৩১/১/২০২১,ওয়েবডেস্কঃ

সম্প্রতি যৌন নিগ্রহ নিয়ে দুই বিতর্কিত রায় দেন বোম্বে হাই কোর্টের মহিলা বিচারপতি পুষ্প গনেদিওয়ালা।
প্রথম ঘটনায় তিনি বলেন পোশাক না সরিয়ে নাবালক বা নাবালিকার শরীরে অন্যায় ভাবে স্পর্শ করলেও তা যৌন নিগ্রহ নয় , এবং দ্বিতীয় ঘটনায় প্যান্টের চেন খুলে যৌনাঙ্গ প্রদর্শন যৌন নির্যাতন নয়।

প্রথম রায়ের ওপর ইতিমধ্যেই স্থগিতাদেশ দিয়েছে সুপ্রিমকোর্ট কলেজিয়াম। এরই সঙ্গে তুলে নেওয়া হলো বোম্বে হাইকোর্টে তার স্থায়ীকরনের সুপারিশও। দেশের শীর্ষ আদালতের মতে তার প্রয়োজন আরও প্রাসিক্ষনের।

সুপ্রিম কোর্টের তরফে জানানো হয়েছে,”ওই বিচারপতির বিরুদ্ধে কনো ব্যক্তিগত রাগ নেই।কিন্তু তার এখনও অনেক কিছুই শেখা প্রয়োজন। যখন যিনি আইনজীবী ছিলেন তখন হয়তো এই ধরনের মামলা তিনি বিশেষ দেখেননি। তাই তার আরও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন।

সাধারণত কোনো বিচারপতির স্থায়ীকরনের জন্য সুপ্রিমকোর্টের কলেজিয়ামের সুপারিশ প্রয়োজন হয়, এরপর এই সুপারিশ যায় কেন্দ্রের কাছে এবং সরকার তাতে সিলমোহর দিলেই কার্য সম্পন্ন হয়। এক্ষেত্রে গন্ডগোল হয় সেই বিষয় নিয়েই। সুপ্রিমকোর্ট আটকে দেন সেই সুপারিশ।

গত ২০শে জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়াম বোম্বে হাইকোর্ট এ নাগপুর বেঞ্চে স্থায়ী বিচারপতি পদের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল সেই মহিলা বিচারপতির নাম। কিন্তু তার পরই এমন রায় দেয়ায় আলোড়ন পরে যায় গোটা দেশে। এই রায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন আইনজীবীদের একটা বড়ো অংশ।

১৯শে জানুয়ারি বোম্বে হাইকোর্টের নাগপুর বেঞ্চে পকসো আইনে দায়ের হওয়া একটি মামলার রায়ে বিচারপতি পুষ্প গনেদিওয়াল জানান পকসো আইন মতে যৌন নির্যাতন হওয়ার জন্য অভিযুক্ত ও আক্রান্তের ত্বকের সাথে ত্বকের স্পর্শ ঘটাতে হবে , জামা খুলে বা সরিয়ে আপত্তিকর কাজ করলে তবেই তা যৌন নির্যাতন বলে গণ্য করা হবে। পোশাকের ওপর দিয়ে স্পর্শ করলে তা যৌন নির্যাতন নয়।

১২ বছরের একটি মেয়েকে যৌন নিগ্রহের অভিযোগে চলছিল মামলা।অভিযোগ, মেয়েটির বুকে অন্যায় ভাবে স্পর্শ করেছিল ৩৯ বছর বয়সী এক যুবক।
সেখানেই ওই মহিলা বিচারপতি এই রায় দেন যে, ” যেহেতু মেয়েটির পোশাক খোলা হয়নি বা পোশাক সরানো হয়নি তাই এটি যৌন নির্যাতন নয় “।

এর দিনকয়েক পরেই ফের আরেকটি মামলার শুনানি করেন ওই একই মহিলা বিচারপতি।

সেখানেও তিনি রায় দেন ৫ বছরের শিশুর হাত ধরা এবং প্যান্টের চেন ক্ষুকে যৌনাঙ্গ প্রদর্শন যৌন হেনস্থার সমকক্ষ অপরাধ নয় পকসো আইনে।। এই রায়ের ফলে অভিযুক্ত ৫০ বছর বয়সী ব্যক্তি পাঁচ বছরের কারাবাসের সাজা কমে হয় পাঁচ মাস ।

এই দুই রায়ের বিরোধিতা করে হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি প্রদীপ নন্দরাজক বলেন ,” এই ধরনের মামলায় আদালতের দায়িত্ব হল অভিযুক্তের উদ্দেশ্য কি ছিল তা চিহ্নিত করা।যে কনো অন্যায় স্পর্শ না আচরণ যদি যৌন হেনস্থার উদ্দেশ্য নিয়ে করা হয় তবে তা পকসো আইনের আওতায় অপরাধ বলেই গণ্য করা হবে। এখানে ত্বকের সাথে স্পর্শ করা হয়েছে কিনা বা প্যান্টের চেন খোলার পরে কি হয়েছে – এইসব ধর্তব্যের মধ্যেই আসবে না যদি অভিযুক্তের উদ্দেশ্য হয় যৌন নিগ্রহ।
আরও সমস্যার বিষয় হলো এই রায় দিয়েছেন এক মহিলা বিচারপতি । আমরা আইনী ক্ষেত্রে মহিলা বিচারপতি , অফিসার, বা কর্মী নিয়োগ করি এই ভেবে যে মহিলা বা শিশুদের ওপর হওয়া এই ধরনের অত্যাচার ও অপরাধ গুলির আরও সঠিক ও সংবেদী বিচার পাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এখানে তেমনটা ঘটেনি “।

বোম্বে হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অভয় থিপসেও এই দুই রায় কে ‘ভুল’ বলেই ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন ‘ ” যদি দুই ক্ষেত্রেই যৌন নির্যাতন না হওয়ার সিদ্ধান্তে এসে উপনীত হন বিচারপতি তবে তার পেছনে অবশ্যই যথাযথ ও অখণ্ড যুক্তি থাকা প্রয়োজন। নয়তো ভবিষ্যতে প্রতিটি মামলায় এই রায়ের কু প্রভাব ফেলবে। যদি এমন হয় যে অভিযুক্ত হাতে গ্লাভস পরে কুকর্ম করেছে, তবে সেক্ষেত্রে তো সে যুক্তি দেবে , ত্বকের সঙ্গে স্পর্শ হয়নি তাই এটি যৌন নির্যাতন নয় “।

স্যোশাল প্রসিকিউটর উজ্জ্বল নিকমের মতে, ” মূলত নাবালিকাদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য পকসো আইন আনা হয়।ফলে এই আইনে যে অভিযোগ উঠেছে তাতে অভিযুক্তর উদ্দেশ্য ভালো করে খতিয়ে দেখাই মূল বিষয় হওয়া উচিৎ। অপরাধ কোন পদ্ধতিতে হয়েছে তা বিশ্লেষণ করা অযৌক্তিক। এসব করলে আইনের নজরকে বিভ্রান্ত করা হবে “।

এই বিতর্কের মাঝেই সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়াম পুষ্পর স্থায়করনের সুপারিশ নাকচ করেন।

61