ফেব্রুয়ারি, ২৪,২০২১: দিনটা ১৬ই আগস্ট। সকাল থেকে গা-টা গরম গরম মনে হচ্ছিল। ওই অবস্থাতেই দৈনন্দিন কাজে দিনটা কাটাই। রাতের দিকে গা গরম ভাবটা খানিকটা বাড়ল মানে জ্বর টা একটু বেশি হল। পরের দিন সকালে পারিবারিক ডাক্তার প্রদ্যুৎ বসাকের কাছে যাই। উনি দেখে কিছু ওষুধ দিলেন এবং কয়েকটা টেস্ট করতে বললে করলাম। রিপোর্টে আশঙ্কাজনক তেমন কিছু ছিল না। কিন্তু নাছোড় জ্বরটা ছাড়ল না ওঠানামা ছাড়া। রাতের খাবার খেয়ে প্রত্যেকদিনের ওষুধের সঙ্গে জ্বরের ওষুধ খেয়ে বিছানায় গেলাম। নানা দুশ্চিন্তায় চোখে ঘুম নাই। বাইরে দুই-তিনবার সাইরেন বাজিয়ে এম্বুলেন্স যাওয়া-আসার শব্দ শুনলাম। অতিমারি করণা মোকাবিলায় করণীয় কি তার সরকারি ভাবে প্রচার শুনেছি সারাদিন।

জ্বরের বয়স যখন তিন দিন হল কমা বা ছাড়ার নাম যখন নাই তাহলে কি আমি করোনাগ্রস্থ হয়ে পড়লাম? কথাটা মাথায় আসতেই কেমন যেন ভয় ভয় লাগতে লাগল। পরের দিন সকালে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ভাবলাম, করোনা টেস্ট করেই নিশ্চিত হব। রিপোর্ট নেগেটিভ আসলে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাবে। আর যদি পজিটিভ আসে? পজিটিভ! করণা আক্রান্ত রোগীদের সাথে কি অমানবিক ব্যবহার করা হয়,স্বজন-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে একাকী থাকতে হয়, সরকারি নজরদারি আর নানাজনের নানা রকম উপেক্ষার শিকার হতে হয়, সেসব খবর টিভি আর খবরের কাগজে নিয়মিত শুনছি দেখছিও। এসব সাত-পাঁচ ভেবে করোনা টেস্ট করব কিনা তাই নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লাম। খানিকক্ষণ পর মন শক্ত করে সিদ্ধান্ত নিলাম রিপোর্ট যাই আসুক না কেন টেস্ট করবই। ফোন তুলে সুভাষ( আমার ভাইপো) কে ডেকে বললাম রায়গঞ্জে যাব। ততক্ষণে আমি রেডি হয়ে  টেস্টের কথা বাড়িতে জানাতেই সবাই একবাক্যে নিষেধই করল। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল রইলাম। আমি শুধু আমার কথা না বাড়ির সবার কথা ,বিশেষ করে আমার নাতির কথা বেশি করে ভাবলাম। আমি ভাবলাম, নেগেটিভে আমি নিশ্চিত মুক্ত। আর যদি পজিটিভ হয় তবে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে একা রেখে সংক্রমনের কবল থেকে বাড়ির সবাইকে মুক্ত রাখতে পারব। আর সেটা টেস্ট ছাড়া সম্ভব নয়। টেস্ট না করে নিজেকে যতোই আলাদা রাখার চেষ্টা করি না কেন, ছোঁয়াছুয়ি, আদান-প্রদান যেকোন সময় যেকোন ভাবেই হোক হবেই। আর ডানপিটে নাতিতো  ছাড়ার পাত্র নয়। কোলে ঘাড়ে মাথায় তার ওঠা চাই। এসবের জন্য করোনা টেস্টটা খুব জরুরী। 

ততক্ষণে সুভাষ এসে হাজির। দুজনে বেরিয়ে পড়লাম রায়গঞ্জ সুপার  স্পেশালিটি হসপিটাল এর উদ্দেশ্যে ১৯শে আগস্ট ৯ টা নাগাদ হাসপাতালে পৌঁছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করে অপেক্ষা করতে থাকলাম। রোদে গরমে ইতস্তত পায়চারি করতে থাকলাম। কারণ কোন বসার জায়গা পর্যন্ত ছিল। পরিকাঠামোর অভাবে পরিষেবা না থাক রাজকীয় নামটা জ্বলজ্বল করছিল রায়গঞ্জ সুপার স্পেশালিটি হসপিটাল। ১২:৩০ নাগাদ অপেক্ষার অবসান হল। ডাক পেয়ে টেস্ট করালাম। দুই দিন পরে গিয়ে রিপোর্ট আনতে বললেন। যুদ্ধ জয়ের আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। দুদিন পর আমাকে মেসেজ পাঠাল হাসপাতাল থেকে। দেখলাম পজিটিভ । রিপোর্ট পড়েই কি করব ভাবতে পারছিলাম না। বাড়ির লোকজনও হা-হুতাশ করতে লাগল। কিন্তু আর তো কিছু করার নাই। মনকে তৈরি করলাম নিজেকে এক ঘরে বন্দি রাখার। দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্র, নিত্যদিনের ওষুধ, পড়ার জন্য কিছু বই, কিছু বিস্কুট চিড়া-মুড়ি,কিছু ফল আর ইলেকট্রনিক উনুন নিয়ে তিনতলার এক ঘরে প্রবেশ করলাম।  আর হ্যাঁ সঙ্গে গুরুদেবের ছবি আর জপমালা নিতে ভুল করলাম না। শুরু হলো ২৫ জনের নির্বাসন জীবন। সব থেকেও যেন কিছু নাই। সবাই থাকলেও আজ আমি বিচ্ছিন্ন। হয় ভোট নানারকম ভাবনার পাহাড় মাথায় ভর করছে ক্রমশ। সব ভাবনা সরিয়ে নিজেকে তৈরি করলাম করণা যোদ্ধা হিসেবে। খানিকটা জেদ নিয়ে মনে মনে বললাম যে করেই হোক এই করোনা নামক মারণ রোগ থেকে নিজেকে মুক্ত করতেই হবে। শুরু হলো অজানা, অচেনা চোখে না পড়া ভয়ঙ্কর দৈত্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার লড়াই।

একাকী নির্বাসনের সেই ২৫ দিন অতিবাহিত করলাম কিভাবে তা সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করছি। বাড়িতে এক গ্লাস জলও গড়িয়ে খাইনি কোনদিন। একা ঘরে গরম জল করা, চা করা, দুধ গরম করায় অভ্যস্ত হয়ে গেলাম বাধ্য হয়েই। দিনে রাতে সাতবার গরম জলের ভাপ নিতাম। আট দশবার গরম জলে  লবণ লেবুর রস মিশিয়ে গারগেল করতাম। চার-পাঁচবার লাল চা খেতাম। উপসর্গ  গলা খুসখুস করা, শ্বাসকষ্ট, অনুভূতিশূন্যতা  আর  কোন খাদ্যবস্তুর স্বাদ না পাওয়া। যদিও এসব উপসর্গের একটারও উপস্থিতি আমার ছিলনা। 

চিকিৎসা

করোনার প্রতিষেধক না থাকায় প্রতিরোধক কিছু ব্যবস্থায় ছিল মূল অস্ত্র। সেই সময় আমি রায়গঞ্জের ডাক্তার সুদেব সাহার পরামর্শে ছিলাম। সেই ডাক্তার বাবুর কাছে আমি কৃতজ্ঞ থাকব। কারণ আমি যতদিন ফোন করেছি ততদিনই আমার অসুবিধার কথা মনোযোগ সহকারে শুনে বিন্দুমাত্র বিরক্তি প্রকাশ না করে প্রয়োজনীয় উপদেশ দিতেন। দেবতুল্য সেই ডাক্তার আমাকে কিছু উপদেশ আর কিছু ওষুধ খেতে বলেছিলেন। যেমন হালকা কাশির জন্য সিরাপ। ইমিউনিটির ইমুগার্ড নামক ক্যাপসুল। ভিটামিন সি ট্যাবলেট। খাওয়ার রুচি বাড়াতে ভিটামিন সিরাপ। উপরোক্ত উপসর্গ তেমন ভাবে না থাকলেও আমি ক্লান্ত, দুর্বল ও অস্বস্তি অনুভব করতাম খুবই। কোন খাবার খেতে পারতাম না। স্বাদ পেতাম না বলে নয়, রুচি হত না বলে। একাকী বন্দী জীবন ভীষণ কঠিন। কত দুঃশ্চিন্তাই না মাথায় আসতো। ভাবতাম দুধ গরম করতে গিয়ে যদি গায়ে হাতে পড়ে কি হবে? কে আসবে আমাকে সাহায্য করতে? অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হবে। বাড়ির সামনে কত লোকজনের ভিড় হবে। এইরকম নানা উদ্ভট চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেত। বন্দিদশায় কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু নিয়মিত ফোন করে আমায় সাহস দিত। শারীরিক অবস্থার খবর নিত। তাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। অন্য কিছু বন্ধু ও কিছু নিকটাত্মীয় আমাকে দূর থেকে দেখা বা ফোনেও কথা বলত না কোনোদিন। হয়তো মোবাইলেও সংক্রমিত  হবার ভয়ে। করোনা অবস্থায় কোন সরকারি ডাক্তার বা অন্যকোন আধিকারিক কোনরকম ভাবে আমার করনীয় কি বা কি করনীয় নয় এসব বলে নি। এটা আমার কাছে সরকারি অব্যবস্থা বলেই মনে হয়েছে। দেখতে দেখতে ধার্য দিনগুলো পার করে পরিবারের সবার সঙ্গে মিলিত হলাম। যেন অশৌচ অবস্থা থেকে পার পেলাম। ব্যবহারিক কিছু জিনিস ফেলে দিয়ে, কিছু জিনিস পরিষ্কার করে, সারা বাড়ির স্যানিটেশন করে, স্বাভাবিক জীবনে প্রবেশ করলাম।

 করোনা সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বলব যে, করোনা হলে অযথা ভয় না পেয়ে সংযত, পরিষ্কার দূরত্ব এবং নিজের ব্যবহারের জিনিস অন্যকে ব্যবহার করতে না দেওয়া আর সুচিকিৎসকের পরামর্শে থাকা। বিধি নিষেধ ঠিকমত পালন করা। হতাশ না হওয়া। আর দশটা রোগের মত এটাও একটা রোগ মনে করে দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারলে করোনাকে জয় করা কঠিন কিছু নয়।

19