Categories
Uncategorized

কোভিড কথা

দ্বিতীয় জীবন

সুকুমার বাড়ই

একবিংশ শতক যেমন প্রযুক্তির উন্নতির কাল তেমনি করোনা কালও। দেশ- দেশান্তরে শিশু থেকে বড়ো সকলেই কোভিড ১৯ বা করোনা ভাইরাস এই নাম জানে। এটি ২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি ব্যাবহার হওয়া শব্দ। সুতরাং কোভিড কি বা করোনা কি এ দিকে আর না গিয়ে আমার কোভিড কথার স্মৃতি ভাণ্ডার খুলে দিলাম ।করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করে যেন দ্বিতীয় জীবন পেয়েছি। করোনা আক্রান্ত হয়ে দেশে প্রতিদিনই মানুষ মারা যাচ্ছে। ভয় হতো এই মৃত্যুর মিছিলে আমিও চলে গেলাম ভেবে। চোখে পরিবার, সহকর্মীদের সঙ্গে কাটানো স্মৃতি ভেসে উঠত। আমার শরীর প্রচণ্ড দুর্বল ছিল। বেশ কয়েক দিন কিছুই খেতে পারি নি । তবে অনেক কষ্টে মনোবল ধরে রেখেছিলাম। তারপর সকলের আশির্বাদ আর শুভেচ্ছায় এ যাত্রায় ফিরে এসেছি। এই কোভিড কথা লিখবো লিখবো করে আর লেখা হয়ে ওঠেনি।সুযোগ এল কুলিকইনফোলাইনের তরফ থেকে। হাতছাড়া করি কি করে?কড়া শীতের কামড়ে মন চলে গেল সেই ২০২০ সালের ১১ জুলাইয়ে। শরীরটা বড্ড ম্যাচ ম্যাচ করছিল। বিকেলের দিকে জ্বর এলো। তখনও স্বাভাবিক কাজকর্ম অস্বস্তি থাকা সত্বেও করে চলেছি। রাতে খেতে গিয়ে কেমন যেন রুচিহীনতা। পরদিন ১২ জুলাই জ্বরের জন্য বাড়ির সামনের দেবা দার ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ নিয়ে এলাম। বাড়িতে কেউ ছিল না। স্ত্রী-কন্যারা বেড়াতে গেছিল। বিধায়ক মোহিত সেনগুপ্তের ডাকে বিকেলে ছড়াকার কল্লোল বন্ধ্যোপাধ্যায়ের স্মরণ সভায় যাই। শরীর ভালো নেই। কেমন যেন স্বাভাবিকতা নেই। ওখান থেকে নাগর নদীতে ছবি তুলতে তুলতে ভুলে গেছিলাম শরীর খারাপের কথা। সাথে ছিলেন রানা দেবদাশ। পরে অঞ্জনদার আমন্ত্রণে ওনার আমার বাড়িতে খাওয়া দাওয়া। আবার ভালো না লাগা পেয়ে বসে। বাড়িতে এসে মেঝেয় শুয়ে টি ভি দেখি। ১৩ থেকে ১৫ জুলাই ভেতরে ভেতরে নিজের সাথে লড়াই করে চলেছি। জ্বর কোনোভাবেই কমছে না। শরীরে কোন যুত নেই। সব সময় কেমন একটু অস্বস্তি বোধ। কখনো মেঝেতে টিভি দেখতাম। কখনো বই পড়তাম। কিছুতেই ভালো লাগতো না। ওষুধ খেয়ে চলেছি। ভিটামিন সি আরও কত কি! প্যারাসিটামল খাওয়ার পর একটু জ্বর কমে। পরে আবার যে কার সেই। এর মধ্যে জানতে পারি জেলার এ ডি এম মৃদুল হালদারের করোনা পজিটিভ। জেনেই মন কেমন করে ওঠে। আসলে অঞ্জন দার বাড়িতে সেদিন আমরা একসাথে ছিলাম। জানতে পারি অঞ্জন দা,রানা দেবদাশসহ সেদিন যারা ছিলাম সকলের শরীর খারাপ। ১৫ তারিখ সন্ধ্যায় স্ত্রী-কন্যারা ফিরে আসে। আমি ওপরে নিজের পড়ার ঘরে চলে যাই।ওদের বলি তোমরা আমার সংস্পর্শে এসোনা। স্ত্রী শুভ্রা কাড়াসহ নানা জরি- বুটি খাওয়াতে থাকে। ১৫ থেকে ২২ জুলাই ওপরের ঘরেই থেকেছি আর নিজের সাথে নিজে লড়াই করেছি।মেয়েরা দূর থেকে দেখে যেত। শরীর আর মন ভেঙে যাচ্ছে। একের পর এক ডাক্তারের পরামর্শ নিচ্ছি । আর তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাচ্ছি। সুদর্শন দার গাড়ির চালক নতুন থার্মোমিটার দিয়ে গেছে।

বড় মেয়ে সহ অনেকেই বলছে করোনা টেস্ট করিয়ে নিতে। আবার কেউ বলছেন কোন দরকার নেই। টেস্টে পজিটিভ এলে সামাজিক চাপে পড়ে যাব। পরিবারের ভীষণ অসুবিধে হবে। বিষয়টিকে খুব বেশি পাত্তা দিইনি। আসলে সে সময়ে শরীর ভীষণ দুর্বল হয়েছে। দুর্বল হয়েছে মনোবলও। যারা ফোন করছে তাদের কারো ফোন ধরতে আর ইচ্ছে করত না। বাড়ির সকলেই ভীষণ দুশ্চিন্তা করতে থাকে। কোন রাতেই ঘুম হচ্ছে না। আমাকেও কেমন যেন দুশ্চিন্তায় পেয়ে বসেছিল। কখনো ভাবতাম এই যাত্রায় বোধহয় আর ফিরে আসতে পারবো না। মাঝে মাঝে নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যা হতে লাগে। থার্মোমিটারে জ্বর ১০২ এর নিচে নামে না। এ সময়ে নানা ভাবনার জাল বুনতে বুনতে শরীর আর মন ভীষণ দুর্বল করে ফেলেছিলাম। অক্সিমিটার দিয়েগেছিলেন কৃষ্ণেন্দু দা। দেখতে থাকি শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা।।২২ জুলাই সকালবেলায় প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। অক্সিমিটারে দেখি কখনো ৮১ আবার কখনো ৭৩। সাথে সাথেই রায়গঞ্জ পৌরসভার পৌরপতি সন্দীপ বিশ্বাসকে ফোন করি। উনি সাথে সাথেই অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে দেন। পরিজন ছেড়ে যখন গাড়িতে উঠি তখন মন ভীষণ ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছিল। মেয়েদের কথা, স্ত্রীর কথা, মা বাবা ভাইদের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে হাসপাতালে পৌছে গেছিলাম বুঝতে পারেনি। ড্রাইভারের ডাক শুনে জেগে উঠি। ধড়পড় করে উঠতে পারিনি। সে শক্তি নেই।

সকাল ৯ টা নাগাদ রায়গঞ্জ হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি হই। সব বলে রেখেছিলেন পৌরপতি।নানান রকম কাগজপত্রে সই করে আইসোলেশন বিভাগে যাওয়ার পর অক্সিজেন দেওয়া শুরু হয়। প্রথমঅভিজ্ঞতা। মনে মনে ভাবতে লাগলাম প্রকৃতির কাছ থেকে আমরা সর্বদা অক্সিজেন নিয়ে বেঁচে থাকি। আর এখন কৃত্রিম অক্সিজেন আমাকে বাঁচিয়ে রাখছে।শরীর ভীষণ খারাপ তা সত্ত্বেও তখন পরিবেশের অবদানের কথা মনে পড়ছিল। মুখে কোন রুচি নেই। কোন খাবার খেতে পারতাম না। তখনো আমার কোন টেস্ট হয়নি। যেখানে ছিলাম সেখানে অনেক করোনা সন্দেহভাজন অসুস্থ রোগীরা ভর্তি ছিলেন। কারুর কারুর অবস্থা ভীষণ খারাপ। করোনা এমনই একটি রোগ যা সম্পর্কের বাঁধন কেটে দেবার জন্য এসেছে মনে হতে থাকে। শুয়ে শুয়ে মনে হতো আমরা নাকি মানুষ? নিজের জীবন নিজের কাছে সত্যিই অমূল্য। কিন্তু ব্যতিক্রমও দেখেছি। এসময়ে অলিপ মিত্র, ডা. নারায়ণ দাস, ডা. প্রদীপ কুমার মন্ডল, পবিত্র চন্দ্র, বিধায়ক মোহিত সেনগুপ্ত , কৃষ্ণেন্দু দাস,সুদর্শন ব্রহ্মচারী সবসময় সাহস দিয়ে গেছেন। রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অনিল ভুইমালি, অধ্যাপক বাবুলাল বালা, অধ্যাপক স্বপনকুমার পাইনসহ অনেকেই সবসময় খোঁজ নিয়েছেন। কলেজের উপাধ্যক্ষ মুকুন্দ মিশ্রসহ সহকর্মীরাও নিরন্তর খোঁজ রেখেছিলেন। ফোনে কথা বলতে ইচ্ছে করত না। কেউ যখন ফোন করতো তখন ভালো লাগতো না। সাংবাদিক বন্ধুরাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। কয়েকজন ডা. বন্ধু নিয়মিত খোঁজ রেখেছিলেন। হাসপাতালে সুপার সহ অনেকেই বিশেষভাবে দেখভাল করেছেন। সে সময়ে যে যাই করুক আমার তেমন ভাল লাগছিল না। আইসোলেশন ওয়ার্ডে ২২ তারিখ সন্ধ্যায় আমার লালা নিয়ে গেল। ২৩ তারিখ গভীর রাতে রিপোর্ট এলো। করোনা পজিটিভ। ভীষণ ভেঙে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম আর বোধহয় বাঁচবো না। ২৩ জুলাই রাতেই ওয়ার্ড বয় আমাকে অন্যত্র নিয়ে গেল। ওখানে সকলেই করোনা পজিটিভ রোগী। (ক্রমশ…)

154

Leave a Reply