Categories
Uncategorized

কোভিড কথা

সুকুমার বাড়ই

দ্বিতীয় পর্ব

পজিটিভ ওয়ার্ডে কারুর কারুর অবস্থা ভীষণ খারাপ। সারা দিন-রাত না খাওয়া, না ঘুম। শরীর অনেকটা শুকিয়ে গেছে। কাউকে দেখা করতে দেওয়ার নিয়ম নেই। এ সময়ে আত্মীয়-পরিজনদের কথাও কেমন যেন ভুলে গেছিলাম। স্বপ্নে মৃত্যুকে দেখতাম। মৃত্যুর সাথে কথা বলেছি বারবার। তাকে বলেছি আমি মারা গেলে পরিবার পরিজনের কি হবে? এসব নানা কিছু ভাবতে থাকি। কতো কাজ করার ইচ্ছে ছিল। আর বোধহয় তা হল না। বয়স্ক বাবা- মার কি হবে? স্ত্রী, মেয়েদেরই বা কি হবে? এসবই শুধু ভেবেছি। অন্যান্য রোগীদের অবস্থা দেখে আরো ভয় পেয়ে গেছিলাম। ওখান থেকে দুজনকে নিয়ে যাওয়া হয় রায়গঞ্জের মিকিমেঘা করোনা হাসপাতালে। আমার যেদিন পজিটিভ হলো সেদিন আমাকে মিকিমেঘা বা অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। এসময় ওয়ার্ড বয়েরাও ভয়ে এক বোতল জল দিতে আসতো না। মাঝে মাঝে রাগ হতো। পরে বুঝতাম কার উপর রাগ করবো? এ রোগটাই তো এমন। এ দু দিনে যা অভিজ্ঞতা হল তা সারা জীবন মনে থাকবে। সবাই ফোনে শুধু জ্ঞানের কথা বলেন। আমি যখন মৃত্যুর সাথে লড়ছি তখন কি আর জ্ঞানের কথা ভালো লাগে? আমারও লাগেনি। আমি শুধু ভেবেছি আর ভেবেছি। ওয়ার্ড বয় দূর থেকে জানিয়ে গেল আপনার লালার আর টি পি সি আর করতে দেওয়া হয়েছে। ওই রিপোর্টে এলেই আপনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ২২ থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত বিরামহীনভাবে অক্সিজেন চলছে। বাথরুমে যেতে ভীষণ ভয় হতো। কারণ অক্সিজেন নল খুলতে হত। বাথরুম থেকে হাপাতে হাপাতে এসেই দ্রুত অক্সিজেনের নল লাগিয়ে নিতাম। এই তিন দিন হাসপাতালে রোগী, ডাক্তার আর ওয়ার্ড বয় ছাড়া কাউকে দেখতে পাইনি। বাড়ির লোকেরা এসেছে কিন্তু তাদের সাথে দেখা হয়নি। নানান রকম ভাবনার জাল বুনতে থাকি। সময় একদম কাটতে চায় না। হাসপাতালে খাবারের মান নিয়ে কথা বলতে চাইছি না। তাহলে আরেক পর্ব হয়ে যাবে। তবে একদিন বোন লোপা সরকার প্রচুর শুকনো খাবারের সাথে চিকেন বিরিয়ানি পাঠিয়েছিল। ভালো লেগেছিল ভীষণ। মুখে রুচি নেই তাই সে খাবার তেমন মজা করে খেতে পারিনি। ওর সব সময়ে পাশে থাকা আজও স্মৃতির ক্যানভাসে ভেসে আসে। ডাক্তাররা দিনে একবার আসেন। কোন কিছু না বলে দেখতেন আর চলে যেতেন। এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট আর প্যারাসিটামল দিয়ে যেতেন ওয়ার্ড বয়। ক্ষীণ আশার আলো দেখতে পাই। এর মধ্যে আর জ্বর নেই। কিন্তু মনে বড় ভয়। অনেক রাতে আমার ঘরের এক রোগী বন্ধুর শারীরিক অবস্থা ভীষণ খারাপ হয়ে পড়ে। আমি চিৎকার করে ওয়ার্ড বয়কে ডাকি। আর ওনার অক্সিজেনটা লাগিয়ে দিই। ওনার বাড়ি থেকে কেউ আসে না বলে উনি কাঁদছিলেন। বাড়ির লোকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে নানা কথা বলেন হাঁপাতে হাঁপাতে। আমার ভীষণ খারাপ লাগে। ওনাকে বোঝাতে থাকি। আমরা যে একই যাত্রি। পরে ওনাকে তড়িঘড়ি করে নিয়ে যাওয়া হয় মিকিমেঘা হাসপাতালে। এ সময়ে আমার আতঙ্ক আরও বেড়ে গেল। কিছুই আর ভালো লাগছিলো না। মাঝে মাঝে মনে হয় আর বোধহয় বাঁচবো না। রাত্রি তখন দেড়টা-দুটো হবে। ওয়ার্ড বয় জানান, আর টি পি সি আর রিপোর্ট এসেছে। নেগেটিভ। এবার ভয় কমার চেয়ে আরো বেড়ে গেল। আমি নেগেটিভ হলে কি হবে? আমিতো আছি সমস্ত পজেটিভ রোগীদের মাঝে। তাহলে আমার কি হবে? এ সময় কোথা যেন মনে শক্তি ফিরে পেতে থাকি। ভাবি যা হবার তা হবেই। ও নিয়ে ভাববো না। ওয়ার্ড বয় আমাকে বলেন, আপনি কাল সকালে বাড়ি চলে যান। এখানে আর থাকবেন না। এটাতো মৃত্যুপুরী। আমি বললাম, কিভাবে যাব? আমার তো শরীর ভীষণ দুর্বল। এখনো তো আমি সুস্থ হইনি। তখন তিনি বললেন, আপনার যেহেতু নেগেটিভ হয়েছে তাই আপনি যে করেই হোক এখান থেকে বেরিয়ে যান। আপনার কপাল ভালো যে আপনার নেগেটিভ হয়েছে। শুনে একটু সাহস পেলাম। পরদিন বিকেল নাগাদ অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে শেষে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে তিনতলায় চিকিৎসার জন্য ভর্তি হই। নানা রকম টেস্ট করিয়ে শেষে জানা গেল আমার নিউমোনিয়া হয়েছে। ডাক্তার অনেকেই ছিলেন। পরে ডাক্তার সুদীপ্ত সাহার নেতৃত্বে চিকিৎসায় সাড়া দিতে থাকলাম। ভাই সুজন পাল সব সময় আমাকে যেভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় এবারও তার ব্যতিক্রম হয় নি।
ভাই রঞ্জন মিত্র, জয়ন্ত বাড়ই, সঞ্জয় মিত্রদের সাহায্যের কথা আজও মনের দুয়ারে ভীড় করছে। ২৬ জুলাই থেকে একটু একটু করে সুস্থ বোধ করতে লাগলাম। বাড়ির লোকেরা দেখা করতে এসেছে। দেখা করে গেছেন বৌদি বকুল দাস ও জামাই ভাস্কর বনিক, বন্ধু বিশ্বজিৎ সাহা সহ অনেকে । একটু একটু করে ভালো লাগতে শুরু করেছে। এ সময়ে কৌশিক ভট্টাচার্যের সারাক্ষণের সাহায্যের কথা ভোলার নয়। ভোলার নয় বিধায়ক মোহিত সেনগুপ্ত, পৌরপতি সন্দীপ বিশ্বাস, পবিত্র চন্দ ও সহ আরো অনেক মানুষের কথা। শিক্ষক যাদব চৌধুরী একদিন হাসপাতালে হাজির। ভীষণ ভালো লেগেছিল সেদিন। হাসপাতালে থাকাকালীন জানতে পারলাম, এ সময়ে আমার বাড়ির অবস্থার কথা। বাড়িতে করোনা পজিটিভের পোস্টার লেগেছিল ২৩ জুলাই। ২৪ জুলাই রাতে নেগেটিভ হলেও ২৬ জুলাই পর্যন্ত সে পোস্টার থেকেই যায়। আমার করোনা পজিটিভের খবর দ্রুত ছড়িয়েছিল। অনেকেই খবর রটিয়েছিলেন আমি শিলিগুড়ি গেছি। কেউ আবার রটিয়েছেন আমি মিকিমেঘা হাসপাতালে আছি। কেউ কেউ বলেছেন আমাদের বাড়ির সকলের করোনা হয়েছে।
আর ও কতো কথা। কিন্তু আমার যখন নেগেটিভ হয় সে খবর কেউ জানতেও পারে না। পরে ২৭ জুলাই বাড়ির পোস্টার ছিঁড়ে পঞ্চায়েত কর্তৃপক্ষ। আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে যারা যেতেন তারা নাকি বাড়ির দিকে তাকাতেও ভয় পেতেন। যাক সে কথা। কাজের দিদির বাড়ি আব্দুল ঘাটা। আমার বাড়িতে কাজের সুবাদে তাকেও কম যন্ত্রণা পোহাতে হয়নি। আশে পাশের বাড়ির লোকেরা যা ব্যবহার করেছেন তা আজীবন মনে থাকবে। তবে এসবের মাঝেও ভালোলাগা যে পাড়ার সুব্রত দত্ত,উত্তম কর, প্রলয় শ্যাম,শ্যামল কর্মকারসহ অনেকের মতন দাদা,ভাই এবং বন্ধুরা সব সময় পাশে থেকেছেন। যারা সেদিন দূরে থেকেছেন অথবা না জেনে অনেক ভুল খবর ছড়িয়ে আমার পরিবারেকেভ অসুবিধের মধ্যে ফেলেছেন তাদের প্রতি রইল একাকাশ ভালোবাসা। যে সমস্ত বন্ধুরা পাশে না থেকে ভুল খবর রটিয়েছিল আমি বাড়ি ফিরে এসে তাঁদের নানা সমস্যাতে এগিয়ে গেছি। এতে মনে কোথায় যেন ভালোলাগা কাজ করে। আসলে রোগটাই তো আতংকের। গতানুগতিক জীবনের বাইরে যেতে না পারাটায় দোষ কোথায়? সাহায্য করেছেন কমলাবাড়ী পঞ্চায়েতের প্রধানসহ অনেকেই।
হাসপাতালে আমি অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছি। ২৮ জুলাই আবার টেস্ট। আবার মনের কোনে ভয়ের আনাগোনা। কি হয় কি হয়! এখন মুখে বেশ রুচি এসেছে। পেঠ ভরে খেতে পারছি। রাতে ঘুম হচ্ছে। তবে শরীর ভীষণ দুর্বল। হাটতেও কষ্ট। ভাবছি রিপোর্ট পজিটিভ বা নেগেটিভ যাই আসুক এবার বাড়ি যাব। ৩০ জুলাই রিপোর্ট হাতে এলো। নেগেটিভ। মন পজিটিভ হয়ে গেল। বাড়ি ফেরার তোড়জোড় শুরু। কৌশিক ভট্টাচার্য ছিল সাথে। ওই সব সামলে নিয়ে আমাকে ওষুধপত্রসহ বাড়ি দিয়ে যায়। ওকে কি যে বলি? ওর মতো মানুষ আরও আসুক এ ধরায়।এখনতো করোনা হলে তেমন কিছুই হয়না। আমার সময়ে করোনা হওয়ার ফলে আমি যেন অচ্ছুৎ বনে গেছিলাম। আমার বাড়ির লোকেরা যে কষ্টে কাটিয়েছেন তার জন্য কাউকে দোষ দিতে রাজি না। আসলে রোগটি এমন। পরে সকলেই বুঝতে পেরেছেন। এটাই বড় পাওয়া। মানুষের আপদে-বিপদে মানুষের পাশে থাকাটা মানুষেরই কাজ। এই সত্য প্রচারিত হোক প্রসারিত হোক। এসেছি যখন পৃথিবীতে, চলেও যেতে হবে এ পৃথিবী ছেড়ে। জীবন চকার পথেঘাটে বহু বিপদ আসবেই। সকলের আশীর্বাদ এবং শুভেচ্ছায় সে বিপদ কাটিয়ে ওঠার মানসিকতা তৈরি হোক সকলের। করোনা পজিটিভ অনেক ভালো, মানসিকতা নেগেটিভের চেয়ে।

165

Leave a Reply