ডাঃ দেবব্রত  রায়

জানুয়ারি ১৯,২০২১:এবারে উৎসবের ধরনটা যেন একটু অন্য রকম। শুধু ‘উৎসব’ বললে সত্যের অপলাপই হবে। বরং ‘মহোৎসব’  বলা যাক। কিন্তু চেনা উৎসবে আমজনতার যেমন উন্মাদনা থাকে, যেমন সাজো সাজো ভাব থাকে, যেমন বাদ্য বাজনা, প্রচার, দেওয়ালের কথাবার্তা থাকে এবারে তেমন নেই। বদলে আছে একটা চাপা উত্তেজনা, এদিক সেদিক কানাঘুষো, সত্য মিথ্যার জাল বোনা,চায়ের পেয়ালায় তুফান, সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রলিং, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ধারাবিবরণী- যেন কোনো মহামানব এর আবির্ভাব লগ্ন আসন্ন।

  রাজকীয় আগমনই বটে।     

‘অমৃত’ আসছে কিনা!!!

সাগর মন্থনকালে যখন অমৃত উঠে আসছিল তখন দেবতা এবং অসুর দু’পক্ষই সাগরতীরে যেমন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন বাঁচার অমৃত লাভের আশায় এওও যেন অনেকটা তেমনি।

‘ করোনা প্রতিষেধক ভ্যাকসিন’ আসছে যে।

দীর্ঘ এক বছরে আমাদের ধৈর্য, সহ্য আর জীবনীশক্তিকে  নিংড়ে দিয়ে প্রায় যখন খাদের কিনারায় পৌঁছে গেছি আমরা; সেকেন্ড ওয়েভ  করোনা , ভিন্নতর স্ট্রেইন নিয়ে ভাবনা আর দুশ্চিন্তায় জাল যখন রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গিয়ে প্রায় অবশ করে ফেলেছে চেতনা আর ভাবনার জায়গা তখন পাশাপাশি তীব্র আকুতি তৈরি হয়েছে ‘ভ্যাকসিন’ নিয়ে। ।

  খবরের কাগজের পাতায় করোনার খবর দিন কয়েক আগেও প্রথম সারিতে ছিল। সেসব বাদ দিয়ে আনাচকানাচে খুঁজে বেড়াচ্ছি ভ্যাকসিনের খবর।কোনদিন দু এক কলম খবর থাকছে, কোনোদিন আবার তাও থাকছে না।

কোথায় কি অবস্থায় তৈরি হচ্ছে ভ্যাকসিন, কত তাপমাত্রায় রাখতে হবে কোন্ ভ্যাকসিন,সেই তাপমানে ভ্যাকসিন রাখা আমাদের দেশে সম্ভব কিনা, কতটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে কোন্ ভ্যাকসিন, ভ্যাকসিন নিলে কতদিন পর্যন্ত নিশ্চিন্তে থাকা যাবে-এসব প্রশ্ন ছাপিয়েও  কখনো কখনো বড় হয়ে উঠছে আরও একটি প্রশ্ন– ভ্যাকসিন নিলে অন্য কোন পার্শপ্রতিক্রিয়া হবে না তো?

যেদিন কিছু আশার কথা পাওয়া যাচ্ছে সেদিনটা বেশ ফুরফুরে লাগছে। দিল্লির কৃষক আন্দোলনে সামিল হলে মন্দ হয়না জাতীয় ভাবনা  কিংবা হাই ডায়াবেটিক হয়েও দুটো নলেন গুড়ের রসগোল্লা খাবার তীব্র বাসনা জাগছে মনে। আবার যেদিন খবর পাওয়া যাচ্ছে ভ্যাকসিন নেবার পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হলে তার দায় সরকার নেবে না বা ভ্যাকসিন নিলে দেড় মাস মদ্যপান নিষিদ্ধ (সোশ্যাল-মিডিয়ায়-ভাইরাল )তখন সত্যি সত্যিই এই জুবুথুবু  ঠাণ্ডা সকালে গরম কফির উষ্ণতাও বিস্বাদ লাগছে। এইসব ভাবনা-চিন্তার মধ্যেই ধুপস্ করে এসে গেল করোনা ভ্যাকসিন।

বাড়ির গৃহবধূর সন্তান প্রসবের সময় বাড়ির সবাই যখন প্রসব ঘরের বাইরে চরম উৎকণ্ঠায় নিয়ে বসে থাকেন; এই উৎকণ্ঠার চরম  সীমায় যখন মায়ের প্রসব বেদনার চিৎকার থেমে গিয়ে বাচ্চার কান্না শোনা যায় তখন যেমন সবার একটা অসম্ভব স্বস্তির অনুভূতি হয় অনেকটা তেমনি আস্বাদ।

ভ্যাকসিন হাতের কাছে পৌঁছে গেছে–

তবে তো নিশ্চিন্তি।

এই স্বস্তির অনুভূতিকে যে কি দিয়ে বিশ্লেষণ করা যায় তা অজানা ।এই চরম শান্তির পরেও কিন্তু মনটা আবার খুঁতখুঁত করছে- ভ্যাকসিন নিলে কোন প্রতিক্রিয়া হবে না তো? করোনা শুরুর সময় যেমন অনেকে ভাবতেন আমার তো কোন উপসর্গ নেই তাহলে আমি টেস্ট করাব কেন ? এখনো অনেকে ভাবছেন আমার তো কোভিদ হয়েই গেছে তাহলে আমি আর ভ্যাকসিন নেব কেনো? এসব হচ্ছে ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আতঙ্কের ফল।প্রস্তুতির সংস্থা সেরাম ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া বিজ্ঞপ্তিতে জানাচ্ছেন ভ্যাকসিন নেওয়ার পর 10 জনের মধ্যে মাত্র একজন সামান্য জ্বর, বমি বমি ভাব, গলা ব্যথা, সামান্য কাঁপুনি, সামান্য কাশি অথবা টিকা নেওয়ার জায়গায় সামান্য ব্যথা বা ফোলা , সামান্য চুলকানি, ক্লান্তি মাথা ব্যথা, গায়ে ব্যথা, গাঁটে গাঁটে ব্যথা ইত্যাদি জাতীয় সামান্য উপসর্গে ভুগছেন। ১০০ জনের মধ্যে মাত্র একজনের তলপেটে ব্যথা, প্রচণ্ড ঘাম বা বমি হচ্ছে । এসবের কথা মাথায় রেখেই ভ্যাকসিন নেওয়ার পর আধা ঘন্টা সময় নজরদারিতে রাখা হচ্ছে গ্রহীতাকে। যাতে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

আশার কথা এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত এই রাজ্যে সরকারি খবর অনুযায়ী বড় ধরনের সমস্যার খবর মেলেনি ।একমাত্র কলকাতার একজন নার্সিং স্টাফের  অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঘটনা ছাড়া। খবরে অবশ্য প্রকাশ যে এই গ্রহীতার  আগে থেকেই অ্যলার্জি সংক্রান্ত সমস্যা ছিল। শেষ পাওয়া খবর পর্যন্ত উনি ভালই আছেন।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা সাইডএফেক্ট/ অ্যাডভার্স ইভেন্ট  যে কোনো ওষুধেই যে কারো ,যে কোন সময়েই ঘটতে পারে ।  ভ্যাকসিন প্রয়োগে তো হতেই পারে ।

আসলে আমরা আতঙ্কিত এই কারণে যে রোগটির নাম কোভিদ নামক অতিমারী ।আর ভ্যাকসিনটিও  সদ্যোজাত এবং দুর্জনেরা বলছেন ভ্যাকসিনের নাকি সব পর্যায়ের পরীক্ষাই শেষ হয়নি।সেসব সম্পন্ন হওয়ার আগেই ব্যবহার করা হচ্ছে। সংগঠিতভাবে না হলেও মিডিয়া বিশেষত সোশ্যাল মিডিয়া এই প্রসঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই  নেতিবাচক ভূমিকা নিচ্ছে ।

আতঙ্ক ,অবিশ্বাসের বাতাবরণে তৈরি হচ্ছে এভাবেই।  আশা করা যায় দিন যত এগোবে, ভ্যাকসিন প্রাপকের সংখ্যা যত  বাড়তে থাকবে ততই কমতে থাকবে সংশয়ের পরিবেশ ।

পরিশেষে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়–

অতঃ কিম?

ভ্যাকসিন নিলে কি আমরা 100% বিপদমুক্ত হয়ে গেলাম ?

আমরা কি আবার সেই ঘেঁষাঘেষি  আর ঠেসাঠেসির    পর্যায়ে চলে যেতে পারবো?

অতটা খুল্লামখুল্লার অনুমতি অবশ্য এখনই দিতে নারাজ  বিশেষজ্ঞরা ।

‘আনলক পর্যায়’ যতই আসুক না কেন মাস্ক ছাড়া যাবে না। ‘নিউ নর্মাল’ কে যেভাবেই উপভোগ করুন না কেন  হাত ধোয়া আর স্যানিটাইজার ব্যবহার এখনই বাতিল করা যাবে না। এই মুহূর্তে গলাগলি আর  কোলাকুলিও করা যাবে না আগের মত।

ভাবছেন যে এত সুখের খবরের সময়ে এত হতাশার কথা শোনাচ্ছি  কেন?

উত্তরটিও সহজবোধ্য— ভাইরাসটির নাম করোনা আর ভ্যাকসিন একেবারেই সদ্যোজাত ।

92