Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার: মেগা প্রবন্ধ: পর্ব ৩৫

বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জনজীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

মুসলিম জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আনসারউদ্দিনের ‘স্বপ্ন- দুঃস্বপ্ন’ গল্পটি। কথকতার ঢঙে আনসারউদ্দিন গল্প বলে চলেন। বেশিরভাগ গল্পে তিনিই কথক। এক আপাত মধুর ভঙ্গীতে তিনি গল্পের পরিণতি ঘটান। সহজাত বিষয় ও কাহিনি নিয়েই তিনি গল্পে উপস্থিত হন। কিন্তু গল্প নির্ণয়ে থাকে চমক। এ গল্পে লেখক একটি বালকের স্বপ্নকে কেন্দ্র করে মুসলিম জীবনের ধর্মীয় বিশ্বাস, কুসংস্কার, লোকবিশ্বাস সমস্তই তুলে ধরেছেন। ধর্মীয় বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে নিম্নবিত্তের মুসলিমদের কিভাবে শোষিত হতে হয় তা লেখক দেখিয়েছেন। আনসারউদ্দিনের বেশিরভাগ গল্পেই সমাজের নিচু তলার মানুষের প্রতি একটা ঝোঁক লক্ষ করা যায়। দিদার আলির বাড়িতে রয়েছে জমজমের পানি। জমজমের পানি হল আরব দেশ থেকে আনা পবিত্র জল। এই জল খেলে অনেক ভয় বিপদ নিরাময় হয়। কিন্তু দিদার আলি আজ মৃত। সেই জল আছে দিদার আলির পুত্র সোরাবুদ্দিনের কাছে। কিন্তু এই জল আনতে গেলেই নানা কৈফিয়ৎ দিতে হয়। সেই কৈফিয়ৎকে কেন্দ্র করেই ফজলচাচা ও কথকের পিতাকে কেন্দ্র করে গোটা গল্প বিবর্তিত হয়েছে। আসলে লেখকের লক্ষ মুসলিম সমাজের total life ফুটিয়ে তোলা। সেই সমাজ বারবার ফিরে আসে গল্পে।

        সময়ের দর্পণে মানুষের ছবি আঁকা কখনই শিল্প হতে পারে না। সময়কে, মানুষকে শিল্প করে তোলাই কথাকারের কাজ। আর এ কাজ করার জন্য একজন কথাকারকে নিরন্তর জটিলতার মধ্যে দিয়ে আখ্যানকে প্রবাহিত করে নিয়ে যেতে হয়। সময়ের কুচক্রীগ্রাসে মানুষ নিরন্তর পাল্টাচ্ছে। সময়কে যদি আমরা দুটি পর্বে বিভাজন করি- বড় সময়, ছোট সময়। বড় সময় যদি বহিঃবিশ্বের বিভিন্ন কার্যকলাপ হয় তবে ছোট সময় হল অন্তঃবিশ্বের কার্যকলাপ। সময়ের স্রোতে মূল্যবোধহীন পৃথিবীতে মানুষ ক্রমাগত পাল্টাচ্ছে। সেই বিবর্তিত মূল্যবোধের অবদংশনের ক্ষয়িতমনা সময়কেই কথাকার ধরতে চান। ফলে গল্পের কাহিনি এক হলেও জীবনবোধ, জীবনচেতনা পাল্টে যায়। সেই জীবনচেতনার সন্ধানেই অগ্রসর হন কথাকাররা। শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পে আমরা দেখেছিলাম পশুপ্রীতির আশ্চর্য নিদর্শন। তবে সেখানেও প্রতিবাদ ছিল, মুক্তি ছিল। কিন্তু নিম্নবিত্তের যে মুক্তি নেই তা দেখিয়েছেন মনোজ দে নিয়োগী তাঁর ‘আবারও মহেশ’ গল্পে। আমিনারা রেহাই পায় নি শহরে গিয়েও। আমিনাদের মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয় সময়ের কুচক্রী গ্রাসে। আনসারউদ্দিনের ‘জম্জমের পানি’ গল্প পশুপ্রীতির আশ্চর্য  নিদর্শন ফুটে উঠেছে। ইদ্রিশের এক জোড়া বলদ আছে, তার মধ্যে একটি অসুস্থ। গ্রামীণ মানুষ, কৃষক মানুষ পশুকে সন্তানসম স্নেহে পালন করে। কৃষকের কাছে ফসল উৎপাদনের প্রধান হাতিয়ারই বলদ। নিম্নবিত্তের গ্রামীণ মানুষের কাছে হালের বলদের যে অত্যন্ত প্রয়োজন তা আনসারউদ্দিন খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। মুসলিম লোকাচার বিশ্বাস জমজমের পানি পান করলে সমস্ত রোগ নিরাময় হয়। প্রিয় বলদের সুস্থতার জন্য ইদ্রিশ জমজমের পানি আনতে গিয়েছিল সিরাজ ফরাজির বাড়ি। কিন্তু সেখান থেকে ব্যর্থ ও অপমানিত হয়ে এসেছে। কিছু দিনের মধ্যেই মারা যায় বলদটি। এই মৃত পশুর জন্য ইদ্রিশের যে হাহাকার সেটিই গল্পের মূল সুর-

“ তা কী করে ? কথা অনুচ্চস্বরে বললে ইদ্রিশের বউ ? তার কথার ধরতাই পেয়ে আবার বললে- বলদ দুটোকে তুমি তো কম ভালোবাসতে না। কতদিন ওদের শাড়ির আঁচলে গা ঝেড়ে দিয়েছে। নাদায় তেষ্টায় পানি ঢেলে দিয়েছে। তখন কি তুমি জানতে ওদের একটাকে আমরা এভাবে হারিয়ে ফেলবে ? সন্তানশোকের চেয়ে এ শোক কম নয় গো-“ (‘জম্জমের পানি’, তদেব, পৃ. ১০৯)

লেখকের ব্যঙ্গ ফুটে উঠেছে মুসলিম ধর্মজীবনের প্রতি। ইদ্রিশকে আজ সামান্য জমজ্মের পানির জন্য অপমানিত হতে হয়েছে। এই জলে রোগ নিরাময় হয় আবার অনেক সময় হয় না। গ্রামীণ মানুষের বিশ্বাস তবুও যদি পান করলে একবার ভালো হয়ে যায়। আরব থেকে আনা জমজমের পানি শেষ হয়ে যাওয়ায় সিরাজ ফরাজি কল থেকে এক বিন্দু জল ঢেলে দিয়েছিল। সেই জলই সবাই জমজমের পানি বলে কাজ চালাত। আজ সেই কলের গোড়ায় নানা আর্বজনার জল প্রবেশ করেছে। এই দৃশ্য ইদ্রিশ দেখেও নীরব থেকেছে। এই নীরবতার মধ্যে দিয়েই লেখক দুটি প্রশ্ন বড় করে তুলেছেন। একটি হল সিরাজ ফরাজির অবহেলার প্রতি প্রতিবাদ, অন্যটি হল ধর্মজীবনের প্রতি অবিশ্বাস। আনসারউদ্দিন যেমন আস্তিক্যবাদী দর্শনের গল্প লেখেন তেমনি সময়ের স্রোতে সমাজকে ধরতে নৈরাশ্যবাদী নাস্তিক্যদর্শনের দিকেও পা বাড়াতে হয়। আনসারউদ্দিনের গল্পে সে সময় বড় হয়ে ওঠে, যে সময়ে মানুষ সামাজিক নানা ঘাত প্রতিঘাত ও অন্ধবিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সেই ঘাত- প্রতিঘাতের দ্বন্দ্ব মুখর সময়ই আনসারউদ্দিনের গল্পের মূল সুর।

        আনসারউদ্দিনের গল্পে গ্রামীণ সমাজ বাস্তবতা প্রবল ভাবে ধরা দেয়। তিনি ফেসবুকে নিজের পরিচয় দিয়েছেন –প্রান্তিক চাষি বলে। আবার কখনো নতুন বন্ধুর সান্নিধ্য পেয়ে হাত ধরেই বলেন লাঙল টানা হাত তো তাই শক্ত করে ধরলাম।নিজেকে উদ্বাস্তু লেখক হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন না। ফলে ভূমিজ মানুষ তাঁর গল্পে প্রবল ভাবে উঠে আসে। আর সেই ভূমিজ মানুষ হল প্রান্তিক মুসলিম জনজীবনের মানুষ। ‘অঙ্কশাস্ত্র’ গল্পে দরিদ্র মুসলিম ইরফান মাস্টারের করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন। আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে প্রাইমারি শিক্ষকের স্বচ্ছল অবস্থা ছিল না। তার পূর্ব সময়ের অবস্থা আরও ভয়ংকর ছিল। এজন্যেই প্রবাদ প্রচলিত ছিল- “চাকরি ভাতার যার পোড়াল কপাল তার / চাষা ভাতার যার খাসা কপাল তার”। গল্প কথক কোনদিনই অঙ্কে ভালোছিল না। কিন্তু পিতার ইচ্ছা সন্তান যেন অংকে ভালো হয়। কৃষক মানুষ অংকে ভালো বুঝতে বোঝেন সুদের হার ,কৃষিই ঋণের পরিমাণ। বিদ্যালয়ে ইরফান মাস্টার অংক পড়ান। সমান্য বেতনে ইরফান মাস্টারের দিন চলে না। সেই ইরফান মাস্টারের কাছেই টিউশুনি পড়তে এসেছে গল্প কথক। পড়ার বদলে জমি চাষ করে , আর মাস্টার পরীক্ষায় বেশি নম্বার দেয়। এভাবেই প্রাথমিক থেকে উচ্চবিদ্যালয়ে গেছে কথক। সে আজ চলেছে মাধ্যমিক দিতে। ইতিমধেই মারা গেছে ইরফান মাস্টার। পিতা বলে পরীক্ষার আগে  ইরফান মাস্টারের কবরে প্রণাম করে যেতে। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘ভবিষ্যতের ভার’ গল্পে আমরা দেখেছিলাম মধ্যবিত্তের আদর্শচ্যুতি কিভাবে ঘটে। এ গল্পের ইরফান মাস্টারের পরিণতি আরো ভয়ংকর। পরীক্ষা দিতে যাবার আগে কথক কবরের সামনে প্রণাম করতে গিয়ে যেন রুক্ষতার মুখোমুখি হয়-

“ নিজের মুখ থেকে উচ্চারিত কথা নিজের কানেই ধ্বনিত হল। আমি আবার অন্ধকার ফাটলের দিকে তাকালাম। আমার কেন না-জানি মনে হল মাস্টারমশাই হাই তুলে তুলে ওই ফাটলের মধ্য দিয়ে তাঁর পেটের খিদেকে উড়িয়ে দিচ্ছেন।“( ‘অঙ্কশাস্ত্র’, ঐ, পৃ.২২৩)

এই অসহনীয় জীবনযন্ত্রণার মর্মান্তিক চিত্রের মধ্যে দিয়েই আনসারউদ্দিন গল্পের পরিণতি ঘটান। লেখক অধিকংশ গল্পের পরিণতিতে বাস্তববাদী। বিপন্ন মানুষের হৃদয় যন্ত্রণার মর্মভাষ্যই তিনি তুলে ধরতে ভালোবাসেন। কেনই বা তুলে ধরবেন না- তাঁর ভূগোলের চারিদিকে বিপন্ন পরিবেশ আজও বর্তমান। প্রান্তিক মুসলিম মানুষেরা আজও শিক্ষার আলোয় আসতে পারে নি। মুসলিম জীবনের অর্থনৈতিক চিত্র আজও ভয়ংকর ভাবে দুর্বল। সেই যন্ত্রণার কথাই তিনি ফুটিয়ে তোলেন। গ্রাম জীবনের অভিজ্ঞতা ফুটে উঠেছে ‘গ্রাম কমিটি’ গল্পে। পঞ্চায়েত রাজ কীভাবে বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিল গ্রাম্য নেতাদের কৌশলে লেখকের দৃষ্টি সেদিকে। তবে অন্য সব লেখক থেকে আনসারউদ্দিনের স্বতন্ত্রতা সহজেই চোখে পড়ে। অন্যান্য লেখক যেখানে আবেগের উপর নির্ভর করেন সেখানে তিনি নির্মমভাবে সমাজ সত্যের কথাকার। আর এই সমাজ সত্য সম্ভব হয়েছে আনসারউদ্দিন নিজেও কৃষক শ্রেণির প্রতিনিধি বলে। পঞ্চায়েতর বিলি ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গ্রামে যে কমিটি গড়ে উঠেছে সেখানে প্রত্যেকেই দারিদ্র্য। বক্কার, কাদের,অবজাল প্রত্যেকেই নিম্নবিত্ত মানুষ। তাঁর গল্পে শাসক ও শোষিতের সম্পর্ক যেন এক সরলরেখায় মিশে যায়। তাদের একটি পরিচয়ই বড় হয়ে ওঠে তা হল দারিদ্র্যতা। ফলে পঞ্চায়েতের মাল বাটোয়ারা নিয়ে আর্থিক অসংগতি নয় গ্রাম্যজীবনের প্রকৃত ছবি উঠে আসে।

            আনসারউদ্দিন গ্রামীণ জীবনের ভাঙা গড়া ও তার বিবর্তনের ছবি আঁকেন সুন্দর ভাবে। সমাজের ক্ষেত্রে আজ বহমানতাই বড় হয়ে উঠেছে। তিনি সেই বহমান জীবনস্রোতের শিল্পী। জীবনে বেঁচে থাকা ও লড়াই সংগ্রামকে তিনি মিলিয়ে দেন ‘সেলাই’ গল্পে। জীবনে বেঁচে থাকা যেন একধরণের সেলাই, যে যত শক্ত সূতোয় বাঁধতে পারে সে তত সফল হয়। ওসমান দর্জির টেলারিং এর দোকান। সেখানে সে পুরুষ মহিলা সকলেরই পোশাক বানায়। দারিদ্র্যতা থেকে সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়েছে। ওসমানের স্ত্রী ছবিরণ। ছবিরণ কুৎসিত হলেও দারিদ্র্যের কারণে ওসমান এতেই মুগ্ধ। সে গাছা বাজারের সেরা দর্জি। তাঁর সাফল্য ছড়িয়েছে চারিদিকে। আপাত তুচ্ছ বিষয় নিয়ে লেখক এ গল্পে নেমেছেন।একদিন  ব্লাউজ কাটতে গিয়ে সে শাড়ির আঁচল কেটে ফেলে। দামী কাপড়ের এই অসহনীয় অবস্থা দেখে মেয়েটি চিৎকার করে ওঠে। বাজারের সবাই ভাবে ওসমান বুঝি ধর্ষণ করেছে। কুৎসা রটে যায় বাজারে। শেষে সমস্ত দোকানদাররা মিটমাট করে। ওসমান জীবনে এই প্রথম ভুল করল। কাপড়ের মূল্য হিসেবে তাঁকে ফেরত দিতে হয় সাত হাজার টাকা। সেই শাড়ির ওসমান সেলাই করে নিজের স্ত্রীর জন্য নিয়ে এসেছে। ওসমান আজ আর প্রকৃত সত্য প্রকাশ করেনি। শুধু বলেছে-

“ কিছু মনে কোরো না। এ নিয়ে দুঃখ কোরো না। মনে জানবা তোমার-আমার সম্পর্কটা তো সেলাইয়ের। নইলে ভেবে দেখো কোথায় তোমার বাবার বাড়ি আকন্দপুর আর আমার বাড়ি কুটির পাড়া। কতদিন ধরে একসঙ্গে আছি বল দিকিন। যত দামিই হোক না কেন শাড়ি একদিন ফেঁসে যায় ছিঁড়েও যায়, কিন্তু সেলাই সহজে ছিঁড়ে যায় না। সেলাই সেলাই-ই থেকে যায়।“ (‘সেলাই’ তদেব, পৃ. ৬৫)

লেখক অদ্ভুত ভাবে মিলিয়ে দেন জীবনের সঙ্গে শিল্পকে। তেমনি লেখক সমাজ বিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেন। তাঁর গল্পের প্রথম দিকে  গ্রাম্য জীবনের চাষিবাসী, নিম্নবিত্ত ভূমিজ মানুষের বর্ণনা পেলেও সেই গ্রাম যে ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে, মানুষ যে ক্রমাগত আধুনিকতার দিকে যাত্রা করেছে, গ্রামেও যে এসেছে নগরায়ণের ছাপ তা তুলে ধরলেন এই গল্পে। তিনি শুধু বাস্তবের শিল্পী নন, বাস্তবের ভিতরে বহু বাস্তবের যে স্বর, যাকে কোন কোন সমালোচক বলেছেন ‘অধিবাস্তব’- সেই পথ আবিষ্কারে মত্ত থাকেন। লেখক ওসমান দর্জির নিপীড়নের ছবি আঁকলেও গোপন পাঠে তা যেন অন্য ভাষ্য রচনা করে। এইভাবেও বেঁচে থাকা যায়, নানা লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে নতুন জীবনস্বপ্নে এগিয়ে যাওয়া যায়- বাঁচার স্বপ্ন এগিয়ে যায়। মনে পড়ে মিশেল ফুকোর কথা –“ The individual is not to be conceived of as a sort of elementary nucleus on which power comes to fasten …. in fact, it is already one of the prime effects of power that certain bodies, certain gestures, certain discourses, certain desires come to be identified and constituted as individuals.” ( তপোধীর ভট্টাচার্য, ছোটগল্পের বিনির্মাণ, অঞ্জলি পাবলিশার্স, প্রথম প্রকাশ ২০০২, পৃ. ১৪৩)

76

Leave a Reply