বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জনজীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

আনসারউদ্দিনের অধিকংশ গল্পে সে নিজেই কথক। কথকতার ঢঙে গল্প বলতেই তিনি ভালোবাসেন। কোন ভূমিকা নয় তিনি সরাসরি গল্পের অন্দরমহলে প্রবেশ করেন। তিনি একটি সমাজের প্রতিনিধি। সেই সমাজ পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক মুসলিম সমাজ। সেই অবহেলিত সমাজের কথা যেন কথনভঙ্গিতেই তিনি জীবন্ত করে তোলেন- তেমনই একটি গল্প হল-‘গানের খোঁজে’। সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে পল্লিবাংলা। হুল্লোড় প্রিয় সভ্যতা আজ নিজের  অতীত ভুলতে বদ্ধ পরিকর। সেখান থেকে গল্পকার দের আজ গল্প লিখলেই চলে না, নীতিশিক্ষা, সমাজ শিক্ষা দিতে হয়। সমাজ সংশোধন সাহিত্যের কাজ নয় তবুও একালে বসে সে পথ অবলম্বন ছাড়া উপায় নেই। এ গল্পের কথক আজ অগ্রসর হয়েছে বিভিন্ন লোকসংগীতের খোঁজে। যান্ত্রিক সভ্যতার চাপে যেসব লোকসংগীত আজ পল্লিবাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে কথক সেই অতীত সন্ধানে অগ্রসর হয়েছে-

“ আমার অনেকদিনের শখ নেহাতই গ্রাম বাংলার নিজস্ব কিছু গান সংগ্রহ করার। যে সমস্ত গান গ্রাম বাংলার মানুষ একসময় মাঠে- ঘাটে গাইত। সে সমস্ত গান কারা রচনা করেছে, কারাই বা সুর দিয়েছে অনেক সময় তার হাল-হদিস করা মুশকিল। তবে গানের কথা শুনে আমার মনে হয়েছে এ গানের রচয়িতা গাঁয়ের অল্পশিক্ষিত কিংবা নিরক্ষর মানুষেরা। এইসব মানুষের মধ্যে কত যে রসবোধ লুকিয়ে থাকতে পারে সেটা জানতে পেরে সত্যিই পুলকিত হই।“( ‘গানের খোঁজে’, তদেব, পৃ.১৮৩)

পল্লিবাংলা থেকে ধীরে ধীরে লুপ্তপ্রায় বঁদগান, ধুয়োগান জারিগান সহ বহু গান। সেই গান সন্ধানে গল্প কথক আজ উপস্থিত হয়েছে আমানিপুরে নুরুদ্দির কাছে। নুরদ্দির পিতা বিখ্যাত লোকসংগীত গায়ক ছিল। কিন্তু আজ নুরদ্দিনের পরিবারে অসহনীয় দারিদ্র্য। গল্পকথক নুরদ্দির কাছ থেকে আজ গান সংগ্রহ করে নিতে চান। এই পর্যন্ত গল্পের কাহিনি এক সরল রেখাতেই চলছিল- কিন্তু এখান থেকেই গল্প বাঁক নেয়। নুরদ্দি জানায় সে অসহানীয় দরিদ্র, কন্যা রূপসেনাকে কিছুতেই বিবাহ দিতে পারছে না। সে যদি নিজের পুত্রবধু করে নিয়ে যায় রূপসেনাকে তবে নুরদ্দি খুব খুশি হবে। গল্পকথক গান সংগ্রহে গিয়ে একটি নির্মম ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন। আনসারউদ্দিন কোন ঘটনার ব্যাখ্যা বা সমস্যার সমাধান করেন না, কিংবা গল্পকে শিল্পসত্তায় উত্তীর্ণ করেন না। তিনি নির্মম ভাবে সমাজ সত্যের প্রতি নজর দেন। তবে তাঁর সমাজ সত্য ও গল্পের প্লট অন্য গল্পকারদের থেকে পৃথক। আনসারউদ্দিনের স্বতন্ত্র চিহ্নিত গল্প ‘ শিল্পী’। ধর্মীয় ভারতবর্ষ, সাম্প্রদায়িক ভারতবর্ষের বিরুদ্ধে এক ব্যঙ্গের চাপেটাঘাত নিয়ে উপস্থিত হন এ গল্পে। বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে যে সাম্প্রদায়িক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল গল্পটি সেই প্রেক্ষাপটে লেখা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এ গল্প পড়ে মনে হয়েছিল-‘ বেশ উচ্চকিত আদর্শমূল্য’। মানবজীবন প্রেমিক এক উদার শিল্পসত্তার পরিচয় পাওয়া যায় এ গল্পে। তিনি মিলনের জয়গাথা গান, ধর্মের ভেকধারীদের প্রতি বঙ্গবাণ বর্ষণ করেন। এ গল্পের বিষয় খুবই সামান্য। কিন্তু বৃহৎ প্রেক্ষাপটে জীবন মৃত্যুর দোলায় তিনি জীবনকে দুলিয়েছেন। গ্রামে এসেছে এক শিল কাটানো মানুষ। তিনি শিলের উপর রাম মন্দির আর বাবরি মসজিদের ছবি আঁকেন। এ জন্য দুই সমাজের মানুষের কাছেই সে প্রবল প্রিয়। তবে এর জন্য যে প্রহার খেতে হয় নি তা নয়। সংখ্যাগুরু গ্রাম ভিন্ন দুই সমাজই প্রহার করেছে তাঁকে-

“ এই দ্যাখেন উপরের পাটিতে কটা দাঁত নেই। হিন্দু- গাঁয়ে গিয়ে এই অবস্থা। ওদের দাবি মজুরি যা খুশি নাও বাবরি মসজিদ আঁকতে পারবে না। আর কান চোয়ালের এই কোপের দাগ দেখেছেন ? ওটা মুসলমান গাঁয়ে। বলেছিল কাফেরদের মন্দির আঁকলে কোরবানি দেব। ভাগ্যির খাতিরে বেঁচে গেছি। আসলে ধর্মটা হল মনের বিশ্বাস। আর মনের মধ্যে মন্দির মসজিদ। যাদের মানুষের উপর বিশ্বাস নেই তাদের আবার ধর্ম করা কেন ?” (বাংলা গল্প সংকলন –চতুর্থ খণ্ড, সম্পাদনা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সাহিত্য অকাদেমি, প্রথম প্রকাশ ২০০৬, পৃ. ৪০০)

 এই শিল্পীর মধ্য দিয়েই আনসারউদ্দিনের জীবনদর্শন প্রকাশিত হয়েছে। সেই শিল্পী বলে- ‘জাত নেই বলে দুটোই সমানভাবে পারি’। দরিদ্র মানুষের কোন ধর্ম থাকতে পারে না, ক্ষুধার্ত মানুষের কোন শ্রেণি থাকতে পারে না, বিপন্ন মানুষের শুধু একটাই আর্তনাদ বেঁচে থাকার কৌশল আবিষ্কার। এই শিল্পী হত দরিদ্র। আজ শিল কাটতে এসে ক্লান্ত অবসন্ন মনে বহু শিলের মধ্যে এলোমেলো করে ফেলে শিলগুলি। রামমন্দিরের চিহ্ন আঁকা শিল চলে যায় মুসলিম বধুর কাছে আর বাবরি মসজিদের চিহ্ন শিল চলে যায় হিন্দু পরিবারে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই দুই সমাজ প্রহার করতে উদ্যোত হয়। হিন্দু মানুষটির শিলের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পরে শিল্পী। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শিল্পী’ গল্পে মদনের শিল্পসত্তা বড় হয়ে উঠেছিল। এ গল্পের শিল্পী বলে-“ আমাকে মাফ করবেন। মরে গেলেও পারব না। মানুষ হিশাবে আমারও তো একটা ধর্ম আছে। যে মসজিদ নিজ হাতে গড়েছি তাকে কেমন করে ভাঙি। কাতর অনুরোধে লোকটার গলা ভারী হয়ে উঠল।“ (  তদেব, পৃ.৪০৩)। শিল্পসত্তাকে রক্ষা করতে গিয়ে বরণ করে নিতে হয়েছে মৃত্যুকে। দুই ভিন্ন যুগের প্রেক্ষাপটে মানিক ও আনসারউদ্দিন শিল্পীর আত্মমর্যদার পৃথক মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠা করেছেন। তবে আনসারউদ্দিন গল্পের পরিণতিতে আরো নির্মম। উপমা পেতে হয়েছে ‘বিজপির দালাল’- সময়ের উপর জোড় দেন লেখক। এভাবেই যান্ত্রিক ভারতবর্ষের এক অধঃপতিত রূপ উঠে উঠেছে এ গল্পে।

      অন্যদিকে ‘নেনিনের মা’ গল্পে বর্তমান ভারতের রাজনীতিকে লেখক অদ্ভুত ভাবে মিলিয়ে দিয়েছেন। সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণি ও কৃষক শ্রেণির কথা ভেবেছিল লেলিন। কমরেড জাবের তাই ছেলের নাম রেখেছে নেনিন। স্থানীয় উচ্চারণে লেলিন হয়েছে নেনিন। দারিদ্র্য জাবের আজ মৃত। দলের কথা রাখতে আজ ভোটে দাঁড়িয়েছে জাবেরের স্ত্রী অচেনা। গ্রাম্য রাজনীতির এক সচেতন স্বরূপ লেখক তুলে ধরেছেন এ গল্পে। অচেনা বিধবা নারী, পঞ্চায়েতের নানা ভাতায় তাঁর দিন চলে। সে সদ্য স্বাক্ষরও হয়েছে। অচেনা ভোটে না দাঁড়াতে চাইলেও দলীয় পরিস্থিতি তাঁকে বাধ্য করেছে। কিন্তু কংগ্রসের কাছে সে এক ভোটে হেরে যায়- গল্পের কাহিনি এটুকুই। কিন্তু লেখক এই কাহিনিকে বিধবা জীবনের আত্মযন্ত্রণার সঙ্গে উঁচু সুরে বেঁধেছেন। মুসলিম সমাজে বিধবা নারী এমনিতেই বেওয়া। তার মধ্যে ভোটে হেরে অচেনার মনে হয়েছে-“ আবার যেন সে নতুন করে বিধবা হল।“ (বাংলা ছোটগল্প – অষ্টম খণ্ড, সম্পাদনা  বিজিত ঘোষ, পুনশ্চ,পৃ. ২৩২)। স্বামী জাবের নেই, এই বঞ্চিত বিধবা নারী পরাজিত প্রার্থী কীভাবে বেঁচে থাকবে সে প্রশ্ন বড় হয়ে উঠেছে। অচেনার আজ বড় পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নেনিনের মা। আসলে সর্বহারারা বোধহয় কোনদিন জয়ী হতে পারে না ! লেখক কোন দর্শন দ্বারা চরিত্রদের কোন সময়ে জিতিয়ে দেন। কিন্তু আনসারউদ্দিন এক্ষেত্রে বাস্তববাদী, নির্মম কথাকার। গ্রামীণ সমাজবাস্তবতাকেই প্রাধান্য দেন। আসলে এই সমাজ বাস্তবতা লেখকের প্রতক্ষ্য বাস্তবতা। তাই তিনি শিল্পের সেই স্বরূপ ফুটিয়ে তুলতে তিনি আপস করেন না।

                আনসরউদ্দিন সহজ সরল ভাবেই গল্পে প্রবেশ করেন। গল্পকে অযথা জটিল করে ফেলেন না। জীবনের ছোট ছোট সুখ-দুঃখগুলি নিয়েই তাঁর গল্পের ক্যানভাস গড়ে ওঠে। স্থানিক রঙ ও কথ্য ভাষার মিশ্রণে গড়ে ওঠা চরিত্র গুলি যেন জীবনের শাশ্বত সত্যের সন্ধান দেয়। সেখানে তিনি নির্মম, এক জটিল জীবনযন্ত্রণার অভ্রভেদী নির্মাতা। রুশতি সেন সেদিন আনসারউদ্দিনের গল্পের মূল্যায়ন করতে গিয়ে লিখেছিলেন –“আনসার তাঁর সাহিত্যে বিসেষ গল্প আর নির্বিশেষ গল্পহীনতার টানাপোড়েনকে আরো সাবলীলতায় গাঁথবেন ; আরো স্পষ্ট বিন্যাসে বলবেন, যে, কোনো কাহিনীই শেষ আসলে শেষ নয়, কোনো কাহিনীর কোনো বিশেষ ঘটনাবিন্যাসই আসলে বিকল্পহীন নয়। আর ভবিষ্যতে আনসারউদ্দিনের সেইসব গল্প পাঠকের দরবারে পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য কোনো –না-কোনো ‘ধ্রুবপদ’ তখনো থাকবে।“ (‘সমকালের গল্প উপন্যাস : প্রত্যাখ্যানের ভাষা’, পৃ. ৬৯) আজ আছে ‘অভিযান’ এর মারুফ হোসেন, যিনি পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছেন আনসারউদ্দিনের –‘গো রাখালের কথকতা’ (উপন্যাস ), ‘মাটির মানুষ মাঠের মানুষ’ (উপন্যাস ), ‘জনমুনিষ’ (উপন্যাস ), ‘গণিচাচার খেতখামার’ (গল্প সংকলন ), ‘জীবনের কথা যাপনের কথা’ (গদ্য সংকলন )।

                                        প্রথম থেকেই আনসারউদ্দিন এক স্বতন্ত্র ভুবন নির্মাণে হাত দিয়েছেন। যদিও তাঁর কাজ মুসলিম জীবন নিয়ে তবুও এ মুসলিম নিম্নবিত্ত জীবনের মুসলিম। খেটে খাওয়া অভাবী মানুষের দল। যেমন ‘কবর’(১৯৯২) গল্পটি। অতি সামান্য কথায় বলতে গেলে এ গল্প এক জ্যান্ত মানুষের কবর। কিন্তু গল্পের কাহিনিকে তিনি যে ভাষায় পরিবেশন করলেন তা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। মুসলিম লোকাচার জীবনের যে পরিচয় তিনি দিলেন সে সত্যের সঙ্গে আমরা বিশেষ পরিচিত নই ! ধর্মজীবন, লোকায়ত ইতিহাস ও সামাজিক ইতিহাস অনেক সময় গল্প থেকেই খুঁজে নেওয়া যেতে পারে, তেমন একটি গল্প ‘কবর’। গল্পের নায়ক ভিখু। তবে এ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভিখু নয়, কোন জৈব কামনা তাঁর নেই। এ আনসারউদ্দিনের ভিখু। কথক বড় যত্ন করে এই ভিখুকে গড়ে তুলেছেন, কিন্তু পরিণতিতে নির্মমও হয়েছেন। গল্পের পরিণতিতে মনে হয় সেই অবধারিত মৃত্যুতে না গিয়ে অন্য পথে গেলে হয়ত গল্পের আখ্যানে পাঠক অন্য সত্য আবিষ্কারের সুযোগ পেত। তবে একথাও সত্য গল্পকারকে উপদেশ দেবার দায়িত্ব সমালোচকের নেই। প্রতিটি লেখকই চরিত্রের পরিণতিতে যে শেষ সত্য উপলব্ধি করেছেন সেই নির্মম কথাই তিনি তাঁর বীণাযন্ত্রে বাজিয়েছেন, সেখানে সমালোচকের আলাদা উপদেশ কখনোই বিবেচ্য নয়।

    ভিখুর কাজ ছিল কবর তৈরি করা। বাদরি গ্রামে সেই এ কাজ করে এসেছে। সে নিজেও অভাবী। অনেক সময় নিজের কাজ বাদ দিয়েও এই কবর প্রস্তুত করতে হয়েছে। তাই সে একাজ শিখিয়ে দেয় তেরালি মুলুককে। কখনও ভিখু থাকে না, অন্য গ্রামে ফসল কাটতে যায়, সেজন্য এই ব্যবস্থা। এ গল্পের দুটি পরিচ্ছেদে দুটি প্লট রয়েছে। ভিখুরা দল নিয়ে বহুদূরে ধান কাটতে যায়। সেখানে রয়েছে নিজের গ্রামের ইকামতের কন্যা ফুলছন। ভিখু প্রতিবারই সে কন্যার সঙ্গে দেখা করে আসে, পিতার দেওয়া নানা জিনিস পৌঁছে দেয়, সুখ-দুঃখের গল্প করে, ফুলছনকে নিজ কন্যা ভেবেই সান্ত্বনা দেয়। এমনকি কাজ শেষ করে আসার সময় দেখা করে আসে। আজ ফুলছনের সন্তান হয়েছে। সে এই সুসংবাদ নিয়ে এবার গ্রামে ফিরছে। ইতিমধ্যেই গ্রামের কিছু লোক মারা গেছে। খবরে প্রচার হয়েছে ভিখুও নাকি মারা গেছে। এজন্য ভিখুরও কবর কাটা হয়েছে। কিন্তু ভিখু এসে এই নির্মম সত্যের মুখোমুখি হয়ে দিশেহারা হয়ে গেছে। গ্রাম্য মৌলবীদের নির্দেশ যখন তাঁর নামেই কবর কাটা হয়েছে ফলে তাঁকেই কবরে যেতে হবে। এই পর্বে ভিখু চরিত্রের মনস্তাস্ত্বিকতার অপূর্ব নিদর্শন রয়েছে। একটি মানুষ নিজেই জীবিত অবস্থায় মৃত সজ্জায় যাবে, তার নানা দোলাচলতা লেখক আবিষ্কার করেছেন। যে নিজেই সারাজীবন কবর খুড়ে এসেছে আজ তাঁর কবর খুড়েছে তেরালি মুলুক। ভিখু বারবার বাঁচার আর্তনাদ জানিয়েছে কিন্তু গ্রামের মৌলবীদের নির্দেশের কাছে তা টেকে নি। স্ত্রী, সন্তানের কান্না, ভিখুর বাঁচার জন্য মনে মনে কাকুতি, গ্রাম্য লোকাচার সব মিলিয়ে এক নাটকীয় পরিস্তিতির সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু গল্পকার বড় নির্মমভাবেই শেষ সত্যে পোঁছেছেন, যেখানে জীবন্ত ভিখুর কবর হয়ে যাচ্ছে। এই সত্যটুকুই গল্পের সার কথা নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে লোকাচার সহ একটি গ্রামের অর্থনৈতিক চিত্র ও বেঁচে বর্তে থাকা মানুষের ক্রন্দনের ইতিবৃত্ত। মুসলিম জীবনে কবর তৈরির নানা রীতি নির্দেশ আছে, আমরা বরং সেই অচেনা জগতের সঙ্গে সামান্য পরিচিত হই –

“তাছাড়া কবর তৈরীর নানান রকম কায়দা-কানুন। বর্ষার সময় কবর যাতে ধ্বসে তার জন্য একপাশে খোল করে বগলাই কবর। অন্যান্য সময় সিন্দুক কবর। যেমন যেমন দৈর্ঘ্যের মানুষ তেমন তেমন কবর খোঁড়া। এ বড় কঠিন কাজ। কাফেরের জান দরকার বুঝলে তেরালি, বুঝলে মুলুক, খুঁড়তে খুঁড়তে একবার চোখের পানি ফেলেছে তো সর্বনাশ ! কবর দরিয়া হবে। এক কবর পানির মধ্যে কিয়ামত আব্দি মুর্দারা হাবুডুবু খেয়ে কষ্ট পাবে। এসব কথা ভিখু ওদের পই পই করে বুঝিয়ে দিয়েছে। মাঝেমধ্যে ওস্তাদি চোখে দেখে নিয়েছে। একটু ভুলচুক হলেই কথার চাঁটি মারত। বলতো – হভাঁরে তেরালি মুলুক, এ্যাদ্দিনে তো এই শিখলি ? লোকটা কবরে শুয়ে কি বলবে শুনি ? ঘুম হবে এঁই যা ? ঝটকা মেরে হাতের কোদাল কেড়ে নিয়ে বাকি কাজটা সমাধা করেছে। বুঝলি মুলুক তেরালি, এমন কবর কাটবি যেন জ্যেন্ত মানুষের পাঁচদণ্ড শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।“ (আনসারউদ্দিনের গল্পসংগ্রহ, তদেব, পৃ ২৮) 

‘কবর’ গল্পের পাশে রেখে পড়া যেতে পারে ‘গোরস্তানের অধিকার’ গল্পটিকে। সেখানে ছিল জ্যান্ত মানুষের কবর আর এখানে কবরের অধিকার নিয়ে লড়াই। তবে সে লড়াই নিজের সঙ্গে নিজেরই। মুসলিম ধর্মজীবনের দিকে এবার নজর লেখকের। মৃতব্যক্তির কবরের জন্য রয়েছে কারাবালা কমিটি। প্রথমে সামান্য জমিতে কবরের ভূমি গড়ে উঠলেও পরে টাকা দিয়ে জমি কিনে কবরের ভূমি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই ভূমি কেনার টাকা গ্রামবাসীরাই দান করেছে। সেই নিয়মে মীরজামালকেও টাকা দান করতে হয়েছে। অথচ তাঁর পরিবারে আজও কেউ মরেনি। পিতা –মাতা কারাবালা কমিটি গড়ে ওঠার আগেই মারা গেছে। অন্যদিকে আছে সোভানগাজি নামে এক গ্রাম্যব্যক্তি। মীরজামালের বাবা এই সোভানগাজিকে দিয়েছিল জমি কিনতে কিন্তু তিনি সমস্ত জমি নিজের স্বত্বেই রেখে দিয়েছিলেন। ফলে নিজস্ব ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হতে হয়েছিল মীরজামালের পিতাকে। মীরজামাল তখন ছোট হলেও বিষয়টি বুঝেছিল, সেই থেকে সে সোভানগাজিকে বিষবৎ চোখে দেখে। আজ সোভানগাজি মরণাপন্ন। ইতিমধ্যেই এসেছিল কারাবালা কমিটি কবরের জন্য নতুন জমি কেনার চাঁদা চাইতে। কেননা অবশিষ্ট যে জায়গা আছে সেখানে কেবল একজনের কবর হবে। কিন্তু এই সোভানগাজির মত অধার্মীক মানুষের কবর সেখানে হবে তা মেনে নিতে পারেনি মীরজামাল। তাই গভীর রাতে সে কবরস্থানে গিয়ে নিজের কবর নিজে খুঁড়ে গাছে ফাঁসি নিয়েছে। সেদিন রাতেই মৃত হয়েছে সোভানগাজি। কিন্তু সেখানে আর জায়গা দিতে হয়নি মীরজামালের। কবরে একটি মানুষের জায়গা না দিতে নিজেই আজ আত্মবিসর্জন দিয়েছে মীরজামাল। মুসলিম ধর্মজীবন, শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা ও ধর্মের নামে কীভাবে মানুষকে শোষণ করা হয় এবং পরলোক সম্পর্কে মানুষের বিশ্বাসকে লেখক উদার দৃষ্টিতে তুলে ধরেছেন। যেমন দিলসাদ কারাবালার মাটিতে কবর দিতে চায় না, কেননা সেখানে নিয়তের মত চরিত্রহীন মানুষের কবর রয়েছে। তাঁর বিশ্বাস সেখানে স্ত্রীর কবর হলে স্ত্রী স্বর্গে যেতে পারবে না। আসলে মুসলিম জীবনের কত প্রকার বাঁক যে আমাদের অজানা তা আবিষ্কার করেন আনসারউদ্দিন। সেই অপরিচিত জীবনকে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তাঁর চরিত্ররা যেন নিজেরাই কথা বলে। কোনপ্রকার চাপিয়ে দেওয়া কথাবার্তা লক্ষ করা যায় না। সেখানে কোন ভঙ্গি বা আখ্যানের কারুকার্য নেই শুধু আছে কথার পর কথা সাজিয়ে দেওয়া। বহু ফুল একসঙ্গে দিয়ে দিলেও সবাই যেমন সমান সুন্দর মালা গাঁথতে পারে না তেমনি একই জীবন নিয়েও একই কাহিনি নিয়েও এক আখ্যান গড়া সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। সেই দেখাটা বিশেষ জরুরি। আমার মনে হয় সেই দেখায় আনসারউদ্দিন সফল কথাকার।

43