Categories
কুলিক রোববার প্রথম পাতা

কুলিক রোববার: মেগা প্রবন্ধ : পর্ব ৩৭

বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জনজীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

‘’মাটির গন্ধ’ কথাটা প্রথম দিকে ভালো লাগত, তারপর যত গল্প লিখেছি ক্রমাগত মাটির গন্ধ শুনতে শুনতে ভীষণ একঘেয়ে লাগে। চাষাভুসো মানুষ। মাঠ মাটি নিয়ে থাকি। বর্ষায় কাদামাটিতে ধান রোয়াই। তার আবার গন্ধ কী !” (জীবনের কথা যাপনের কথা, অভিযান, পৃ. ৪৯ ) আসলে আনসারউদ্দিন মানুষের গল্প লিখতে চেয়েছেন। জমিকে কেন্দ্র করে যে মানুষ, জমিকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা মানুষের জীবনের কাহিনি শোনাতে চেয়েছেন। কিন্তু আনসারউদ্দিনের যে যাপিত জীবন সেখান থেকে এলিট শ্রেণির পাঠকের যাপিত জীবন অনেক দূরে। ফলে আনসারউদ্দিনের গল্পপাঠে পাঠকের মনে হয় এমন তো পড়িনি, বা শুনিনি, তাই সেই আখ্যা দিয়ে থাকেন। সত্যি তো আমরা কৃষক, কৃষিজীবন এইসব শব্দগুলি শুনে থাকলেও সেই জীবনের অভ্যন্তরে কতটা প্রবেশ করেছি ! আর সেই অচেনা গলিপথের যে কত রহস্য রয়েছে, কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের জীবনবৃত্তান্তের যে কত কাহিনি রয়েছে সত্যি তো সে সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি ! ফলে গল্পের পাঠক সাধারণভাবে সে আখ্যা গল্পকারকে দিয়ে থাকেন। যদিও গল্পকার লিখতে চান জীবনের গল্প, মানুষের গল্প। কিন্তু পাঠক বা সমালোচক গল্পের খুঁটিনাটি বিচার বিশ্লেষণে সে আখ্যায় অবতীর্ণ হতে বাধ্য হন। ফলে লেখকের জগৎ থেকে পাঠক কোথাও যেন দূরে চলে যান !

                    তেমনই এক গল্প ‘পাম্পসেট’। শস্য উৎপাদনের যে নানা পদ্ধতি, রহস্য রয়েছে তা এখানে ফুটে ওঠে। তেমনি গ্রাম জীবনে কৃষির বিবর্তন, চাষের জন্য নানা পদ্ধতির আবিষ্কার, কৃষকের সাফল্য – ব্যর্থতা সব মিলিয়ে এক অচেনা জগৎ আনসারউদ্দিনের গল্পে আমরা পাই। এ গল্পের প্রধান বিষয় আবিদের নতুন পাম্পসেট। তা কীভাবে কেনা হল, একটি গ্রাম্য মানুষকে সেই পাম্পসেট কিনতে কীভাবে বিপর্যস্ত হতে হল , এমনকি সেই পাম্পসেটে কীভাবে জীবন গেলে সেই মর্মকাহিনির ভাষ্য এ গল্প। আবিদ লোন নিয়ে পাম্পসেট কিনেছে। লেখকও ডিটেলিং দেন এভাবে –“পারবে মানে এক বছরের গ্যারান্টি। কোনো কিছু গড়বিড় হলে নি খরচায় সারিয়ে দেব। কুকুরের ল্যাজে খবর পাঠালে মধু মিস্ত্রী দৌড় ধরবে। নেন নেন। নতুন কোম্পানি। অতুল শক্তি। সেই সঙ্গে চিনিয়ে দিয়েছিল মেসিনের হাড় –পাঁজর। এটা এলিমেন্ট, এটা নজেল, এটা ক্যাপলিং। আর এই যে ঘোড়ার মুখের মতো এটা টেলপিস। স্টার্ট দিলে হড় হড় করে জল বেরয়।“ (আনসারউদ্দিনের গল্পসংগ্রহ, পৃ. ৫৪ ) আবিদের ধর্মে বিশ্বাস নেই, তাই সে নামাজ পড়ে না। শুধু বিশ্বাস নয় সারাদিন পরিশ্রমের পর আর ইচ্ছা থাকে না ধর্মে মন দিতে। সে শুধু জানে যন্ত্রের দেবতা বিশ্বকর্মা ও শস্যের দেবতা লক্ষ্মী। এখন সে ব্যস্ত নতুন মেশিন নিয়ে। এবার ফসলও ফলিয়েছে বহু, লোন শোধের চিন্তাও আছে মাথায়। কিন্তু যন্ত্র তো মানুষের বশ্যতা স্বীকার করে না। ফলে পাম্পসেট আজ অনেক তেল টানছে, বিকট শব্দ তুলছে, আর তা বন্ধ করতে গিয়েই ক্যাবলিং নাটে আবিদের গামছা আটকে মারা যায়। গল্পের শেষ হয়েছে আবিদের করুণ পরিণতির মধ্য দিয়ে। সে ফসল ঘরে তুলতে পারে নি। তাঁর পরিবারের কী পরিণতি ঘটবে তা আমরা জানি না। কিন্তু পাম্পসেট কেনার সময় তো জমি ব্যাঙ্কে মটগেজ করতে হয়েছিল। ফলে সে পরিবারের অবস্থা সহজেই অনুমেয়।

                    মুসলিম ধর্মজীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ‘শবেবরাতের মেহমান’ গল্পটি। মুসলিম ধর্মজীবন, বিশ্বাস, লোকাচার, ধর্মভয়কে সামনে রেখেই এ গল্পের কাহিনি বিবর্তিত হয়েছে। তবে ধর্মজীবনকে লেখক ব্যঙ্গ করেননি, বা সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ আবিষ্কার করেননি। ইবাদের বাবা অনেকদিন হল মৃত হয়েছে। সে কবর জঙ্গলে ভরে গেছে। আজ হঠাৎ শবেবরাতের দিন তাঁর মনে হয়েছে বাবার পূণ্যের জন্য সে মৌলবীদের আমন্ত্রণ করে খাওয়াবে। আমন্ত্রণও করেছিল কিন্তু সে গরিব বলে মৌলবীদের আজ আসার সময় হয়নি, মৌলবীরা গেছে বড়লোক ইকবাল সাহেবের বাড়ি। তবে ইবাদও ছাড়ার পাত্র নয় –“সে আর একবার খাটিয়া লক্ষ্য করে বলে ওঠে – হেই মোল্লাজী, আপনার সঙ্গে কি কথা হইছিল ! আপনি যে জবান দিছিলেন ? তার বুঝি এই দাম দিচ্ছেন ?” (তদেব, পৃ. ১৯৬ ) কিন্তু তখনই এসেছে আপমান। সঙ্গপাঙ্গরা তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছে। এই ব্যর্থতায় ইবাদের মনে হয়েছে মসজিদে প্রকৃত আল্লা থাকে না। তখন সে বাড়িতে আসা এক ফকিরকেই আল্লাহ মনে করে। সেই ফকিরের কাছ থেকে কোরান শুনেছে, খাইয়েছে, রাতে ঘুমাতেও দিয়েছে কিন্তু ভোর রাতে সেই ফকির ইবাদের মাতার কানপাশা চুরি করে পালিয়েছে। যে ইবাদের ধর্ম সম্পর্কে কোন বিশ্বাস ছিল না সেই ইবাদই ধর্মে বিশ্বাস করে প্রতারিত হয়েছে। শুধু ইবাদই নয় গ্রামীণ মানুষ ধর্মের ওপর বিশ্বাস রেখে এভাবেই শোষিত হয়। সেই সমাজ সত্যকেই আনসারউদ্দিন ধরতে চান তাঁর গল্পে। সেখানে মিথের প্রসঙ্গ স্বভাবতই আসে, কিন্তু তিনি তা নিয়ে বেশি উচ্ছসিত নন, কখনও মিথের ওপর আলো ফেলেন বটে  তবে আভাসেই প্রসঙ্গান্তরের চলে যান। আসলে যাঁর হাতের কাছেই লেখার শতশত উপাদান তিনি কেনইবা মিথে যাবেন, তবে তাঁর গল্পে মিথ আসে কাহিনির চোরাস্রতে চরিত্রের সহজাত প্রবণতাগুলিকে ধরে দেবার জন্য।

                        ‘সুজানী’ গল্পের উপাদান সামান্য। এক নারীর ‘নিকে’ হওয়ার প্রসঙ্গ। মুসলিম সমাজে নারীর এই ক্ষতবিক্ষত চিত্রের পরিচয় আমরা আগেই পেয়েছি। আসলে মধ্যবিত্ত মুসলিম জীবনে নারীর সেটাই ভবিতব্য। অর্থের সাথে, রুটি রোজগারের সাথে মুসলিম মধ্যবিত্ত নারীর ভবিষ্যৎ পাল্টে যায়। নারী সেখানে নিছকই খেলনার বিষয়। সমাজ নারীর ইচ্ছাশক্তিকে তেমন মূল্য দেয় না। এই সমাজসত্যই ফুটে ওঠে এ গল্পে সুজানী চরিত্রের মধ্য দিয়ে। সুজানীর জীবনের বাল্য থেকে যৌবনের অন্তিম পর্ব পর্যন্ত চিত্র এঁকেছেন লেখক। যে সুজানী একদিন শাড়ি পড়তে পারতো না, সেই সুজানীর একদিন বিবাহ হয়ে যায়, কন্যা টুকটুকি জন্ম নেয়, স্বামী মারাও যায়, ফলে সুজানীকে পিতার ঘরে ফিরে আসতে হয়। পিতা শেরজান আবার কন্যার বিবাহ দেয়। কিন্তু কন্যাকে এবার আর সুজানী নিয়ে যেতে পারেনি। অথচ মন পড়ে থাকে কন্যার জন্য। সে ভাবে কন্যার বদলে পুত্র সন্তান হলে এমন করে তাঁর হয়ত বিবাহ হত না, পুত্রকে নিয়েই সে মাটি আঁকড়ে থাকতে পারতো। কিন্তু কন্যা মানেই তো পাখি, যার নিজস্ব গৃহ বলে কিছু নেই। সেই ঘরে গিয়েও সুজানী বাঁচতে চায় নি, আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল কিন্তু সফল হয়নি। এই আত্মহত্যার চেষ্টাই যেন সুজানীর প্রতিবাদ, তবে লেখক সুজানীর মুখ দিয়ে কোন পৃথক প্রতিবাদের বাণী আনেন নি। পিতামাতার কথাকে সে মনে নিতে বাধ্য হয়েছে, সমাজের দিকে চেয়ে দ্বিতীয় বিবাহ করতে বাধ্য হয়েছে। বহু নারীই তো মুখে প্রতিবাদ করতে পারে না, পৃথক পথ বেছে নেয়, সেখানে মৃত্যুই যেন একমাত্র পথ, সুজানী তাঁদের অন্যতম। 

    অন্যদিকে ‘দাম্পত্য’ গল্পে এক মুসলিম নারীর প্রতিবাদী সত্তা ফুটে ওঠে। সুজনী প্রতিবাদ করেনি ,তবে এ গল্পের মরিয়ম প্রতিবাদ করেছে, স্বামীকে নিজের বন্ধনে ফিরিয়ে এনেছে। আসলে কোন নারীই স্বামীকে নিজের পরিধি থেকে অন্য নারীর পরিমণ্ডলে যেতে দেয় না। নারী যুদ্ধ ঘোষণা করে অন্য নারীর বিরুদ্ধে। এ গল্পের মরিয়মও স্বামীকে ছিনিয়ে নিয়েছে সুলতানার কাছ থেকে। আত্মকথনধর্মীতে লেখা এ গল্প এক দরিদ্র কৃষকের জীবনবৃত্তান্ত। নায়কের জীবনে ভ্রমণের ইচ্ছা থাকলেও অর্থ ছিল না। তেমনি নায়ক প্রেমে পড়েছিল সুলতানার। আর তা ধরা পড়ে যায় স্ত্রী মরিয়মের চোখে। নায়কের জমির পরিমাণ পাঁচ বিঘা, প্রস্থির মাঠে এক বিঘা ও বগেড়ির মাঠে চার বিঘা। কিন্তু প্রস্থির মাঠে এক বিঘা জমি হলেও সেখানে সুলতানার দেখা পাওয়া যায় বলে নায়কের গন্তব্য সেই মাঠে, বগেড়ির মাঠের ফসল রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়। নায়কের ইচ্ছা দীঘা ভ্রমণে যাওয়ার। মরিয়ম মুরগি বিক্রি করে ভ্রমণের টাকা দেয়। কিন্তু নায়ক ভ্রমণে গিয়ে মরিয়মের জন্য দশ টাকার মালা ও সুলতানার জন্য পনেরো টাকার মালা কেনে, আর তা ধরা পড়ে যায় মরিয়মের চোখে। আজ মরিয়ম স্বামীকে জব্দ করেছে। স্বামী তালাকের কথা বললে সেও প্রতিবাদ করেছে, স্বামী কোরাণের হাদিসের কথা বললে সেও নারীর অধিকার নিয়ে সচেতন হয়েছে। শেষ পর্যন্ত নায়ক মরিয়মের কাছে পরাজিত হয়েছে, বিসর্জন দিয়েছে সুলতানার জন্য কেনা মালা, এমনকি প্রস্থির এক বিঘা জমি বিক্রি করে দিতে চেয়েছে স্ত্রীর নির্দেশে। তবে নায়ক তাঁর অবৈধ প্রেমকে কখনোই অস্বীকার করে নি স্ত্রীর কাছে। শেষে সেও ভেবেছে দাম্পত্য জীবন টিকিয়ে রাখতে গেলে হার স্বীকার করতেই হবে। আর তখনই লেখক পাঠককে শুনিয়ে দেন –“বনের পশুকে যদি বা বাগ মানানো যায়, কিন্তু ঘরের বউ একবার বিগড়ে গেলে বিষম দায়।“ ( তদেব, পৃ. ২১৯ ) আজ মরিয়ম ফিরে পেয়েছে স্বামীকে, আজ তাঁর সুখের দিন, তাই সে সাজতে বসেছে। আসলে নারীর সুখ তো গহনায় নয়, তা মনে। সেই সুখ আজ পেয়েছে মরিয়ম, যা তাঁকে নিয়ে গেছে এক আত্মতৃপ্তির জগতে।

                সাধারণ,অতিসাধারণ মানুষরা আনসারউদ্দিনের গল্পের নায়ক। সেই সাধারণ মানুষদের জন্য তিনি এক সহজ-সরল ভাষাই ব্যবহার করেছেন। কোন তত্ত্বকে কেন্দ্র করে তিনি গল্পের ফসল ভরিয়ে তোলেন নি। তিনি জীবনকে দেখেছেন। জীবনের আবার তত্ত্ব কী ! সেই তত্ত্বহীন জীবনের তত্ত্বকথাই আনসারউদ্দিনের গল্পের মূল বিষয়। আসলে ভারতবর্ষের মত তৃতীয় শ্রেণির দেশের গঞ্জে গঞ্জে কত মানুষ শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত, আর সে মানুষ যদি সংখ্যালঘু মুসলিম হয় তবে শোষণ আরও বেশি লাঞ্ছনীয়। আনসারউদ্দিন নিজের ভূগোলকে সামনে রেখে সেই লাঞ্ছিত মানুষদেরকে নিজের সৃষ্টিভুবনে এনেছেন। তবে ভুগোলকে অতিক্রম করে এক ভিন্ন স্বাদ তাঁর গল্পে পাওয়া যায়। সেখানে আমরা চিনে নিতে পারি ভারতবর্ষ নামক মহান দেশের এক শ্রেণির মানুষকে। এখানেই আনসারউদ্দিনের স্বতন্ত্রতা, তিনি কালের কথাকার, স্বজাতির আত্মপ্রতিষ্ঠার অভ্রভেদী নির্মাতা।

76

Leave a Reply