শৌভিক রায়

                                 এক

আজ নিয়ে তিনদিন। সেই একই। তার পাশে। কসবা পোষ্ট অফিস থেকে রুবি অবধি। সেদিন পেছনের সিট ফাঁকা ছিল। সামনে প্যাসেঞ্জার ছিল। ওঠে নি। সেদিনই যা বোঝার বুঝেছিল তারক। গায়ে কি মাখে কে জানে, ভুরভুরে গন্ধে তারকের মৌতাত লাগে! রুবি অবধি রাস্তা হয়ে যায় ঘুম থেকে দার্জিলিং। জীবনে ওই একবারই  কলকাতার বাইরে গেছিল তারক। তারক দেখে সামনে রাজেশ খান্না। তার কানে ভেসে আসে কিশোরের গান- “রূপ তেরা মস্তানা….”

                                   দুই

টেকোটা সামনে বসতে চেয়েছিল কাছেই নামবে ব’লে। পিছনে পাঠিয়ে দিয়েছে তারক। বিজন সেতুর মুখে প্যাসেঞ্জার হাত দেখালেও থামায় নি গাড়ি। জ্যামের জন্য এমনিতেই একটু লেট আজ। লেট না হলেও থামতো না অবশ্য। টিকিয়া-উড়ান চালায় তারক। পোষ্ট অফিস স্টপে এসে দাঁড়ায় সোজা। ওই তো! লাল শাড়িতে আজ একদম ঝক্কাস লাগছে। তারকের কানে ভেসে আসে অনেক আগে গাওয়া কিশোরের গান- “পরেছে লাল শাড়ি যাবে সে কোন বাড়ি….শ্বশুরবাড়ি?” নাঃ যেতে দিচ্ছে কে? টেকোটা মিটমিট করে হাসছে। ব্যাটা বুঝেছে কেন তারক তাকে সামনে বসতে দেয়নি। পিত্তি জ্বলে গেলো তারকের। পেছনের বাঁ দিকের চাকা ইচ্ছে ক’রে গর্তে ফেললো তারক। এক ধাক্কায় টেকোর কপাল ঠুকলো রডে আর লালপরীর ডান বুক তার পিঠে!! রুবিতে নামিয়ে দিলে লালপরীর এগিয়ে দেওয়া একশো টাকার নোট দেখে “পরে নেবো” বলে দিল সে। একটু হেসে মেয়েটা খানিকটা এগোতেই গোল্লুগোল্লু চোখে আগের গাড়ির ঝন্টা বললো- “কি কেস গুরু? খুচরো তো আছেই।” শালা তুই কি বুঝবি রে….!! এখন তারকের কানে ভেসে আসছে কিশোরের সেই গানটা- “আমার মনের এই ময়ূরমহলে…..”

                                 তিন

আজ পাঁচদিন হ’ল তারক পরের গাড়িকে লাইন ছেড়ে দিয়েছে। গাড়ির কন্ট্রোলার গুঁফো জগাদা আজ কুতকুতে বলল- “কি রে শূয়োর? কেস খেয়েছিস নাকি? প্রতিদিন এক টাইম! মরবি আমার মতো। মনীন্দ্রনাথ কলেজের স্টুডেন্ট ছিলাম রে! কেস খেয়ে তোদের গাড়ির কন্ট্রোলার হয়েছি। তোর তো শূয়োর ফ্লাইওভারের নীচে সুলভ শৌচালয়ের কন্ট্রোলার হতে হবে রে শালা।” অন্য সময় হলে তারক উত্তর দিত। কিন্তু মাথায় এখন কিশোর। তারকের কানে ভেসে এলো- “চলো যাই চলে যাই দূর বহুদূর….”

                                     চার

এতোক্ষণে ফাঁকা হল তারক। মাঝেমাঝে এরকম ভাড়া খাটে সে। পয়সাও ভালো পাওয়া যায়। কাছে পিঠেই ড্রপ করতে হয় বিয়েবাড়িতে খেতে আসা লোকেদের। এই ভাড়াটা ধরে দিয়েছে কসবা রথতলার জ্যোতিষদা। এখন টাকাটা নিয়ে কেটে পড়বে সে। সানাইয়ের প্যাঁ প্যাঁ শুনে তার কান পচে গেলো এতক্ষণ ধরে। আর না। এবার যাবে সে টাকাটা নিয়ে। কাল একটু দেরীতে লাইন দেবে সে। একেবারে ওই সময়ে।

                                   পাঁচ

মেয়ের বাপের জোরাজুরিতে অগত্যা তারককে বসতেই হ’ল লাস্ট ব্যাচে। না খেলে নাকি অকল্যাণ হবে মেয়ের। হাসি পেলেও না করলো না তারক। বাড়ির লোকই সব। তাকে মনে হ’ল একটু বেশীই খাতিরদারি করছে । মেয়ে জামাই এলেই পরিবেশন শুরু হবে। ঝলমলে পোষাকে এসেও গেলো তারা। আর মেয়ের মুখ দেখেই তারকের বুকের ভেতর যেন নিজের অটোর ঢিক ঢিক আওয়াজ, রক্তের বেগ স্পিডোমিটারে একশ ছুঁই ছুঁই। মেয়ে তার দিকে তাকিয়ে চেনা হাসি ছুঁড়ে দিতেই মেয়ের বাপ হাজির- ” হে হে…আপনার কথা খুব বলে ও। খুব ভাল চালান নাকি গাড়ি। তাই ওর পিসতুতো দাদাকে জ্যোতিষকে ব’লে আপনাকেই আনতে হয়েছে। গাড়ি তো কম নেই। তবে একই মেয়ে। আবদার রাখতেই হয়!” মেয়েটি আবার তার দিকে তাকায়। একটু হাসেও। তারক যেন স্পষ্ট দেখে মেয়েটির চোখের কোনায় জল চিকচিক করছে। তার বুকের অটো গিয়ার পাল্টে নিউট্রালে এলে তারক শোনে কিশোর গাইছে-“নয়ন সরসী কেন ভরেছে জলে…”

গানকে থামিয়ে ক্যাটারারের লোক বলে- “আর একটা রাধাবল্লভি দিই দাদা।”

62