বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জনজীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

‘শিকড়ের খোঁজে ঘরে ফিরুক বাঙালি মুসলিম’ নামক প্রবন্ধে সোহারাব হোসেন প্রশ্ন তুলেছিলেন-‘’বাঙালি মুসলিমরা অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগছে। এ সঙ্কট ঘরে-বাইরে দু’দিক থেকে ঘনিয়ে উঠেছে। এক দিকে সন্ত্রাসের দায় তার ওপরও বর্তাচ্ছে। দায়িত্ব থাক বা না থাক, সংখ্যাগুরুদের একাংশ তাকে সন্ত্রাসের জাত বলে অভিযুক্ত করেছে। বাসে-ঘাটে, অফিস-আদালতে,স্কুল-কলেজে, মাঠে-ময়দানে, কর্মক্ষেত্রে সন্দেহের তীর হেনে তাকে আহত করেছে। অন্য দিকে ধর্মবিশ্বাস, ধর্মচর্চা, জন্মহার, অর্থে-শিক্ষায় অনগ্রসরতা তাকে ক্রমশ ছোট একটা গণ্ডিতে বেঁধে রেখেছে। এই দ্বিমুখী সমস্যার সামনে বাঙালি মুসলিম বিভ্রান্ত। এক দিকে তাঁর দেশপ্রেমের ওপর আস্থাহীনতার অভিযোগ উঠেছে, অন্য দিকে সে খুঁজে পাচ্ছে না নিজস্ব বিশ্বাসভূমি।“ ( গল্পসরণি ১৪২৫, সোহারাব হোসেন বিশেষ সংখ্যা, পৃ. ৩৫৫ ) সেই বিশ্বাসভূমির গল্প নির্মাণ করতে চেয়েছেন তিনি। নানা দ্বন্দ্বের মধ্যে মানুষ কীভাবে ডুবে যায়, একটি ঘটনা গ্রাম্য মানুষের জীবনে কীভাবে সর্বনাশ ডেকে আনে তা চিহ্নিত করতে চেয়েছেন তিনি।

                ‘আকাল যাযাবর’ গল্পে আমরা পাই ফরিদকে। এ গল্পে লেখক এক মুসলিম কসাইয়ের আশ্চর্য পশুপ্রীতির নিদর্শন স্থাপন করেছেন। বাংলা ছোটোগল্পের ইতিহাসে পশুপ্রীতির নিদর্শন আমরা বহু পেয়েছি। তবে এত গল্পের পরও সোহারাব পশুপ্রীতির গল্প লিখতে গেলেন কেন নতুন করে ? আসলে সোহারবের গল্প ট্রিটমেন্টের দিক থেকে আলাদা। আর গল্পের মধ্যে জড়িয়ে আছে একটি সমাজের লোকাচার ও বিশ্বাস। ফরিদ কসাইয়ের কাজ করে, তবে তাঁর বাড়িতে বহু কুকুর ও পায়রা আছে, এদের সঙ্গে ফরিদের নিবিড় সখ্য। কসাইখানার ছাট মাংস সে যেমন কুকুরের জন্য আনে তেমনি এই পশুদের সঙ্গেই সে সারা রাত কাটায়। জিনাত হাজি এক সময় তাঁর সহযোগী ছিল কিন্তু হজ থেকে ফিরে জিনাতের সম্মান বৃদ্ধি পেয়েছে। আজ ফরিদের বিরুদ্ধে প্রধান অভোযোগ তাঁর শরীরে কুকুর ও পায়রার গন্ধ বলে কেউ মাংসা কিনতে চায় না। এই অভিযোগে ফরিদের সব কসাইখানার কাজ বাতিল হয়ে যায়। আজ সত্তর বছর বয়স্ক এই মানুষের আয় নেই বলে স্ত্রী সহ পুত্ররা অভিযোগ এনেছে। এ গল্পে সোহারাব দেখান অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভালোবাসা কী করে কমে যায়। স্ত্রী খায়রোনও ঠিক করে খেতে দেয় না, সবাই বলেছে এই পশুদের বিদায় দিতে, কিন্তু সে লক্ষে অবিচল। আজ সে পশুদের জানায় –“তোয়ের থাক,, তোয়ের থাক সপ। আকাল এসতেছে !” অভিমানে সে আজ পশুদের ওপর আঘাত এনেছে। কিন্তু আবার পশুদের সঙ্গেই আনন্দ নিকতনে মেতে উঠেছে। আজ ফরিদ অন্য গ্রামে কসাইখানায় কাজ নিয়েছে। রাতের অন্ধকারে পশুদের নিয়ে যাযাবরের মত যাত্রা করেছে। তবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেনি, শুধুমাত্র পরিস্তিতির সঙ্গে লড়াই করে গেছে –

“কুকুরগুলো এখন আস্তানার বাইরে। ফরিদ এবার পায়রার ঝাঁকে আঘাত করে। তারা এলোমেলো উড়ে আবার পূর্ব জায়গায় গিয়ে বসে। ব্যাপার দেখে ফরিদ একটু হেসে ফেলে –‘বুইছি, এমোন নিশ্চিন্দির সুক ছেড়ে যাতি চাচ্ছিস নে। কিন্তুক এই বুড়োডারে একলা পাঠানে কি ভালো হ্যারা ? চল । ঘর ছাড় ।

তারপর সেই অলৌকিক রাতে এক অতিকায় বৃদ্ধের পাশেপাশে, উপরে –নীচে কাফেলা করে এক দঙ্গল জীবজন্তু পাখ-পাখালির ঝাঁক ঘরে ছেড়ে পথে নামে। যাযাবরের মতন। (তদেব, পৃ. ৬৪ )

 এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পাড়ি দেয় ফরিদ ও তাঁর দলবল। এ যাত্রার শেষ আছে কি না অথবা যাত্রা শেষে কোন স্থায়ী সুখের সন্ধান আছে কি না তা আমাদের জানা নেই। তবে সিদ্ধহস্ত গল্পরস বলতে আমরা যা বুঝি তা সম্পূর্ণ পাই এ গল্পে। আসলে তিনি গড়তে জানেন। আর যিনি নির্মাণ করতে জানেন তিনি যে অতি সহজ বিষয়কেও এক অনলসভঙ্গীতে উত্তীর্ণ করে দেবেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি দায়বদ্ধ সময়ের প্রতি, সমাজের প্রতি। তাই এক শুভবোধ নিয়েই তিনি গল্প আসরে নামেন। মানুষের কুচেতনা ও নঞর্থক দিকগুলিকে ধ্বংস করে দিয়ে মানবতার এক নব আকাশে তিনি তাঁর চরিত্রকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বিদায় নেন। তাই সমালোচক মানস মজুমদার লেখেন –“তিনি দায়বদ্ধ শিল্পী! সামাজিক মঙ্গল কল্যাণ ও শুভবোধে তাঁর আস্থা। নিছক বিনোদনসর্বস্ব গল্প তিনি লেখেন না। ব্যবসাদার লেখক নন। সাহিত্যের আসরে শৌখিন মজদুরী করতে আসেন নি। সোহারাব ঘুমপাড়ানি গল্পকার নন, ঘুমতাড়ানি গল্পকার ।“ (সময়ের গল্প দুঃসময়ের গল্প, তদেব, পৃ. ৫  )

            ‘আকাল যাযাবর’ গল্পে ফরিদ দলবল নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল আর ‘হরিয়াল হরিয়াল’ গল্পে  সন্তানের দূরে চলে যাওয়ায় ইয়ার আলি নিজের প্রিয় ঘুঘু পাখিকে উড়িয়ে দিয়েছে। ফরিদ পরিবারের কাছে, সমাজের কাছে হার মেনেছে আর ইয়ার আলি হার মেনেছে নিজের বিশ্বাসের কাছে। ফরিদের  আছে আনন্দ তবে ইয়ার আলি বিষাদ গ্রস্থ। সন্তানের প্রতি কোন মায়া নেই ফরিদের কিন্তু সন্তান বাৎসল্যই ইয়ার আলিকে উদাসীন করে দিয়েছে। ‘হরিয়াল হরিয়াল’ গল্পে ইয়ার আলি পাখি বিক্রেতা। তাঁর একটি শিকারি ঘুঘু আছে যা হরিয়াল নামে পরিচিত। বাজারে পাখি বিক্রি করতে গিয়ে অনেক সময় ক্রেতার হাতাহাতিতে পাখি উড়ে যায় তখন এই ঘুঘু ছেড়ে দেয় ইয়ার আলি। এই ঘুঘুই ফিরিয়ে নিয়ে আসে অন্য পাখিদের। সে মাঠ থেকে পাখি ধরে বাজারে বিক্রি করে, তবে বর্তমানে পাখি ধরা নিষেধ, তবুও সে বিক্রি করে যায়। এই পাখি বিক্রি করা তাঁর তিন পুরুষের ব্যবসা তাই এ সম্পর্কে নানা গপ্পকথা আছে, যা সে বলে স্ত্রী মারুফাকে। তাঁর বড় সন্তান রাজনীতিতে অংশ নিয়েছে, এ নিয়ে স্ত্রী চিন্তিত কিন্তু ইয়ার আলি জানায় এ ক্ষেত্রেও সে হরিয়ালের রীতি ব্যবহার করবে। হরিয়াল হিসাবে নিয়োগ করতে চেয়েছে ছোটো ছেলেকে। এই ছোটো ছেলেই ফিরিয়ে নিয়ে আসবে বড় ছেলেক। আজ ইয়ার আলি পাখি পায়নি, পাখি বন্যপ্রাণী বলে কিছু মানুষ উড়িয়ে দিতে বলেছে । বাড়ি ফিরে শোনে ছেলে খুনের দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে পালিয়েছে, বাড়ি ফিরে এসেছে ছোটো ছেলে। এই দুঃখে সে নিজের প্রিয় হরিয়ালকেও উড়িয়ে দেয় –“তারপর দরজটা খুলে দেয়। হরিয়ালটাকে বাইরে আনে। আকাশে উড়িয়ে দেয়। পাখিটা উড়ে যায়। অন্ধকারের মধ্যে। তার ডানা ঝাপটানোর শব্দ শোনা যায়। ক্রমশ ক্ষীণ হতে হতে সে শব্দ মিলিয়ে যায়। চাপ-চাপ নৈঃশব্দ্য নামে। তারপর সেই শব্দহীন রাত্রি এক সময় ফালা –ফালা হয়ে যায়। ডুকরে-ডুকরে কাঁদছে ইয়ার।“ (তদেব, পৃ. ১৭৭ )

                সোহারাব হোসেন এক দেশজ রীতিতেই গল্পের কাহিনি সন্নিবেশ করেন। ফলে তাঁর গল্পে রূপকথা, লোককথা বারবার ফিরে আসে। কিন্তু সেখান থেকেই তিনি গল্পের সত্যে বা বাস্তব সত্যে উপনীত হন। গল্পের ভিতরে এক গপ্প শোনাতে শোনাতেই তিনি কাহিনের ধ্রুব সত্যে পাঠককে পৌঁছে দেন। গল্পে এক মায়াজাল রচনা করে পাঠককে এক প্রান্ত সীমায় দাঁড় করিয়ে দিয়ে বিদায় নেন। আসলে প্রত্যেক লেখকেরই নিজস্ব একটি লেখার উপনিবেশ রয়েছে। সোহারাব হোসেন তাঁর গল্পের অন্তিমে পাঠককে ভাবার অবকাশ দেন না। তিনি পাঠককে এক বোধে এনে দেন, যেখানে পাঠক পায় এক মুক্ত আকাশ।

                    বিপন্ন সময় ও  বিপন্ন মানুষরাই সোহারাব হোসেনের গল্প উপন্যাসের ভিত্তিভূমি। উচ্চবিত্তের আলগা প্রেম রোমান্স নিয়ে তিনি গল্পে প্রবেশ করেন না, আর করলেও জীবনের গভীর সত্যে পৌঁছে যান যেখানে এক বা একাধিক সমস্যা আমরা উপস্থিত হতে দেখি, যেগুলি সময়ের সমস্যা। ‘নূরবক্সের গাঁজাগাছ ও একটি প্রজাপতির গল্প’ এক দরিদ্র মুসলিম ও তাঁর পরিবারের জীবন সংগ্রাম ও টিকে থাকার গল্প। এ বাংলার গ্রাম প্রান্তরে বহু মানুষ ক্ষুধার্ত, যাঁরা আইনকে ঠিক মানে না। যেখানে ক্ষুধাই শেষ সত্য সেখানে আইনের চোখ রাঙানির মূল্য কতটুকু ! আর সোহারাব নিজেও গ্রামে বড় হওয়া মানুষ বলে মানুষের সমস্যাগুলি প্রবল ভাবে ধরেছেন। এ গল্পে নূরবক্সের তিনটি গাঁজাগাছ আছে। এই তিনটি গাঁজাগাছ নিয়েই নূরবক্সের স্বপ্ন। কেননা এই গাঁজার দাম বহু, আর তা দিয়েই তাঁর সংসারের হাল ফিরতে পারে। কিন্তু গাঁজা গাছ রাখা যে সরকারি ভাবে বেআইনি তা ধরা দেয় না নটেখালির নূরবক্সের চোখে। স্ত্রী সইফাতারা সহ পাঁচ ছেলে মেয়ে নিয়ে তাঁর সাত জনের সংসার। আজ সংসারের অভাব ঘোঁচাতে সে রঙের কাজ করে, আজ সঙ্গে নিয়েছে বড় ছেলে হেলাতালিকে। মালিক হেলাতালির জন্য অতিরিক্ত পয়সা দেয় না, তবে দুপুরের খাবার দেয়, এটাই নূরবক্সের প্রাপ্য। সে ভালো বাঁশি বাজাতে পারে, মহুয়া পালার কাহিনি শুনাতে পারে, আর সন্তান হল শ্রোতা। বলে কাজের সময় গল্প থামাতে হয় –“নূরবক্সের গল্প থেমে যায়। যতবার সে তার দুঃখের সংসার ছাড়িয়ে কোনো এক অজানা দেশের মহুয়া সুন্দরীর রূপে নিজেকে ভুলিয়ে নিয়ে যায়, ততবার ছেলে হেলাতালি যেন বিরুদ্ধতা করে এভাবে। তাই গল্প থামিয়ে নূরবক্স কাজে মন বসায়। তখন দু’বাপ-বেটায় চলে রঙের কাজে। তুলি টানা, সারা মন দিয়ে। সমস্ত চোখ দিয়ে। “ (তদেব, পৃ. ৭২)

                    আজ কাজে মালিককে তাঁরা সন্তুষ্ট করেছে। শ্রমের আনন্দ নিয়েই বাড়ি ফিরছে পিতা-পুত্র। ক্ষুধার তৃপ্তিতে মনে এসেছে রোমান্স। সোহারাব হোসেনের গল্পে শ্রেণিচরিত্র হিসাবে মুসলিম এলেও তিনি একটি বক্তব্যে পোঁছাতে চান। আসলে একটি বক্তব্য বা সময় বা প্রান্তিক ঘটনা, মানুষ ও তাদের সমস্যা নিয়ে তিনি গল্প লেখেন। সেখানে হিন্দু-মুসলিমের পৃথক কোন ভেদ নেই। এই  বিপন্নতা হিন্দুর জীবনে যেমন সত্য তেমনি মুসলিমের জীবনেও সত্য। আমরা শুধু মুসলিম জীবন নির্ভর গল্পগুলিকে বেঁছে নিয়েছি। 

                        দুই প্রতিবন্ধী মানুষকে নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘অ্যাক্ট’ গল্পটি। এ গল্প সম্পর্কে মানস মজুমদার লিখেছেন –“অ্যাক্ট’ গল্পটি অসাধারণ। বাংলা সাহিত্যে এর কোনও দোসর নেই।“ দুটি অসহায় মানুষের যন্ত্রণাকে সামনে রেখে সোহারাব এ বাংলার রাজনৈতিক নেতাদের কার্যকলাপকে নিদারুণ ব্যঙ্গ করেছেন।  কোন শ্রেণির রাজনীতিতে সোহারবের বিশ্বাস নেই। জনজীবনে রাজনীতি মানুষকে কীভাবে শোষিত করে লেখকের দৃষ্টি সেদিকে। এ গল্পে রয়েছে রহমতালি ও পুটে নামে দুই প্রতিবন্ধী মানুষ। রাজনৈতিক দল এই দুই প্রতিবন্ধী মানুষকে ব্যবহার করেছে জনসভায় মানুষের আনন্দ বিতরণে। রহমাত এক অসহায় মানুষ, বহু কষ্ট করে সে বিবাহ করেছিল কিন্তু আজ স্ত্রীকে নিয়ে পালিয়েছে নইজুদ্দির। সে আজ ব্যথিত, ফলে জনসভায় কোন অভিনয়ে অংশ নেয় না। কিন্তু নেতার কথা রাখতে তাঁকে অভিনয়ে অংশ নিতেই হয়, আর আজ সে অভিনয় করে বিরোধী নেতার স্ত্রী কীভাবে অন্য ছেলের সাথে পালিয়ে গিয়েছি। নিজের চোখের অশ্রু গোপন করে আজ মানুষকে হাসিয়ে গেছে রহমতালি ও পেটু।

        এই যন্ত্রণাদীর্ণ মানুষেরাই সোহারবের নায়ক। এই সব ভাঙাচোরা, দূর্বল মানুষকে নিয়েই সোহারাব গল্পভুবনে প্রবেশ করেন। সোহারবের কোনো গল্পই নিছক বিনোদন সর্বস্ব গল্প নয়, গল্পের ভিতরের সত্যকে আবিষ্কার করেন, গল্পকে শিল্পের সীমানায় নিয়ে যান। কেননা গল্পে তিনি নিছক গপ্প বলতে চান না, এক গভীর বোধ থেকে গল্পের ভিতরে প্রবেশ করেন। তাই কখনও বলেন –“নিছক মজা কিংবা বিনোদন সর্বস্ব, ব্যাবসা-মুখ্য, লেখালিখির পথটাকে চোরাবালি বলেই মানি। ও পথের সাহিত্যকে, তা যতোই জনমনোরঞ্জক এবং জনপ্রিয় হোক –না –ক্যানো, আমি শিল্প বলে মনে করিনে।“ (আমার সময় আমার গল্প, তদেব )

                    গ্রাম্য জীবনের কোন্দল, ভ্রাতৃ বিচ্ছেদ নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘বরাভয়’ গল্পটি। গ্রামীণ মানুষের স্বার্থপরতা, কুবুদ্ধি যে কত নীচ হতে পারে তা এ গল্পে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন সোহারাব। আসলে গ্রামীণ জীবনের একরাশ অভিজ্ঞতা নিয়েই তিনি গল্পজীবনে প্রবেশ করেছিলেন, ফলে গ্রামীণ জীবন ও মুসলিম জীবন নিয়ে লেখা গল্পগুলি তাঁর হাতে চমৎকার ভাবে ফুটে ওঠে। নটেখালির দুই ভাই ফজের আলি জোহর আলি। দুজনেই ইঁটভাটায় কাজ করে কিন্তু কেউ কারো সাথে কথা বলে না। বিবাহের পরেই এই বিচ্ছেদ প্রবল হয়েছে। নটেখালির মন্ত্রী জালাউদ্দিন এ সময় এসেছে গ্রামে। মন্ত্রী যখন গ্রামে আসে তখন যাঁর মুখ প্রথম দর্শন করে সে যা চাইবে তাই পায়। এবার প্রথম মুখ দেখেছে ফজর ও  জোহর আলির। কিন্তু দুজনেই বাড়িতে ফিরলে একে অপরের সর্বনাশ সাধনে মেতে ওঠে। দুজনেরই ইচ্ছা এই সুযোগ থেকে ভাই যেন বঞ্চিত হয়। গ্রামীণ মানুষ কত বোকা, নীচ, কুবুদ্ধি সম্পন্ন তা লেখক দেখান। অপরের সর্বনাশ সাধনে প্রবৃত্ত হয়ে নিজেরই সর্বনাশ ডেকে আনেন । অদ্ভুত নাটকীয় বিন্যাসে লেখক গল্পের উপসংহারে পৌঁছেছেন  –

“তেমাথা নীরব। সভাস্থল নীরব। কী চাইবে ফজের ? সবার কান তার দিকে। ফজের এগিয়ে আসে। মানুষ কৌতূহলী হয়। এবং সব্বাইকে অবাক করে দিয়ে ফজের জানায় তার প্রার্থনা –‘আমার এক্‌টাই চাবা মুনতিরি ভাই ! জোহর আলি যা চাবে তা যেন না পায়।“

…..    …..    ……    ……    …….    ……

“ফজেরের কথায় যেন বাজ পড়ে সভাস্থলে। বাজ পড়ে জোহরের মাথায়। সেই চাওয়ায় মন্ত্রীও যেন স্তব্ধ হয়ে যান। অবধারিত ভাবেই তাঁর দৃষ্টি জোহর আলির মুখের উপরে পড়ে। সমস্ত পরিমণ্ডলে তৈরি হয়েছে রহস্য। এবার জোহর ওঠে। মুখে –চোখে তার ভয়ঙ্কর বিষাক্ত ছায়া। সে চিৎকার করে বলে –‘আমিও তাই চাই মুনতিরি ভাই। ও শত্তুর যেদি ভবিষ্যতে কোনো দিন তোমার সামনে পড়ে, তবে যা চাবে তা যেন না পায়।“ ( আয়না যুদ্ধ, পৃ. ২৮৬ )

সোহরবের হোসেনের সামগ্রিক গল্পের প্রেক্ষিতে মুসলিম জীবন নিয়ে লেখা গল্পের সংখ্যা নিছকই কম। আসলে তিনি হিন্দু –মুসলিম শ্রেণি বিভাজনে বিশ্বাসী নন, তেমনি গল্প উপন্যাসে এক শ্রেণির জীবন তুলে ধরার পক্ষপাতীও নন। সে বোধ থেকেই প্রথম গল্পসংকলন ‘দোজখের ফেরশতা’র উৎসর্গপত্রে লিখেছিলেন –‘পশ্চিমবঙ্গের, ভারতের, পৃথিবীর দাঙ্গাবিরোধী মানুষকে’। গল্পে তিনি নিয়ে এসেছিলেন এক বিশেষ প্রকরণ, বক্তব্যরীতি ও আখ্যান। আর আঞ্চলিক জনজীবন চিত্রণে বসিরহাটের বাগরি অঞ্চলের মানুষদের। সেই জীবন চিত্রণেই মুসলিম জীবন এসেছে। তবে মুসলিম অন্তঃপুরে  না গিয়ে তিনি সময়ের চিত্রণে, মিথের ভেলায় মানুষের উত্তরণে, জাদুবাস্তবতায় বৃহত্তর সময় ও সমাজের কাহিনি লিপিবদ্ধ করে যান। সোহারাব সে সমাজের মানুষ হওয়ায় মানুষের বিপন্নতা খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন, ফলে বিপন্ন মানুষকে সামনে রেখে তিনি ভারতবর্ষের গল্প লিখতে চেয়েছেন। সোহারাবের উপন্যাসেও দেখি ব্যক্তির আত্মদংশনের মধ্য দিয়ে তিনি চেতনার গভীরে নিয়ে যান। তবে সোহারাব আশাবাদের শিল্পী। চরিত্রের উত্তরণ ঘটান তিনি নিজস্ব রীতিতেই। মানুষকে তিনি নরকে ফেলে দিতে চাননা। তবে নরকের যন্ত্রণা উপলব্ধি করান। কেননা ভারতবর্ষটাও যেন এক নরকের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছে। সেই বিপন্ন সময় তাঁর গল্পে বড় হয়ে ওঠে।

29