বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জনজীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

দেশভাগকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল নানা ছিটমহল। আর সেই ছিটমহলের মানুষের সমস্যার কথা আমরা পেয়েছিলাম অমর মিত্রের গল্প উপন্যাসে। দেশকে একটি কাঁটাতার দিয়ে বিচ্ছেদের ফলে কি ভয়ংকর সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল তা বুঝতে পেরেছিল সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষেরা। সেই সীমান্তের কথাই উঠে এল ‘অথ সীমান্তকথা’ গল্পে। গল্পটি স্বতন্ত্র ও ব্যতিক্রম। শাসন আইনের কাছে মূল্যবোধের অবক্ষয় কি ভয়ঙ্কর হতে পারে তা এ গল্প পড়লে বোঝা যায়। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে কুলদা রায়ের ‘মেঘনাদবধ’ গল্পের কথা। মধুসূদনের কোনো দেশভাগ হতে পারে না তাই বালক ছেলেটি ওপারবঙ্গে থেকে এপারে আসার সময় ‘মেঘনাদবধ কাব্য’টি ওপারবঙ্গেই রেখে এসেছিল। এ গল্পের নায়ক আহম্মদ, বাড়ি রাঢ়বঙ্গে। রাঢ়বঙ্গে পূর্বে বাড়ি ছিল ওপারবঙ্গের কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের। দেশভাগে তাঁকে দেশত্যাগ করতে হয়েছে। সেই রাঢ়বঙ্গের প্রেক্ষাপটে তিনি একটি গল্প লিখেছেন, যাতে আহম্মদের চরিত্র ধরা পড়েছে। তাই আহম্মদ সেই লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করে নানা বই নিয়ে সীমান্ত দিয়ে এপার বাংলায় আসে। আর এই বই নিয়েই বিপত্তি ঘটে, বি.এস.এফরা তাঁকে সন্দেহ করে এই বইয়ের জন্য। এমনকি মানসুর আলি ওপার বাংলায় কন্যার বাড়ি থেকে কোরান শরিফ নিয়ে এসেছিলেন বলেই তাঁকে বি.এস.এফ. বাধা দেয়, লাদেনের চর মনে করে। কোরান তো বিভেদের কথা বলে না, সংর্ঘষের কথা বলে না, বলে শান্তির কথা। কিন্তু সেই কোরান নিয়েই আজ বিপদে পড়তে হয়েছে মানসুর আলিকে। আসলে লেখকের এ ব্যঙ্গ ধর্মীয় ভারতবর্ষের প্রতি। মেঘনাদের দেশভাগ হতে পারে না আর কোরান শরিফ নিয়ে একজনকে বিপদের সামনে পড়তে হয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবী কীভাবে পাল্টে যাচ্ছে, মূল্যবোধের অবক্ষয়ে কীভাবে মানুষের শুভবোধ গুলি বিপথে চালিত করছে সেগুলিই লেখক বড় করে দেখিয়েছেন। আর এই মূল্যবোধের অবক্ষয়ে বলি হতে হয়েছে দুই মুসলিম মানুষ মানসুর ও আহম্মদকে।

                                                    একবিংশ শতাব্দীতে মূল্যবোধের অবক্ষয় আজ ভয়ংকর প্রশ্নের মুখে। আর সেই বিদ্ধস্ত মূল্যবোধকে নিয়েই গড়ে উঠেছে নীহারুলের ‘ভিড়’ গল্প, অবশ্য মুসলিম পরিবারের প্রেক্ষাপটে লেখা। মূল্যবোধের অবক্ষয় আজ মানুষকে কত ভয়ংকর পথে চালিত করে তার দৃষ্টান্ত হাজি । অনেক প্রাচীন বলেই বোধহয় এমন নাম। হাজির দুই পক্ষ। প্রথম পক্ষের  তিন ছেলে। বড় ছেলে জকিম। সামান্য মানুষ থেকে সে আজ হাজিতে পরিণত হয়েছ, ধর্মকর্মে মন দিয়েছে। হাজি তাঁর দ্বিতীয় বিবিকে খুন করিয়েছিল বড় ছেলে জকিমকে দিয়ে কৌশলে। জকিমকে পাসপোর্ট করে হাজি পাঠায় বাংলাদেশে। জকিম রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পেরিয়ে এসে খুন করে সৎমাকে। খুন করে আবার সে ওপারে চলে যায়। জকিমের পাসপোর্ট যেহেতু বাংলাদেশে তাই সরকারি ভাবে সে বাংলাদেশে রয়েছে কিন্তু খুনটি করেছিল জকিমই – এই বুদ্ধি ছিল ব্রিটিশ হাজির। কিন্তু এখন প্রশ্ন হল দ্বিতীয় স্ত্রীকে খুন কেন ? গল্পকারের মুখেই শোনা যাক- “ খুন করালে কেনে শুনবা ? খুন করালে টাকার লেগে। ওই বুটার নামে মেলা টাকার জীবনবিমা ছিল, ওই জীবনবিমার টাকার লেগে।“ (তদেব, পৃ. ১৭৩) মূল্যবোধের চরমতম অবক্ষয় এ গল্পে প্রাধান্য পেয়েছে, আর তাঁতে বলি হতে হয়েছে একটি নারীকে। আসলে আমরা যতই মুখে নারীবাদের প্রশ্ন বলি যুগের ক্ষেত্রে নারী শোষণ আজও অব্যাহত – আর সেই শোষণে প্রবলভাবে শোষিত হতে হয় মুসলিম নারীদের। সেই সব বঞ্চিত নারীরাই নীহারুলের গল্পে উঠে আসে। তবে ধর্মান্ধতার প্রতি বিশ্বাস নেই লেখককের। ধর্মের নক্করজনক দিকগুলি ফুটিয়ে তুলতেই তিনি সিদ্ধহস্ত – এক্ষেত্রে এক উদার মানবপ্রেমিক জীবনবোধের শিল্পী নীহারুল ইসলাম।

        ‘শতছিটের ঝোলা’ গল্পটি গড়ে উঠেছে ভিখারি নরুকে কেন্দ্র করে। গল্পটি বন্যার প্রেক্ষাপটে লেখা। প্রবল ঝড়, বৃষ্টি ও বন্যার হাত থেকে রক্ষা পেতে নরু বাবলা গাছে আশ্রয় নিয়েছিল। কিছু লোক তাঁকে নামিয়েছিল কাঁধে থাকা ঝোলার জন্য। কিন্তু সে ঝোলাতে কিছুই ছিল না। নরু আজ আশ্রয় পেয়েছে ভগবানগোলা হাইস্কুলে । অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘দুইবার রাজা’ গল্পে দেখা গিয়েছিল প্রতিটি মানুষই জীবনে দুইবার রাজা হয়- এক বিবাহের সময় আর মৃত্যুর সময়। এ গল্পের বন্যা বিপন্ন ভিখারি নরু যেন আজ মহারাজা –“ বাবলা গাছে তিনদিন আটকে ছিল বলেই তার আকর্ষণ এত। ভগবানগোলা হাইস্কুলের দোতলায় একটি ঘর সে একা পেয়েছে। বনভাসি শহরে সে এখন ভিআইপি। বিভিন্ন দলের স্থানীয় নেতারা এসে তার খোঁজ –খবর নিয়ে যাচ্ছে দু- বেলা। আর সবাই তাকে নিয়ে আলোচনা করছে।“ (তদেব, পৃ. ১১৭)

        মুসলিম জীবনে সবচেয়ে বড় উৎসব  ঈদ। আর এই ইদের সাতকাহন নিয়েই গড়ে উঠেছে ‘ইদ’ গল্পটি। ইদ মহম্মদ এ গল্পের নায়ক। ধর্মের রীতি- নীতি, আচার- আচারণ, ধর্মীয় প্রথার প্রতি তাঁর অগাধ বিশ্বাস। ধর্মীয় প্রথা অতিক্রম করে অনেকে যেমন এগিয়ে এসেছে তেমনি অনেকের রয়েছে ধর্মের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। এই দুই শ্রেণির দ্বন্দ্ব ও শ্রেণিচরিত্রের কথা উঠে এসেছে ইদ মহম্মদের কথার মধ্য দিয়ে। সাড়া মাস ধরে ইদের ব্রত পালন করা কারো জীবনে আনন্দ আবার কারো জীবনে দুঃখের সমস্তই লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। আসলে লেখকের লক্ষ ছিল ইদকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজ মানস ফুটিয়ে তোলা। সে সমাজের ভাঙা- গড়া, ঐতিহ্যেকে অতিক্রম করে এগিয়ে আসার প্রয়াস, গণ্ডিবদ্ধ সমাজে থেকেও গণ্ডিকে অস্বীকার, ব্যক্তিজীবন কোথাও শ্রেণিচরিত্রে মিশে যায়, আবার সঙ্গবদ্ধ জীবনকে অতিক্রম করে নিঃসঙ্গ নায়ক হিসেবে এগিয়ে যাওয়া – এসবই নীহারুলের বিষয়। আর সে সব বিষয় ফুটিয়ে তুলতে নীহারুল এক দক্ষ চিত্রকর। তবে ধর্মান্ধতার প্রতি আঘাত যে করেন না তা নয়। ধর্মের নঞর্থক দিকগুলির প্রতি আঘাত, ব্যঙ্গ এনেই তিনি গল্পের উত্তরণে এগিয়ে যান। গল্পের আখ্যানের জন্য যেটুকু প্রয়োজন সেটুকুই তিনি করেন, কোন নীতিবিদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন না।

            মুসলিম ধর্মের ঐতিহ্য – প্রথার নবরূপ, হাদিস ও কোরানের নির্দেশ নিয়ে মৌলবীরা কীভাবে সমাজকে শোষণ ও বিপথে চালিত করে সেই প্রেক্ষাপট গড়ে উঠেছে ‘জেনা’ গল্পটি। সমাজকে সঠিক পথে চালিত করতে কখনও যে মিথ্যা ধর্মের আবরণও প্রয়োজন হয় তা প্রকাশ পেয়েছে। আসলে ভয়কে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে ভক্তি – এই বাস্তব সত্যের মুখোমুখি তিনি পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেন। গ্রামে এসেছেন হুজুর। তিনি নানা ধর্মীয় উপদেশ দিয়ে যান। ‘জেনা’ শব্দের অর্থ হল অবৈধ প্রণয়। হুজুরের কথা মতো ইসলাম ধর্মে অবৈধ প্রণয় নিষেধ। অথচ কোরানের কোথাও সে কথা লেখা নেই। অথচ হুজুর তা কোরানের নির্দেশ বলেই চালিয়ে দিয়েছেন। এক মৌলবীর প্রশ্নে তিনি জানান- “ ওসব কেতাবয় কথা হয় মৌলভী। কেতাবে যা আছে তা দিয়ে মানুষকে আর পাপ থেকে বিরত করা যায় না। তাই ওসব মনগড়া কথা বলতে হয়। না হলে মানুষকে আল্লাহর রাস্তা দেখানো যাবে না। কারণ মানুষের চরিত্র হচ্ছে এমন, যেটা যত বেশি নিষেধ করবে সেটার প্রতি তার আগ্রহ বাড়াতে তত।“(জেনা, বাংলা ছোটগল্প, বিজিত ঘোষ সম্পাদিত, পুনশ্চ, প্রথম সংস্করণ ২০০৯, পৃ. ৩০৪ )হুজুরের সেবায় নিযুক্ত রাবিয়া। হুজুরের দৃষ্টি গেছে আজ রাবিয়ার প্রতি। হুজুর রাবিরয় সঙ্গে যৌন মিলন ঘটাতে চান। রাবিয়া দোজখের দীঘল কাঁটার কথা বললে হুজুর বলে –“ এতদিন দুনিয়ার কত মানুষ এল গেল। কত মানুষ এমন পাপ করলে- তাদেরই শাস্তিতেই সে গাছের কাঁটা ক্ষয়ে গাছের সাথে মিশে গেছে। তাতে না হয় আল্লা একবার ছ্যাঁচড়ে ওঠানামা করালেই বা।“(তদেব, পৃ. ৩০৯) সামাজিক দিক থেকে মুসলিম সমাজ এমনিতেই পিছিয়ে। আজও সেখানে অব্যাহত রয়েছে ধর্মীয় শাসন। সেই ধর্মীয় শাসনের অপব্যাখ্যা মানুষকে কীভাবে ভ্রান্ত করে সেই দিকটিই তুলে ধরেছেন লেখক। 

            নীহারুলের ভূগোলের মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তিনি তাদের দেখেছেন বিরাট কালের পটভূমিকায় ও নগ্ন বাস্তবতার নিরিখে। সহানুভূতি বোধ যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে নিরপ্রেক্ষ মানসিকতা। নিজের সমাজ বলে তিনি সমস্তই ভালো বলে ঘোষণা করেন নি, নীহারুলের নায়করাই তার প্রতিনিধি। জীবনবোধের এক সার্বিক মমত্ত্ব নিয়ে তিনি গল্পের ফসল ঘরে তুলেছেন। সমস্ত ক্ষেত্রেই যে সাফল্য হয়েছেন তা নয়, তবে তাঁর দেখাটা জীবন্ত। আপাত সরল ভাবেই তিনি গল্প শুরু করেন, তবে গল্প নির্ণয়ে এক অন্তহীন রুদ্ধশ্বাস নিয়ে উপস্থিত হন। নিজস্ব ভূগোলের মানুষরাই তাঁর নায়ক। গল্পের উপাদানের জন্য তিনি বড় ভূগোলে যান না। তবে গল্পকে চিরকালীন করে তোলার এক অনায়াস ভঙ্গি সহজেই চোখে পড়ে। 

30