Categories
প্রথম পাতা Uncategorized

কোভিড কথা: ডঃ সুদেব সাহার নিজের অভিজ্ঞতা নিজের বয়ানে

কোভিড কথা: ডঃ সুদেব সাহার নিজের অভিজ্ঞতা নিজের বয়ানে

ডা: সুদেব সাহা



কথামুখ: ‘ সার্স কোভ টু’ নামে স্বল্প জানা একটি ভাইরাসের দাপটে গোটা মানব সমাজ অজানা আতঙ্কে এক সময় থমকে গেছিল। তখন থেকে ভাইরাসের উৎস, গঠন, চরিত্র, মানবশরীরে বংশবৃদ্ধি ও রোগবিস্তার, চিকিৎসা, রোগপ্রতিরোধ ইত্যাদি নিয়ে বিরামহীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা চলছে। অতিমারির ভয়ঙ্কর আবহে আমরাও করোনা সংক্রান্ত সাধারণ ধারণা গুলো আমাদের মত করে মানুষের কাছে লাগাতার নিয়ে যাবার একটা আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। রোগাক্রান্ত মানুষের পাশে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত সুপরামর্শ দেওয়ার একটি সংগঠিত উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে চলছে। ভয় ও সন্দেহের বশে ছোঁয়াচে রোগের ছোঁয়াচ বাঁচাতে পাড়ায় পাড়ায় কিছু মানুষকে একঘরে করে রাখার প্রবণতা বাড়তে লাগল। সেসময় বৈজ্ঞানিক যুক্তি স্বাস্থ্যবিধির নির্দেশাবলী নিয়ে মানুষের পাশে আমরা হাজির হয়েছি। সেসব সংগঠিত উদ্যোগের আমিও একজন সাধারণ সৈনিক।
আমার কথা:
আমি একজন সাধারন চিকিৎসক। সাধ্যমত পি.পি.ই. পরেই সাত-আট মাস ধরে রোগী দেখছিলাম। সমস্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনেই জীবন যাপন করেছি। তারপরও আমি কোভিড আক্রান্ত হলাম। এখানে বলে রাখা দরকার, ডাক্তার-রোগী সম্পর্ক ছাড়াও অন্যান্য সামাজিক সম্পর্কের মধ্যেও একজন ডাক্তারের শরীরে মুহূর্তের অসতর্কতায় ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে বাসা বাঁধতে পারে। প্রায় একমাস মারাত্মক অসুস্থ থাকার পর এখন অনেকটা সুস্থ। আমার রোগভোগ এবং নিরাময়ের ইতিবৃত্তের অভিজ্ঞতার কিছু কথা বলা আমার সামাজিক দায় ও বটে। রোগলক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার ৬ দিন পর RT-PCR করে প্রমাণ হল সার্স কোভ টু । কভিদ ১৯ মানেই তো মৃত্যু পরোয়ানা নয়। নিয়মমতো RT-PCR পজিটিভ হলেই সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার মধ্যে প্রবেশ করা। জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর থেকে স্বাস্থ্যকর্মীরা পর্যায়ক্রমে রোগের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ খোঁজখবর নিয়েছেন। ওষুধপত্র পথ্য এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সুপরামর্শ দিয়েছেন। তীব্র জ্বর, শ্বাসকষ্ট, পালস অক্সিমিটার রিডিং ৯৪ বা তার কম হলেই জেলার কোভিড হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। প্রায় ১২ দিন পর আমার খুব শ্বাসকষ্ট শুরু হল, SPO2 নেমে হল ৮৮। লেভেল টু কোভিড হাসপাতাল থেকে তৎপরতার সাথে শিলিগুড়ির লেভেল থ্রী হাসপাতালে পাঠানো হল। সেখানে High Flow Nasal Cannula-র সাহায্যে উচ্চচাপে মিনিটে ৫০ লিটার অক্সিজেন দেওয়া হল। আমার শরীরে যাতে রক্তজমাট বেঁধে না যায় সেইজন্য হেপারিন প্রয়োগ করা হল। এ ছাড়াও উচ্চমাত্রায় জীবনদায়ী ওষুধ স্টেরয়েড প্রয়োগ করা হল। করোনাভাইরাস শুধু শরীরের সমস্ত রক্তনালীতে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়না, বিভিন্ন জৈব রাসায়নিকের পরিমাণ অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেয়। ফলে শরীরের সমস্ত সিস্টেমের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বিশেষত চিকিৎসকদের টীম এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা যে দক্ষতা সহানুভূতির সাথে বিশেষ তৎপরতায় আমার জীবন রক্ষা করেছেন সুস্থ করেছেন তাতে আমি অভিভূত কৃতজ্ঞ। আমি সবাইকে হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে উৎসারিত আবেগমিশ্রিত ভালোবাসা ও কুর্নিশ জানাই।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হল,আমাদের মত সমাজে বন্ধুবান্ধব,শুভানুধ্যায়ীরা নিঃস্বার্থভাবে, আত্মত্যাগের মানসিকতা নিয়ে যে সহানুভূতি-সহযোগিতার পরিপূরক বলয় তৈরি করেন তার মূল্য অপরিসীম। আর এ বলয় তো তৈরি হয় এক দীর্ঘকালীন বোধ-মনুষ্যত্ব-মননের পারস্পরিকতায়।

শেষ কথা:
অতিমারীর ভয়ের অবসান তিন ভাবে হতে পারে।

১. নিরাপদ এবং কার্যকরী ভ্যাকসিন প্রয়োগ;

২. খুবই বিপজ্জনক ও অনৈতিক পথে বহু সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর পর ন্যাচারাল হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হওয়া;

৩. মিউটেশনের ফলে স্প্যানিশ ফ্লু, সার্স কোড ওয়ান, মার্স ভাইরাস যেভাবে পৃথিবীতে বেঁচে আছে;

একটি গবেষণায় জানা গেছে ১৯৬৬ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত যে ৩৫৫টি নতুন ব্যাধি দেখা গেছে তার ৬০% এসেছে বন্যপ্রাণী থেকে। অন্য অর্থে এই অতিমারীও মনুষ্যসৃষ্ট। তাই আমাদের বাঁচতে হবে প্রকৃতির ছন্দে। পরিবেশবিদ রাচেল কারসেনের উদ্ধৃতি দিয়ে কথা শেষ করছি,”Man’s attitude toward nature is today critically important simply because we have now acquired a fateful power to alter and destroy nature. But man is a part of nature, and his work against nature is inevitably a war against himself”(বর্তমানে প্রকৃতির প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এই কারণেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে .এখন প্রকৃতিকে বদলে দিতে ও ধ্বংস করতে আমরা এক সুবশ ক্ষমতার অধিকার পেয়েছি। তবে মানুষ তো প্রকৃতিরই অঙ্গ এবং প্রকৃতি-বিরোধী কর্মকাণ্ড নিশ্চিত রূপে তার নিজের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ)।

290

Leave a Reply