পিয়ালী মিত্র

 -‐– ইয়ে …. মানে গতমাসে তোমাকে  যে টাকাটা ….

— আরে হ্যাঁ, এই তো পরেশদা , আপনাকেই তো খুঁজছিলাম । কিন্তু, কি বিপদ বলুন তো, দাদা ?

—– কেন কি বিপদ হলো আবার  ? 

—– আরে না না ; এ বিপদ সে বিপদ নয় । মানে বলছিলাম আর  আধা মিনিট আগেও যদি আপনার সাথে দেখাটা হতো  …

বড়ো বড়ো  চোখ করে  পরেশবাবু বললেন, ” তালে কি হতো ? “

—- তালে ঐ মুরগীটা আপাতত  প্রাণে   বেঁচে যেতো , আর কি !

—‐ তা মুরগীর সাথে আমার কি সম্পর্ক সেটা তো ঠিক বুঝলুম না , নিখিলেশ  ? 

—- আরে , মুরগীর সাথেই তো আপনার সম্পর্ক,  মশাই ….. ঠিক বুঝলেন না তো ? আরে মশাই, অনেক খুঁজে  আপনাকে না পেয়ে শেষে ঐ টাকাটায়  মুরগীটাই কিনে ফেললাম ; রবিবার বলে কথা ; বুঝলেন কিনা ! হেঁ হেঁ  হেঁ ….

—- ও ,,, তাতে কি ? ঠিক আছে পরে দিও ক্ষণ । ভারী তো একশোটা টাকা ….

মুখে এ কথা বললেও মনে মনে বেজায় অসন্তুষ্ট হলেন পরেশবাবু  । কিন্তু, কি করা যাবে ! সহকর্মী অখিলেশের মাসতুতো ভাই নিখিলেশ । একটা তো ভদ্রতা আছে । অবশ্য এই সব টাকা পয়সা  ধার দেওয়া নেওয়ার ব্যাপারে অখিলেশ  বিন্দু – বিসর্গ কিছুই জানেনা । পরেশবাবুও তাঁকে কিছু বলেননি।

              আসল ব্যাপারটা হলো ,পরেশবাবুর সাথে নিখিলেশের এই বাজার করতে এসে প্রায় রোজই দেখা হয় । মাসখানেক আগে বাজার করতে গিয়ে একশটা টাকা কম পড়ে নিখিলেশের । তখন পরিচিত হবার সুবাদে পরেশবাবু সেই টাকাটা নিখিলেশকে ধার দেন । এর পর থেকে রোজই কোন না কোন ছুতোয় টাকাটা ফেরত দেওয়ার  ব্যাপারটা নিখিলেশ সন্তর্পণে  এড়িয়ে যায়  । নরম সরম শান্ত স্বভাবের পরেশবাবু বেশি কিছু বলতেও পারেননা । 

        এদিকে ঐ একশো টাকাটা পরেশবাবুর জীবনটাকে প্রায় অতিষ্ঠ করে তুলেছে । প্রতিদিন বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পর পরেশবাবুকে  খুব ভালো করে  বুঝতে হয় , তিনি কত বড়ো অপদার্থ  ; কিভাবে তিনি একটি সোজা সরল অবলা নারীর জীবন নরক করে দিয়েছেন, তাঁর মতো আস্ত বোকা মানুষকে পেলে কি ভাবে মাথায় হাত বুলিয়ে লোকে সব লোপাট করে নেবে , আর তখন ছেলেপুলে নিয়ে পথে বসতে হবে  ইত্যাদি ইত্যাদি আরো অনেক কিছু  । তাই ঐ একশটা টাকা এখন তাঁর ‘চোখের  বালি ‘। যতক্ষণ না ওটা আদায় করে এনে গিন্নির হাতে দিচ্ছেন ততক্ষণ ওই অবলা নারীর হাত থেকে এ বিষয়ে তাঁর নিস্তার নেই । তাই, যত্পরোনাস্তি ভদ্রতা বাঁচিয়ে তিনিও নিখিলেশের পিছনে পরে রইলেন । 

—- না না , দাদা , ও কথা বলবেন না । একশো টাকা কি কম ? বিনা পরিশ্রমে কি আর ওটা পাওয়া যায়  ? আপনি  এক কাজ করুন, পরেশদা , বিকালে মধুর চায়ের দোকানে আসুন।  তখন দিয়ে দেবো আপনাকে ।

—- আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে।  তাই হবে ক্ষণ ।

এই বলে দুজনে যে যার বাড়ির পথে এগোলো । বিকেলে পরিপাটি সেজে – গুজে গিন্নিকে টাকাটা আনতে যাওয়ার আশ্বাস দিয়ে পরেশবাবু  নির্দিষ্ট সময়ে মধুর চায়ের দোকানে গিয়ে হাজির হলেন । সেখানে অবশ্য গিন্নির ভবিষ্যত্ বানীকে মিথ্যা করে দিয়ে নিখিলেশ আগে থেকেই এসে দাঁড়িয়ে ছিলো। অন্ততঃ  ‘ নিখিলেশ কিছুতেই আসবেনা ‘  গিন্নির এই ভবিষ্যত্ বানীটি না ফলতে দেখে পরম নিশ্চিন্তে  পরেশবাবু বত্রিশ পাটি বের করে  এগিয়ে গেলেন ।

—- এই তো পরেশদা, এসে গেছেন । চলুন মধুর চা খাওয়ার আগে পাশের দোকানের কবিরাজী কাটলেটটা  খাই । এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঐ কাটলেটের গন্ধে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছিনা , দাদা । তবে , হ্যাঁ, আগেই বলে রাখি  দাম  কিন্তু  আমি দেবো । এ বিষয়ে আপনি বয়সে বড়ো হলেও কিন্তু আপনার কোন কথাই আমি  শুনবো না ।

পরেশবাবু লজ্জিতভাব দেখিয়ে বললেন, ” আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে।  তাই দেবে । ” 

কাটলেট খেতে খেতে ‘এই দোকানটা ছোট হলেও খাবারের গুণগতমান, বিক্রেতার অমায়িক ব্যবহার, প্রতিটি খাবারের  ন্যায্য দাম’  ইত্যাদি নানান জেনারেল নলেজ পরেশবাবুকে নিখিলেশ দিয়ে দিলো । কিন্তু,  যে জন্য এখানে আসা সে বিষয়ে  কোন কথাই  উঠলো না ।

কিন্তু, ইতিমধ্যে একটা ভয়ঙ্কর সর্বনাশ হয়ে গেছে সেটা আবিষ্কৃত হলো কাটলেট এবং চায়ের দাম বাবদ ৬০ টি টাকা দিতে যাওয়ার সময়  । নিখিলেশের পকেটমার হয়েছে । কখন কোন সময়ে ব্যাটা  পকেটের মধ্যে হাত ঢুকিয়েছে , একটুও টের পায়নি সে । যদি একবারও  একটুও টের পেতো , চোর ব্যাটাকে সে বুঝিয়ে দিতো , কার পকেট কাটতে এসেছে সে ! 

—– পকেটমার কি আর জানান দিয়ে পকেট কাটে ? ওদের হাতের কারসাজিই আলাদা।  যা দিন কাল পড়েছে ! তা যাইহোক, কত টাকা গেলো ?

—— আর বলবেন না পরেশদা , আপনার একশো টাকাটা ছাড়াও আরো শ’দেড়েক টাকা ছিলো । ইয়ে,,, মানে সব মিলিয়ে প্রায় আড়াইশো টাকা মতোন তো হবেই । 

“যাক গে , যা হয়ে গেছে তা নিয়ে আর মন খারাপ করে কি হবে ! সন্ধ্যে হয়ে গেছে, চলো বাড়ি যাওয়া যাক , ” বলে পরেশবাবু চা কাটলেটের ৬০ টাকা মিটিয়ে দুজনে যে যার বাড়ির পথে হাঁটা দিলো ।

           বাড়ি ফিরে এই সাঙ্ঘাতিক ঘটনা গিন্নিকে সবিস্তারে জানালে গিন্নি হাউমাউ করে চিত্কার করে কাঁদতে শুরু করলো । নিখিলেশের দুঃখে গিন্নিকে এইভাবে কাঁদতে দেখে পরেশবাবু প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও পরে  নিজ পরলোকগত পিতৃদেবকে দূষতে  শুনে স্পষ্ট বুঝতে পারলেন এ কান্না নিখিলেশের দুঃখে নয় । সেদিন  বাবার  বিচারে সুদর্শন, বিদ্যান, সরকারী চাকুরেরত সুপাত্রকে বিয়ে করে সত্যিই গিন্নি আজ মহা বিপাকে পড়েছে  । এরথেকে কদাকার , কম শিক্ষিত, সাধারণ উপার্জনকারী কোন বুদ্ধি  – সুদ্ধি সম্পন্ন পাত্র কি তার জুটতো না ! এই দুঃখেই গিন্নি মর্মাহত হয়ে পড়েছে ।

             গিন্নির হা – হুতাশ শুনে পরেশবাবু  নিজের  বোকামি বুঝতে পারলেন  । আর, তখন আরো  জেদ চেপে বসলো ঐ একশো টাকাটা আদায়ের জন্য  । অন্য সময় হলে হয়তো ঐ একশো টাকাটার মায়া তিনি ত্যাগই করতেন । কিন্তু, আর তো তা হবার নয়  । এবার  তিনি যেন  তেন প্রকারে ঐ টাকাটা আদায় করে দেখাবেনই যে,  ‘হ্যাঁ, তিনিও পারেন ।’

              এই ঘটনার পর দিন তিনেক কেটে গেছে।  বাজারে এই তিন দিনের মধ্যে নিখিলেশের সঙ্গে আর দেখাও হয়নি  । গিন্নিও এই তিন দিনের মধ্যে ও বিষয়ে আর কোন কথা তোলেনি । কিন্তু, পরেশবাবুর ঠিক শান্তি হচ্ছে না কিছুতেই  । তাই আজ আপিস ফেরতা বিকালে নিখিলেশের বাড়ি যাবার সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললেন । বাড়িটা ঠিক কোথায় সেটা পরেশবাবু ভালো করে জানতেন না । তবে, শুনেছিলেন মনসাতলায় পদ্মপুকুরের পাশেই নিখিলেশের বাড়ি।  অফিস থেকে রিক্সা ভাড়া ওই ৩০ টাকা মতোন । তো সে যাইহোক, মনসাতলা আর পদ্মপুকুরের ভরসাতেই একটা রিক্সায় চেপে বসলেন । মনসাতলায় পদ্মপুকুর বলে যেখানে রিক্সাওয়ালা নিয়ে গেলো, সে পুকুরে পদ্ম তো দূর অস্ত একটা শাপলাও নেই । পঁচা এঁদো পুকুর একটা । দেখে বোঝা গেলো মহল্লার সব বাড়ির আবর্জনা এখানেই ফেলা হয়  । যাইহোক, ঠিক কোন বাড়িটা নিখিলেশের সেটা খুঁজতেও দুই একবার চক্কর মারতে হলো । তারপর অবশ্য খুঁজে পাওয়া গেলো। রিক্সা ওয়ালাও মওকা বুঝে ঘোরাঘুরির জন্য ৩০ টাকার জায়গায় ৫০ টাকা ভাড়া নিয়ে নিলো । 

—– ওমা, পরেশদা যে ! কি মনে করে ! আসুন আসুন ….

—- না , সেদিন বলছিলে , মাসিমার হাঁটু ব্যাথার তেলটা পাচ্ছিলেনা , তাই , আমাদের ওখানে পেলাম তাই ভাবলাম দিয়ে যাই । 

—- মার হাঁটু  ব্যাথার তেল ! তা ভালোই করেছেন । তবু তো এটার জন্য আপনি পায়ের ধূলো দিলেন আমার বাড়ি । বসুন বসুন । কত নিলো ২০ টাকা তো ? এক একটা দোকান মশাই এক এক রকম দাম চায় । 

—- আরে, না না মাসিমার জন্য সামান্য মালিশের তেল ,,,, তার আবার  দাম কি ! ও কথা বলো না । তা তোমার  মেয়ে দুটি কোথায়  ?

      নিখিলেশের ডাকে রিদ্ধি সিদ্ধি নামের বছর পাঁচেকের দুটি মিষ্টি যমজ বোন এসে দাঁড়ালো।  পরেশবাবু সৌজন্যতার খাতিরে দুজনের জন্য   চল্লিশ চল্লিশ আশি টাকা দিয়ে দুটো ক্যাডবেরী এনেছিলেন।  সে দুটো দুজনকে দিলে তারা হাসি মুখে ভিতরে চলে গেলো । 

–‐-‐ আরে, যদি একটা ফোন করে আসতেন …. আসলে আমার স্ত্রী সুলেখা বাড়িতে নেই । সেলাই ক্লাশে গেছে । আপনাকে যে একটু চা খাওয়াবো তারও উপায় নেই । মা তো আবার হাঁটুর ব্যাথায় বিছানা থেকে উঠতেই পারেনা ।

—– না না সে ঠিক আছে । আমি  এবার  উঠবোও । তা বলছিলাম, ওই একশো ….

—– হ্যাঁ হ্যাঁ টাকাটা তো  ! দাঁড়ান । 

বলে নিখিলেশ ভিতরে চলে গেলো । মিনিট দুয়েক পরে ফিরে এসে বললো , ” আলমারির চাবিটা যে কোথায় রেখে গেছে , কিছুতেই খুঁজে পেলাম না । আরে , পরের দিন বাজারে …..

—- না না বাজারে কখন দেখা হয় আর না হয়  তার তো ঠিক নেই ! আমি কালকে বৌদী থাকতেই আসবো।  ফোন করেই আসবো । 

—– ও,,, কালকে ? কালকে তো আমি থাকছিনা । একটু রানাঘাট …

—- তাতে কি ? বৌদী  তো থাকবেন।  আমি  আসবো।

নিখিলেশ বেগতিক বুঝলো । একবার  যদি সুলেখার কানে যায় একশো টাকা সে ধার করেছে ; তবে কেন, কোথায়, কিভাবে সব নাড়ি নক্ষত্র টেনে বার করবে । তখন কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে যাবে । তাই, নিখিলেশ আর বিলম্ব না করে একশো টাকাটা ফেরত দিয়ে দেওয়াই শ্রেয় বলে মনে করলো। 

—- আপনি একটু দাঁড়ান, পরেশদা।  আপনাকে আবার কষ্ট করে আসতে হবে  !!! দেখি কোথাও যদি পেয়ে যাই তো আপনাকে দিয়ে দিতে পারি । 

                     বলে ভিতর থেকে একশোটি টাকার একটা নোট  এনে পরেশবাবুর হাতে দিয়ে বললো, ” ভাগ্যিস মার বালিশের নিচে ছিলো ! “

                  পরেশবাবু  টাকাটি নিয়ে পরম শান্তিতে বিজয়ের হাসি হাসতে হাসতে  আবার কুড়িটি টাকা রিক্সা ভাড়া দিয়ে  বাড়ি ফিরলেন ।

                    গিন্নির হাতে একশো টাকাটা দিয়ে কিভাবে বুদ্ধি করে কথার মার প্যাঁচে সেটা আদায় করেছেন সেটা সবিস্তারে গিন্নিকে  জানালেন । 

               সবটা শুনে গিন্নি চিত্কার করে বলে উঠলো, ” হা, ভগবান, এ কার পাল্লায় ফেলেছো আমায় ? দুশো তিরিশ টাকা খরচা করে একশো টাকা এনে , আবার  বুদ্ধি  ফলাচ্ছে, গো ,,,  !!!! “

32