Categories
Uncategorized

কোভিড কথা : জয় দত্ত রায়

জানুয়ারি, ২২,২০২১: করোনা অভিজ্ঞতা লিখতে গিয়ে প্রথমেই মনে হয়েছিল মানুষ যেন কেমন ট্যারা চোখে তাকায়? এই অভিজ্ঞতা হয়ত অনেকেরই হয়েছে। যেহেতু আমি পেশায় মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ তাই রোগ এবং রোগীদের সঙ্গে আমার সরাসরি সম্পর্ক। সাবধান সচেতন সব সময় ছিলাম কারণ পেশার কারণে রোগ এবং রোগী দুটোই ওতপ্রোতভাবে জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে। অক্টোবর মাসে একুশে অক্টোবর প্রথম কিছু উপসর্গ শরীরে অনুভূত হয় সেগুলি সাধারণভাবে ছিল একটু একটু গা ম্যাজ ম্যাজ করা ভাব যা স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়েছিল সারাদিন কাজের পর ক্লান্তির লক্ষণ। পরে শরীরে হালকা তাপমাত্রা সঙ্গে কিছু লক্ষণ ছিল যা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন এর উপসর্গ। যেহেতু প্রথমেই বললাম যে পেশাগত কারণে আমাদের সরাসরি সম্পর্ক রোগ এবং রোগীর সঙ্গে তাই শরীরে কিছু লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে বাড়িতে আইসোলেশন এ থাকা শুরু করলাম। চার দিন হয়ে যাওয়ার পরও উপসর্গগুলো কম ছিল না ফলে 25 শে অক্টোবর নবমীর দিন পাড়ার এক ডাক্তার বাবুর কাছে যাই তার পরামর্শ নেবার জন্য। সেখানেই তিনি অন্যান্য পরীক্ষার সঙ্গে আরটিপিসিআর পরীক্ষা করে নেওয়ার কথা বলেন। তার পরামর্শ অনুযায়ী সেইদিনই রায়গঞ্জ জেলা হাসপাতালে করোনা পরীক্ষা করাই। পরদিন দশমী ছিল সেই দিন স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে প্রথমে ফোন করে জানানো হয় যে আমার রিপোর্ট করোনা পজিটিভ। মৃদু উপসর্গ থাকায় প্রথম দিন থেকেই যেহেতু বাড়িতে সেল্ফ আইসোলেশন এ ছিলাম তাই ডাক্তার বাবুদের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতেই ছিলাম। 30 শে অক্টোবর রাত্রে হঠাৎ করে অক্সিমিটার দেখি অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমতে থাকে এবং তা আশির কাছাকাছি এসে দাঁড়ায় সাথে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শ মিকি মেঘা কোভিড হাসপাতালে ভর্তি হই এবং সেখানে চিকিৎসা শুরু হয়। পরবর্তীকালে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পায় এবং কিছু উপসর্গ ও প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে নিয়ে প্রায় এক মাসের মতো থাকতে হয় পরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক সুস্থ হয়ে উঠি। করুণা হাসপাতালে একটা অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মধুর ছিল যেহেতু করণা চিকিৎসার বিধি অনুযায়ী করোনা রোগীর সঙ্গে চিকিৎসাকর্মী ছাড়া কেউ দেখা করতে পারবেন না তাই পরিবার এবং পরিজনদের সঙ্গে কোন সাক্ষাৎ সম্ভব ছিলনা কিন্তু এই পরিস্থিতিতে সেই অভাব পূরণ করেছে আমার বন্ধু গৌতম সে প্রতিদিন আমার পাশের জানালা নিচে দাঁড়ানো এবং ফোনে তার সঙ্গে প্রায় অনেকক্ষণ কথা হতো ফলে পরিবার-পরিজনকে না দেখার অভাব অনেকটাই দূর হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ এক মাস পর আমার বাবাও করণাতে আক্রান্ত হন তার অনেকগুলি কোমর বিডিটি ছিল। কিন্তু তার কোন উপসর্গ ছিল না যেহেতু তিনি প্রতিবছর শীতে অসুস্থ হন তাই ডাক্তারবাবুর পরামর্শ তারও আরটিপিসিআর পরীক্ষা করানো হয় এবং রিপোর্ট পজেটিভ আছে। নিজের করণা অভিজ্ঞতার থেকেও তখন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল নিজের বাবার পরিস্থিতি কি হবে আমার কোনো কমতি ছিল না কিন্তু বাবার আছে। কোথায় গিয়ে তিনি শেষ করবেন কারণ বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি ক মর বিডিটি থাকলে অনেক সময়ই রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন না। কিন্তু আমার বাবা নানা রকম শারীরিক সমস্যা থাকলেও 13 দিন পরে বাড়িতে ফিরে আসেন পরবর্তীকালে আরো বেশ কিছুদিন তার একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে চিকিৎসা চলে এখন তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ। করণা অভিজ্ঞতায় একটা জিনিসই বারবার মনে হয়েছে যে নিজে সাবধান থেকে এই রোগকে প্রতিরোধ করা যাবে না যদি না আপনি যাদের সঙ্গে সব সময় চলছেন প্রতিটি মানুষ ন্যূনতম করণা বিধিগুলি মেনে না চলেন। এছাড়া যদি কোন উপসর্গ বা লক্ষণ শরীরে দেখা যায় তাহলে লুকিয়ে না রেখে বা আইসোলেশন এ থাকতে হবে পজেটিভ হলে এই ভাবনা থেকে দূরে থেকে সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা করানো দরকার। কারণ একটা জিনিস স্পষ্ট মনে হয়েছে আগে যারা পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসা শুরু করেছেন তারাই কিন্তু ভালো হয়ে উঠেছেন যাদের উপসর্গগুলি মারাত্মকভাবে শরীরে প্রকট হওয়ার পর চিকিৎসা শুরু হয়েছে তাদের কিন্তু ফল ভালো হয়নি এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার মৃত্যুকে ডেকে এনেছেন। নিজের অভিজ্ঞতার কথা লেখা শেষ করব এই বলে যে করো না এখনো দূর হয়নি আমাদের আরও সাবধান এবং সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরী তাহলেই এই রোগের বিরুদ্ধে আমরা জয়ী হতে পারব।

105

Leave a Reply