বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জনজীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

নিম্নবিত্ত মুসলিম চাষির জীবন নিয়ে লেখা আফসার আমেদের ‘ডিপ টিউবওয়েলের দাম কত ?’ গল্পটি। গল্পটি ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। নিম্নবিত্ত চাষি শুকুর জীবনের ভাঙা –গড়া, উত্থান-পতনের গল্প এটি। গ্রামকে না চিনলে ভারতবর্ষের প্রকৃত স্বরূপ চেনা যায় না। গ্রামের মাটি মেশানো ভূমিজ কৃষকের গল্প এটি। নক্‌শাল আন্দোলন পরবর্তীকালে বাংলা ছোটোগল্প গিয়েছিল ভূমিজ মানুষের কাছে। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ছেলে আফসার বোধহয় যৌবনের দিনে সেই আন্দোলনের ঢেউ পেয়েছিল ! গল্পের চরিত্রগুলি প্রায়ই, আফসারের চেনা , ফলে রক্তমাংসসহ জীবন্ত হয়ে উঠেছে। শাকুর স্ত্রী নসিবা, পুত্র মুক্তার ও কন্যা লায়লা। পরিবারের প্রতি শাকুর ভালোবাসা আছে, তবে তার থেকে বেশি ভালোবাসা জমির প্রতি। জমিকে নিজের হৃদয়ের মতই ভালোবাসে শাকু। এজন্যই কথাসাহিত্যিক অমর মিত্র বলেছিলেন –“চাষার জমি চাষার হৃদয়।“ শাকুর শারীরিক অক্ষমতা নেই পায়ে বসন্ত আছে অন্যদিকে নাসিবার একটি পা পঙ্গু। জীবন সংগ্রামে ব্যর্থ এই দুই মানুষকে মিলিয়েছে কথাকার –

“পনেরো বছরের আগের ঘটনাও শাকুর বর্তমান ও ভবিষ্যতের জীবন –যাপন বোধ অনুভবে সম্ভাব্যতায় নালার জলের মতো বহে যাচ্ছে, যাবেই। সেই বিয়ের রাতের ঘটনা দিয়ে এখনের আরো অন্য সময়ের সমগ্রতা আছে। নসিবা ডান পা-টা দেখতে দেবে না। আর শাকু এই বিদগুটে চেহারার লম্বা লম্বা হাত-পা চামড়া জড়ানো, বাঁকা বুড়ো আঙুল, মুখে বসন্তের দাগ –হাত ছুঁড়লেই কড়িকাঠে আঙুলের ঝাপটানি লাগে, মাচার বিছনায় শুয়েও কিন্তু পা দুটো ঝুলে পড়ে, এত এত খায়, কেউ পেটভাতে কাজ নেয় না –এ বাড়ি সে –বাড়ি গরু ধরে চরাতে চলে যেত সেই বাড়বাঁধে।“ ( আফসার আমেদের সেরা ৫০টি গল্প, পৃ. ৭৬ )

নিম্নবিত্ত পরিবারে ডিপ টিউবওয়েল কেনার ক্ষমতা নেই। দামোদরের জলে তারা চাষ আবাদ করে। কিন্তু ডিপ টিউবওয়েল এলে জমি হস্তান্তর হয়ে যাবে। চাষার হৃদয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে হৃদয়সত্তা। সেই ভাঙা হৃদয়সত্তার বিবর্ণ চিত্র এঁকেছেন লেখক। চাষের কাজে সাহায্য করেছে পুত্র –কন্যা। শাকুর চোখে ধরা পড়ে চারা লাগানো থেকে শুরু করে ফসল বড় হওয়ার প্রতিটি পদক্ষেপ। শাকুর ফসলের প্রতি ভালোবাসার চিত্র গল্পের শেষ কয়েকটি পরিচ্ছেদ জুড়েই আছে। আর আছে গল্পকে জীবন্ত করে তুলতে আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ। যেমন-

            অঞ্চল –অনছল

            গ্রাম প্রধান – মিমবর

‘একটি গিটার’ গল্পটি শারদীয় ‘বারমাস’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে। এ গল্পে আফসার উদার ধর্মচেতনার পরিচয় দিয়েছেন। মুসলিম পরিবারের মেয়ে নেহা বিবাহ করেছে হিন্দু ছেলেকে। নেহার এই জাতি ত্যাগ নিয়ে পরিবারের লোকেদের যে অনুশোচনা তারই কাহিনি এ গল্প। সময়ের সাথে সভ্যতা পাল্টায়, পাল্টে যায় মানুষের ভাবনা চিন্তা। তাই ভালোবাসার মানুষকে পেতে জাতি ত্যাগ করতেও দ্বিধা করে নি নেহা। নেহার এই উদার দৃষ্টির প্রতি সমর্থন আছে ভাই আবিদের। একবিংশ শতাব্দীর ছেলে আবিদ, তাঁর পরিবার ধর্মাচ্ছন্ন নয় তবে জাতি ত্যাগে একটু চিন্তিত হয়ে পড়েছে। একদিকে ধর্মীয় সত্তা ও অন্যদিকে ধর্মের বেড়াজাল অতিক্রম করে বেড়িয়ে আসার প্রচেষ্টা –এই দুই এর দ্বন্দ্ব লেখক অদ্ভুত ভাবে দেখিয়েছেন-

“ধর্মীয় সংস্কারাচ্ছন্ন পরিবেশ তেমন নেই। বাড়ির বয়স্ক লোকজন নামাজ পড়ে। আব্বুজি সরকারি চাকরি করে। অফিসার নয়। ইউ. ডি ক্লার্ক। বাড়ির হিন্দু বন্ধুদের যাতায়াতও আছে তার। কিন্তু ধর্ম মানে, ধর্মীয় পরিমণ্ডলকে অস্বীকার করে নাই কিন্তু মেয়ে হিন্দু ছেলেকে বিয়ে করতে পারে, ভাবতেই পারে না। সেটা অপরাধ হয়। ক্ষমার যোগ্য অপরাধ।“ (তদেব, পৃ. ২৯৭)

তবে নেহার প্রতি বাড়ির লোক চিন্তিত নয় এর মধ্যে যেমন ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে তেমনি আবিদের সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতি উদার দৃষ্টি আছে। প্রশ্ন জাগে আবিদ পুরুষ বলেই কি তাঁর প্রতি পরিবারের উদার দৃষ্টি আর নেহা নারী বলেই কি তাঁকে নিয়মের বন্ধনে বেঁধে রাখা হবে ! আসলে নারীরা যুগে যুগে শোষিত, সেই শোষণের কৌশল পাল্টায় কিন্তু শোষণ পাল্টায় না – ফলে নেহাকে যেতে হচ্ছে পরিবার বিচ্ছিন্ন এক বঞ্চিত নারী হিসাবে। 

        ‘প্রেমিকার কবর’ ( শারদীয় বারোমাস, ২০০৫ ) এক রোমান্টিক প্রেমিকের গল্প। ওয়াসিমের প্রেমিকা ছিল মণিকা। সে গত রাতে মৃত হয়েছে। সে গোটারাত পাহাড়া দিয়ে আজ প্রেমিকার দেহ কবরস্থ করেছে। তবে কবর দিয়ে ওয়াসিম মণিকাদের বাড়িতেই বিশ্রাম নিয়েছে। রাতে হঠাৎ মনে পড়ে কবর থেকে দেহ উঠিয়ে যদি শিয়াল তছনছ করে এজন্য সে বন্ধু জাভেদকে নিয়ে কবর পাহাড়া দিতে গেছে। তবে জাভেদ ভীতু হওয়ায় সে নিজেই গেছে। এমনকি পরিকল্পনা করেছে জাল দিয়ে কবর ঢেকে দিলে শিয়ালের অত্যাচার বন্ধ হবে। এজন্য জাভেদকে জালের ব্যবস্থা করতে বলে। জাভেদ ছোটোমিয়ার জাল নিয়ে আসে। কিন্তু এই ছোটোমিয়া এক গল্পবাজ মানুষ। সে এমন গল্প জুড়ে দেয় যে ওয়াসিম ও জাভেদ কবরের কথা ভুলে যায় সেই রাতে। আসলে তাঁর গল্প বলার কারণ সে জাল দেবে না, অথচ জাল সঙ্গে করে এনেছে সে, এমনই বিচিত্র চরিত্র ছোটোমিয়া। ফলে বাধ্য হয়ে কবর পাহাড়া দিতে হবে ওয়াসিমকে। এক আত্মভোলা প্রেমিককে এখানে আমরা পাই। মুসলিম জীবনে শরিয়তের নিয়ম অনুসারে বিবিধ বিবাহের নিয়ম থাকলেও আদর্শ প্রেমিকও আছে, আফসার সেই আদর্শ প্রেমেরই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এ গল্পে। 

        অন্যদিকে ‘ভালোবেসে ব্যথা পেয়ে পেয়ে’ মনস্তাত্ত্বিক গল্প। আশিক ও নাসিমার ছিল সুখের সংসার। কিন্তু আশিফ খুনের দায়ে ফেঁসে যায়। আশিফের বন্ধু অনুপ খুন করে স্ত্রী অনুরূপাকে। সেই লাশ পুঁতে দেওয়া হয়েছিল আশিকের গ্যারেজের পিছনে। ফলে আশিকও খুনের মামালায় জড়িয়ে গেছে, তবে সাতাশ দিন পরে ছাড়া পেয়েছে কিন্তু তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্কে ফাঁটল ধরে গেছে। আজ বাড়িতে  আছে আশিক, অথচ স্ত্রী নাসিমা কোন কথা বলে না। আশিকের চেতন অবচেতন স্তরের মধ্য দিয়েই লেখক গল্পকে পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তাঁরা এক বিছানায় রাত্রি যাপন করে কিন্তু কোন কথা নেই আশিকের অবদমিত যৌনতা প্রকাশ পায় কিন্তু স্ত্রীর কাছে ব্যক্ত করতে পারে না। স্বামী খুনি হিসেবে চিহ্নত হওয়ায় ( যদিও খুনি নয় ) নাসিমা স্বামীর সঙ্গে তেমন কথা বলে না। আশিকের আজ ব্যবসাপত্র নেই, সে সারাদিন বাড়িতেই থাকে, আর ভেবে চলে নিজেদের সম্পর্কের কথা। আশিক বয়স ছত্রিশ, নাসিমা বত্রিশ। নাসিমা যখন স্বামীর সামনে বস্ত্র পরিবর্তন করে তখন আশিক আর নিজেকে সামলে রাখতে পারে না তবুও কিছু বলার সাহস নেই –“পাশাপাশি শুয়ে থাকার ভেতর স্পর্শ তো পায় নাসিমার। অন্য সময় ঘরের ভেতর যাপনে স্পর্শকাতর করে তুলছে। খুনের আসামির পরিচয় তৈরি না হলে নাসিমা নামাজ শেষ করলে নাসিমাকে শারীরিক সম্পর্কে যেতে বাধ্য করাত সে। এখন সম্পর্কটা তেমন নয়। জোর করলে খুনের মতো হবে। তার চেয়ে এই মনোভঙ্গি কম কিছু নয়। কামার্ত হয় সে। কামার্ত হতে সে ভালোবাসে।“ (আমার সময় আমার গল্প, পুনশ্চ, প্রথম প্রকাশ ২০০৮, পৃ. ২৪৪ ) নাসিমা পুরুষের অবস্থানকে স্বীকার করে নিয়েছে, কিন্তু প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে একটি কথাও বলে না, ফলে আশিকও দাম্পত্যলীলার সুযোগ পায় না। যখন সে সুযোগ আসেনি, তখন সে শুধু দেখেই তৃপ্ত হয়েছে। তবে গল্পের শেষে লেখক মিলন ঘটিয়েছেন। আজ নাসিমা আশিকের পাশে নিশ্চিত মনে ঘুমাতে পারে। আজ আর কোন স্পর্শ নেই, মনে হয়েছে স্বামী এক আশ্রয়ের নাম। 

                    ‘আদিম’ ( শারদীয় পরিচয়, ১৯৮১ ) গল্পে নিয়তি প্রাধান্য পেয়েছে। তবে জগদীশ গুপ্তের গল্পের নিয়তি থেকে এ নিয়তি পৃথক। একটি মুসলিম পরিবারের অন্তঃপুরের ঘটনাকে নিয়ে এ গল্প গড়ে উঠেছে। ইজ্জত আলির পুত্র কায়েম আলি।কায়েমের স্ত্রী হাফেজা। কিন্তু ইজ্জতের স্ত্রী মারা যাওয়ায় সে আবার বিবাহ করে। এ বিবাহতে পুত্র কায়েম কোন আপত্তি জানায় নি। হাফেজাও খুশি কেননা সাবেরা নিজের গ্রামের মেয়ে, ফলে তাঁদের নিবিড় সখ্য গড়ে ওঠে। তবে ইজ্জতের এই বিবাহতে কন্যারা আপত্তি জানিয়েছে। কায়েমেরও পূর্ব প্রেম ছিল মোসলেমার সঙ্গে, কিন্তু সে ছিল বিধবা, তবে ভরা যৌবনের মেয়ে। ফলে ইজ্জত জোড় করে হাফেজার সঙ্গে কায়েমের বিবাহ দিয়েছিল। আজ সংসারে রয়েছে দুই নারী – হাফেজা ও সাবেরা। দুজনের খুনসুটি, ভালোবাসা নিয়ে দিন চলে। সম্পর্কে সাবেরার সন্তান হয় কায়েম, ফলে লজ্জা পায় দুজনেই। ইজ্জত ও কায়েম দুজনেই বাইরে নানা কাজ করে সংসার চালায়। ঘরে দুই নারীর মান অভিমান আছে বটে, তবে ভালোবসাও আছে। সেই সঙ্গে আফসার চিহ্নিত করেছেন  গ্রামীণ মুসলিম সমাজের সম্পূর্ণ চিত্র। হাফেজা একদিন স্বামীকে কেরোসিন আনতে বলে, পিতা –পুত্র দুজনেই কেরোসিন আনতে যায়, সেই গ্রামেই দুজনের শ্বশুরবাড়ি বলে হাফেজা ঘুরে আসতে বলে। ফলে বাড়ি ফিরতে রাত্রি হয়। প্রচণ্ড গরমে হাফেজা ও সাবেরা উঠোনেই শুয়ে ছিল, কিন্তু রাত বেশি হলে তাঁরা ঘরে যায়। কিন্তু সাবেরা ঘুমে অচেতন হয়ে গেলে নিজের ঘরের বদলে হাফেজার ঘরে ঢুকে পড়ে। ফলে বাধ্য হয়ে হাফেজাকেও অন্য ঘরে যেতে হয়। ভাবে পুরুষরা আর ফিরবে না। কিন্তু গভীর রাতে পিতা –পুত্র ফিরে নিজেদের ঘরে চলে যায়। নারীর শরীরে হাত দিয়ে কায়েম বুঝতে পেরেছিল কিন্তু তখন আর কিছু করার ছিল না –

“কায়েম ঝিম মেরে বসে থাকে। কত সময় চলে যাচ্ছে চুপি চুপি। সে ঘরের ভেতর ভূতের মতো নড়ে নড়ে বেড়াচ্ছে। এটায় হাত দেয়, ওটায় হাত দেয়। গা জ্বলে যায়। সারা শরীরের ভেতর জ্বলে গেল। ছটফট করে সে। ঘরে চাকা চাকা অন্ধকার। কিলকিল করছে। চারদিকে তার চোখ। গা জ্বলে গেল, গা জ্বলে গেল। অন্ধকারে অস্থির বসে আছে সে। সময়গুলো কেমন ঝুর ঝুর গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। এই আঁধারে চোখ বড়ো জ্বালা করে। জরুল –তিল। তিল –জরুল। তিলের কোনো অবয়ব থাকে না। জরুলকে ছোঁয়া যায়। স্পর্শ পাওয়া যায়।“ (তদেব, পৃ. ৩৯ )

 এটি আফসারের প্রথম পর্যায়ের গল্প। তখন বয়স মাত্র বাইশ। সেই সমান্য বয়সেই আফসার পরিপূর্ণ গল্প বলতে যা বোঝায় তা ফুটিয়ে তুলেছেন। আখ্যান নিয়ে কোন কারচুপি নয়, নিজস্ব সমাজকে সামনে রেখেই সে সমাজের সম্পূর্ণ চিত্র অঙ্কন করেছেন। সে সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আঘাত করার সাহস তখন তাঁর আসেনি, ফলে বৃদ্ধ বয়সে বিবাহ নিয়ে কোন রসিকতা নয় তিনি জীবনের যে দোলাচলতা তাই দেখিয়েছেন। সে সমাজের বন্ধনজাল থেকে তিনি তখনও বেরিয়ে আসতে পারেন নি, ফলে গল্প যেদিকে এগিয়ে গেছে অনিবার্য ভাবে তাই অঙ্কন করেছেন। লেখকের মতে এই বসবাসই আদিম গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের বিশ্বাস। ফলে সেখানে কোন ভুল নেই, অনুশোচনা নেই।

28