বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জনজীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

সোহারাব হোসেন (১৯৬৬ ) এসেছেন উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাটের অজ পাড়াগাঁ থেকে। স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিলেন। সোহারাবের মৃত্যু বাংলা ছোটোগল্পের জগতে এক অপূরণীয় ক্ষতি। গল্প জীবনের প্রথম থেকেই তিনি নিজস্ব একটি ঘরানা তৈরি করে নিয়েছিলেন। গল্পরচনার এক সহজাত জীবনতুলি নিয়েই তিনি এসেছিলেন। ফলে তাঁর গল্পগুলি এক অন্য জগতে আমাদের নিয়ে যায়। সময়ের রূপ থেকে রূপান্তর, লোকায়ত জীবন, রূপকথা –উপকথা, জাদুবাস্তব, পণ্যায়ন ও ভোগবাদ সমস্ত মিলিয়ে তিনি একটি এমন গল্পবলয় তৈরি করেন যেখানে তিন আজও একক। সোহারাবের প্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পীকে পেতে বাংলা ছোটোগল্পকে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে তা আমাদের জানা নেই !  আমরা অনেক গুলি গল্পগ্রন্থ তাঁর হাত থেকে পেয়েছি – ‘দোজখের ফেরেশতা’ ( ১৯৯৬ ), ‘বায়ু তরঙ্গের বাজনা’ (২০০২), ‘আয়না যুদ্ধ’ (২০০৫ ), ‘আমার সময় আমার গল্প’ ( ২০০৮ ), ‘সুখ সন্ধানে যাও’ (২০০৯ ), ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ (২০১০ ), ‘নির্বাচিত গল্প’ (২০১১ ) ও ‘ভেজা তুলোর নৌকা’ ( ২০১৭ )।গল্পে প্রবেশের আগে তাঁর গল্প সম্পর্কিত ধারণা পাঠকের কাছে স্পষ্ট করা প্রয়োজন –

“বিষয়কে শিল্পে রূপান্তরিত করার কাজে আমি যে গল্প –প্রকরণে স্বাচ্ছন্দ্য বোধকরি তা মূলত দেশজ-লোকজ ঘরানা। গল্প-প্রকরণে আমি মান্য প্রচল রূপবন্ধনের থেকেও বেশিবেশি করে গুরত্ব দিই আমার দেশের লোকজ ধারাটিকেই। সেখানে তাই রূপকথা, উপকথা,ইতিকথা, ছড়া- ধাঁধা –প্রবাদ-প্রবচনের কোলাজজাত অভিঘাত, কথকথা,বৃত্তান্তধর্মিতা আর দেশীয় ‘টেল’ –এর রীতিটির সঙ্গে অধুনান্তিক নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষার সম্পৃক্তিকরণ ঘটছে। বৃত্তান্তে –বৃত্তান্তে কিংবা কথকথার কাহিনিতে-কাহিনিতে যে ইন্টার –লক্‌ড্‌ ফর্ম তাকে আশ্রয় করেই আমি গল্পকে শিল্প করার সিঁড়ি বলে ভেবে নিয়েছি। এই সিঁড়িতে চড়েই আমার সময়ের সমস্ত অভিমুখ, সমস্ত প্রান্ত, সব মাত্রা, তার ধ্বংস ও গঠনশীলতা এবং বিশ্বাস ও স্ববিরোধকে নিয়ে আমি সাহিত্যের কালান্তক প্রান্তরে জরুরি চেষ্টা করি। যেতে পারি কিনা জানিনা!” (ভূমিকা, আমার সময় আমার গল্প, পুনশ্চ, প্রথম প্রকাশ ২০০৮ ) ।

‘দোজখের ফেরশতা’ সোহারাব হোসেনের অন্যতম গল্প। কথক ও সাহেবালিকে কেন্দ্র করে এ  গল্প উঠেছে। দরিদ্র সাহেবালি একদিন কথকের কাছে দেড় টাকা নিয়েছিল সামান্য গুড় কেনার জন্য। সাহেবালি বলিষ্ঠ পুরুষ হলেও এখন কর্ম ক্ষমতা হারিয়েছে, ফলে আর কেউ কাজে নেয় না। মোশারাফ দর্জির দোকানে কথক মাস্টারের সঙ্গে সাহেবালির বহু কথা হয়েছিল। মোশারফের সেলাই মেশিনে সাহেবালি জীবন যুদ্ধের চাকা ঘুরতে দেখেছিল। সে বেহেস্তো ও দোজোকের খবর দিতে পারে। সে কিছুদিন কবর খোড়ার কাজও করেছিল। কিন্তু সব মৃত্যুতেই সে দোজোকের গন্ধ পায়। ফলে আজ আর কেউ তাঁকে কবর খোড়ার জন্য ডাকে না। অভাবের জন্য স্ত্রীও চলে গেছে। কথক বহুদিন সাহেবালিকে দেখেনি, ফলে একদিন নিজেই গেছে সাহেবালির বাড়িতে। সেখানে শুনেছে তাঁর করুণ পরিণতির কথা। আজ সাহেবালি নিজের শরীর থেকেই দোজোকের গন্ধ পায়। কিন্তু সে গন্ধ পায় না কথক।  আজ কথক সাহেবালিকে কিছু টাকা দিতে চাইলেও নেয় না। কেননা স্ত্রী চলে যাওয়ায় সে আরও উদাসীন হয়ে গেছে। তাঁর ভাবনা কীভাবে বেহেস্তে স্থান পাওয়া যাবে, টাকা দিয়ে তো বেহেস্তে স্থান পাওয়া যায় না, তাই আজ সে টাকা নিতে অস্বীকার করে। 

    এক অদ্ভুত চরিত্র সাহেবালি। আর তাঁকে আরও অদ্ভুত করে তুলেছেন লেখক এক অনবদ্য পরিবেশে। সোহারাব হোসেন এক দর্শনকে সামনে রেখেই গল্পের প্লট গড়ে তোলেন। সস্তা সাদামাঠা কাহিনির উৎসব তাঁর গল্প নয়। মানবজীবনে সবারই নরক বা বেহেস্তের ভয় থাকে। গল্পের প্রেক্ষাপট যেহেতু মুসলিম জীবন তাই বেহেস্তের ভয় বলা হয়েছে। আর সে ভয় থেকে বাদ যায়নি সাহেবালিও।  পরলৌকিক জীবন সম্পর্কে যে বিশ্বাস, সেই বিশ্বাসকে সামনে রেখেই গল্পের বিবর্তন রেখাটি গড়ে উঠেছে। আসলে এই গল্পের মত বহু গল্পকেই নির্দিষ্ট মুসলিম জীবনের গল্প বলে লেবেল সেটে দেওয়া যায় না। এখানে গল্প নদীর ঢেউয়ের মত সমতলে গড়িয়ে যায় নি। লেখক একটি নির্দিষ্ট দর্শনে পৌঁছতে চান বা কিছু বলতে চান, আর তা গড়ে তুলতে চরিত্রগুলিকে সাজিয়ে একটি প্লট রচনা করেন। আর লেখকের অভিজ্ঞতা যেহেতু মুসলিম জীবন সম্পর্কে প্রবল তাই চরিত্রগুলি মুসলিম হয়ে ওঠে। লেখকের মনে হয়েছে এই সাহেবালি ঈশ্বর প্রেরিত ফেরেশতা, কিন্তু সাহেবালি তা অস্বীকার করেছে। অতিকথন নেই, তিনটি পরিচ্ছেদে এক নিটোল গল্প রূপায়ন করেছেন লেখক। কখনও আত্মকথনে গিয়েছেন –

“দীর্ঘকাল মাস্টারি করার অভিজ্ঞতার নিরিখে এতদিন  দাবি করতুম যে, মানুষ চিনতে আমার ভুল হয় না। এখন দেখছি আমার এই দাবি খুব একটা জমাট ভিতের উপর দাঁড়িয়ে নেই। অন্তত সাহেবালির ক্ষেত্রে আমি সম্পূর্ণ ব্যর্থ এই কথা অবনত মস্তকে মেনে নিতে কোনো দ্বিধা নেই। বস্তুত সাহেবালিকে এখন যত দেখছি ততই আমি বিস্মিত হচ্ছি। এমনকী মনের মধ্যে এই চিন্তা বিশ্বাসের মতো প্রবেশ করেছে যে, সাহেবালি এই মর –জগতের কেউ নয়। স্বর্গীয় ঈশ্বর্য ও পরিবেশের কোনো বিশেষ কাজে ঈশ্বর তাকে নররূপে মর্ত্যে পাঠিয়েছেন – এমন ভাবনায় এখন আমি সাহেবালির প্রতি খানিকটা শ্রদ্ধাশীলও ।“ (শ্রেষ্ঠ গল্প, করুণা, প্রথম প্রকাশ ২০১০, পৃ. ৩৭ )

‘ছায়া প্রলম্বিত’ গল্পে রাকাছতুল্লার চেতন অবচেতন স্তরের মধ্য দিয়ে লেখক বাবরি মসজিদ ধ্বংসকে কেন্দ্র করে যে দাঙ্গার পরিস্তিতি সৃষ্টি হয়েছিল তা  নিজস্ব দর্শন থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। দাঙ্গা হিন্দু বা মুসলিম বাধায় না, দাঙ্গা বাধায় কিছু দাঙ্গাবাজ মানুষ। তবে এইসব মানুষরা সাধারণ মানুষের মনে দাঙ্গার চেতনা সঞ্চার করে দেয়। প্রায় কিছু মানুষের মধ্যে ধর্মান্ধ চেতনা আছে তবে তা প্রকাশ পায় না প্রতিকূল পরিবেশের জন্য , কিন্তু মনে মনে  তা লালন করে চলে, নিজেকে বাঁচানোর জন্য প্রস্তুত রাখে। রাকাছতুল্লা গ্রামে দাঙ্গা নেই, কিন্তু দাঙ্গাকে কেন্দ্র করে এক ভয় মনে মনে কাজ করেছে। রাকাছতুল্লা আজ ফসল পাহাড়ায় গেলেও কিছুতেই ঘুম আসে না, চেতনে –অবচেতনে দাঙ্গার প্রেক্ষাপট ও পরিণতির চিত্র ভেসে ওঠে। দূর গ্রামে চিৎকার শুনে মনে হয় সন্তান আব্দুর রহিমও কি দাঙ্গা সৃষ্টি করতে গেল নাকি ! প্রতিটি মানুষই বাঁচতে চায়, বাঁচার স্বপ্ন দেখে  এবং বাঁচার জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সংগ্রাম করে। তাই আজ রাকাছতুল্লাও বাঁচার জন্য ধারালো অস্ত নিজের কাছে রেখেছে। যে রাকাছতুল্লা বলেছিল –“হিন্দু –মোছলমানের আজীবন একসাথে বাস। মিটমাট করে নে সব। দাঙ্গাবেটি রক্তখাগি। মানুষখাগি। ঝ্যাঁটা মেরে পার কর। “ (তদেব, পৃ. ১৪ ) – এই মানুষই আজ মানুষকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবেছে। আর সে প্রতিদ্বন্দ্বী হল নিজেরই ছায়া। আসলে এক সুপ্ত দাঙ্গার চেতনা মনে মনে সঞ্চার হয়ে গেছে। সেই বোধ থেকে সমস্ত বিধর্মী মানুষকেই শত্রু বলে মনে হয়েছে। রাতের অন্ধকারে রাকাছতুল্লা নিজের ছায়াকে হিন্দু মানুষ ভেবে আক্রমণ করতে গিয়ে নিজের ধারালো অস্তে ধান খেতে নিজেই পরে গিয়ে তল পেটে বিদ্ধ হয়েছে। এই মৃত্যুর ঘটনাকে সামনে রেখেই লেখক সোহারাব হোসেন এক বোধে উপনীত করেন পাঠককে। দাঙ্গার পরিবেশ নেই, তবুও যেন দাঙ্গার পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে গেল। সকালে যখন রাকাছতুল্লার সন্তান বা প্রতিবেশী এই দৃশ্য দেখবে তখনই হয়ত আরও দাঙ্গা সৃষ্টি হতে চলবে। প্রকৃত সত্য কীভাবে মিথ্যার আড়ালে চাপা পড়ে যায়, আর সেই মিথ্যাকে কেন্দ্র করেই কীভাবে মরণ রহস্যের ফাঁদ সৃষ্টি হয় তাই দেখিয়ে দেন লেখক।

                    ‘বোবাযুদ্ধ’ গল্পে আমরা পাই বালক তরিকুলকে। আসলে গরিব মানুষকে বেঁচে থাকতে যুদ্ধ করতে হয় এই পৃথিবীতে। সে যুদ্ধ শ্রেণির সঙ্গে, খাদ্যের সঙ্গে, টিকে থাকার সঙ্গে। মেম্বারের কল্যাণে তরিকুলের কিছু পাউরুটি জুটত। এই মেম্বারের মৃত্যুতে সে বোবা হয়ে যায়। আসলে এই মৃত্যুই যেন তাঁর খাদ্যকে কেড়ে নেয়। তরিকুল বাজারে থাকে, সবার ফরমাইশ মত কাজ করে , ফলে কিছু খেতে পায় । কিন্তু যে তারিকুল অনবরত কথা বলত সে আজ বোবা হয়ে গেছে। এক মৃত্যু ও খাদ্য বন্ধ হয়ে যাওয়া এই তার কারণ। মৃত্যুর অনুসন্ধানে সে গেছে, গাছে ঝোলা বাদুরদের দেখেছে কিন্তু কোন সত্যে পৌঁছাতে পারেনি। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে গেছে, কিন্তু তিনদিনেই ছেড়ে দিয়েছে। আজ আবার বাজারে ফিরেছে তরিকুল। বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসে চায়ের গ্লাস ভেঙে ফেলে বালক রবি ঘোষ। ফলে দুজনকেই প্রহার করে মালিক। আজ তরিকুলের প্রতিবাদী সত্তা জেগে উঠেছে। রাতের অন্ধকারে সে ও রবি  মাটির উনুন ভেঙে দিয়েছে। তরিকুলরা এই নশ্বর প্রজন্মের সন্তান, তাই তাঁর সঙ্গে তুলনা হতে পারে না রবীন্দ্রনাথের ‘অতিথি’ গল্পের তারাপদ বা শরৎচন্দ্রের কোন চরিত্রের। আসলে তরিকুলদের আজ লড়াই ক্ষুধার সঙ্গে। এ সময়ে, এ সমাজে চুরি হচ্ছে, সরকারের বরাদ্দ অর্থ থেকে জনগনকে ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে তবুও তরিকুলদের বাঁচতে হবে সামান্য ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করেই। এই সুপ্ত চৈতন্য বালকের জাগরণ ঘটিয়ে দিয়েছেন লেখক। এ পৃথিবীতে কেউ কার নয়, নিজের পথ নিজেকেই করে নিতে হবে, ভালোবাসার দাম কেউ দেবে না, সেখানে বোবা মানুষের অভিমানের কোন মূল্য নেই। ফলে তরিকুল ও রবি ঘোষ আজ প্রতিবাদের নিশান হাতে উঠিয়ে নিয়েছে। সোহারাব হোসেন সময় সমাজ  সত্যের কথাকার। তাঁর গল্পে বাস্তব রূপান্তরিত হয় অতিবাস্তবে বা পরাবাস্তবে। কিন্তু সেখান থেকেও তিনি কৌশলে নির্মম বাস্তবের মুখোমুখি পাঠকে দাঁড় করিয়ে দেন। আসলে প্রতিটি লেখকের একটি নিজস্ব কৌশল থাকে, যে পদ্ধতির মধ্য দিয়ে তিনি গল্পের সত্যে পাঠককে পৌঁছে দিতে চান। সোহারাব হোসেনও নিজস্ব পথেই গল্পের সত্যে আমাদের পৌঁছে দেন।

37