Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার: মেগা প্রবন্ধ: পর্ব: ৩১

বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জনজীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

“আমার লেখার পাত্র –পাত্রীরা মুসলমান সমাজের হওয়ায়, অনালোক এই সমাজের সুবিধে আমি পেয়েছি। আর এটুকু বলতে পারি, এই সমাজ নিয়ে লেখার অনেক কিছু আছে। নিরন্তর লিখে চলা যায়। অনেক কিছু বলার আছে, নিরন্তর বলে যাওয়া যায়। পাত্র –পাত্রীরা একটা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ, আমি এই মানুষদের মধ্যে স্বাধীন মানুষকেই অনুসন্ধান করেছি। কোনো বাধা তাদের কতখানি যন্ত্রণা দিয়ে চলেছে, পরাধীন করে রেখেছে, তার কথা বলে যেতেই হবে আমাকে। নিরপ্রেক্ষভাবেই এ – কথা আমি বলে যাব। যদি বলেন মুসলমান সমাজের প্রতি আমার পক্ষাবলম্বন , যথেষ্ট আছে, এই সমাজেরই মানুষ আমি। কিন্তু রক্ষণশীল নই, সমাজেরই লেখক পরিচয় নিয়ে থাকতে চাই, মাথা উঁচু করে। “(গাধা পত্রিকা, আফসার আমেদ সংখ্যা, পৃ. ২২৪ )

‘গোন্‌হ’ গল্পটি প্রকাশিত হয় ‘পরিচয়’ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে। আফসার বাংলা কথাসাহিত্যে ভিন্নস্রোতের মানুষ। প্রচলিত আখ্যান থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান করেন। নারী জীবনের মত তাঁর লক্ষ থাকে গোষ্ঠী জীবন। সেই গোষ্ঠী জীবনের সামগ্রিক লোকাচার, লোকবিশ্বাস, প্রেম, ভালোবাসার এক নিপূণ কারিগর তিনি। ‘গোন্‌হ’ গল্পটি গড়ে উঠেছে ফরিদা খাতুন নামে এক দরিদ্র মুসলিম কন্যাকে নিয়ে। ফরিদা কাজ করে জয়নুদ্দিন কাজির বাড়ি। জয়নুদ্দিনের ছেলে মালেক বিবাহিত, সে ফরিদার রূপে মুগ্ধ। ফরিদাকে পেতে সে নিজের স্ত্রীকেও তালাক দিতে চায়, কিন্তু তালাক দেওয়ার প্রসঙ্গ গল্পে আসেনি। কাজিবাড়িতে এসেছেন আরবি শিক্ষিত মৌলানা। সে নানাধর্মীয় উপদেশ দেন। এমনকি মৌলানা নাশতা দিতে যাওয়া ফরিদার হাত দেখতে চান। মৌলনার এই জীবনদর্শনের প্রতি লেখকের ব্যঙ্গবাণ ফুটে উঠেছে। আফসার মুসলিম সমাজের প্রতিনিধি হলেও সে সমাজের ধর্মান্ধতা কিন্তু মেনে নেয় নি। ধর্মের নেতিবাচক দিকগুলি ফুটিয়ে তুলে তিনি এক উদার ধর্মমতের পরিচয় দিয়েছেন। তাই লেখক বলেন –

“হাত দেখছে না আরো কিছু। হাত দেখছে না আরো কিছু । হাত দেখছে না আরো কিছু … চাপদাড়ি লোকটা… না থাক। ও হ্যাঁ, লোকটা অনেক কিছু জানে। হাতের মধ্যে হাত রাখা। সে জানে না। স্যাঁতানো সাপের হাত কীভাবে আদর খাওয়া ঘোরাগুরিতে বিজলির মতো স্যাঁৎ স্যাঁৎ করে ওঠে।“ ( আফসার আমেদের সেরা ৫০টি গল্প, পৃ. ২৫)

নারীকে যুগে যুগে শোষিত হতে হয়েছে পুরুষের কাছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারী যেন ক্ষমতার দাসে পরিণত হয়েছিল। তবে আফসার হতাশার শিল্পী নন। তিনি ফরিদাকে জিতিয়ে দিয়েছেন মালেকের সঙ্গে অন্যায় অসামাজিক মিলনে। তেমনি রয়েছে ধর্মের ভেকধারী মৌলানার প্রতি প্রতিশোধের স্পৃহা। বিছনায় সূঁচ রেখে ফরিদা, যা ফুটে যায় মৌলানার বুকে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এর জন্য কোনো শাস্তির ব্যবস্থা করেন নি লেখক। আসলে লেখকের লক্ষ ছিল ফরিদা। অন্যায় অসামাজিক প্রেমের মধ্যে দিয়েও নারী বেঁচে থাকতে পারে, নারী এগিয়ে যেতে পারে আফসার তাই তুলে ধরেছেন। আফসারের লক্ষ্যই হল প্রান্তিক মুসলিম জনজীবন তুলে ধরা। সেই মুসলিম সমাজের ধর্মান্ধতার কাহিনি তিনি মেনে নিতে পারেন না। অথচ ধর্মান্ধতা মুসলিম সমাজে এখনও বদ্ধ পরিকর – সেই ত্রুটিই লেখক তুলে ধরেন।

                    ‘জনস্রোত জলস্রোত’ গল্পটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে ‘পরিচয়’ পত্রিকায়। ভাবতে অবাক লাগে লেককের বয়স তখন কুড়ি। এ গল্পের দ্বারাই সেদিনই প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল যে আফসার বাংলা ছোটোগল্পের নতুন নক্ষত্র। অবশ্যই পাঠককে চমকে দেওয়ার মত গল্প ‘জনস্রোত জলস্রোত’। ব্যক্তি নয় সমষ্টি জীবনই প্রাধান্য পেয়েছে এখানে। একটি প্রান্তিক মুসলিম জনজীবন উঠে এল এ গল্পে। বন্যায় ভেসে যাওয়া কিছু পরিবার আশ্রয় নিয়েছে একটি উঁচু জমিতে। তেমনি ভাঙাচোরা মানুষের জীবনের শোচনীয় ব্যর্থতা গুলি নিয়েই আফসার বাংলা গল্পে প্রবেশ করলেন। আসলে লেখক নিজেই তো গ্রামে বড় হয়ে উঠেছেন। ফলে চরিত্রগুলি লেখকের বড় বেশি চেনা। আর তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে সমালোচক অমলেন্দু চক্রবর্তীর বক্তব্যে –“আফসার সর্বাংশে গ্রামের ছেলে। বর্ষায় কাদায় শীত গ্রীষ্মের ধুলোয় পা ডুবিয়ে হাঁটা তাঁর আজন্ম অভ্যাস। .. অন্যদের যেখানে গিয়ে পৌঁছতে হয়, আফসার আমেদ সেখানে আজন্ম বর্ধিত হয়ে উঠেছে উদ্ভিদ বা বৃক্ষের আদলে। যে মানুষগুলি তার রচনার চরিত্র, ব্যক্তিগত জীবনাচরণে তাদের অনেকই হয়ত স্বজন প্রতিবেশী। ( ভূমিকা, আফসার আমেদের ছোটগল্প, প্রতিক্ষণ, ১৯৮৯ ) ।একটি মানুষ ক্ষুধায় কতখানি কাতর হলে নিজের স্ত্রীর স্তন পান করতে চায় তা নরুকে দেখলেই বোঝা যায়। তেমনি গ্রামের বিত্তশালী মানুষগুলো নদীতে ভেসে যাওয়া মরা গরুর মাংস ভক্ষণ করতে চাইছে –

    “ – একটা গরু ভেসে আসছে রে।‘

    -‘হ্যাঁ বেশ মোটাসোটা।‘

    -‘চল শালাকে জবাই করি।‘

    -‘দুৎ মরে ফুলে ঢোল হয়ে গেচে রে।‘

    -দেখবি ছুরি চালালে ছটফট করবে খন।‘

    -‘মরা গরুর গোস্ত খাবি জিকরি ?’

    -‘শালা নিজেরাই মরে ভূত !’

    -জিকরিয়া ছাদ থেকে লাফ দিল লাল পানিতে।

    …..             ……    …..    …..    ……

    -‘তোরা মরদরা থাকতে মোরা কচি ছেলে বুকে লিয়ে মরে যাব ?’

    -‘মর না, ভাসিয়ে দেব লাশ লাল পানিতে।“ ( তদেব, পৃ. ১৬ )

ব্যক্তি জীবন সমষ্টি জীবন মিশে গেছে। নরু, ফুলু আর ব্যক্তি নয় তারা বিপন্ন মানুষের প্রতিনিধি হয়ে যাচ্ছে। তেমনি রয়েছে ভিটেমাটি ধ্বংসের জন্য আর্তনাদ। বন্যায় একের পর এক ঘর ভেঙে যাচ্ছে। কাসেম, জিকরিয়া, হিমানি ভিটেমাটি হারিয়ে আজ যেন অন্য গ্রহের জীবে পরিণত হয়েছে। নরুর শরীর আর শরীর নেই – দাঁড়াতে পারে না ঠিক করে। সেই শরীর নিয়েই সে সাঁতার দিয়েছে খাদ্যের জন্য। সামান্য বেঁচে থাকতে ও সামান্য খাদ্যের জন্য মানুষের হাহাকার গল্পের পাতায় পাতায় ফুটে উঠেছে। এ গল্প সম্পর্কে এক সমালোচক লিখেছেন –“কাহিনি হারিয়ে যায় কোলাজে” ( শমীক ঘোষ, কথাসোপান ) – এ মতের সঙ্গে আমি সহমত। এ গল্প যেন একটি দৃশ্যের যাত্রা – যে যাত্রায় রয়েছে নিম্নবিত্ত মুসলিম জনজীবনের ভাঙা-গড়ার কাহিনি। ফুলুর আঙ্গুল ভেঙে গেছে কিন্তু এ সত্য সে প্রকাশ করে নি। অনাহারের দিনে তা তুচ্ছ বলেই মনে হয়েছে তাঁর। ‘এ পৃথিবীর রণরক্ত সফলতা সত্য / তবু শেষ সত্য নয়’- সেই শেষ সত্যেই লেখক পৌঁছতে চান। বন্যা কমে গেছে, নব জীবনের ইঙ্গিত তো এখানেই –

“চোখের মণি খসিয়ে বান মাপে। আবার ছুটে আসে। আবার যায়। আবার ফিরে আসে ফুলুর কাছে। ফুলুর শরীরে যেন তার নাক –মুখ –চোখ ঘষে দিতে চায়। বান কমছে। ‘ও ফুলু তুই ঘুমোচ্চিস ? বান কমে গেল।‘ ফুলুর শরীরের বিশেষ বিশেষ উপত্যকায় নরুর ইচ্ছে করে নাক মুখচোখ ঘষতে। বুকের সুখগুলোকে একটা একটা করে গহনার মতো কুলে রেখেছিল পরে ফেলতে চায় সে। বান কমছে বান কমছে।“ (তদেব, পৃ. ১৮ )

মুসলিম জীবন নিয়ে লেখা একটি অসাধারণ গল্প হল ‘রক্তলজ্জা’। গল্পটি ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে ;প্রতিক্ষণ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আফসার আমেদের অন্যতম সেরা গল্প এটি – সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এ গল্প লিখতে অসাধারণ শক্তির প্রয়োজন। এক মায়াবি ভাষার বাতাবরণে গল্পের কাহিনিকে তিনি তুলে ধরেন। ‘দুঁহু ক্রোড়ে দুঁহু কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া’ –প্রেম সম্পর্কে এই সত্যই যেন ফুটে উঠেছে ফতিমা ও হাসানের অবৈধ প্রেমে। ফতিমার স্বামী শাকিল কোলকাতায় দোকান চালায়। হাসান ফতিমার চাচাতো দেওর। হাসানও বিবাহিত, হাসানের স্ত্রী সেলিমা। ফতিমা যে স্বামীকে ভালোবাসে না তা নয়, স্বামীর প্রতি তাঁর অসীম ভক্তি ও ভালোবাসা, কিন্তু স্বামী থাকে কলকাতায়। যৌবনে প্রবেশ করা ফতিমা এই অবসরেই হাসানের সঙ্গে নিবিড় হয়ে পড়ে। হাসান বিবাহিত হলেও তাঁদের অন্যায় অসামাজিক প্রণয় চলতে থাকে । পাঁচ বছরের বেশি হল তাঁদের এই অসামাজিক প্রেম। হাসান বিবাহ করলেও সেলিমা সম্পূর্ণ অধিকার নিতে পারে নি স্বামীর। অন্যদিকে ফতিমার মনে হয়েছে দাম্পত্যটা যেন তাঁরাই পেয়েছে। সেলিমা হাসানের স্ত্রী – একথা ফতিমাকে তুষের আগুনের মত দহন করেছে আবার হয়ত বা নয় ! সেলিমা শান্ত স্বভাবের মেয়ে –কোনো বাধাই সৃষ্টি করেনি তাঁদের প্রেমে। নিজের যৌন চাহিদা শুধু নয় হাসানের প্রতি ফতিমার রয়েছে অগাধ ভালোবাসা। ফতিমার জীবনে চাহিদার কথা লেখক অনবদ্য ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন –

“গোপনতার জীবনতৃষ্ণার সত্যে কারো কাছে ধরা পড়ে না ফতিমা। জীবনতৃষ্ণার সত্য সকলের কাছে সত্য নয়, তার জীবনে সত্য। জীবনতৃষ্ণার সত্য সকলের জীবনে অহিত, তার জীবনে হিত। জীবনতৃষ্ণার সত্য সকলের জীবনে কখনো কোনো সময়ে তুলোর বীজের মতো উড়ে আসে, তেমনি অনুর মতো হারিয়ে যায় সে সত্য। হারিয়ে ফেলতে চায় সকলে। ফতিমা হারায় না, হারিয়ে ফেলতে চায় না, ক্রমশ প্রাকার হয়ে ওঠে।“(তদেব, পৃ. ১৩৪)

মানসী প্রেম থেকে শরীরের স্পর্শ পেতে চেয়েছে ফতিমা। আবার শুধু শরীর নয় প্রেম মানে সে বোঝে সঙ্গ। কিন্তু হাসান কামুক পুরুষ – শরীরের প্রতিই তাঁর দৃষ্টি। কিন্তু নারী শুধু শরীর চায় না প্রেমের ক্ষেত্রে সে আরও কিছু চায়। তাই শরীর পেতেই সে নানা অভিনয় করেছে। ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ গল্পে শশী বলেছিল ‘শরীর শরীর তোমার মন নাই কুসুম’ – আর এ গল্পে সে বিষয়ই ফুটে উঠেছে ফতিমার কথায় –“ফতিমার সঙ্গে সে প্রেমে জাগতে পারে না। শরীর শরীরই। সে সময় শরীর পায় সেখানেই শুরু সমাপ্তি হয়।“ (তদেব, পৃ. ১৩৯ )

    ফতিমা চিরন্তন প্রেমিক নারী। সে শুধু যৌনতাই বোঝে না বোঝে ভালোবাসা। প্রেমিকের সুখ-দুঃখ জীবন সংগ্রামের কথা। ফতিমা চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ লেখক অপূর্ব ভাবে দেখিয়েছেন। হৃদয়ে দুই পুরুষ হাসান ও শাকিল। কাউকেই ফতিমা বঞ্চিত করেনি। স্বামীর প্রতি যেমন দায়িত্ব কর্তব্য রয়েছে তেমনি হাসানের কাছে সে চিঠির প্রত্যাশী। সামান্য জায়গা নিয়ে বিবাদ ঘটেছে শাকিল ও হাসানের পরিবারের মধ্যে। হাসান ও শাকিলের এই বিবাদ মেনে নিতে পারে না ফতিমা, সে আজ কারও পক্ষেই নিজের সমর্থন জানাতে পারে না। একদিকে স্বামী, অন্যদিকে প্রেমিক পুরুষ – এই দুই দ্বন্দ্বে ক্ষত বিক্ষত হয় ফতিমা। পাঠককে একটু গল্পের স্বাদ দেওয়া যাক –

“হাসান ভাবছে, শাকিলকে মারলে ফতিমা খুশি হবে ? শাকিল ভাবছে, হাসানকে মারলে ফিতমা খুশি হবে ? কাটারিটাকে ভয় করছে ফতিমা। পাশ ফিরে কাটারিটাকে কেউ দেখতে না পায়। কাটারিটা সরাতেও পারছে না ফতিমা। সরাতে গিয়ে ওদের চোখে যদি পড়ে যায় ? ওদের মধ্যে কেউ যদি কাটারি কেড়ে নিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হাতের ওপর ? সে মেয়েমানুষ কাটারিটাকে ধরে রাখতে পারবে কেন ? কার চোখে পড়বে ? কে কাটারিটা কেড়ে নেবে তার হাত থেকে ? হাসনকে যদি কাটারিতে চুপিয়ে মেরে ফেলে, হাহাকারে মরে যাবে ফতিমা। শাকিলেরও মৃত্যু চাচ্ছে না। হাসান একটু আঘাত পেলে বড়ো বুকে বাজবে ফতিমার ।“ ( তদেব, পৃ. ১৪৫ )

 এই বিবাদকে কেন্দ্র করে দুই পরিবারের মধ্যে ব্যবধান বেড়ে গেছে। আগে হাসান ফতিমার সঙ্গে মেলামেশা করলেও পরিবারের কেউ কিছু বলেনি আত্মীয় বলে আজ মেজো ভাবি সখিনা প্রশ্ন তুলেছেন হাসান শত্রুর বাড়ি যাবে কেন ? তাদের অন্যায় অসমাজিক প্রেম ধরা পড়ে যায় সখিনার চোখে। নিজেকে বাঁচাতে হাসান বলে ফিতমার বাড়ি কোরান পাঠ শুনতে গিয়েছিল। তবুও সংশয় জাগে সেলিমার মনে। অবশেষে সংশয় ভাঙতে হাসান কোরান ছুয়েই মিথ্যা কথা বলে। কোরান ছুয়ে নিজের প্রেম সম্পর্কে মিথ্যা বাক্য বলা মেনে নিতে পারে না ফতিমা। দুজনেরই জীবনদৃষ্টি সঠিক। লেখক আশ্চর্য ভাবে এই কৌশল অবলম্বন করেছেন। অবৈধ প্রেম স্বীকার করলে হয়ত ফতিমার ওপর প্রতিশোধের তীর আসতে পারে তাই সে মিথ্যা বলে। অন্যদিকে নিজের প্রেম সম্পর্কে কোরান ছুয়ে মিথ্যা বলা মেনে নিতে পারে না ফতিমা। ফতিমা চিরন্তন মুসলিম নারীর প্রতিনিধি। যে কোরানের বিশ্বাস অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। কোরানের সত্যকে মানতে গিয়ে ফতিমা নিজের জীবন বিসর্জন দিতেও হয়ত রাজি ! আর একেই বলে হয়ত প্রেমের জন্য আত্মবিসর্জন। লেখক অসাধারণ ভাবে এই দৃশ্যটি ফুটিয়ে তুলেছেন –“ফতিমা যন্ত্রণায় ভেঙে পড়ে ! একি করছে হাসান ? আল্লার কসম খেল, আবার কোরান ছোঁবে। হায় আল্লা ! লোকটা আল্লাকে ছেলেখেলা করে, কোরান নিয়ে শয়তানি করে ? এটা অন্যায় করেছে হাসান। হাসান কোরানের পবিত্রতার বিশ্বাসে আঘাত করেছে। ফতিমা যন্ত্রণায় বেঁকেচুরে যায়। “ (তদেব, পৃ. ১৪৯) সে নিজের আত্মগ্লানির মধ্যেই নিজেকে ডুবিয়ে দেয়। ব্যর্থ প্রেমের যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে সে আবার কোরানেই আশ্রয় নেয়। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে অমর মিত্রের একটি গল্পের কথা –‘অলীক ক্রন্দনধ্বনি’। রিনি বুশরার দাদু কৃষ্ণ মিদ্দে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দুটি সন্তান হারান। সন্তান হারানোর যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে ও সুখের প্রত্যাশায় শেষে ইসলাম ধর্ম নেন। কিন্তু স্ত্রী পদ্মাবতী ইসলাম ধর্ম নেন নি, তিনি হিন্দুই থেকে যান। তাই কৃষ্ণ মিদ্দের মৃত্যুতে রিনি বুশরারা ইসলাম মতে ও বড় মাসি হিন্দু শ্রাদ্ধ করে। গল্পকার অসাধারণ ভাষায় সে প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন –“ নানা মরে গেছে তিন বছর আগে, তখন নানি তাঁর শাঁখা ভেঙে সিঁদুর তুলে বিধবা হয়েছে, ইসলাম মতে আমরাও করেছি তার কাজ, কিন্তু নানি এখনও কাঁদে।“ (অলীক ক্রন্দনধ্বনি, হারানো দেশ হারানো মানুষ, সোপান পৃ. ২৭৫ ) একটি মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দুই সমাজের দুই লোকাচার আর ফতিমা নিজের আত্মগ্লানির মধ্যেই নিজেকে শেষ করেছে। তাই জানালা বন্ধ করতে গিয়ে আঙ্গুল চাপা পড়ে রক্ত বেড়িয়ে গেলেও সেদিকে তাঁর নজর নেই – এটিই হয়ত প্রতীকী প্রতিবাদ বা প্রেমিক পুরুষ হারানোর যন্ত্রণায় নিজের জীবন নাশের আকাঙ্ক্ষা।

88

Leave a Reply