পিয়ালী মিত্র

কদিন ধরে শরীরটা খুব একটা ভালো লাগছেনা । মাঝেমধ্যেই বুকের বাঁদিকে একটা চিনচিন করে ব্যাথা হয় । মাঝে মাঝে হাঁপও ধরে যাচ্ছে । তপনকে কিছু বলিনি । ও অল্পেতেই খুব ব্যস্ত হয়ে ওঠে । ওর শরীরটাও ভালো নয় । সুগার , প্রেসার সব আছে । নিয়ম করে ওকে রোজ ওষুধ খেতে হয় । তার উপর অফিসে কাজের খুব চাপ চলে । বুঝতে পারি ও আর পেরে উঠছেনা । তবু মুখে কিছু বলেনা । মুখ বুজে খেটে চলে । তার উপর
আমার আর মেয়ের যদি একটু কিছু শরীরে এদিক ওদিক শোনে তো ভীষণভাবে চিন্তা করতে শুরু করে দেয় ; ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে । তাই, আর কাউকে কিছু বলিনি । মেয়েকেও কিছু জানাইনি । ওর সামনে ফাইনাল পরীক্ষা । তাই ওকে আর ব্যস্ত করতে চাইনি । নিজেই গ্যাসের ওষুধ, হজমের ওষুধ, অম্বলের ওষুধ নিয়ম করে আমার ডাক্তারী বুদ্ধিতে খেয়ে চলেছি ।
আজ রবিবার । সকাল থেকেই শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে । সকালে সবাই একসাথে চা জলখাবার খাওয়া হলো । তারপর মনে হলো অনেক দিন কিছু রান্না করিনা ওদের জন্য । তাই রান্না ঘরে গিয়ে ঝুম্পাকে ডাল আর চিকেনটা রান্না করে চলে যেতে বললাম । মুন্নির পছন্দের খাবার হলো পনির । ওরা বাপ – বেটিতে আমার হাতের পেঁয়াজ পনির পোস্ত খুব পছন্দ করে । পেঁয়াজ পনির পোস্ত বানাতে বানাতে নিজে নিজেই মনে মনে বেশ একটা গর্ববোধ করছিলাম নিজের ডাক্তারী বিদ্যার উপর । যাইহোক, দুপুরে সবাইমিলে একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া হলো । প্রতিবারের মতো খাবার টেবিলে পেঁয়াজ পনির পোস্তর প্রশংসা খুব তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলাম ।
আকাশে খুব মেঘ করেছে । ঠান্ডা হাওয়া বইছে । খেয়ে উঠে মুন্নি পড়তে চলে গেল ওর ঘরে । বারান্দা থেকে এক চক্কর ঘুরে এসে তপন বললো , “বৃষ্টি আসছে । একটু শুয়ে নিই । ঘুম ঘুম পাচ্ছে । তুমি শোবে তো ? ” মাথা নাড়িয়ে ওকে “হ্যাঁ” বললাম । তারপর একটু ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ঘেটে নিয়ে মেয়ের ঘরে উঁকি মারলাম । দেখলাম খুব মন দিয়ে পড়ছে । তাই আর কোনো সাড়া করলাম না । চুপচাপ ঘরে এসে ঘাটের উপর বসলাম । তপন ঘুমিয়ে কাদা । বাইরে খুব জোরে বৃষ্টি নেমেছে । চাদরটা টেনে নিয়ে শুয়ে পড়লাম । আস্তে আস্তে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই । হঠাত্ মনে হলো কেউ আমার শ্বাসনালি চেপে ধরেছে । প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে । বুকে অসহ্য যন্ত্রণা । দম আটকে আসছে । জোর করে শক্তি সঞ্চয় করে পাশে শোয়া তপনকে ধাক্কা দিতে লাগলাম । কিন্তু না ! এত ধাক্কা দিয়েও ওকে একটুও নাড়াতে পারলাম না । চিত্কার করে মুন্নিকে ডাকলাম । কিন্তু, না ! পাশের ঘর থেকে মুন্নিও আমার চিত্কার শুনতে পেলোনা । পাশে শোয়া তপনও আমার চিত্কার শুনতে পেলোনা । খুব অবাক লাগলো ! তারপর কোনরকমে আস্তে আস্তে উঠে বারান্দায় গেলাম । একরাশ ঠাণ্ডা হাওয়ার দমকায় সব কষ্ট যেন কোথায় চলে গেলো চক্ষের নিমেষে । মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে চলেছে । বেশ ভালো লাগছিলো ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে । অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েও থাকলাম ।
হঠাত্ ঘরের ভিতর থেকে ভীষণ রকম হৈ – চৈ কানে এলো । মুন্নি চিত্কার করে চলেছে, “ও মা তুমি সাড়া দিচ্ছোনা কেন ? ” তপনের গলাও কানে এলো ,” কি হলো তোমার ? হাত – পা এত ঠান্ডা কেন ? উত্তর দিচ্ছোনা কেন ?” দৌড়ে ঘরের ভিতর এলাম । দেখলাম আমার শায়িত শরীর টাকে ওরা ক্রমাগত ধাক্কা দিচ্ছে আর চিত্কার করে চলেছে । আমি ওদের কাছে দৌড়ে এসে বললাম, ” এই তো আমি ; তোমরা এমন করছো কেন ?” কিন্তু ওরা যেন আমার কোন কথাই শুনতে পেলোনা । ইতিমধ্যে হৈ – চৈ তে আমাদের পাশের, নিচের , উপরের ফ্ল্যাটের লোকজন ছুটে এসেছে । ঘর ভর্তি লোকজন । তপন পাগলের মতো ছোটাছুটি করছে আর ফোন করছে শুনলাম আমাদের হাউজ ফিজিশিয়ান ডাঃ মুখার্জিকে । আমিও এঘর ওঘর দৌড়া -দৌড়ি করছি । কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিনা । কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাঃ মুখার্জি চলে এলেন । দেখলাম ওনার পেছন পেছন ঝুম্পাও ঢুকলো । রাতের রান্না করার জন্য ঝুম্পা অবশ্য রোজই এই সময়েই আসে । কিন্তু আজ ঢুকেই মরা কান্না শুরু করে দিলো । কি প্রচন্ড বিরক্ত লাগছে যে আমার বলার কথা নয় । ওদিকে ডাঃ মুখার্জি আমার শায়িত শরীর টাকে পরীক্ষা -নিরীক্ষা করছেন । স্টেথো দিয়ে দেখলেন । মুখটা দেখলাম বেশ গম্ভীর । এমনিতে মানুষটা বেশ হাসি – খুশি । কিন্তু আজ যেন অদ্ভুত রকমের গম্ভীর লাগলো এই ষাটোর্দ্ধ মানুষটাকে । আমার হাতের নাড়িটা চেপে ধরে তপনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ” ঘন্টা চারেক আগেই সব শেষ হয়ে গেছে । ” শুনেই তপন বেহুশ হয়ে গেল । ভাগ্যিস উল্টো দিকের ফ্ল্যাটের সুদীপদা ওকে ধরে ফেলেছিল । না হলে সচাপটে মেঝেতে পড়ে যেতো । সবাই মিলে ওকে ধরে পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিলো । ওর যে প্রেসার আছে , সুগার আছে , ওর যে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে এমন হলে । দৌড়ে এলাম আমাদের শোবার ঘরে । দেখি ডাঃ মুখার্জি কাগজের উপর কলম দিয়ে খচখচ করে কি সব লিখে যাচ্ছেন । আমি চিত্কার করে বললাম, ” ওসব রাখুন ; তপনকে দেখুন ” । কিন্তু উনি যেন আমার কোনো কথাই শুনতে পেলেন না । ভীষণ রাগ হতে লাগলো , কেউ কেন আমার কোন কথাই শুনছে না ! হঠাত্ তখনই তপনের ছোটবেলার বন্ধু চাঁদুদা ডাঃ মুখার্জিকে তপনকে একটু দেখে দেওয়ার জন্য বললেন । চাঁদুদা কখন এলেন বুঝতে পারলাম না । তা সে যাইহোক, ডাক্তারবাবু তপনকে ভালো করে দেখে বললেন ,” ভয়ের কিছু নেই । এতবড় আঘাত সামলাতে পারেনি । ওকে এক গ্লাস গরম দুধ খাইয়ে দিন । ” সঙ্গে সঙ্গে ছুটলাম রান্নাঘরে ।দুপুরে খাওয়ার পর দুধটা গরম করে রেখেছিলাম । এতক্ষণে ঠান্ডা হয়ে গেছে । তাই ভালো করে গরম করার জন্য গ্যাস জ্বালাতে গেলাম । কিন্তু কি আশ্চর্য ! কিছুতেই গ্যাসটা জ্বালাতে পারলাম না । ঝুম্পা চোখ মুছতে মুছতে এসে গ্যাসটা জ্বালিয়ে দুধটা গরম করলো । চাঁদুদার বউ মিতালি একটা গ্লাসে করে দুধটা নিয়ে তপনকে খেয়ে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে লাগলো । ঠিক কি হয়েছে কিছুই বুঝতে পারছিনা । ডাঃ মুখার্জি কেন বললেন , সব শেষ ! …. কি শেষ ? আমি কি স্বপ্ন দেখছি ? …………
হঠাত্ সম্বিত ফিরলো , মুন্নির চিত্কারে । মেয়েটা আছারি পিছারি করে কাঁদছে আর বলছে , ” মা আমাকে ছেড়ে তুমি কোথাও যাবে না । ” দৌড়ে গেলাম ওর কাছে । ওকে বুকের মধ্যে জাপটে ধরার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না । চিত্কার করে বললাম, ” তোকে ছেড়ে আমি কোনদিনও কোথাও যাবোনা । কেন যাবো তোকে ছেড়ে ? ” কিন্তু, আমার কোন কথাই ও শুনতে পেলোনা । দেখলাম, ফ্ল্যাটের পাঁচ – ছয়জন মহিলা মিলে মুন্নিকে সামলানোর চেষ্টা করছে । ইতিমধ্যে আমার দাদা , বৌদী , মামাতো ভাই, মাসতুতো ভাই, আমার ননদ , ননদাই , দেওর সবাই বিভিন্ন জায়গায় থেকে চলে এসেছে । ওদের দেখেই ছুট্টে গেলাম দাদার কাছে । বললাম, ” দেখ কি শুরু করেছে এরা । মুন্নিকে বোঝা , আমি আছি । আমি কোথাও যাইনি । ” কিন্তু কি অদ্ভুত, দাদা যেন আমার কোন কথাই শুনতে পেলোনা ।
হঠাত্ কানে এলো , কে যেন বললো , ” বডি আজকে বরফ দিয়ে রাখা হবে । কালকে দাহ হবে ।” ……………… চমকে উঠলাম । এবার সব আস্তে আস্তে পরিষ্কার হতে শুরু করলো । আমি তালে মরে গেছি ? …………… খুব কান্না পেলো । কিন্তু কাঁদতেও তো পারছিনা । মুন্নিকে ওইভাবে কষ্ট পেতে দেখে খুব কষ্ট হচ্ছে আমার । হঠাত্ আমার পিঠের উপর খুব পরিচিত একটা হাতের স্পর্শ অনুভব করলাম । বহুবছর হয়ে গেছে এই স্পর্শ আমি পাইনি । চমকে পিছন ফিরে তাকালাম । দেখি বাবা । সেই খদ্দরের পাঞ্জাবী আর সাদা পাজামা পরা । একগাল ছোট ছোট সাদা কালো দাড়ি । চোখে চশমা । আর মুখে সেই নির্মল হাসি । আমি অবাক হয়ে বললাম, ” বাবা , তুমি ? তুমি তো মারা গিয়েছিলে !! তুমি তো চলে গিয়েছিলে আমাকে ছেড়ে ! সেদিন কত কেঁদেছিলাম , কত চিত্কার করেছিলাম । কিন্তু সেদিন তো তুমি সাড়া দাওনি । তারপরেও এতগুলো বছর ধরেও তো কতো কেঁদেছি । কত কথা বলেছি তোমার সাথে । তুমি তো কোন কথার কোন উত্তর দাওনি ! আমি তোমার জন্য এত কষ্ট পাচ্ছি দেখেও তো তুমি আসোনি আমার কাছে ! তবে , আজই বা কেন এলে ? কেন সেদিন চলে গিয়েছিলে আমাকে ছেড়ে ? ” বাবার বুকের উপর মাথা দিয়ে খুব কাঁদতে লাগলাম । বাবা আমার মাথায় হাত বুলাতে লাগলো । মাথায় বাবার হাত বুলানোর মধ্যে ছিল অনেক শান্তি । বহুবছর পর সেই শান্তির স্পর্শ পেলাম । হঠাত্ মুন্নির চিত্কারে ফিরে তাকালাম ; মেয়েটা ক্রমাগত কেঁদে চলেছে আর বলে চলেছে , ” মা তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবেনা । “
মেয়েটার কষ্ট আমার আর সহ্য হচ্ছে না । বাবাকে বলতে লাগলাম, ” মেয়েটা কেন বুঝতে পারছেনা যে ওকে ছেড়ে আমি কোনদিনও কোথাও যাবোনা ! আমি ওর চারপাশে ওকে ঘিরেই থাকবো সব – সময় ! “
বাবা মুচকি হাসলো । বললো , ” সেদিনও তো তোকে এই কথাটাই বোঝাতে চেয়েছিলাম । কিন্তু সেদিন কি তুই আমার কথা শুনতে পেয়েছিলিস ? পাসনি । সেদিনও তোকে ওইভাবে কষ্ট পেতে দেখে আমারও বুকটা ফালা ফালা হয়ে যাচ্ছিলো । আমিও সেদিন তোকে এটাই বোঝাতে চেষ্টা করেছিলাম, যে, কোন বাবা – মা তার সন্তানকে ছেড়ে যেতে পারেনা । সন্তানকে ঘিরেই চিরকাল তাঁদের অস্তিত্ব থেকে যায়। “

41