Categories
Uncategorized

কোভিড কথা : সবিতা নাগ

ফেব্রুয়ারি ১১,২০২১:সমস্ত প্রোটোকল মেনে বাড়ির বাইরে না গিয়েই বাড়িতেই ছিলাম। কিন্তু কোথা থেকে এই ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করল কিছুই বুঝতে পারলাম না। হঠাৎ দেখছি কোন স্মেল পাচ্ছি না। আর কোন উপসর্গ আমার ছিল না। সেটা ছিল সাতাশে সেপ্টেম্বর। গেলাম ডাক্তার তন্ময় পালের কাছে। ডাক্তারবাবু ওষুধ দিলেন আর বললেন করোনা টেস্ট করাতে। যথারীতি আঠাশে সেপ্টেম্বর রায়গঞ্জ হাসপাতালে টেস্ট করালাম। ফোন নম্বর নিয়ে বলে দিলেন আগামীকাল রেজাল্ট পেয়ে যাবেন।

ঊনত্রিশে সেপ্টেম্বর সকালে রেজাল্ট এল। আমি এমনিতে বেশ সাহসী। কিন্তু সাহস করে মেসেজটা দেখতে পারছিলাম না। বড় মেয়েকে বললাম ফোনে মেসেজটা দেখতে। মেয়ে দেখে বলল, মা তোমার করোনা পজিটিভ। শুনে বসে পড়লাম। ভাবলাম তবে কি এখানেই শেষ? দায়িত্বগুলো তো পড়ে রইল।

এবার শুরু হলো ফোন আসার পালা। কম করে দশটা ফোন। একটাই কথা,” আপনি সুপার স্প্রেডার। আপনি বাড়ি থাকতে পারবেন না। আমরা এম্বুলেন্স পাঠাচ্ছি আপনি কোভিড হাসপাতালে চলে আসুন।” আমি ভাবছি আমার তো কোনো অসুবিধা নেই। আর দশটা মানুষের মতো আমি সুস্থ। তবে আমি কেন হাসপাতালে যাব?

কিন্তু উপায় নেই। শুরু হলো কোভিড হাসপাতালে যাবার প্রস্তুতি। মেয়েরা আমায় প্রস্তুত করে দিল কোভিড হাসপাতাল এর উদ্দেশ্যে যাবার জন্যে। বাড়ি থেকে বের হবার সময় মেয়েদের দিকে একবার তাকাই একবার বাড়িটার দিকে তাকাই। এটাই কি আমার শেষ বের হওয়া! মেয়েদের কি আর দেখতে পাবো না?আরো কত কি!

অবশেষে পৌছালাম কোভিড হাসপাতালে। সেখানকার পরিষেবা খারাপ ছিল না সেখানে দুবেলা ডাক্তার এসে আমাদের দেখে যেতেন। আর যারা আমাদের খাবার জোগান দেওয়ার, পরিচ্ছন্নতার দায়িত্বে ছিলেন তাদের পরিষেবা ভাল ছিল।

আমার ডাক্তারবাবু তন্ময় পাল বলেছিলেন আপনার তো সিম্পটম নেই, আপনাকে তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেবে। সেই মতই আমি তিনদিন পর ছাড়া পাই। কিন্তু বাড়িতে আসতে পারিনি। আমাকে কোভিড হাসপাতাল থেকে সেফহোম সেন্টারে পাঠানো হয়।

গাড়ি করে আমাদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। গাড়ির ভেতর থেকে বুঝতে পারছিলাম না কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আমাকে। অবশেষে একটা ফাঁকা জায়গায় গাড়িটা থামল, নামলাম। নামার পর একটু হলেও মনটা ভাল হয়ে গেল ঐ ফাঁকা মাঠ ভর্তি কাশফুল দেখে। তারপর আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো আমাদের থাকার রুমে। পাশেই ছিল একটা বড় মাঠ যেটা বিল্ডিংয়ের ওই রুমের জানালা দিয়ে দেখা যেত। সেই মাঠে ভোর পাঁচটায় অনেক অল্প বয়সী ছেলে-মেয়ে উপস্থিত হত। সঙ্গে থাকত শিক্ষক যিনি তাদের খেলাধূলার নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতেন। আমার খুব ভালো লাগত। বন্দিদশায় ওই মাঠের দিকে তাকিয়ে বেশ আনন্দ পেতাম।

তারপর এল সেই দিন। নভেম্বরের সাত তারিখ, যেদিন আমার ছুটি হল।ছুটির পর এলাম বাড়ি। কদিন ঘরবন্দি থাকলাম। তারপর একটু একটু করে কখনো দোতলার বারান্দায়, কখনো বাড়ির ছাদে যেতে লাগলাম। আর তখনই বুঝতে পারলাম যে আমি সবার থেকে বিচ্ছিন্ন। আমার প্রতিবেশীরা আমার শরীর কেমন আছে সেটা জিজ্ঞেস করা দূরে থাক তারা আমার দিকে তাকালেই বুঝি তাদের ভাইরাস অ্যাটাক করবে এমনটাই ভাবতো। আবার কোন প্রতিবেশী দিব্যি বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। যেই বাড়ির সামনে এলো এমনি মাস্কটা মুখে লাগিয়ে নিত, এমনভাব যেন আমাদের বাড়ি থেকে ভাইরাস বের হচ্ছে।

প্রতিবেশীর ছেলের বিয়ে। ভেবেছিল বুক পোস্টে চিঠি দেবে কেননা চিঠিটা পোস্ট কথাটা লেখা ছিল। আমি প্রায় দুমাস পরে একদিন বাইরে বেরিয়ে ছিলাম। আমার পরিচিত একটি মেয়ে রাস্তার উল্টোদিক থেকে আসছিল। আমাকে চিনতে পারেনি। একটু কাছে এসে চিনতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে মাস্কটা বের করে মুখে লাগিয়ে নিল। এসব দেখে মনে হতো,কেন এত অসম আচরণ!

আমরা তো কোন সামাজিক অপরাধ করিনি না ভাইরাস তৈরি করিনি!  গাইডলাইনে বারবার বলা হয়েছে আমাদের লড়াই রোগের সাথে রোগীর সাথে নয়। জানিনা আমি নিজে কেমন আচরণ করতাম অপরের সাথে। হয়ত এমনটাই করতাম। কেননা এই রোগ সম্বন্ধে এমনই ভয় হয়েছিল মানুষের মনে।

এই অসম লড়াইয়ে আমাদের পাশে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে আমার ছোড়দা যার কথা না বললেই নয়।উনি আমাদের ও আমার মেয়েদের সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিস এনে দিয়েছেন। আবার আমার রিলেটিভ ফ্রেন্ডস যারা আমাদের নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছেন। আবার ফীড দ্য নীডের  ছেলেরা আমি কোভিড হাসপাতালে থাকাকালীন অবস্থায় আমার প্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দিয়েছে। শুধু তাই নয় আমায় ফোন করে অনুরোধ করেছে যে আপনি একটু জানলার কাছে আসুন,আমরা দেখি আপনি কেমন আছেন। এগুলো ছিল একটা ভালো দিক।

সবশেষে এটাই বলব যে এটা কোন সামাজিক অপরাধ নয়। এটা আমাদের অজানা একটা নভেল করোনাভাইরাস। এই ভাইরাস কখন কাকে অ্যাটাক করবে কেউ জানেনা। তাই বলছি এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের কাছে নয় পাশে থেকে সহযোগিতা করুন। আবার বলছি লড়াই রোগের সাথে রোগীর সাথে নয়।

38

Leave a Reply