রিনা সাহা

অগ্রদানী বামুনদের অনুরোধে পার্টনারশিপ বিজনেসে খাটাবেন বলে আমার গো-ব্যবসায়ী কবি বন্ধু গোবরাচরণ গড়করি সুদূর গোরখপুর থেকে  দশমাসী দেশী বাছুরটা বড় শখ করে কিনে এনেছিলেন।দুর্মূল্যের বাজারে খাইয়ে-দাইয়ে বেশ ডাগর-ডোগর করে বড় করে আমায় ফোন করে দেখতে ডাকলেন একদিন। নাদুস-নুদুস তেল চকচকে চেহারার গরুটাকে দেখে বেশ পছন্দ হল আমার।মাথায় টাক, ঘি-রঙা গা,আড়াইফুটি ল্যাজ আর ল্যাজের আগায় একগোছা কুচকুচে কালো সানসিল্ক অ্যাড চুল—এ গরুর ল্যাজ ধরে বিন্দাস বৈতরণী পার হওয়া যাবে।গরুটার গায়ে হাত বোলাতেই খুঁদি খুঁদি ত্যারছা চোখে আমার দিকে চেয়ে ইয়াব্বড় জিভ দিয়ে হাতটা চেটে দিল। তারিফের সুরে বললাম—–খাসা দেখতে হয়েছে তো! তা দাদা ওর নামটা কি রেখেছেন।

গদগদ গোবরাবাবু বললেন—-গমিতসা। গোরখপুর থেকে আনা বলে ওই নামটা রেখেছি।

—-বাঃ ভারী মিষ্টি,মানুষের নামের মতো। নামে-গতরে মানিয়েছেও বেশ।কিন্তু নামের মানেটা তো বুঝলাম না।

—–হা হা হা। ও নামের মানেটানে কিছু নেই—“গ”-তে গরু আর “মিতসা” মানে বন্ধুর মতো—-এমনটাই ভেবে রেখেছি আমি। কিন্তু যা দুষ্টু না! এই তো সেদিন গো-সুমারী অফিস থেকে ওর কানে আধার ট্যাগ লাগাতে এসেছিল যে লোকগুলো,ওদের এমন লেংগি মেরেছে যে খোঁড়াতে খোঁড়াতে ফিরে গেছে বেচারারা। হা হা হা।

—–কি আর করা যাবে দাদা।মানুষ তো নয় যে আধারের গুরুত্ব বুঝবে! হা হা হা।

—-কিন্তু দাদা সবই তো ঠিক আছে। খুব চিন্তায় পড়েছি আমার আগের কেনা দশটা গরু নিয়ে।

—-কেন ওদের আবার কি হল?

—-ওরা যে সব পাচার হয়ে আসা গরু।কেনা-বেচার রসিদ-টসিদ কিছুই নেই।তাই গো-সুমারী অফিস থেকে আধার ট্যাগও দিল না ওদের। যাবার সময় বলে গেল ক্যাব লাগু হলে এই গরুগুলোকে রাখা মুশকিল হয়ে যাবে—-ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দিতে হবে।

আমি তো হাঁ—গরুদেরও ডিটেনশন ক্যাম্প? ওটা আবার কোথায়?

—–কথাটা শুনে আমিও অবাক হয়ে হেসে ফেলেছিলাম। ওরা বলল—-হাসছেন কেন মশাই? সরকারী খোয়াড়ই তো ওদের ডিটেনশন ক্যাম্প।

—-ও আচ্ছা, এবার বুঝলাম।হা হা হা। তা এখনই অত চিন্তার কিছু নেই। আগে তো বিলটিল পাশ হোক,তারপর দেখা যাবে। এখন কিছুদিন মাঠেঘাটে চরাতে না গিয়ে গরুগুলোকে আপনার গোয়াল ঘরেই নজরবন্দি করে রেখে যত্ন আত্তি করুন। আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে কবিতা লিখুন মন দিয়ে। আপনার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থটা খুব শিগ্গিরই দেখতে চাই।

আমার কথায় আশ্বস্ত হয়ে বেজায় খুশি গোবরাবাবু গোমতী বৌদিকে ডেকে বাড়ির গরুর খাঁটি দুধের চা আর ছানার পকোড়া অর্ডার দিয়ে ওর আড্ডাঘরে বসালেন। এবছরই “কবিশ্রী” উপাধি পাওয়া গোবরাবাবুর সাথে বেশ খানিকক্ষণ কবিতাড্ডা শেষে রাত ন’টা নাগাদ বাড়ি ফিরে এলাম।

পরদিন সক্কাল সক্কাল গিন্নীকে চা দিতে বলে “গন্ধটা সন্দেহজনক” খবরের কাগজটা নিয়ে বসতেই আমার চোখ কপালে। প্রথম পাতার হেডলাইনেই বড় বড় করে লেখা—“কবিশ্রী গোবরাচরণ গড়করির দশখানা বিদেশী গরু শ্রীঘরে”। কি সব্বোনাশ! রাতারাতি ধরে নিয়ে গেল গরুগোলোকে! এখন কি হবে! চেঁচিয়ে ডেকে বউকে খবরটা দিতেই উনিও ক্যাব-ম্যাব-শ্রীঘর কিছু না বুঝে বলে বসলেন—-অ্যাঁ কি বলছ গো! গরুর শ্রীঘর! ওটা আবার কোথায়! কবে হ’ল? আগে তো কখনও শুনিনি এমন ঘরের কথা!

এমনিতেই মেজাজটা খিঁচে আছে তখন। মুখ ঝামটা মেরে বললাম—-আমার মাথায়।সাধে তো আর বাপ-মা গজগামিনী নামটা রাখেনি! গোদা পায়ের গোদা ভেজা—ভুষি-ভরা মাথা। খোয়াড়ের নাম শোনোনি? গরুদের শ্রীঘর ওটাই।আর সরকারী ভাষায় গরুর ডিটেনশন ক্যাম্প।

কথাটা শেষ হতে না হতেই গোবরাবাবুর ফোন।

—–সব শেষ হয়ে গেল দাদা। কাল আপনি চলে যাবার পর ৪২০ নং গোবরাছড়া অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা এক ভ্যান পুলিশ আমার গোয়ালঘরে রেড মেরে দশখানা গরুই নিয়ে চলে গেছে। গোরখপুরের গরুটার কানে আধার ট্যাগ ছিল বলে ওটাকে নেয়নি। বাকী গুলোর পায়ে কড়া পড়িয়ে হিড়হিড় করে টানতে টানতে পুলিশ ভ্যানে ওঠালো দাদা! গরুগুলো লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে পালাবার চেষ্টা করছিল আর আমার দিকে তাকিয়ে হাম্বা-সাম্বা ডাক ছেড়ে চিৎকার করে কাঁদছিল। উফ্ চোখে দেখা যায় না সে দৃশ্য! এখন আমার আর গোমতীর কি হবে গো দাদা! গরুর ব্যাবসা না থাকলে খাব কি! আর খালি পেটে কবিতাই বা কি ছাই আসবে! ভাঙা মালই হাতে গোঁসাই মন্দিরের সামনে বসে হরিনাম জপে ভিক্ষে করা ছাড়া আর কোনো উপায় তো দেখছি না। 

—- এখনই অত অস্থির হবেন না দাদা। আপনার কবিতার বইয়ের সরকারি রয়্যালটি আছে আর তাছাড়া গোরখপুরের গরুটাও তো আছে। ওটাকে শ্রাদ্ধের কাজে লাগিয়ে যে টাকা পাবেন তাতে করে আপনাদের দুজনার বেশ ভাল ভাবেই চলে যাবে। ৪২০ নং অঞ্চলের পুলিশ অফিসার আমার বাল্যবন্ধু গদাইকে ফোন করে এখুনি পুরো ব্যাপারটা জেনে নিয়ে আপনাকে জানাচ্ছি।

গোবরাবাবুর লাইনটা কেটে সাথে সাথেই গদাইয়ের খোয়াড়-থানায় ফোন লাগালাম।

—-হ্যালো… হ্যা লো…৪২০ নং গোবরাছড়া অঞ্চল খোঁয়াড়?

—-হ্যাঁ বলছি, বলুন কাকে চাই।

—-আমি “গাইনাড়া হাই স্কুলের” মাস্টারমশাই গজেন মন্ডল বলছি।ভিজিলেন্স পুলিশ অফিসার গদাই লস্কর আছেন?

—-গজেন মন্ডল মানে গজা তুইই! আমি গদাই বলছি রে,তোর ন্যাংটা কালের বন্ধু।অ্যাদ্দিন বাদে! কি খবর বল।

—-আর বলিস না ভাই। ভারী বিপদে পড়ে ফোন করলাম তোকে। আমাদের গোবরাবাবুর দশখানা গরু কাল রাতে তোর খোয়াড়ের পুলিশ এসে তুলে নিয়ে গেছে। 

—–এ মা! তাই নাকি! আসলে কাল অত রাতে আর জানা হয়নি কোন গোয়ালে রেড মেরেছিল ওরা। গরুগুলো আমাদের কবিশ্রীর বাড়ির গরু! তাই তো ভাবছি অন্য গরুগুলোর থেকে ডাকগুলো কেমন যেন আলাদা,ছন্দময়—“হাম্বা হাম্বা হাম্বা/সাম্বা সাম্বা সাম্বা/বাঁচাম্মা বাঁচাম্মা বাঁচাম্মা”।

আহা রে বেচারা গরু। কোন দেশে এসে পড়েছিস রে তোরা! নিজের মনে কথাগুলো বলে গদাইকে বললাম—-তা ওদের এখন ছাড়িয়ে নিয়ে আসবার কি উপায় আছে বল। 

—-আপাতত কিছু হবে বলে তো মনে হচ্ছে না। কেননা দিল্লী গরমেন্ট খুব তেতে আছে এখন।সব খোয়াড়েই কড়া মেইল এসেছে—অনুপ্রবেশকারী গরুদের মার্ক করো—-ব্যাটাদের ধরো আর পোরো।মাস ছয়েকের মধ্যে টার্গেট ফুলফিল করতে হবে আমাদের। তাছাড়া ওদের নামে আরও একটা কেস আছে নন বেলেবল্ সেকসনে। 

—-অ্যাঁ বলিস কি!

—–হ্যাঁ। দিনকয়েক আগে যার জমিতে ওর জার্সি গরুগুলোকে চরতে দিয়ে এসেছিলেন গোবরাবাবু, সেই জমির মালিক এফ আই আর করে দিয়ে গেছে ওদের নামে। ওরা নাকি লোকটার দেশী গরুকে মেরে গুঁতিয়ে জমি থেকে বের করে সব ঘাস নিজেরাই সাবার করে নিয়েছে।

—-ডাঁহা মিথ্যে কথা। গোবরাবাবুর কাছে শুনেছি ঘটনাটা। লোকটা নাকি খুব হিংসুটে টাইপের। গোবরাবাবুর রমরমা গরুর ব্যাবসা সহ্য করতে পারছেন না। কি করেছে জানিস! গরুগুলোকে মেরে গলার দড়ি কেটে হাইরোডে ছেড়ে দিয়ে এসেছে। অন্য লোকজন দেখতে পেয়ে ওদের তাড়িয়ে নিয়ে গোবরাবাবুর বাড়িয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে। তা না হলে ট্রাক চাপা পড়ে মরেই যেত সবক’টা।

—-কি বলছিস !এই কেস!ঠিক আছে নলেজে থাকল।তবে যতদিন না ফাইনাল লিস্ট হচ্ছে ততদিন ওদের এখানেই থাকতে হবে। সরকারী হিসেব হয়ে গেলে যা হোক একটা ফাঁক খুঁজে ওদের নামগুলো কাটিয়ে দেবার চেষ্টা করব।তুই চিন্তা করিস না। একদিন খোয়াড়ে আয় জমিয়ে আড্ডা হবে।

—-ঠিক আছে আসব। ভাল থাকিস ভাই।

ফোন ছাড়তেই গোবরাবাবু আর গোমতী বৌদি ঝড়ের বেগে ঘরে এসে ঢুকলেন।

—-ও দাদা,দাদাগো, খবর পেলেন কিছু? কাল সারারাত দু চোখের পাতা এক করিনি।বাচ্চা গরুগুলো এই শীতে কোথায় শুয়ে আছে,খেল কি খেল না, দুজনাই ঠায় জেগে ভেবেছি। ছেলেপিলে নেই,ওরাই তো আমাদের সব ছিল। এমন আইন হল,বাবা-মা একখানে, বাচ্চারা আর এক জায়গায়! হে ভগবান!

বলেই হাঁউমাঁউ করে কাঁদতে লাগলেন গোবরাবাবু। ওকে শান্ত করে সোফায় বসিয়ে গদাইয়ের সাথে ফোনে হওয়া কথাগুলো বুঝিয়ে বলে বললাম—মাস ছয়েক আপনাকে ধৈর্য্য ধরতেই হবে দাদা।এ মুহূর্তে কিচ্ছু করার নেই।

—-অ্যাঁ ছয় মাস! আমার হাতের খাবার খেতে না পেলে ছয়মাস কেন ছয়দিনও বাঁচবে না যে ওরা। 

—-মন শক্ত করুন দাদা! আমাদেরও খুব খারাপ লাগছে।গোটা দেশেই তো এই চলছে। অবলার ওপর সবলার দাদাগিরি! অফিস-কাছারী-স্কুল-থানা-খোয়াড় সবখানেই এক ছবি।

আমার কথা শেষ হতে না হতেই গোবরাবাবু বিকারগ্রস্তের মতো হা-গরু,হায় রাম,হা-গরু,হায়-রাম, বলে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেলেন।

পেছন পেছন গোমতী বৌদিকেও ছুটতে দেখে  গজগামিনী গোদা পায়ে লাফাতে লাফাতে দৌড়ে গিয়ে জাপটে ধরে আটকাল ওকে। দুজনে মিলে বুঝিয়ে শুনিয়ে তখনকার মতো শান্ত করে বাড়িতে রেখে এলাম বৌদিকে। কিন্তু গোবরাবাবুকে বাড়ির কোত্থাও দেখতে পেলাম না। ফিরে আসবার সময় গোয়ালঘরে উঁকি মেরে দেখি গমিতসা জাবনা ভর্তি চাড়ির একপাশে বুকে মুখ গুঁজে বসে আছে। গমিত,এই গমিত বলে ডাকতেই আমার দিকে ঘাড় ত্যারা করে একবার তাকিয়েই উল্টোদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

মাঝে দিনচারেক গোবরাবাবুদের আর কোনো খবর না পেয়ে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরবার পথে ওদের বাড়িতে গিয়ে দেখি এলাহি কান্ড।গোমতী বৌদির ঘরে প্রতিবেশী বউগুলো ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে।ভিড়ের ফাঁক দিয়ে কোনোমতে উঁকি মেরে দেখলাম বৌদি বিছানায় শুয়ে আর মাথার নীচে কলাপাতা দিয়ে একজন ওর মাথায় সমানে জল ঢালছে। ওদের একজনকে জিজ্ঞেস করে জানলাম চারদিন হয়ে গেল গোবরাবাবু বাড়িতেই ফেরেননি।গোমতীবৌদির বাপের বাড়ি থেকে খবর পেয়ে ওর ভাই বলদাচরণ এসে অনেক খোঁজাখুঁজির পর গোহাট বাজারে গিয়ে গোবরাবাবুর দেখা পেয়েছে। তবে ওর অনেক জোরাজুরিতেও উনি নাকি বাড়ি আসতে রাজী হননি।

বলদাচরণকে ডেকে বললাম—-চলুন তো আমাকে নিয়ে কেমন করে বাড়ি না আসে দেখি। উনি আসবেন না, ওর ঘাড় আসবে।

গোহাটে গিয়ে দেখি হাটের ঠিক মাঝখানে যেখানটায় গরু কেনা-বেচা হয় সেখানে একদল লোক গোবরাবাবুকে ঘিরে ধরে সুর করে কি যেন গাইছে আর ঘুরে ঘুরে হাততালি দিয়ে নাচছে। আর গোবরাবাবু, শরীর শুকিয়ে কাঠ, গলায় একটুকরো গরুর দড়ি পেঁচানো,কপালে তিলক,হাতে কর্তাল—ফাটা কাঁসর গলায় চোখ বুজে মাথা দোলাতে দোলাতে একমনে গেয়ে চলেছেন আর দুলাইন গানের ফাঁকে ফাঁকে হাটের লোকগুলো ধুয়ো ধরছে,”আহা বেশ বেশ বেশ”—

প্রথমে বন্দনা করি গোরখনাথের চরণ

তারপরে বর্ণনা করি গাইয়ের ক্যাবের কানুন।।

আমার জমি তোমার জমি গরুর জমি নাই

খাসের জমির ঘাস গরুর খাওয়ার রাইট নাই।।

জন্মের কাগজ নাই গরুর জাতের বালাই নাই

জাতের দোহাই দিয়া গাই বাইন্ধা নিয়া যাই।।

খোয়াড় বান্ধা গাইয়ের গলায় ক্যাবের দড়ির ফাঁস

মানুষ হইলে গাইও বুঝতো ক্যামন দ্যাশের বাঁশ।।

গান থামতেই লোকের ভিড় ঠেলে আমরা দুজনে মিলে প্রায় পাঁজাকোলা করে ওকে তুলে নিয়ে একটা ফাঁকা জায়গা দেখে বসালাম। ধমকের সুরে বললাম—-পাগলের মতো কি যা তা আচরণ করছেন এক হাট মানুষের সামনে! আপনি না কবিশ্রী! আপনাকে এসব মানায়!

গোবরাবাবু চিঁ চিঁ করে চেঁচিয়ে উঠলেন—-রাখুন মশাই আপনার কবিশ্রী উপাধি। আপনি না শিক্ষক! মাতৃদুগ্ধ আর গোদুগ্ধ পানে পুষ্ট হয়েছেন! ডঃ রাধাকৃষ্ণনের উত্তরসূরীরা,জাতির মেরুদন্ডরা কই কিছুই তো করতে পারছে না গরুগুলোর ওপর অন্যায়-অবিচারের! গরুরা কতদিন বাঁচে গরমেন্ট জানে না? ওদের বাপ-ঠাকুদ্দার আমলে পশুঅফিস থেকে গরুর বার্থ-ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়ার চল ছিল? ফালতামি মারা আইন ফলানো!

একথা শুনে জোর হাসি পেল আমার। 

কোনোমতে হাসি চেপে বললাম—-আপনিও তো  কবি,রবিঠাকুরের উত্তরসূরী। কবিতা লিখে অন্যায় কাজের প্রতিবাদ না করে হাটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কবিগান গাইছেন!

গোবরাবাবু তেড়েমেড়ে বললেন—-কবির নিকুচি করি। কোথায় নোবেল আর কোথায় কবিশ্রী! ঝালমুড়ি শিল্প নিয়ে লোকজনকে উৎসাহ দিতে খান চল্লিশেক কবিতা লিখে “দাদাকে বলো”-তে ফোন করে শুনিয়েছিলাম বলেই না ওটা পেয়েছি!ওগুলো সব জিকে-র দাওয়াই দিতে কাজে লেগেছে,আমার লাভের লাভ কিছুই হয়নি। আজই তথ্য-সংস্কৃতি দপ্তরে গিয়ে “কবিশ্রী” উপাধি ত্যাগ করে আসব,বলেই আবার কাঁদতে লাগলেন।

—-আঃ থামুন তো মশাই! পুরুষ মানুষ যখন তখন ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে নাকি! আচ্ছা ওই যে জিকের কথা বললেন—উনি আবার কে?

—-ক্যানো ওর নাম শোনেননি? জিকে তামিল— পুরো নাম ঈশ্বর জেনারেল নলেজ! ঈশ্বর ওর ঠাকুর্দার নাম, জেনারেল বাবার নাম আর নলেজ ওর নিজের নাম।

—-কি খটমট নাম রে বাবা!হা হা হা। তবে এখন আর দেরী নয় চুপচাপ বাড়ি চলুন,গোমতী বৌদি ফিটের ওপর ফিট হচ্ছেন চারদিন ধরে!

—-কেন? আমার গোমতীর কি হয়েছে? ওকেও কি ধরে নিয়ে যেতে এসেছে নাকি!গরুগুলোর না হয় কাগজ নেই,কিন্তু গোমতীর তো সবই আছে! রেশন কার্ড,ভোটের কার্ড,আধার কার্ড,সব চনচনে,তবে?ওরে বলদাচরণ, শিগ্গিরই আমায় নিয়ে চল তোর দিদির কাছে!

বলদাচরণ শশব্যস্ত হয়ে বলল—-জলদি চলেন জাম্বু। দিদির জিউ টান দিছেনি।অহনই গঙ্গা-পানি খিলাবেন তো খিলান,না খিলালে পরে পস্তাবেন হিনি।

চাপা স্বরে ধমকে উঠলেন গোবরাবাবু—-গঙ্গা-পানি! আস্তে কথা বল হারামজাদা বলদা। কতদিন বলেছি না এদেশে এলে এদেশের ভাষায় কথা বলবি? আর ওই চেক-চেক লুঙ্গির সাথে ফুল-ফুল ফুলশার্ট না পড়ে খাকি প্যান্ট,সাদা হাফ শার্ট বানিয়ে এনে পড়বি?

—-ছোরি জাম্বু। এ ভুল আর হবেনি।

 বলদাচরণকে অমন অদ্ভুত ভাষায় কথা বলতে শুনে টাসকা খেয়ে শুধোলাম—-আপনার শ্যালক কোথাকার ভাষায় কথা বলছে গো দাদা? 

—-ও হো আপনার কাছে একটা কথা বেমালুম চেপে গেছি দাদা! ওরা বাংলাদেশী,বগুরায় বাড়ি। বহুদিন আগে একবার বর্ডার ফাঁকি দিয়ে লালমণির হাটে গরু কিনতে গিয়ে গরুর মালিক গোবর্ধনবাবুর মেয়ে গোমতীকে দেখে পছন্দ হয়ে যায়।গরু কিনে ফিরবার সময় গরুর সাথে গোমতীকেও পালিয়ে নিয়ে চলে এসেছিলাম। দেখবেন দাদা,কথাটা যেন পাঁচকান না হয়!

অত দুঃখেও হেসে কুটিপাটি আমি তখন।চোখ টিপে বললাম—-এই সেরেছে! আপনার গোরু-বৌদি সব ওপার বাংলার? কোলো করে বসে আছেন তো মশাই! গরুগুলো তো গ্যাছেই দাদার ভোগে,এবার আপনাদের কোমরেও দড়ি পড়ল বলে! তবে আমার দিক থেকে কথাটা লিক হওয়ার কোনও চান্স নেই, বলদাচরণকে বলবেন, যে ক’দিন এদেশে আছে মুখে কুলুপ এঁটে থাকতে।নইলে একমাত্র দেশজ আত্মীয় হয়ে আপনাদের পচা-পোড়া বডি সনাক্ত করে, পোস্ট-ক্যাব-মর্টেমের পর, শ্রাদ্ধ-শান্তির জন্য বডির ছাই ঘেঁটে ডিএনএ খুঁজে পেতে আমারও ফুটুরি ফুটে ডুম-ফুট্টুস! হা হা হা। তাই গরু যায় যাক—-গোমতী বৌদিকে বাঁচান। গরু গেলে গরু কেনা যাবে, বউ গেলে কি আর বউ পাওয়া যাবে ! এখন তো আর সে আমল নেই যে, জাত-ধর্মের দোহাই দিয়ে ঘাটের মরার হাতেও কচি কন্যে তুলে দিয়ে খাল্লাস হবে বাপ-মা!

গোবরাবাবু কি বুঝলেন কে জানে! তবে পায়ের ধুতি হাঁটুর ওপর তুলে শ্যালককে বগলদাবা করে বাড়ির দিকে দে ছুট।দড়ি ছেঁড়া গরু ধরতে ছুটতে দেখেছি লোকেদের, কিন্তু বউ বাঁচাতে এমন ছুটতে কাউকে দেখিনি কখনও।কবি চরিত্র,দেবা ন জানন্তি,কুতঃ মনুষ্যা! 

(গল্পটি মুজনাই পত্রিকায় পূর্ব প্রকাশিত)

28