বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জনজীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

আফসার আমেদের ‘বিরহ’ (প্রতিক্ষণ, ১৯৮৮ ) গল্প সময়ের চোরাস্রতে ভেসে যাওয়া প্রেমের দংশনের আত্মকাহিনি। এই দংশনের জন্য নায়ক নিজেই দায়ী। ভালোবাসা মানেই অপেক্ষা করা কিন্তু যৌবনের জন্য, সুখ ও শাক্তির জন্য অনেক সময়ই অপেক্ষা করা যায় না, ফলে এ গল্পের নায়িকাও অপেক্ষা করে নি। আর কেনইবা অপেক্ষা করবেন যেখানে প্রত্যাশা বলতে কিছু নেই। সইফুর সঙ্গে বিবাহ হয়েছিল বদরনের। কিন্তু বিবাহের কিছুদিন পরেই সইফু নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। সে এক বাউণ্ডুলে চরিত্র। বিরহে দিন কাটায় বদরন। এমনকি বর্ষায় ঘরও ভেঙে যায়। দাদা রব্বানি আশ্রয় দিয়েছিল বদরনকে। পরে রব্বানিরাই বদরনকে বিবাহ দেয় হানিফের সঙ্গে। আজ গ্রামে ফিরেছে সইফু। কিন্তু আজ আর বদরনের দিকে তাকানো তাঁর নিষেধ। কেউ কেউ পরামর্শ দিয়েছে বউকে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু সে অধিকার তো তাঁর আজ নেই। ফলে সে আজ ক্ষতবিক্ষত এক ট্র্যাজিক চরিত্র। আজ সে হয়ে গেছে জগৎ জীবন সম্পর্কে উদাসীন, বাড়ি ফেরার কোন ইচ্ছা নেই। বিবাহের পর বদরনের কী হল, সইফুর প্রতি তাঁর কোন আকর্ষণ রইল কি না তা লেখক চিহ্নিত করেন নি। লেখকের মূল কেন্দ্রবিন্দু সইফু। ভিন্ন জেলা থেকে গ্রামে ফেরা, সইফুর কর্মবৃত্তি, কর্মের রূপান্তর, নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বোনা, অচেতনে বদরনের চিন্তা –এ সমস্তকে কেন্দ্র করেই লেখক সইফুর জীবনবৃত্তান্ত রচনা করতে চেয়েছেন। সময়ের সাথে সাথে যেমন গ্রাম, শহর পাল্টায়, পাল্টে যায় শারীরিক গঠন তেমনি পাল্টে যায় মানুষের ইচ্ছাগুলি। ফলে আর পূর্বের অবস্থায় যাওয়া সম্ভব নয় –“পাঁচবছর বদরনকে ছেড়ে থেকে, পাঁচবছর পরে ফিরে এসে একইভাবে বদরনকে দেখবে তা হয় না। বদরনের অবস্থান বদলে যেতে বাধ্য। যেমন রকম আমতা শহর বদলে গেছে। এই বদলের মধ্যেই নিজেকে সোঁপে দিচ্ছিল সইফু। মেনে নিচ্ছিল বদরনের অপ্রাপ্তিকে। এটা একটা অভাববোধ ছাড়া কিছু নয়।“ (তদেব, পৃ. ৫১ )

    জীবনের সত্য সে মেনে নিয়েছে। কারও বিরুদ্ধে সে অভিযোগ করেনি। আসলে উদাসীন বাউলের তো কোন অভিযোগ নেই। তবে বিদ্রোহ আছে নিজের বিরুদ্ধেই। তাই সিনেমা দেখতে গিয়ে কিছু সিন বাদ যাওয়ায় অভিমানে সে বহু চেয়ার ভেঙে ফেলেছে। একটি সিন বাদ দিলে যেমন সিনেমা পূর্ণতা পায় না, তা দর্শককে আঘাত করে তেমনি জীবনও ! জীবনের সমান্তরাল রেখায় কোথায় বিচ্যুতি ঘটলেই যেন জীবনকে আর গড়া যায় না। মাটির হাড়ি যেমন একবার ভেঙে গেলে আর জোড়া লাগে না তেমনি ভালোবাসাও। বদরন আজ অন্যের সাথে ঘর বেঁধেছে, সেখানে কোন অধিকার নেই সইফুর – এ সত্য সে মেনে নিয়েছে। কেননা জীবনের ক্ষেত্রে এটাই সত্য, আর সে সত্যের কথক আফসার আমেদ। তিনি সে সমাজের উন্নতি চেয়েছেন। এ জন্য কখনও ব্যঙ্গ, কখনও ধর্মের মূলে আঘাত করে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছেন। সে সমাজকে নিয়ে তিনি ক্রমাগত ভেবেছেন, সেই চিন্তার ফসল গল্প উপন্যাস। তিনি শুধু আখ্যানই লিখতে চান নি, সে সমাজের সমস্যা ও সেই সমস্যা থেকে পরিত্রাণেরও উপায় করেছেন । তাই ‘অন্ধকারের উৎস থেকে’ রচনায় লেখেন –“মুসলমানরা যাঁরা আলোকপ্রাপ্ত হবেন, তাঁরা তো মূলস্রোতের একজন হয়ে উঠবেন। তাঁদের নতুন আত্মপরিচয় তৈরি করবেন তাঁরা, বিচ্ছিন্নতার আঁধার তাঁরা সরাতে পারবেন। বিচ্ছিন্ন মুসলমান মহল্লার বসবাস না করে যৌথ সমাজের অংশে তাঁরা পৌঁছে যাওয়ার অধিকারী হবেন। আর সেখানে সেই বিনিময়তা বিভেদকে দূর করতে পারবে। গলা ফাটিয়ে বক্তৃতা দিয়ে যা সম্ভব নয়।“ (মুসলমান সমাজ :নানা দিক, দে’জ, প্রথম প্রকাশ ২০১১, পৃ. ৮৫ ) আফসারের মৃত্যু বাংলা কথাসাহিত্যে অপূরণীয় ক্ষতি করেছে সে কথা স্বীকার করতেই হবে। আফসারই প্রথম লেখক যাঁর ‘ধানজ্যোৎস্না’ আখ্যান নিয়ে মৃণাল সেন সিনেমা বানিয়েছিলেন। ‘ভুবনসোম’ সিনেমায় প্রথম মুসলিম জীবন এল। আর সে আখ্যানের লেখক আফসার আমেদ। তিনি নিজে একটি সমাজকে দেখেছেন, সে সমাজের ভাঙা-গড়া উপলব্ধি করছেন, সমাজের মধ্যে থেকেই সমাজ ভাঙার কাহিনি লিখেছেন। আসলে তিনি মুসলিম জনজীবনকে ধর্মান্ধতার আড়াল থেকে  শিক্ষিত সভ্যতার মুখে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। আফসার গল্প উপন্যাসের ক্ষেত্রে যে কথনভঙ্গি ব্যবহার করেছেন তা নতুনত্ব এনেছে। সমালোচক দেবেশ রায়ের মন্তব্য দিয়ে আমরা এ প্রসঙ্গ শেষ করব –

‘’আফসারের গল্প উপন্যাস মুসলমান জীবনের ভিতর থেকে বলা। 

 এত মুসলমান মুসলমান করায় কেউ-কেউ আপত্তি করে বলতে পারেন- গাঁ, বাড়িঘর, ডোবা, দুঃখ এ-সবও কি মুসলমানদের আলাদা হয় নাকী। এ-রকম প্রশ্নে একটা ধর্মনিরপেক্ষ সাম্প্রদায়িকতা থাকতে পারে। আবার, হিন্দু-মুসলমানের জীবনযাপনের এত পার্থক্য কারো সমাজবোধেই বিরক্তি আনতে পারে। কিন্তু আমরা তো তথ্যগত সত্য-অসত্য বিচার করছি না। কোনো লেখক যদি তাঁর গল্পে এগুলোকে আলাদাই বলতে চান, তা হলে তাঁর গল্পেই সেটা আলাদা কী না তা আমরা জানতে পারি। বাইরের কোনো তথ্য গল্পের সত্যকে ঢাকতে পারে না। আর গল্প ছেড়ে তথ্যে গেলে তথ্যেরও তো পাল্টা তথ্য আসবে।

লেখক হিশেবে আফসারের পরাক্রম এইখানে যে এই মুসলমানি নির্দিষ্টতা যতই নির্দিষ্ট হতে থাকে ততই তাঁর গল্পে সেই নির্দিষ্ট বাস্তব ধসে যেতে থাকে। আফসার নিজেই তা ধসিয়ে দেন।‘’ ( উপন্যাসের নতুন ধরনের খোঁজে, দে’জ, পৃ. ১৮৪)

49