জানুয়ারি ২৫,২০২১:

এই পৃথিবীতে নিরন্তর ঘটে চলেছে কিছু না কিছু।
প্রত্যেকটি মুহূর্তে ঘটে চলেছে লক্ষ কোটি ঘটনা।আমাদের প্রত্যেকের জীবন আসলে এরকমই কিছু ঘটনার সমষ্টি মাত্র। তবে এই অবিরাম ঘটনা প্রবাহের মধ্যে কিছু ঘটনা এরকম থাকে,যা আমাদের জীবনদর্শন কে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে। আমার কোভিড এ আক্রান্ত হওয়া এরকম ই একটা ঘটনা।কোভিড এর সাথে আমার দিনযাপনের দুর্ভাগ্য হয়েছিল গত বছরের নভেম্বরে।তার আগের লকডাউন মাসগুলোতে সকলের মতোই আমিও এই নতুন ভাইরাস নিয়ে ভীত এবং উদ্বিগ্ন ছিলাম। সকলের মতো আমিও যথাযথ সাবধানতা অবলম্বন করতাম।কিন্তু ধীরে ধীরে কিন্তু ভয়টা কমছিলো।ঠিক এরকম সময়েই ঘটলো ঘটনাটা। ২ রা নভেম্বর সন্ধ্যে বেলায় আচমকা ই ভীষণ জ্বর এলো।এত জ্বর যে বিছানা থেকে উঠতে পারিনি একটুও।ওষুধ খেয়েও জ্বর কিছুতেই কমলো না।প্রায় ৩০ ঘন্টা পর জ্বর কমলো।জ্বর কমে যাওয়ার পর মনে হলো,এটা নিতান্তই ‘ভাইরাল ফিভার’।তার ৭/৮ দিন বাদে একদিন সকালে উঠে আবিষ্কার করলাম, কোনো গন্ধ পাচ্ছি না।একটুও না।ভীষণ ভয় পেলাম,একটু বাদে বুঝলাম গন্ধের সাথে সাথে স্বাদ এর ও কোনো অনুভূতি নেই(এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, এই স্বাদ ও গন্ধ না পাওয়া,সর্দি হওয়ার ফলে স্বাদ ও গন্ধ না পাওয়ার চেয়ে পুরোপুরি আলাদা)। সাথে সাথে এক বন্ধুস্থানীয় ডাক্তার এর পরামর্শ নি।তার কথামত কিছু ওষুধ জোগাড় করে খাওয়া শুরু করি। শরীর একটু একটু করে দুর্বল হতে শুরু করে,সেটা বেশ বুঝতে পারি।জ্বর আসার পর থেকেই নিজেকে গৃহবন্দী করে নিয়েছিলাম।কিন্তু পরে একবার(১৩ই নভেম্বর) টেস্ট করাতে হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। টেস্ট এ আমি এবংল আমার স্ত্রী দুজনের ই কোভিড পজিটিভ ধরা পড়ে।টেস্টের পর তখন ১৪ দিন গৃহবন্দী থাকা বাধ্যতামূলক ছিল।তাই সারা নভেম্বর মাস গৃহবন্দী থেকে,ডিসেম্বর এর ৮ তারিখ থেকে আমি ঘরের বাইরে বের হই এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করি।যাই হোক, ৮-১০দিন স্বাদবিহীন,গন্ধবিহীন এক জীবন কাটিয়েছি।সঙ্গে ছিল ভীষণ দুর্বলতা।সারাক্ষন একটা অস্বস্তি কাজ করত শরীরজুড়ে।বুকে সবসময় মৃদু ব্যাথা অনুভূত হতো। মাঝে মাঝে মনে হতো আর বুঝি স্বাদ আর গন্ধ ফিরে পাবো না।তবে ৮-১০ দিন বাদে একটু একটু করে স্বাদ গন্ধ ফিরে পেতে থাকি এবং শারীরিক দুর্বলতা ও অনেকটা ই কমে যায়।যদিও এই দুর্বলতা এখনো সামান্য আছে।
গৃহবন্দী থাকার সময়ে প্রতিদিন জেলা কোভিড কন্ট্রোল ইউনিট এর প্রতিনিধিরা ফোন করতেন এবং শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিতেন,যেটা খুব ই ভালো একটা ব্যাপার। আশেপাশের অনেকেই নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছেন,যখন যা দরকার,সেটা রান্নার বাজার হোক কিংবা ওষুধ, সেসব সরবরাহ করেছেন।যেহেতু আমরা বাড়ি থেকে বেরোতে পারছিলাম না,তাই এই সাহায্যেটুকু না পেলে খুব অসুবিধে হত।আমরা শুনেছিলাম যে পৌরসভা থেকে বাজার করে দেওয়ার একটা ব্যবস্থা থাকে,যদিও সেটা আমরা পাইনি।তবে পৌরসভার পক্ষ থেকে বাড়ি স্যানিটাইজ করা হয়েছে দুবার।সবমিলিয়ে বলতে গেলে ওই দুঃসময়ে অনেক মানুষকে নিজেদের পাশে পেয়েছি।
তবে কিছু অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা ও হয়েছে,বেশ কিছু মানুষ আমাদের প্রতি এমন আচরণ করেছেন,যাতে মনে হয়েছে আমরা হয়তো কোন ভয়ানাক পাপ কাজ করেছি।এমনকি যারা আমাদের সাহায্য করেছেন,তাদের কেও নানাভাবে হেনস্থা হতে হয়েছে।
এই কোভিড এ আক্রান্ত হওয়াটা মানুষ হিসেবে আমাদের অনেকটা পরিণত করেছে,ভিন্নভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। এটুকু বুঝেছি যে সকলের গায়ে ‘সমাজবদ্ধ জীব’ এর তকমা আঁটা থাকলেও, সকলেই কিন্তু সামাজিক নন।এমনকি দেখে মানুষ মনে হলেও সকলেই কিন্তু মানবিক নন।

142