Categories
করোনা প্রথম পাতা

কোভিড কথা: মৌমিতা সেনগুপ্ত

একটি সাধারন পরিবারের গৃহবধূ আমি। পৃথিবীর আর সবার মতোই করোনা মহামারী আমার কাছেও একটি নতুন ও একেবারে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মত এলো।সকলের কষ্টই সমান কিন্তু আমি সকলের থেকে অনেক বেশী অসুবিধায় এই কারণেই পড়েছিলাম আমার বৃদ্ধ শ্বশুর (৮৩) নাম-শ্যামসুন্দর সেনগুপ্ত, ও বৃদ্ধা শাশুড়ি (৭৪) নাম-লিপিকা সেনগুপ্ত একসঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আমার বাড়িতে রয়েছে দুটো ছোট বাচ্চা ,, তার ফলে করোনা ভাইরাস যে কি ভয়ানক হতে পারে ।এটা যারা মানছেন না গুরুত্ব দিচ্ছেন না তাদের কাছে এটাই বলবো আমি এটা কতটা ভয়ানক আসলে যাই হোক, আমি আমার সেই সময়কার অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের কাছে তুলে ধরছি,,,,,,,,,

২৩/১১/২০ সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ আমার বৃদ্ধ বাবা (শ্বশুর) প্রায় দু ডিগ্রী জ্বর নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। সাথে সাথে বাবার কাছে গিয়ে মাথায় হাত দিয়ে দেখলাম বেশ জ্বর ঘরে প্যারাসিটামল থাকায় বাবাকে একটা প্যারাসিটামল খেতে দিলাম। এভাবেই রাতটা কেটে গেল। পরের দিন সকাল থেকেই আমার (শাশুড়ি) মা অসুস্থ বোধ করছিলেন। ঠিক সন্ধে হতেই মাও বিছানায় শুয়ে পড়ল সমানে বমি করতে থাকলো,, কোন কিছুই খেতে পারছিল না গা হাত পা ব্যথা মাথা ব্যথা জ্বর এই সিমটম নিয়ে রাত্রি তখন দশটা।।। দিশেহারা অবস্থায় আমি ও আমার বর ভাসুরকে ফোন করলাম। ভাসুরের সে বাবা-মার যা সিমটম দেখল তাতে আমরা একটু ভীত হলাম।।সিদ্ধান্ত নেওয়া হল বাবাকে ও মা কে দুটো আলাদা আলাদা রুমে রাখা হবে। তাই করা হলো দুটো পাশাপাশি রুমে বাবাকে মাকে রাখা হলো আতঙ্কে বাড়িতে ড্রাম ভর্তি স্যানিটাইজার হ্যান্ড গ্লাভস মাথার ক্যাপ সমস্ত কিছুর ব্যবস্থা করা হলো।। এই পরিস্থিতিতে দুটো বাচ্চা কে দোতালার ঘরে টিভি চালিয়ে রেখে দিলাম একবার নিচে গিয়ে বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়িকে দেখে আসা তাদের ঠিক টাইম মতন খাওয়া-দাওয়া তাদের সেবা করা আবার ঠিক টাইম মতন উপরে এসে বাচ্চাগুলোকে খাওয়ানো তাদের স্নান করানো সমস্ত কিছু করা।। নিচে গিয়ে স্যানিটাইজার স্প্রে করে আবার কাজে লেগে পড়া পরেরদিন বাবা-মা দু’জনকেই ডাক্তার দেখানো হলো। ডাক্তারবাবুর টেস্ট করতে দিলেন সেই অনুযায়ী বাবা-মা টেস্ট করানো হলো। তারপরের দিন আমার ভাসুর আমার বর দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত নেয় যদি বাবা-মার রিপোর্ট পজেটিভ আসে আমাকে কোথায় পাঠানো হবে কারন আমার বড়ো ছেলের অ্যাজমা রয়েছে সাথে আমারও। মনে মনে যে ভয়টা আমাদের ছিল পরের দিন সকাল হতেই সেই ভয় আমাদের সামনে এল বাবা মা দুজনেই covid-19 আক্রান্ত হলেন। প্রিয় মানুষগুলোকে ছেড়ে বাপের বাড়িতে চলে যেতে হল আমায় শুধুমাত্র দুটো বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে ।।। মানসিক যন্ত্রণা যে কি এই কদিনে খুব ভালোভাবেই আমরা সকলে বুঝে গিয়েছিলাম ।।সকাল নাগাদ বাপের বাড়িতে আমি যাই দুটো বাচ্চা নিয়ে।। সন্ধ্যেবেলা সাড়ে সাতটা আটটা নাগাদ আমার শ্বশুর বাড়ির সামনে এম্বুলেন্স আসে মাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ।।সেই সময় আমি বাড়িতে এসেছিলাম কিছু সময়ের জন্য, কারণ মা কোনরকম সেন্সে না থাকার ফলে মাকে শাড়ি পরানো মার ব্যাগ গুছিয়ে দেওয়া, মা কে একবার চোখের দেখা টা দেখতে ইচ্ছুক ছিলাম ।। মুহূর্তে একেবারেই বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন।। মা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে হাসপাতলে চার থেকে পাঁচ দিন মার কোনো সেন্স ছিলনা।।।মা কিছুই বুঝতে পারছিল না যে_ মা কোথায় এসেছে ?মার কি হয়েছিল? এই পাঁচ-ছয়দিন এর কোন ঘটনা মার মনে ছিল না সেই মুহূর্তে।। বাবাকে বাড়িতেই রাখা হয়েছিল,, কারণ বাবা প্রায় সুস্থই ছিলেন। কিন্তু এই বাড়িতে একটি ঘরে এই বৃদ্ধ মানুষটি এতগুলো দিন একা একা চুপচাপ কাটাল ।কথা বলার মতন মানুষ ছিল না শুধু ছিল বাড়িতে আমার বর শ্বশুর একাকীত্ব বাবা এই বয়সে ভীষণভাবে বুঝেছে একাকীত্ব যে মানুষকে কতটা অসহায় করে তোলে,, সেটা চোখে না দেখলে বোঝা যায় না। কিন্তু বাড়িতে পোস্টার লাগিয়ে দিয়ে গিয়েছিল আমার বর ও আমার শশুর মশাই দুজনেই বাড়িতে ছিলেন। বাইরে থেকে আমরা বাজার করে দিয়ে যেতাম বরের বন্ধুরা বাজার করে দিয়ে যেতো বা আমার ভাসুর বাজার করে দিয়ে যেত। মার ওখানেও আমার ভাসুর খাবার পৌঁছে দিতেন রোজ অফিসে যাবার পথে,,।। এদিকে বাড়িতে বাবা থাকার ফলে আমার হাসবেন্ড টাইম মতন বাবাকে খেতে দিত দেখে রাখতো।। টাইমলি বাবার ওষুধ বাবাকে দেওয়া।।
প্রায় ১৩ দিন পরে আমার শাশুড়ি মা আমাদের মাঝে ফিরে আসেন। সেই সময় শাশুড়ি মায়ের মুখে শুনে ও আমরা চোখে দেখে যা বুঝেছিলাম-ভীষণ কষ্ট এর থেকে কষ্টের আর কিছু হয়না,, বয়স হয়ে যাওয়ার ফলে মা অতিরিক্ত কষ্ট পেয়েছেন।। দুটো মাসী রাখা হয় -কারণ মার অক্সিজেনের সমস্যা হচ্ছিল বারবার ।এখনো মা পুরোপুরি সুস্থ হয়নি মার অক্সিজেন এখনো লাগছে মাঝে মাঝে। ভীষণ দুর্বল হয়ে আছেন উনি। । ঠিকভাবে উঠে দাঁড়াতে পারছেন না ।।এই বয়সে আমার শাশুড়ি মা এক নতুন জীবন নিয়ে আমাদের কাছে ফিরে এসেছেন এতেই আমরা অনেক খুশি।
এত সাবধানতা অবলম্বন করার পরেও ,,যখন এই বয়স্ক মানুষ গুলোর উপর করণা অ্যাটাক করতে পেরেছে সুতরাং আপনারাও খুব সাবধানে থাকবেন, ভাল থাকবেন ,সুস্থ থাকবেন। নমস্কার।।

124

Leave a Reply