Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার: গল্প : তরকারি

অর্পিতা গোস্বামী চৌধুরী    

সস্তায় বেশ কিছু পটল পেয়েছিল রদ্রু। আমি দেখে বললাম, এতো পটল কি হবে?  ও বলল, আরে জোর করে দিয়ে দিলো। ও এরকমই করে, বাজার করার সময়। ওই “জোরে”র পাল্লায় গাদা গাদা বাজার। কিছুটা পটল মিনুদিকে দিয়ে দেব ভেবে একটা প্লাসিকে ভরে আলাদা করে রাখলাম। মিনুদি মাজা বাসন গুলো নিয়ে আসতে বললাম, এই পটল গুলো নিয়ে যেও।  কিছু পুঁই ডাটা ছিল। সেগুলোও দিয়ে দিলাম। ওগুলো অবশ্য  আমিই কিনেছিলাম। পাঁচ টাকা আটি। অর্ধেক রান্না করলেই আমাদের হয়ে যায়। বাকিটা দিয়ে দিলাম মিনুদিকে। পটলগুলো ছুলছিলাম পিলার দিয়ে। পিলার দিয়ে ছুললে নিখুঁত ছোলা হয়। একটুও অতিরিক্ত সবজি নষ্ট হয় না। আগে এই সুবিধা ছিল না। হ্যাঁ আগের কথা বলছি, অর্থাৎ আমার ছোট বেলার কথা। যতবার সবজি কাটতে বসি মনে পড়ে ছোটবেলার দৃশ্য গুলো। আমাদের যৌথ পরিবার ছিল।  বিশাল বারান্দার শেষ প্রান্তে  রান্না ঘর।   তখন গ্যাসের চুলা এলেও তার ব্যাবহার সেভাবে হতো না আমাদের বাড়িতে। আসলে উনুনে বিশাল বড় ভাতের হাঁড়ি বসত। কড়াইও অনেক বড়। বাবারা চার ভাই। জ্যাঠিমা কাকিমা। দুই পিসির তখন বিয়ে হয়নি। বাবার এক গ্রামতুতো ভাই তার স্ত্রী এবং এক ছেলে নিয়ে আমাদের বাড়িতেই থাকত। বাবাদের ব্যাবসায় সাহায্য করত। জমির কাজও করতো মাঝেসাঝে। বড় পিসির ছেলেও আমাদের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করত সব মিলিয়ে আমরা ষোলো ভাই বোন। সে এক হই হই কাণ্ড।  আমাদের সে তুতো কাকিমা, অর্থাৎ আমাদের সোনা কাকিমা সকালে উঠে উনুন ধরাত। আমি বারান্দায় হাঁটু ভাঁজ করে বসে ব্রাস করতে করতে দেখতাম। আগে উনুন থেকে আগের দিনের সমস্ত ছাই বের করে পরিস্কার করে মাটি দিয়ে লেপত। অর্থাৎ জলে গোলা মাটিতে ন্যাকড়া ডুবিয়ে সেটা দিয়ে উনুন মুছত।। উনুন শুকালে তাতে স্তরে স্তরে ঘুঁটে সাজিয়ে তার উপর গুল অর্থাৎ গুড়ো কয়লার বল আকৃতির পিন্ড দিয়ে কয়েক স্তর সাজাত। এবার নিচে কাগজে আগুন জ্বালিয়ে ঢুকিয়ে দিতেই সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়ায় ভরে যেত চারপাশ। তখন আর বারান্দায় বসা যেত না। বেশ সময় লাগত সেই উনুন ঠিক ঠাক জ্বলে উঠতে। একবার জ্বলে উঠলে সেই উনুনে ভাতের হাঁড়ি চড়তো আমার মা। আমি তখন দুধ খেয়ে পড়তে বসেছি। ছোট কাকিমা গ্যাসে দুধ গরম করে আমাদের ষোল জনকে খাইয়ে দিয়েছে। সেজ কাকিমার দায়িত্ব ছিল বড়দের সবাইকে জলখাওয়ার দেওয়া। বেশিরভাগ দিন জলখাওয়ারে আলুসেদ্ধ ফ্যান ভাত দেওয়া হত। সেটা রান্না হত ইলেক্ট্রিক উনুন অর্থাৎ হিটারে। পাড়াতে আমাদের বাড়তিতেই শুধু হিটার ছিল। এই নিয়ে আমার বেশ একটা গর্ব ছিল।  আমি যখন আর একটু বড় হয়েছিলাম বেশ অনেক পরের কথা,  মনে হয় তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি, তখন   আমাদের বাড়িতে ফ্রিজ এসেছিল। সেটা একটা অসাধারণ ব্যাপার ছিল। তবে সে গল্প পড়ে বলব। তার আগে মানে যখনকার গল্প বলিছি তখন প্রতিদিন সকালে জ্যাঠু আর ছোট কাকু মিলে বাজারে যেত। আর প্রতি দিনই প্রায় তিন চার ব্যাগ বাজার আসত। চার কেজি পাঁচ কেজির গোটা কাতল মাছ অথবা চিতল মাছ বাধা ছিল প্রায়। এছাড়াও গ্রামের বাড়ির পুকুর থেকে মাছ আসত। সোনা কাকিমা মাছ কাটত। সবজি কাটত  জ্যাঠিমা। এ নিয়ে জ্যাঠুর একটু অসন্তোষ ছিল কিন্তু জ্যাঠিমা তবু সেটা করতোই। সকালে উঠে স্নান করে রান্নাঘরের সামনে বারান্দায়  বসতো তরকারী কাটতে। মধুবালা বলে একজন কাজের মাসি আসত, সে মশলা করে দিত। এতো এতো শুকনা লঙ্কা বাটা হত । শুপরির খোল দিয়ে মশলা টানত। মাঝে মাঝে মালতি বলে এক পিসি আসত, আর একটু পরে। সে আসলে আমাদের এক পরিচিত পিসি।  এসে বসে গল্প করত জ্যাঠিমার সাথে। মালতি পিসির বর তাকে ছেড়ে দিয়েছিল। তখন সমাজে ডিভোর্স প্রচলিত হয়নি। ইচ্ছা হলেই  বররা ছেড়ে দিত তার বিবাহিত স্ত্রীকে। তো সেই মালতি পিসি তার ভাই-এর বাড়িতে থাকতো। আসলে ওটা তার বাবারই করা বাড়ি। ভাই বউ এর সাথে প্রতিদিন ঝগড়া গন্ডোগোল। আলাদা রান্না করে খেত মালতি পিসি। ভাই অল্প স্বল্প কিছু টাকা দিত। সেই দিয়ে চালাতে তার খুব কষ্ট হত। ভাই তার সংসারে ভালো মন্দ বাজার আনত, বউ ছেলে মেয়ের জন্য জামা জুতো কিন্তু কপাল

পোড়া দিদির দিকে ফিরেও তাকাত না। মাসের প্রথমে ভিক্ষা দেওয়ার মতো কিছু টাকা হাতে দিয়ে দায়িত্ব শেষ। ও যে মায়ের পেটের ভাই,  ছোট বেলায় কত কোলে পিঠে খেলা করেছে সব ভুলে গেছে। ওই টাকাটা দেয় বলে বউ যেন মাথা কিনে রাখে। মালতি পিসির চোখে জল আসে। আমাদের পড়া শেষ হয়। আমরা বারান্দায় লাইন দিয়ে বসে বড়দের সাথে আলুসেদ্ধ ফ্যান ভাত খাই। মা ভাতের উপর ঘী দিয়ে যায়। মালতি পিসিকে জ্যাঠিমা খেতে বলে কিন্তু পিসি  খায় না কখনও। দ্বিতীয় প্রস্থ চা হয়। জ্যাঠু চায় জ্যাঠিমা সাথে বসে চা খাক কিন্তু জ্যাঠিমা সেই তরকারি কাটতেই ব্যাস্ত। মালতি পিসি চা খায় পান খায়। তারপর আমাদের বোনদের সেলাই শেখাতে বসে। ধরে ধরে ক্রশ স্টিচ,  কাশ্মীরি স্টিচ। যেদিন স্কুল থাকে সেদিন একটু করতে না করতেই স্কুল যাওয়ার সময় হয়ে যায়। ছুটির দিনে অনেক্ষন ধরে শিখি। তখন বাড়ি ফাঁকা। বাবা কাকারা যে যার কাজে চলে গেছে। দাদা ভাইরা মাঠে খেলছে। আমরা বোনেরা সকালে বা দুপুরে খেলতে যেতাম না। কিন্তু বিকেলে আমাদের খেলার নিয়ম ছিল বাধা। ফলে ছুটির দিনে  আমরা পাঁচ বোন  মা কাকিমাদের সাথে বাড়িতে। মালতি পিসিকে যাওয়ার সময় জ্যাঠিমা তরকারীর খোসা গুলো দিয়ে দিত সব। সে নিয়ে যেত ওর পোশা ছাগলের জন্য। বলত দুধ হলে খাওয়াবে আমাদের। আমাদের বাড়ির সবার এটা ওটা সেলাইও করে দিত। বদলে কিছু পয়সা পেত । একবার আমি একটা টেবিল ক্লথ বানালাম উল দিয়ে।  আসলে হয়েছিল কি তখন ফাইনাল  পরীক্ষা    হয়ে গেছে। মা আর ছোট কাকিমা রান্না করতে করতে একটু নিন্দা চর্চাও করে নিচ্ছে। তার মধ্যে মুল  হচ্ছে জ্যাঠিমা কেমন তরকারি কাটতে বসে অন্য কাজে ফাঁকি দেয়।  আর সে যা তরকারি কাটার ছিড়ি!  খোসার সাথে অর্ধেক তরকারি কেটে বাদ দিয়ে দেয়। হবে না কেন!  মন তো থাকে মালতির সাথে গল্প করায়। যাই হোক  তখন যেটা বলছিলাম,  একটা লোক এল। বিশেষ ধরণের একটা    সূঁচ নিয়ে। উল দিয়ে নিমেষে নক্সা ফুটে ওঠে কাপড়ে। খুব  অল্প সময়েই তৈরি হয়ে গেল একটা গোটা টেবিল ক্লথ।  খুউব আনন্দ হল। সবাইকে ডেকে  ডেকে দেখালাম। জ্যাঠিমা বলল, যা মালতি কে একবার দেখিয়ে আয়।  ক’দিন  ধরে আসেও নি, কি হল একটু  খোঁজও আনিস। তখন আমার কিতকিত খেলতে যাওয়ার তারা।  বললাম,  ঠিক  আছে কাল সকালে যদি না আসে তো তখন  যাব পিসির বাড়ি। পরদিন সকালে মালতি পিসি আসেনি সুতরাং টেবিল ক্লথ টা নিয়ে গেলাম মালতি পিসির বাড়ি। যাওয়ার সময় জ্যাঠিমা আঁচল থেকে তিনটা টাকা বের করে দিয়ে বলল ও আমার ব্লাউজটা  সেলাই করে দিয়েছিল, এই টাকাটা পাবে। দিয়ে দিস। 

মালতি  পিসির  বাড়ি খুব একটা বড় নয় কিন্তু খুব সুন্দর।  উঁচু মাটির বারান্দা। উঠোনে সন্ধ্যা মালতী ফুলের গাছ ভর্তি।  একপাশে একটা কাঁঠাল গাছে পিসির ছাগল বাঁধা। বারান্দার এক কোনে গর্ত করা উনুনে পিসি রান্না চাপিয়েছে। ভাত ফুটছে একটা ছোট্ট হাঁড়িতে।  আর বটিতে মালতি  পিসি বসে তরকারি কাটছে। আমি অবাক হয়ে গেলাম দেখে। মালতি পিসি আমাদের বাড়ি থেকে আনা তরকারির খোসা থেকে বেছে নিচ্ছে খাওয়ার যোগ্য তরকারি। সদ্য কালই আমি শুনেছি জ্যাঠিমা খোসার সাথে বেশি করে তরকারি কেটে ফেলে। মাত্র দশ   বছর বয়সেও আমার বুঝতে বাকি থাকলো না জ্যাঠিমা কেন তেমন করে। মালতি পিসির আত্মসম্মানে বিন্দু মাত্র আঘাত না করে নীরবে সাহায্য করে চলেছে একটা অসহায় মহিলাকে।  প্রায় শুকিয়ে যাওয়া তরকারির খোসাগুলো নিয়ে মালতি পিসি তখন অপ্রস্তুত।  আমি কিছু না দেখার মতো করে জ্যাঠিমার দেওয়া টাকাটা পিসির হাতে দিলাম  আর টেবিলক্লথখানা দেখালাম। ওই নতুন কাজ দেখে খুব খুশি হয়েছিল পিসি।  

আরও কত গল্প আছে ছোট বেলার, সেই  যেবার রাঙা পিসির বিয়ে হল, পরের বছর বড় পিসির ছেলে ডাক্তারিতে চান্স পেল। বাড়িতে একবার চোর ধরা পরেছিল।  আমরা এরকমই বড় হয়ে উঠিছিলাম। বাড়িতে টিভি কেনাটাও এক বিশাল ঘটনা। সব মনে পরে। কি সুন্দর সব স্মৃতি। বইয়ের পাতার মতো পতপত করে উল্টাতে থাকে, বিশেষ করে যখন আমি আমার একলা রান্না ঘরে সকাল বেলা তরকারি কাটতে বসি।   

_______________

68

Leave a Reply