সাধন দাস

রাত ন’টা। নীলদিঘিপাড়ার শেষ গলিটা এতো নিঝুম! রোগা ল্যাম্পপোস্টগুলোর চোখে ছানি পড়া আলো। বিষণ্ণ বাড়িগুলো। কেউ কাউকে চেনে না। কারো সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। মনে হয়, এই পৃথিবীতে প্রাণ নেই। তখনই মেয়েটা ঢুকে পড়লো গলিতে। কারো বাড়ির কাজের মেয়েটেয়ে হবে। আচ্ছা করে খাটিয়ে ছিবড়ে করে ছেড়ে দিয়েছে। একটু কুঁজো। সারাজীবনের ক্লান্তি বয়ে আনছে। শুনেছি, কালিদাসের সুন্দরীরা বক্ষভারে ঈষৎ আনত হয়। উজ্জ্বল শ্যামলা। হাঁসের মতো দুলতে দুলতে আসছে। নিঃসঙ্গ  ছায়াটি দীর্ঘ হচ্ছে, কখনও ছোটো হতে হতে মনে হচ্ছে ফাঁপা, সালোয়ার কামিজই এগিয়ে আসছে, ভিতরে মেয়েটি নেই।  

কিছুকাল আগেও নীলদিঘিপাড়া বনেদি, অভিজাত  এলাকা ছিলো। বলা হতো সীমান্তপুরের বালিগঞ্জ।   

পরপর বাড়িগুলো ফাঁকা। কেউ বাস করে না। বাইরে থেকে দরজা বন্ধ। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলেরা জেলাশহর ছাড়িয়ে দেশ বিদেশের সেরা শহরে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। বাবা মায়েরা কেউ ছেলে, কেউ মেয়েদের কাছে; কেউ বৃদ্ধাশ্রমে, কিংবা বুড়োবুড়ি হতে হতে ফুরিয়ে গেছে। দু’একজন টিঁকে থাকলেও থাকতে পারে। দু’তিন জেনারেশনেই ধু ধু সীমান্তের বালিগঞ্জ। 

এ রকমই একটা পোড়ো বাড়ি ভেঙে নতুন ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে। মাল মেটেরিয়ালস পাহারা দেওয়ার সিকিউরিটি আমি। মশারির মধ্যে বসে বিড়িতে গ্যাঁজা টানছি আর ওৎ পেতে আছি। আর কতোদূর! আয় আয় চই চই। এই গলিতে চেঁচিয়ে মরে গেলেও কেউ শুনতে পাবে না। ছুটে আসারও কেউ নেই। দীর্ঘদিন বাড়ি ছাড়া, বৌ ছাড়া। ফানুষই হোক মানুষই হোক, মেয়েতো! খুব ইচ্ছে করছে। হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এলাম থামের আড়ালে। খুলে যাওয়া লুঙি কষে বেঁধে মশারির কোণ দুটো খুলে দিলাম। সামনা সামনি আসতেই শেয়ালের মতো নিঃশব্দে ছুটে চেপে ধরলাম মেয়েমানুষের মুখ। একটুকরো মাংসের মতো টানতে টানতে নিয়ে এলাম বিছানায়। চিত করে ফেলেছি। একেবারে ন্যাদোস, ভ্যাদভেদে মাল। মুখ থেকে হাত সরিয়েছি। মশারির গায়ে লাগানো আড়াল সরে  রাস্তার আলো এসে পড়েছে। এক খুনখুনে বুড়ি। চিত যখন করেছি, ধরা পড়লে, প্রমোটার দাদাই ভরসা। আশ্চর্য, মাগিটা ধ্বস্তাধ্বস্তি, হাত পা ছোঁড়াছুড়ি কিছুই করলো না। কথা বলার জন্যে গোঁ গোঁ করছিলো। মুখ খোলা পেয়ে দম নিলো। হাত পা এলিয়ে নিজেই চুপচাপ শুয়ে থাকলো। নড়ছে না। বুকের ভিতর ধ্বক করে উঠলো। মরে গেলো নাকি? 

একটু জিরিয়ে বললো- বাবা তুমি আমার ছেলের বয়সি। তা হোক। যা করবা করো। যদি  মরে যায়, এ গলির শেষ বাই লেনের শেষ বাড়ির শেষ তলায় বুড়োটা অপেক্ষা করছে, খাবে।  তুমি টেনে আনার সময় হাত থেকে রুটি সব্জি রাস্তায় পড়ে গেছে। গিয়ে একটু খাইয়ে দিও। পঙ্গু। নিজে খেতে পারে না। আমাদের একমাত্র ছেলে, বিদেশে, এ রকম রাতেই ফিরতো। দেখবে, সে সদর দরজায় আলো জ্বলছে।

57