বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জনজীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

নীহারুল ইসলাম (১৯৬৭)  উঠে এসেছেন মুর্শিদাবাদের লালগোলা থেকে। নয়ের দশকে বহরমপুরের ‘রৌরব’ পত্রিকায় প্রথম গল্প ‘ফুলি’ প্রকাশিত হয়। কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের সংস্পর্শে এসে সাহিত্যজীবন বিশেষ ভাবে সংগঠিত হয়েছে একথা নিজেই বলেছেন। কলেজ জীবনে কবিতাই লিখতেন। কিন্তু হাসান আজিজুল হকের ‘শকুন’ গল্পটি পড়ে কথাসাহিত্যে প্রবেশ করে যান। এযাবৎ কাল তিনশ এর অধিক গল্প লিখেছেন। প্রকাশিত হয়েছে অনেকগুলি গল্প সংকলন –‘পঞ্চমব্যাধের শিকার পর্ব’, ‘জেনা’, ‘আগুনদৃষ্টি ও কালোবিড়াল’,’ ট্যাকের মাঠে মাধবী অপেরা’ ( ‘সোমেন চন্দ পুরস্কার’, ২০১০), ‘ঘাট অঘাটের বৃত্তান্ত’, ও ‘বাবরনামা’। ‘ইলা চন্দ পুরস্কার’, ‘গল্পমেলা পুরস্কার’ সহ পেয়েছেন বহু সম্মান। নির্দিষ্ট প্রিয় গল্প বলে তাঁর কোন গল্প নেই, প্রকাশিত হওয়ার আগে সমস্ত গল্পই তাঁর প্রিয়। এমনকি এও বলেন তৃপ্তি না পেলে গল্প লিখতাম না। বর্তমান নিবন্ধকারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন-“ আমার গল্পে বিপন্ন নারী ও অসহায় মানুষ বারবার উঠে এসেছে। এর কারণ, আমি যে ভূগোলে বসবাস করি, সেখানে নারীরা আজও বিপন্ন, মানুষ অসহায়। ধর্ম-রাজনীতি এঁদের নিয়ে ক্ষমতার খেলা খেলে। আমার চারপাশে প্রতিনিয়ত এই খেলা চলে। আমি দেখি। দেখতে দেখতে নিজেই বিপন্ন বোধ করি। নিজেকে কেমন অসহায় লাগে। তবু প্রতিবাদ করতে পারি না। এজন্য আমার কষ্ট হয়। আর সেই কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে আমি লিখি।“ ( ঊষার আলো, সম্পাদক নিবারণ দাস,  শীত সংখ্যা ২০১৮, পৃ. ৩ )

                নীহারুলের গল্প পাঠে প্রবেশের আগে গল্প সম্পর্কে লেখকের ধারণা পাঠকের কাছে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। ‘আমার গল্প লেখার গল্প’ তে তিনি জানিয়েছেন –

“একটা বন্ধ ঘরে আমি বন্দি হয়ে রয়েছি। আর আমার সঙ্গে বন্দি রয়েছে একটি বাজপাখি। যেন দুই অসম প্রতিদ্বন্দ্বী ! বাজপাখিটি উড়ে উড়ে আমাকে ঠোক্‌রাতে আসছে। আমি বাধা দিচ্ছি। যদিও তার সঙ্গে পেরে উঠছি না। তার শক্ত –ধারালো ঠোঁটের আঘাতে, নখের আঁচড়ে আমার শরীরে একের পর এক ক্ষতের সৃষ্টি হচ্ছে। তা থেকে রক্ত ঝরছে। আমার যন্ত্রণা হচ্ছে। আমি কষ্ট পাচ্ছি। তাই চিৎকার করছি কাঁদছি। কিন্তু আমার সেই চিৎকার, কান্না কেউ শুনতে পাচ্ছে না। কিম্বা, একটি সাপ ! যে, আমার শরীরটা জড়িয়ে –পেঁচিয়ে তার লকলকে ফণাটি তুলে ধরেছে ঠিক আমার কপালের ওপর। তার ভয়ে আমার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ। যদি শ্বাস –প্রশ্বাস চালাতে গিয়ে আমার পেটটা অস্বাভাবিকরকম ফুলে ওঠে, তাহলে সাপটির জড়ানো শরীরে টান পড়বে, তখন সে আমাকে ছোবল মারবে, আর আমি মরে যাব।

মূলত এই দুই রকম অবস্থায় পড়ে আমি গল্প লিখি। আসলে বাজপাখি কিম্বা সাপটির কাছ থেকে নিজেকে বাঁচবার উপায়, আমার চোখে গল্প হয়ে দেখা দেয়। যদিও আমি জানি –ওই বাজপাখি, ওই সাপ আমার নিয়তি। ওদের হাত থেকে আমার মুক্তি নেই। যদি না ওরা  আমাকে মুক্তি দেয় ! অথচ আমি দারুণভাবে মুক্তি পেতে চাই। ওই চাওয়াটাই আমার চোখে গল্প।“ ( কী লিখি, কেন লিখি, সোপান, প্রথম প্রকাশ ২০১৮, পৃ. ১৬৮)

মুসলিম জনজীবন নিয়ে লেখা নীহারুল ইসলামের একটি অসাধারণ গল্প হল  ‘নুরুদ্দি হাজির গল্প নয়’। গল্পটি ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে ‘সাংস্কৃতিক সমসময়’ পত্রিকায় ‘নুরুদ্দি হাজির গল্প নয় ইহা বড় তাওয়ার গল্প’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে গল্পটি আবার ‘পরিচয়’ পত্রিকায় ২০০২ খ্রিস্টাব্দে পুনমুর্দ্রিত হয়। একটি মুসলিম জীবনের ভাঙা- গড়ার কাহিনি নিয়ে এই গল্প। নুরদ্দি হাজি এখন সভ্রান্ত লোক, কিন্তু একদিন সে দরিদ্র ছিল। সেই বিলাই হাঁচড়ি থেকে পায়ে হেঁটে জামা কাপড় নিয়ে এসে ধুলাউড়ির বাজারে বিক্রি করতো। এখন ধুলাউড়ির বাজারে সে নিজেই দোকান করেছে, দোকানে কর্মচারী রেখেছে। তবে সে ধর্ম মানা মানুষ, প্রতিদিন নামাজ পড়েন। হজে গিয়ে পূণ্য অর্জন করে এসেছেন। তবে ধর্মান্ধতা তাঁর মধ্যে নেই। সে টিভি দেখে। স্ত্রী মর্জিনার কোন সন্তান নেই। দ্বিতীয় বিবাহ করতে চাইলেও সে করেনি। মার্জিনার জীবনে নিঃসঙ্গতা কাটাতেই সে এনেছে টিভি। তেমনি রয়েছে গ্রামের মানুষের কুদৃষ্টি। লেখকের ভাষায় সে যেন একটা গরু আর প্রতিবেশীরা ‘গিধিনীর দল’ ( শকুনের দল )। এই শত্রু দলের হিংস্রা রয়েছে তাঁর প্রতি। তবে নুরদ্দি কিন্তু হিংসুক বা স্বার্থপর নয় , দোকানের খরিদদার ও কর্মচারীদের প্রতি সে যেমন ভালো ব্যবহার করে তেমনি গ্রামের মানুষের জন্য ভেবেছে মসজিদ তৈরি করার কথা। নিজ ধর্মের প্রতি তাঁর অত্যন্ত শ্রদ্ধা, তাই টিভি বা দোকানে ভিড় থাকলেও সে নিয়মিত নামাজ পাঠ করে। লেখকের ভাষায়-“ নুরুদ্দি হাজি কিন্তু এবার নামাজ ভুলে থাকলেও ফজরের নামাজ ভুলবে না। কিংবা ভুলবে না ধুলাউড়ি বাজারে একটা মসজিদ গড়ার স্বপ্ন। খোদার ঘর মসজিদ। খোদার কাছে তার মানও আছে।“ ( ঘাট অঘাটের বৃত্তান্ত, অভিযান, প্রথম প্রকাশ ২০১৪, পৃ. ২১) গল্পের নামকরণটি লক্ষণীয়। লেখক হয়তো গোটা সমাজকেই ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন কিন্তু গল্পের মধ্যে নুরুদ্দিই প্রধান হয়ে উঠেছে। শ্রেণিচরিত্র নয় ব্যক্তিজীবনই বড় হয়ে উঠেছে।

“ মহাসাগরের নামহীন কূলে

হতভাগাদের বন্দরটিতে ভাই

সেই সব ভাঙা জাহাজের ভিড় !-

শিরদাঁড়া যার বেঁকে গেল

আর দড়াদড়ি গেল ছিঁড়ে

কব্জা ও কল বেগড়ালো অবশেষ ।“(বেনামী বন্দর, প্রেমেন্দ্র মিত্র)

সেই সব ভাঙাচোরা মানুষদেরই কথাকার নীহারুল ইসলাম।‘তাহের আলির জীবনযাপন’ গল্পটি ‘নিসর্গ’ পত্রিকায় ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। এক পঙ্গু মানুষ তাহের আলি। তাঁর পা দুটি অক্ষম। জীবনে সুখ শান্তি সে দেখেনি। তাঁর জীবনের পরম সুখ হাতে থাকা বাটিতে পয়সা পড়ার শব্দ শোনা। তাহের আলির মাইনে করা মুনিষ ফয়েজ ও সেন্টু। এঁরাই তাহের আলিকে বয়ে নিয়ে যায়। ভিক্ষে করা পয়সা থেকে তাহের আলি তাঁদের বেতন দেয়। তাহের আলির জীবনে কেউ নেই এক ধর্ম-মা ছাড়া। ফয়েজ ও সেন্টু যৌবনে পা দেওয়া যুবক। ধর্ম-মা থাকে ধরমপুরে। তাহের আলির সঙ্গে মাতার কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু মাঝে মাঝে ধরমপুর যেতে হয় কেননা ধরমপুরেই ফয়েজ সেন্টুর বাড়ি। জীবনে যৌনতার স্বাদ পায়নি তাহের আলি, জীবনের চাহিদা গুলো উপলব্ধি করতে সে অক্ষম। সে বোঝে শুধু বাটিতে পরা পয়সার শব্দ সুখ- “ তাহের আলি কিন্তু কষ্ট পেতে চায় না। সে বেঁচে থাকতে চায় সুখ- শান্তির মধ্যে। তার ‘সাধের জিন্দরগানীতে’ পয়সার টুং- টাং শব্দই হচ্ছে তার সুখ- শান্তি।“ (ঘাট অঘাটের বৃত্তান্ত, তদেব, পৃ. ৪৯) সেন্টু বিবাহিত। স্ত্রীর সঙ্গে সামান্য সঙ্গ দিতে চায় না তাহের আলি। একদিন সকালে ফয়েজ- সেন্টু তাহের আলিকে নিয়ে চলেছে গঙ্গার ঘাটে। দুপুর বেলায় খেতে বসে ফয়েজ ও সেন্টু, তখনই তাহের আলির গাড়ি নদীতে গড়িয়ে যায়-

“ ওদিকে তাহের আলি গড়াতে গড়াতে একবার স্রোতে গিয়ে পড়ল। স্রোতে তাকে টেনে নিয়ে গেল ঘূর্ণিতে। আর ঘূর্ণি যে তাকে কোথায় আশ্রয় দিল, ফয়েজ সেন্টু, স্নানরতা মেয়েক-টা কিছুই মালুম পেল না। হতবাক হয়ে শুধু চেয়ে রইল ঘূর্ণির দিকে। এবং দেখল পারের খেয়া মারতে আসা ছোটো নৌকাটিকে ঘূর্ণির উপর দিয়ে ছুটে আসতে।“ ( তদেব, পৃ. ৫১)কেউ রক্ষা করে না – রক্ষা করার প্রয়োজন উপলব্ধি করে না,ফয়েজ- সেন্টুর কাছে অভুক্ত পেটে ক্ষুধা মেটানোর তাগিদই বড় হয়ে ওঠে। এখান থেকে দুটি প্রশ্ন মনে আসে- তাহের পঙ্গু বলেই সমাজে তাঁর প্রয়োজন নেই, তাই কেউ তাঁকে রক্ষা করে নি। ফয়েজ- সেন্টুর জীবন তো অতিবাহিত হত তাহেরের টাকায়, তবুও তাঁরা কেন চুপ করে বসে থাকলো ! আসলে ক্ষুধার তাড়নাই আজ তাঁদেরকে বিপথে ঠেলেছে। ক্ষুধার সত্যই তাঁদের কাছে একমাত্র সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবসন্ন দিনের ক্লান্ত বেলায় ক্ষুধার কাছে তাহের আলির জীবন তুচ্ছ মনে হয়েছে। কেন জানি না এ গল্প পড়তে গিয়ে তারাশঙ্করের ‘তারিণী মাঝি’ গল্পের কথা মনে আসে। সেখানে নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে স্ত্রীকে ছেড়ে দিয়েছিল তারিণী, আর এ গল্পে ক্ষুধা মেটাতেই ক্ষুধার অবলম্বন তাহেরকেই ছেড়ে দিল ফয়েজ – সেন্টুরা। পঙ্গু মানুষগুলো বোধহয় এভাবেই জীবন থেকে হারিয়ে যায় – পৃথিবীতে তাদের প্রয়োজন কতটুকু ?

27