঝে পথের দিকে চেনা চলার থেমে যাওয়া শব্দে চোখ তুলে তাকায়। মা ভিক্ষে করে না।   

 আমি চুরি করিনা। চুরি করা বেআইনি। চুরি চুরি খেলা শিখি। দিন গড়িয়ে যায়।

পথের নীচে বালুচর, পার হয়ে নদী। চারখানা ভাঙা নড়বড়ে খুঁটিতে দাঁড়িয়ে, অর্ধেক নদী অর্ধেক চরে, চরের ঢালে পথের টংয়ে আমাদের ঘর। গায়ে ছেঁড়া, সাততালি হোগলার জামা। ফুটো-ফাটাগুলো জানালা দরোজা। বাতাস লাগলেই দোলে। দাঁতনড়া ঘরখানা ভয়ে হাসতে পারে না। লজ্জায় লুকিয়ে থাকে। সন্ধে হলে মা বুকে প্রদীপ জ্বালিয়ে দুয়োরে দাঁড়িয়ে প্রণাম করে। পথে চলন্ত মানুষের চোখে প্রদীপের বুক পোড়ানো আলোয় মায়ের মুখ মোহময় নারী হয়ে ওঠে।  

 জন্ম হলেই মেয়েমানুষের কাজ ভালোবাসা, হাসা। মা তাকেই ভালোবাসে, যে আসে। কেউ না আসলে, মা নিজেই ভালোবাসতে বেরিয়ে পড়ে।  মায়ের হাত ধরে আমিও বেরিয়ে পড়ি খেলাচ্ছলে চুরি শিখি। রাত কেটে যায়।

ঘরের নড়বড়ে খুঁটিগুলো নিজেরা দাঁড়াতে পারে না। ফাগুনের ফুরফুরে বাতাসে কি কুলুকুলু জোয়ারেও হরবকত্ থরথরিয়ে কাঁপে। খুঁটিতে আঁটা ঘরখানা ঠেকিয়ে রাখতে নানান কিসিমের টানা দেওয়া চারদিকে। 

 একখানা গরুবাঁধা দড়িতে টানা দেওয়া এমপিবাবুর খাটালে। একখানা সরু অদৃশ্য তারে জজসাহেবের ভিতে। আর একখানা রঙদার টানা দেওয়া,ডিএম, এসপির জোড়াবাংলোয়। একখানা শিকলে বাঁধা নোঙরে। নোঙরখানা স্টিমারের। স্টিমারে সাংবাদিক সংঘের ক্লাবঘর। টানা থেকে টানা দেওয়া দু একটা ছুটছাট দড়িদড়া কলকারখানার মালিক ব্যবসাদারদের পাঁচিলে, আস্তানায়। 

 তবু ঘরখানা ঝড়ে পড়োপড়ো। বৃষ্টিতে ভাসার উপক্রম, খরায় জ্বলে, জারে কাঁপে। সদাই টলোমলো। এই বুঝি, টুপ করে খসে পড়ে গঙ্গায়। ভেসে যায় কুটোর মতো।

রাতের অন্ধকারে চুপি চুপি জজসাহেবের পেশকার আসে। মা হাসে। না হাসলে ভিতের টানা কেটে দেবে। মা ভয়ে হাসে। আমি ঘরের তলায়, বালির চরে খেলাচ্ছলে লুকিয়ে থাকি। লুকিয়ে থাকায় আমার নিজেকে চুরি করতে শেখা। এখান থেকে অনুভব করি ঘরের কাঁপুনি। পেশকার কাঁপে শীত্‍কারে। মা আর ঘর কাঁপে বেঁচে থাকার আতঙ্কে। আমি চুরির ফাঁকতাল খুঁজি। 

 ডি এম সাহেবের আর্দালিও চুরি করে আসে। মা হাসে। 

  এমপিবাবুর ডানহাত, মালিক, ব্যবসাদারের কেউ না কেউ যাঁদের যাঁদের বাড়িতে, দেওয়ালে কোথাও না কোথাও ঘরখানার টানা দেওয়া আছে, সব বাবুরাই লুকিয়ে চুরিয়ে আসে। মা হাসে। নইলে, তুলে দেবে, খুলে দেবে, বাঁধন ছিঁড়ে দেবে। ঘরখানা ভেসে যাবে, তলিয়ে যাবে। সেই ভয়ে মা সবাইকে ভালোবাসে।  বাবুরা যাওয়ার সময় মাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেন। চুমু খান, বাঁধনের ভরসা দিয়ে যান। বাবুরা না আসলে, মা হাসে না। হাসতে না পারলে মা হাঁপিয়ে ওঠে। মা তখন নিজেই ভালোবাসতে আর হাসতে বেরিয়ে পড়ে।  টানার বাঁধনগুলো বাঁচাতে হবে তো!

আমিও বেরিয়ে পড়ি। মা কড়ে আঙুল কামড়ে, মাথায় – থুঃ থুঃ! থুক্কুড়ি দেয়।

লুকিয়ে থাকতে থাকতে ভয়ে আমি বেঁটে আর রোগা থেকে বেঁটে আর রোগা হয়েই যাই। মা ক্রমাগত স্লিম হয় আর আপশোষ করে, খোকার বাড় নেই। কবে যে বড়ো হবে? তখনও মা হাসে। হাসিতে ঘর খানা কাঁপে।

61