বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জনজীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

নীহারুলের লেখার বিষয় মুসলিম সমাজ। আর সে সমাজ প্রান্তিক অঞ্চলের জনজাতি। মুর্শিদাবাদ সংলগ্ন অঞ্চলই তাঁর লেখার প্রেক্ষাপটে উঠে আসে। মুসলিম নারী জীবন নিয়ে লেখা একটি অসাধারণ গল্প হল ‘ বেরাদানে ইসলাম’। রাবিয়া নামে এক বঞ্চিত নারীর জীবনযাত্রার অমোঘ ধ্বনি পাওয়া যায় এ গল্পে। রাবিয়ার সঙ্গে বিবাহ হয়েছিল এক্রামের। এক্রাম ছিল পেশায় চোর। স্বাভাবিক ভাবে কিছুদিনের মধ্যেই এক্রামের মৃত্যু ঘটে। এক্রামের মৃত্যুর পর রাবিয়া বেঁচে থাকতে পেশা হিসেবে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে। সেই ভিক্ষা জীবনের কাহিনিই এ গল্পের কেন্দ্রীয় বিষয়। ইসলাম ধর্ম- কর্মে রাবিয়ার বিশ্বাস আছে কিন্তু লোকাচার পালনে সময় নেই, ফলে তাঁর নামাজ পড়া হয় না। যৌবনে ভিক্ষা করতে অনেক গ্লানি সহ্য করতে হয়েছে। তাবে রাবিয়া বুঝে গেছে ভিক্ষা জীবনে গ্লানিই সত্য। আজ মসজিদ নির্মাণকল্পে ধর্মীয় সভা হবে কেরামতের বাড়ি। কেরামত ছিল চোর, সে ছিল এক্রামের সাথি। সেই কেরামতই আজ হয়েছে ধর্মীয় ব্যাপারে উৎসাহী। পরকালের চিন্তা প্রাধান্য পেয়েছে কেরামতের। ধর্মীয় বাণী শুনে রাবিয়ার মনে আজ প্রশ্ন জেগেছে পরকাল নিয়ে। তেমনি ইসলাম ধর্মের নঞর্থক দিকগুলি লেখক তুলে ধরেছেন। পয়সা দিলেই নরকে স্থান হবে না। কিন্তু রাবিয়া তো নিজেই খেতে পায় না, সে কি দেবে আল্লাকে ! লেখক অসাধারণ ভাবে তা ফুটিয়ে তুলেছেন –

“রাবিয়া নামেতে বিবি দুটি আন্ডা দিল

খোদা তুমি তার যত গুণাহ মাফ করে দিও

দয়ার সাগর তুমি রহমানও রহিম

তুমি বিনা গতি নাই রাব্বুল আলামিন।“ (তদেব, ৫৩)

কিন্তু এখানেই শেষ নয়, ডিম ঘরে আনার সময়ই কুপির আলো নিভে যায়। প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার প্রতি লেখকের প্রতিবাদ এখানেই। তবে রাবিয়ার প্রতি লেখকের সহানুভূতি আছে। তিনি বড় যন্ত্র করে গড়ে তুলেছেন রাবিয়াকে। আশ্চর্য সুন্দর ভাবে তিনি রাবিয়া চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা গুলি তুলে ধরেছেন। তেমনি নারী জীবনের অন্দরমহল – বাহিরমহল, ধর্মীয় নীতি সম্পর্কে ভীরুতা ও ধর্মকে অতিক্রম করে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার প্রবণতা গুলি প্রকাশ পেয়েছে। অন্যদিকে ‘ফুলজানের সংসার’ গল্পে একটি মুসলিম নারীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লষণ প্রবণতা ধরা পড়ছে। স্বামী জইনুদ্দিন ও ছেলে জামিলকে নিয়ে সুখের সংসার ফুলজানের। স্বামী জইনুদ্দিন বাইরে কাজ করে, ঈদ উপলক্ষে বাড়ি ফিরেছে। ঈদের আগে বাড়ি ফেরেনি বলে ভাগে গরুর মাংস কেনা হয় নি তাই দুটি মোরগ কিনে এনেছে। উৎসব শেষে জইনুদ্দিন ফিরে যাবে কর্মস্থলে, সে এবার কর্মস্থলে ছেলে জামিলকে নিয়ে যেতে চায়। সন্তান অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় মাতার মনচেতনা বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। মোরগ ডাকা সকালে ঘুম ভেঙেছে ফুলজানের, হৃদয় ছিন্ন করে আজ বিদায় জানাতে হবে স্বামী- পুত্রকে।তাই ফুলজানের চিন্তা জগতে প্রাধান্য পেয়েছে ট্রেন যেন না আসে কিংবা পিতা ইব্রাহিম কীভাবে নিজের সন্তান ইসমাইলকে হত্যা করেছিল সে প্রসঙ্গ। হৃদয়কে শতছিন্ন করে ফুলজান স্বামী- পুত্রকে বিদায় দিয়ে ঘরে শুয়ে থাকে। কিন্তু জনুদ্দিনরা আজ ট্রেন পায় নি ফলে বাড়িতে চলে আসে। এই আসার আনন্দেই গল্পের উপসংহার টেনেছেন লেখক। বঞ্চিত নারী ফুলজান স্বামী- পুত্রকে আরো একদিন কাছে পাবে। সেই সুখ চরিতার্থ করতে ফুলজান আজ মোরগ দিয়ে পোলাও রান্না করেছে। মোরগ ডাকেই আজ ফুলজানের ঘুম ভেঙছে। এ ডাক যেন স্বামী –পুত্রকে হারানোর ইঙ্গিত। কাল থেকে স্বামী- পুত্র আর থাকবে না তাই মোরগের আর প্রয়োজন নেই। ফুলজান আজ সুখী – এ সুখ ক্ষণিক তবুও তো কিছুটা অশ্রুলাঘব হবে। এঁরা নিম্নবিত্ত পরিবারের সাধারণ মানুষ। এঁরা যেন ত্যাগের ব্রত নিয়েই পৃথিবীতে জন্মছে। তবুও একটু সুখের প্রত্যাশী- জীবনকে এমন ভাবেই উপলব্ধি করতে চান ফুলজান নামক মহিলরা।

            বঞ্চিত নারী আয়েষাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ‘ ঘাইহারিণী’ গল্পটি। আয়েষা শহরে শিক্ষিত মেয়ে। অরিতকে বিবাহ করে সে গ্রামে এসেছে। গ্রামের এই নিঃসঙ্গ জীবনে সে ক্লান্ত হয়ে ওঠে। পুত্র সানুকে নিয়ে কিছুটা হলেও সে ক্লান্তির অবসান ঘটে। সানুকে নিয়ে বেরিয়ে পরে প্রতিদিন ঘুরতে। কিন্তু স্বামী সঙ্গ পায় না। স্বামী অরিত মগ্ন ব্যবসায়, বাড়ি ফিরে স্ত্রীর প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ। আয়েষা ও সানু বিকালে বেড়াতে গিয়ে কিছু অচেনা যুবকের নজরে পরে। সেখান থেকে বাড়ি এসে স্বামীকে নিয়ে রবিবার বিকালে নতুন করে ঘুরতে যাবার পরিকল্পনা করে। কিন্তু রবিবার বিকালে ব্যবসা ছেড়ে আসে না অরিত। এই প্রতিশোধ সে ছেলে সানুকে আঘাত করে তোলে। গল্পের নামটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। নিজের বিপদ জেনেও যেমন হরিণ জলপানে নামে আজ তেমনি অয়েষা নিজেকে এগিয়ে দিতে চাইছে অচেনা যুবকদের কাছে। কেনই বা দেবে না ? সংসার থেকে সে তো কিছুই পায় নি। নিজের জীবনকে তিল তিল করে ধ্বংসের পথে নিয়ে গেছে। সেখান থেকে কেন-ই বা মুক্তি পাবে না একটি মেয়ে। শহরে শিক্ষিত একটি মেয়ে গ্রাম্য জীবনে গণ্ডিবদ্ধতার মধ্যে শেষ করে দেবে নিজের স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা – এটি লেখকও চান নি। তেমনি রয়েছে নারী স্বাধীনতা। আয়েষা মুসলিম পরিবারের বধূ হলেও প্রগতিশীল নারী। আসলে সময়ের সাথে সাথে সমাজ মানসের যে পরিবর্তন সেটাই লেখক দেখাতে চেয়েছেন।

 “নষ্ট মূল্যবোধের ক্ষয়ে যাওয়া এক দেশের, স্রোতের বিরুদ্ধে সন্তরণগত মানুষেরা নীহারুলের নায়ক। মুখের বিচিত্র ভাষায়, চোখের তারার অযুত বিভঙ্গে তারা কথা বলে। তাদের কত রং, ঢং, কত বাসনা, বেদনা, কত বিলাপ। এ যেন নানান ভাবভূষণের চরিত্রের এক চিত্রশালা।“(শক্তনাথ ঝাঁ, ঘাট অঘাটের বৃত্তান্ত গ্রন্থের কভার পেজ)

সেই  নষ্ট মূল্যবোধের অবক্ষয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে ‘আমিন’ গল্পে। তেমনি গ্রামীণ জীবনের ব্যভিচার নির্ভর পঙ্কিল সমাজ ব্যবস্থা উঠে এসেছে। আর জীর্ণ সমাজে সবচেয়ে বেশি শোষিত হতে হয় নারীদের। সাবিহারের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি ছিল ফিন্টুর, তাই সাবিহার স্বামী আমিন খুন করে ফিন্টুকে। খুনি আমিন দীর্ঘদিন পলাতক। সেই সাবিহাই আজ ধর্ষিত হয়েছে। প্রান্তিক জনজীবনে নারীদের নিজস্ব কোন কণ্ঠ নেই, সমাজের স্রোতই যেন তাদের কণ্ঠ। সেই স্রোতের বিরুদ্ধে গেলে বর্জিত তো হতেই হয় এমনকি পুরুষশাষিত সমাজ নিজের ইচ্ছা মতো ব্যবহার করে নারীদের। সাবিহা সেই শোষিত নারীদেরই প্রতিনিধি। সে ধর্ষিত হয়ে বাগানে পড়েছিল। গ্রামের কেউ এগিয়ে এসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় নি, পুলিশ যখন আসে তখনও সাবিহার প্রাণ ছিল। ধর্ষণের প্রশ্ন নয়, একটি নারী ধর্ষণকে কেন্দ্র করে গ্রাম্য জীবনে যে ব্যভিচার, ধর্মীয় বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল সেটিই লেখকের মূল লক্ষ। আর সে লক্ষ পূরণে বলি হতে হয়েছে সাবিহাকে। তেমনি রয়েছে ধর্মকে আশ্রয় করে বাঁচার চেষ্টা ও ধর্মীয় দলাদলি। নীহারুলের চরিত্ররা প্রতক্ষ্য দেখা বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই উঠে আসে। এজন্য তাঁর গল্পের প্রেক্ষাপট একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে নীহারুলকে আমি আঞ্চলিক শিল্পী বলতে অনিচ্ছুক। লোকাল কালারকে ফুটিয়ে তুলতে চরিত্র উপযোগী ভাষা ব্যবহার করলেও এক সার্বজনীনতাবোধ তাঁর গল্পে রয়েছে – এজন্যই নীহারুল কালের কথাকার, সময়ের কথাকার। যে সময়ে প্রান্তিক মুসলিম জনজীবন নানাভাবে খণ্ডিত- দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছে। সেই খণ্ডিত সময়-সমাজকেই তিনি এক সরলরেখায় বুনে চলেন। তাঁতি যেমন সমস্ত শাড়ি বুনতে বুনতে শাড়ির ভূখণ্ড একটু কারুকার্য করে তোলে, শিল্পীত হাতের চিহ্ন বুনে দিয়ে যায় কথক নীহারুল ইসলামও তেমনি। ভূগোলকে সামনে রেখে তিনি মানুষের গল্প বলতে চান, যে মানুষ ভারতবর্ষ নামক দেশের প্রান্ত থেকে প্রান্তরে প্রতিনিয়ত পিষ্ট হয়ে চলেছে। 

            দেশভাগ, হিন্দু- মুসলিম নরনারীর প্রেম ও গ্রাম-শহরের মেলবন্ধন নিয়ে একটি চমৎকার গল্প হল ‘সীমানা ছুঁয়ে’। কলকাতার শিক্ষিত হিন্দু যুবক চাকরি সূত্রে এসেছেন মুর্শিদাবাদের এক গ্রামে। অরিত ভাড়া থাকে মুসলিম ইলিশাদের বাড়ি। ইলাশার সঙ্গে তাঁর নৈকট্য, সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নানা ধরণের খোলা মেলা আলোচনায় অংশ নেয় ইলিশারা। এমনকি একে ওপরের প্রতি টানও অনুভব করে। তবে লেখক ইচ্ছা করলেই তাঁদের মিলিয়ে দিতে পারতেন- কিন্তু লেখক পিছিয়ে এলেন। আফসার আমেদ ‘একটি গিটার’ গল্পে দুটি হিন্দু মুসলিম প্রেমিককে মিলিয়ে দিয়ে সম্পর্কের সেতুবন্ধন রচনা করেছিলেন। কিন্তু নীহারুল কৌশলে সে প্রসঙ্গ থেকে গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দেন। দেশভাগে খণ্ড হওয়া দুটি দেশ আর মিলতে পারে না, তেমনি একটি সম্প্রদায়ের সঙ্গে অন্য সম্প্রদায়ের বিবাহও হয়ত নিরার্থক। দেশের ঐতিহ্য দেশভাগ ও পদ্মার ভাঙনে কীভাবে লুপ্ত হয়ে গেছে তা ইলিশা যেমন তুলে ধরেছেন তেমনি অখণ্ড বাঙালি সত্তা কীভাবে খণ্ডিত হয়েছে সে প্রসঙ্গও এসেছে। পাঠকের স্বাদ চরিতার্থে সামান্য অংশ তুলে ধরি-

“ এই জায়গা মুসলমানদের কবরস্থান। মুসলমানরা মরলে তাদের দাফন হয় এমন কবরস্থানে। অভিভক্ত বাংলায় এখানে কবর দেওয়া হত। এখন হয় না। আগে নিশ্চয়ই আশেপাশে গ্রাম ছিল। সে-সব গ্রাম দেশভাগ কিংবা পদ্মার স্থান পরিবর্তনের কারণে নিশ্চিহ্ণ হয়ে গেছে। কিন্তু কবরস্থানটি ঠিক আছে, দেখুন। ঘাসে ঘাসে কেমন ঢেকে গেছে। দুই দেশের সীমারেখা নির্ধারণ করেছে। কীভাবে করছে, সেটা দেখবেন ? তাহলে আসুন আমার সঙ্গে। বলে ইলিশা তাকে ঘাসে জঙ্গলে ঢুকিয়েছিল এবং দেখিয়েছিল আন্তর্জাতিক সীমা নির্ধারণকারী একটি কংক্রিট পিলার। যার একদিকে ইণ্ডিয়া লেখা, অন্যদিকে লেখা বাংলাদেশ। সেটা দেখিয়ে ইলিশা তাকে বলেছিল, এই পিলারটি হয়তো কোনো অখণ্ড বাঙালি মানুষের বুকের উপর বসে আজ সমগ্র বাঙালিকে খণ্ড –খণ্ড করে রেখেছ।“(তদেব, পৃ. ৬৭)

সতীন সমস্যা বাঙালি জীবনের চিরন্তন সমস্যা। সেই সমস্যাকে সামনে রেখেই লেখক গড়ে তুলেছেন ‘ভিমরতি’ গল্পটি। সেই সঙ্গে আছে গ্রাম্যজীবনের প্রচলিত অন্ধবিশ্বাসময় কুসংস্কার জীবন। সাবের আলির দুই স্ত্রী – কুলসুম ও মাসকুরা। প্রথম বিবি নিঃসন্তান হওয়ায় সে বিবাহ করে মাসকুরাকে। এই মাসকুরা কীভাবে ডাইনি ভূত হয়ে গিয়েছিল তাঁকে কেন্দ্র করেই এ গল্প গড়ে উঠেছে। মাসকুরা কেন জিনে পরিণত হল তার কোনো ইঙ্গিত লেখক দেননি। এমনকি মাসকুরা কেনই বা স্বামী সাবের আলির জীবন দংশন করলো তারও কোন ইঙ্গিত নেই। এমনকি বড় সতীন কুলসুমের সঙ্গে কোন দ্বন্দ্ব ছিল না মাসকুরার। একবিংশ শতাব্দীতে বসে গল্পটিকে অলৌকিক না বলে জাদুবাস্তবতার মধ্য দিয়ে দেখা যেতে পারে। একালের গল্পকাররা আর কেউই কাহিনি নিয়ে গল্প লেখেন না। গল্প লেখা তাদের কাছে একটি রহস্য। আর সে রহস্যের জাল ভেদ করতে হয় পাঠককে। মাসকুরার জীবনে  কিছুরই অভাব ছিল না, তবুও সে কেন সাবেরকে আত্মহত্যা করলো তা এক গোলকধাঁধা। এমনকি মাসকুরা সত্যিই সাবেরকে হত্যা করেছিল কি না তা উপলব্ধি করা যায় না। গল্পের ভাষা অনুযায়ী দেখা যায় গাছের ডালে সাবের আলির দেহ ঝুলছে, গল্পকারের মতে মাসকুরা ভূতই এই কাজটি করেছে। সাবের ও মাসকুরার জীবনে কোন কিছুরই অভাব ছিল না, তবুও কেন এই আত্মহত্যা, এ যেন জীবনানন্দের ভাষায় –

“ বধূ শুয়ে ছিল পাশে – শিশুটিও ছিলো ;

প্রেম ছিলো, আশা ছিলো – জ্যোৎস্নায় – তবু সে দেখিল

কোন ভূত ? ঘুম কেন ভেঙে গেলো তার ?

অথবা হয়নি ঘুম বহুকাল – লাশকাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার।“(  আট বছর আগের একদিন, জীবনানন্দ দাশ ) 

একথা স্বীকার করতেই হবে লেখার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার জগৎ লেখকের বড় কাঁচামাল। সেই অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখেই নীহারুল বাবু গল্পের কাহিনি গড়ে তোলেন। সীমান্তবর্তী এক জেলা মুর্শিদাবাদ। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে গঙ্গা নদী। নদীভাঙন, সীমান্ত সমস্যা, বি.এস. এফ এর অত্যাচার,দুপারের মানুষদের আনাগোনা- এ সবই লেখকের চোখে দেখা বাস্তব অভিজ্ঞতা। আর এই অভিজ্ঞতাগুলিই উঠে এসেছে তাঁর গল্পে। সেই অভিজ্ঞতার কথা তিনি মুসলিম চরিত্রদের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। এমনই একটি গল্প হল ‘উগ্রপ্রন্থী’। আজাদ বিয়ে করেছে বাংলাদেশের সুলতানগঞ্জের কন্যা শায়েরাকে। শায়েরার শ্বশুরবাড়ি ও বাপের বাড়ির মধ্যে ব্যবধান মাত্র দুই মাইল। তবে দুটি আলাদা দেশ, এখানে সীমান্ত শাসন তেমন কঠিন নয়। খুব সহজেই এপার ওপার করা যায়। শায়েরা বাপের বাড়ি যাবার জন্য কৌতুহলী, এমন সময়ই আসে মামাতো ভাই এমদাদ। সে ছিল চোরাকারবারের সঙ্গে যুক্ত। আজাদ দিনমজুর, সংসারে স্বচ্ছলতা নেই, তবুও সে চোরাকারবারে যুক্ত হয় নি, সে বাবার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলে – “ আজাদের বাপ ভুলু শেখ বলত, বর্ডারে বাড়ি বাপ, খেতে না পেলেও দুনম্বরি করিস না। দু- নম্বারি কামাই, হারামের কামাই।“( তদেব, পৃ. ৮৮) এমদাদ এখান থেকে চোরাই মাল নিয়ে গেছে কোলকাতায়। এমনকি যাবার সময় শায়েরার দুই ছেলেকে একশো টাকা দিয়ে গেছে। আজাদ গরিব কিন্তু সে সৎ। তাই সে টাকা তাঁর  পৌরুষত্বকে আজ ক্ষত – বিক্ষত করেছে। তবুও সে টাকায় সে স্ত্রী- পুত্রদের ওপারে পাঠিয়েছে। কিন্তু পুলিশ আজ চোরাচালনে আজাদকে সন্দেহ করে গ্রেফতার করে। শান্ত সহজ- সরল মানুষটি আজ বিনা দোষে পুলিশের হাতে পড়েছে –

“হঠাৎ তখনই সে শুনল, কেউ তাকে উদ্দেশ্য করে বলছে, একেবারে নাড়াচড়া করবি না। আমরা পুলিশের লোক। আমরা তোকেই ধরতে এসেছি। তোর বন্ধু তোর বাড়ি থেকে গিয়ে শেয়ালদার হোটেলে আমাদের হাতে ধরা পড়েছে।

আজদের মুখে কোনো কথা নেই। তার কোনো কৌতূহলও নেই আর। কেমন অবশ হয়ে পড়েছে তার দেহ- মন। তবুও সে দেখেছে, চোখ বন্ধ অবস্থায় দেখেছে যেন আব্দুলের দোকানের টিভিতে , চারিদিকে পুলিশ বেষ্টিত এক উগ্রপন্থীকে। যে ধরা পড়ল এক্ষুণি,এই মুহূর্তে।“( তদেব, পৃ. ৯৪)

সহজ –সরল গ্রাম্য জীবন কীভাবে পাল্টে যাচ্ছে লেখকের ইঙ্গিত সে দিকে। উত্তর- ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটের ফলে গ্রাম্য জীবনে প্রবেশ করেছে অর্থের ভাণ্ডার। আর অর্থের পিছনে কার লোভ নেই- ফলে পাল্টে যাচ্ছে গ্রাম্য জীবন। আর সেই পরিবর্তনে বলি হতে হয়েছে হাজার হাজার নিরাপরাধ মানুষকে- আজাদ তেমনই একজন। যে সারাজীবন চোরাচালানকে ঘৃণা করে এসেছে আজ তাঁকে গ্রেফতার হতে হয়েছে উগ্রপন্থী হিসেবে। এই ভবিতব্যই লেখকের উপজীব্য। মাংস বিক্রেতা নুজেদকে নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘তর্পণ’ গল্পটি। নুজেদ চরিত্রের বিবর্তন লেখক আশ্চর্যজনক ভাবে দেখিয়েছেন। যৌবনে নুজেদ ছিনতাইয়ের জন্য জেলে গিয়েছিল তখন নুজেদের বাবা না খেয়ে ক্ষুধায় মরেছে,আজ নুজেদর কাছে অনেক টাকা কিন্তু খাওয়ার লোক নেই- সেই ব্যক্তি ট্র্যাজেডিই এ গল্পের কেন্দ্রীয় বিষয়। তাই প্রতি মহালয়ায় সে অভুক্ত পথের কুকুরদের ভাত – মাংস খাওয়ায়, এ যেন পিতৃপুরুষের প্রতি তর্পণ –

“ আমার জন্মদাতা বাপ একমুঠ ভাতের লেগে তড়পে তড়পে মরেছে ! ঘুরে ফিরে সে কথা মনে পড়ছিল। হামার অন্তর কাঁদছিল। আর হাসি দেখছিলাম মেলা কুকুর ! যারা হামার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। না খেতে পাওয়া পাতলা – দুবল কুকুর সব। কী জানি কেন, এদের দেখে হামার নিজের বাপের কথা মুনে পড়ছিল। বাপের না খেতে পেয়ে মরার কথাটাও। তাই সেদিন হামার নিজের লেগে হোটেল থেকে আনা ভাত- তরকারি এদেরকে খেতে দিয়েছিলাম।“ (তদেব, পৃ. ১৮৪)

 এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে প্রফুল্ল রায়ের ‘জন্মদাতা’ গল্পের কথা। এ গল্পের বীভৎসতা তারাশঙ্করের ‘অগ্রদাণী’ গল্পকেও হার মানায়। বিষ্টুপদ উচ্চবংশীয় বিতাড়িত যুবক। তাঁর বাস সংসার ছেড়ে শ্মশানে। বিষ্টুপদ শুনেছে তাঁর পিতার মৃত্যু ঘটেছে । অথচ তাঁর কাছে কোন অর্থ নেই। তাই সে অন্যের দেওয়া জলের তলায় পড়ে থাকা নৈবেদ্য পিতৃতর্পণের উদ্দেশ্যে দেয়। নিম্মবিত্ত মানুষ কতভাবে বেঁচে থাকে, বাঁচার জন্য কত কৌশল আবিষ্কার করতে হয় তা লেখক নিপূণ ভাবে দেখিয়েছেন।

    ‘বক্তিয়ারের ঘোড়া’ গল্পে  উঠে এল মুসলিম জীবনের সমষ্টির কথা। গ্রাম্য পাহাড়ায় আছে কিছু মুসলিম যুবক। এ গল্প যেন চরিত্রের চিত্রশালা। মতিবুল , বক্তিয়ার চরিত্রগুলি স্বতন্ত্র ভাবে উঠে এসেছে। বাংলা ছোটগল্প চর্চায় প্রায় তিন দশক ধরে নিযুক্ত নীহারুল। ব্যক্তি জীবন – সমষ্টি জীবন সব একাকার হয়ে গেছে গল্পের মধ্যে। কোন তত্ত্ব বা জটিল বিষয়ের অবতারণা করেন না তিনি, তাঁর চরিত্ররা যেন সরলরেখা ধরে চলে। প্রচলিত বাস্তব সত্য ও গল্পেরে সত্য মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় তাঁর গল্পে। ‘আড়বাঁশি’ গল্পটি গড়ে উঠেছে আত্মভোলা শুকরুদ্দিকে কেন্দ্র করে। শুকরুদ্দি জগৎ জীবন সম্পর্কে উদাসীন অন্যদিকে শুকরুদ্দির পিতা জয়নাল সম্পন্ন গৃহস্থ চাষি। শুকরুদ্দির জন্য পিতার অনেক চিন্তা। লেখক নিজেই বলেছেন –

“ তার চার ছেলের তিনটি গেরস্থালিতেই খাটে। আল্লা তাকে খুব সুখ দিয়েছে। যদিও একটা নিজস্ব দুঃখ আছে তার। দুঃখটা তার বড়োপুত শুকরুদ্দির জন্য। আল্লা ছোঁড়ার কাজ করার ক্ষমতা নেই। বলে দিলেও পাবে না। শুকরদ্দি এমনই হুঁশমোটার হুঁশমোটা “(তদেব, পৃ. ১০১)

 উদাসীন আত্মভোলা বলেই সাইফুদ্দিন তাঁর কন্যার সঙ্গে শুকরুদ্দির বিবাহ দেয় নি। শুকরুদ্দি সম্পর্কে সাইফুদ্দিনের বাঁকা কথা সেদিন বুকে বড় বেজেছিল পিতা জয়নালের। এজন্যই জেদের বসে সে গঙ্গাপ্রসাদ গ্রামের চাঁদতলার সঙ্গে ছেলের বিবাহ দেয়। জয়নাল ভেবেছিল বিবাহ হলে বোধহয় শুকরুদ্দির পরিবর্তন হবে কিন্তু আত্মভোলা শুকরুদ্দি যেন – ‘বন্ধনহীন হরিণশিশু’। সে সংসারের জাঁতাকলে বন্দি হতে চায় না। জয়নাল মাঠ থেকে বাবলা গাছের গুড়ি আনার কথা বলেছিল পুত্রকে। কিন্তু সুকরুদ্দি এ কাজ করেনি বলে বেদম প্রহার করে পিতা। অবশেষে জয়নাল পুকুরে স্নানে গিয়ে দেখে বাবলাগাছের গুড়ি শুকরুদ্দি একাই পুকুর ঘাটে নিয়ে এসেছে স্নানের সুবিধার জন্য। পুত্রের এই দক্ষযজ্ঞ সুলভ কর্ম দেখে আনন্দিত হয়ে সে। যে সাইফুদ্দিন এতদিন নিন্দা করেছিল সেই আজ প্রশংসা করেছে শুকরুদ্দির। শত্রুর মুখে এই কথা শুনে  আনন্দে গর্বে বুক ভরে ওঠে জয়নালের –

“ জীবনে এই প্রথম শুকরুদ্দির জন্য জয়নালের বুকের ছাতি চওড়া হয়। আঘাতে সে আর দাঁড়ায় না। পুকুরেও নামে না। ঘুরে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করে। কিছুক্ষণ আগে ছোঁড়াকে সে পিটিয়েছে খুব। পিটিয়েছে ওই বাবলার গুঁড়িটার জন্য। অথচ ছোঁড়ার জন্য তার খুব কষ্ট হচ্ছে।“( তদেব, পৃ. ১০৬)

গ্রামের এই সহজ –সরল মানুষগুলিকে নিয়েই নীহারুলের কথাভুবন। সামান্য তুচ্ছ বিষয়েই এই মানুষগুলো খুশি হয়। আর তাদের জীয়নচিত্র তুলে ধরতে এক সফল চিত্রকার নীহারুল ইসলাম।

31