ঈশিতা দে সরকার

 মেসেজ ঢুকছে পরপর আমার মোবাইলে। পজিটিভ আর পজিটিভ।

বাড়ির পাঁচজন পজিটিভ। কো মর্বিডিটি থাকা মা বাবা সহ সবাই পজিটিভ। মুহুর্তে চারপাশ শুন্য মনে হয়েছিল।

কোভিড ১৯ পৃথিবী ছড়িয়ে এবার আমার ঘরে।ঘরের একমাত্র সাড়ে চার বছরের বাচ্চা নেগেটিভ। তার আর্ত কান্না তখন এম্বুলেন্সের ধুকপুক আওয়াজ কে ছাপিয়ে যাচ্ছে।আমরা হসপিটালের পথে। বাড়িতে একজন আইসোলেটেড বাবা ছঁুতে পারছে না শিশুর অসহায়তা কে।

হসপিটাল এক অদ্ভুত ময়দান।জীবন মৃত্যু এখানে প্রতিনিয়ত চর্চায় রেখেছে নিজেদের।আর তা যদি হয় কোভিড ১৯ হসপিটাল;সেখানে চর্চা আর ও তুমুল।

স্থানীয় কোভিড হস পিটালে শুরু হল আমাদের চার জনের চিকিৎসা।এখানে কাটানো প্রতিটা মুহুর্ত কে ধরে পেরিয়ে আসা যায় অনন্ত শব্দ সমুদ্র।প্রতিটা মুহুর্ত উদ্বেগ আশঙ্কা ইত্যাদি নিয়ে শরীর মনের এক খেপাটে আচরণ।সেকথা লিখতে গেলে কোভিড কথা দীর্ঘতর হবে।আপাতত আমার সেই ঘরের চাবি পরের হাতে দিয়ে একজন অপার মানুষ কে নিয়ে কিছু কথা রেখে যাব এখানে। যে মানুষ ঠিক করে নিয়েছিল মানুষকে সারিয়ে তোলা তার একমাত্র পথ ও শপথ। বাপি দা।বাপি বিশ্বাস। হসপিটালে ভর্তি হওয়ার পর অপু দা শুভ্র দার কাছে যার নাম শুনি প্রথম। শুনি;হসপিটালের সমস্ত চিকিৎসক নার্স স্বাস্থ্য কর্মীর   নিরলস চেষ্টার সাথে জুড়ে থাকা এই নামের।

হসপিটালে চারদিন কেটে গেছে। পাঁচ দিনের সকালে হঠাৎ খুব তোড়জোড় শুরু হয়ে গেলো ওয়ার্ড পরিস্কারের। কয়েক জন কর্মী ছড়াচ্ছে রুম স্প্রে।

কিছু আক্রান্ত বালিশের তলায় লুকিয়ে রাখছে মোবাইল।

দুজন সেবামানুষ বলে গেলো ফোনে অযথা জোরে জোরে কথা না বলতে। সব মিলিয়ে একটা অন্য রকম পরিপাটি ওয়ার্ড  (যদিও হসপিটাল এর ওয়ার্ড রোজ ই পরিস্কার হত)।এই পরিপাট্য কোন স্বাস্থ্য অধিকর্তার আসার বার্তা হিসেবে নিয়েছিলাম আমরা।

পরে জানতে পারি;আজ বাপি বিশ্বাস  বাড়ি থেকে ফিরে হসপিটালে আবার কাজে যোগ দিচ্ছেন।

আগ্রহ বাড়ল।রাতের পর রাত ঘুমাই নি হস পিটালে থাকা কালীন। পাশের বেডে শরীর মনে এবড়ো খেবড়ো মা ;সিসি ইউ তে থাকা ডিমেনশিয়া সহ অন্যান্য সমস্যায় জড়িয়ে থাকা বাবাকে নিয়ে কেটে যেত সময়।মাঝে মাঝে ভুলে গেছি আমি ও বেড নিং ২০৬.

বেড নং ২০৬ এর সামনে দুপুরের হাল্কা বোজা চোখের সামনে গোলাপি পোষাকে এসে দাঁড়ায়।হাতে থার্মাল স্ক্যানার।

প্রথমে আমি তারপর সকলের তাপমাত্রা;;প্রেসার; অক্সিজেন স্যাচুরেশন দেখে নিয়ে জানায়.. “আমি বাপি;যে কোন সমস্যায় আমি তোমাদের জন্য আছি।কেউ ভয় পাবে না। সবাই সুস্থ হয়ে যাবে…’

কেমন এক খোলা আকাশ দেখতে পাচ্ছি যেন সবাই সাদা সিলিং এর বদলে। বদলে গেলো অনেকটাই।

শরীরের নানা সমস্যা বাপি দার কাছে বারবার জানানো হলেও বিরক্তি নেই। সাধারণ ওয়ার্ড থেকে সিসি ইউ।

কে কি ওষুধ খাচ্ছে;কি খাবার খাচ্ছে; কার মন ভাল নেই;কে বাড়ি যাওয়ার জন্য কাঁদছে;কে ওষুধের শিশির ঢাকনা খুলতে পারছে না;কে ছাড়াতে পারছে না লেবুর খোসা;ডিমের খোসা;কাকে এক্ষুনি রাইস টিউব পড়াতে হবে  এমন হরেক রকম বিষয় বাপি দা সেরে ফেলছে পরপর। মোদ্দা কথা সবাই ফ্যান হয়ে গেলো এক দিনে বাপি দার। আমি পুরো গুণ মুগ্ধ।

কোভিড  ১৯ এর সামনের এই সেনাপতি আবৃত্তি গান ওডিশি কত্থক নাচে গুণান্বিত।  সারাদিন মানুষের সেবা করে সেনাপতি রাতে ওয়ার্ড টহল দিত। কার মুখে কম্বল চাপা পড়ে গেছে;কে জেগে আছে অপলক… বাপি দার নোট বুকে সব ধরা থাকত। বাপিদার  দিন রাত বলে কিছু নেই। রাত তিন টেয় আসা এম্বুলেন্স এর আওয়াজ কানে গেলে শোনা যেত তিন তলা থেকে পায়ের সজোর শব্দ তুলে বাপি দা নামছে … ” পদ্ম মণি;তারা ;জিয়াউল.. তোরা কে কোথায় আছিস?…”

কে কোথায় থাকে পড়শির  পোষাকে ;কে হাতে রাখে নরমের গন্ধ…

কেমন করে রাখতে হয়;বাপি দা জানত। রাত জাগা আমি দেখতাম রাতের শান্ত তারার নীচে জেগে থাকা মহামারির গদ্য। বাপি দা সম্বন্ধে গদ্য লিখতে গেলে  আকাশ ও যেন কম পড়ে যায়। মনে পড়ে কত কথা!

“ও দিদি ;তোমার মায়ের লাংগ ইনফেকশন কমে এসেছে গো ” বলে ছুটে আসে বাপিদা। চোখে মুখে কি নিবিড় আনন্দ রেখা!!…এই দৃশ্যে চ্যাপলিনের বয়ে যাওয়া টের পাই।এই দৃশ্য কোভিড ১৯ এর মাথা গুঁড়িয়ে বাড়ি ফেরার আজান বেড়ে দেয় থালায়।

অনেক টা ঝাপ্টা দিল এই মহামারি। আমাকে।ওকে।তাকে। অনেক টা জীবন পাঠ এক বগগা বন্ধুর আঙুল দিল এই মহামারি।  সব টা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।

ফেরার দু দিন পর খবর পাই বাপি দা দ্বিতীয় বার আক্রান্ত। মানুষের রোগের আঁশ ছাড়াতে গিয়ে নিজেই ধারণ করেছে অতিমারির নখ দাঁত।শেষ পর্যন্ত হারে নি।

সবার সহযোগিতা শুভ কামনায় আর নিজের ম্যাজিক রিয়ালিজমে সেরে উঠেছে সে। 

এখন সারিয়ে তুলছে অন্য এক  অসুখ পৃষ্ঠার নোট বই কে। সারাও বাপিদা।তোমার মত মেহনতি স্বাস্থ্য মিস্ত্রি জন্মাক  এই ভুখা দেশে।তোমাকে মিস্ত্রি বললে আমার নিজস্ব লং মার্চ পূর্ন হয়ে ওঠে…..

118