Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার: গল্প: মুক্তি

শৌভিক রায়

                             ১

থ্রি বি ডিলাক্স থেকে বেরিয়ে আসে রাসমণি। কালো নার্স টকটক করে তাকায়। তাকা তাকা! কী আর করবি তাকিয়ে! ওই ডেস্কে বসে, স্যালাইন ঠিক করে আর ডাক্তারবাবুর পেছন ঘুরে ঘুরে তোর জীবন যাবে! বড় জোর এখানে থাকবি না। অন্য কোথাও যাবি। তাতে কি! কাজ তো তোর সেই একই থাকবে। জানিস নে, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে!! হতচ্ছাড়ি! বয়স হল, তাও স্বভাব গেল না। তুই তাকালেই কি আমি আসবো না? আমার আসা বন্ধ করতে পারবি? তোদের বড় ডাক্তারই পারে নি, তুই তো কোন ছাড়!

বিড়বিড় করে কালো নার্সের পিন্ডি চটকে, রাসমণি ফোর এ সেমি ডিলাক্সে ঢুকল। এখানে দুটো বেড। বাচ্চা একটা মেয়ে শুয়ে আছে প্রথমটায়। আর একটায় মাঝবয়েসী এক মহিলা।

– অ্যাই… শোন…কী নাম তোর?

– সো…সোমা।

– নতুন এসেছিস?

– না ম্যাডাম…ন..

– ম্যাডাম!! ম্যাডাম তোর মা কে গিয়ে বল হতভাগী। 

খেকিয়ে উঠল রাসমণি।

– বড়মা। আমাকে বড়মা ডাকবি। 

– আ…আচ্ছা বড়মা। 

– কী হয়েছে?

– কিছু হয় নি তো বড়মা। আ…আমার কী হবে! 

– তোর কথা বলেছি নাকি রে বদমাশ? ওই মেয়েটার কী হয়েছে?

– পেট ব্যথা। 

– কেন? বাঁধিয়েছে নাকি?

– না না সেসব নয়। বদহজম। ঠিক হয়ে গেছে তো। আজই ছুটি!

– অ। বেশ। তা তুই বাঁধাস নি?

– কী বাঁধাব বড়মা!

– আহা…নেকু…কী বাঁধাব!! বোঝে নি যেন! পেট রে পেট…বাঁধাসনি? কপালে তো সিঁদুর দেখছি।তা ক’টি?

– ওহহ…না বড়মা। নেই আমার ছেলেপুলে।

– অ। সেজন্যই শরীরের বাঁধুনি ভাল। এই শোন… ঢ্যামনাটা ছোক ছোক করে না তো?

– কার কথা বলছেন?

– এই শয়তানি…বুঝিস না? তোদের বড় ডাক্তারবাবুর কথা বলছি।

– এরাম। ছি ছি। অমন দেবতার মতো মানুষ। এসব কী বলছেন!

– রাখ তোর দেবতা। একদিন আমিও তোর মতো ছিলাম। আজ না হয় বড়মা হয়েছি! সাবধানে থাকবি। যদি দেখি ওদিকে হাত বাড়িয়েছিস তো বিষদাঁত ভেঙে দেব।

সেমি ডিলাক্স থেকে বেরিয়ে এলো রাসমণি। সে বেরোতেই হাসিতে ফেটে পড়ল সোমা আর ওই বেডের মালতী। 

                             ২

রাসমণির কথায় কেউ কিছু মনে করে না। মনে করলেও তাকে মুখ ফুটে বলবার সাহস নেই কারো। এই বিরাট নার্সিং হোমের মালিক, শহরের নামী ডাক্তারের লোক সে। যদিও খাতায় কলমে রাসমণির সঙ্গে ডাক্তারবাবুর কোনও সম্পর্ক নেই, তবে সেটা কী তা বুঝতে খুব কিছু মাথা ঘামাতে হয় না। সফল পুরুষদের ওসব একটু দোষ থাকে। তাই বয়সকালে নিজের রূপসী বউ ছেড়ে এই নার্সিং হোমের আয়া রাসমণিতে মজেছিলেন ডাক্তারবাবু। তারপর যা হয়। কেচ্ছা কাহিনী কিছু। ঝগড়াঝাটি। তবে কপাল ভাল রাসমণির। ডাক্তারবাবুর বউয়ের শরীর খারাপ হল। এক দেড় বছরের মধ্যেই এমন হাল হল যে এই নার্সিং হোমের একটা কেবিন হয়ে গেল তার ঠিকানা। রাসমণি নাকি সেসময় খুব খেটেছিল। কিন্তু বউ আর বাঁচে নি। বউ মারা গেলে, নার্সিং হোমের ওপরেই রাসমণির থাকবার ব্যবস্থা করে দিলেন ডাক্তারবাবু। নিজের ছোট্ট মেয়েটাকে তুলে দিলেন রাসমণির হাতে। ধীরে ধীরে রাসমণি ডাক্তারবাবুর ঘরের লোক হয়ে গেল একদিন। শেষটায় ডাক্তারবাবু‌ রাসমণির এই বাড়িতে রাতও কাটাতে শুরু করলেন। ও বাড়ি বন্ধ হয়ে রইল। মেয়ে বড় হলে, সব বুঝতে শিখলে, নিজে থেকেই এই বাড়ি ছেড়ে চলে গেল ওই বাড়িতে। ডাক্তারবাবুও মেয়ের সঙ্গে ফিরে গেলেন। এখন সে মেয়ের বিয়ে দিয়ে ডাক্তারবাবু ঝাড়া হাত পা। নার্সিং হোমের বেশিটা দেখেন অন্য ডাক্তাররা। উনি মাঝে মাঝেই এদিক ওদিক চলে যান বেড়াতে। তবে নার্সিং হোমের যা কিছুই হয় তা দুবেলা জানাতে হয় ডাক্তারবাবুকে। নইলে সমস্যায় পড়তে হয় সবাইকে, অন্য ডাক্তারদের‌ও। মেয়ে আর এই বাড়িতে আসে না। রাসমণিকে‌ও ডাকে না। তবে তার সেই ছোটবেলার ডাক বড়মা রয়ে গেছে। 

                               ৩

এখন সব্বাই তাকে বড়মা নামেই ডাকে। তার যখন ইচ্ছে ওপর থেকে নেমে এসে যে কোনও জায়গায় ঢুকে যায়। কেউ কিছু বলতে পারে না। একমাত্র ও টি চললে, সেখানেই ঢোকে না রাসমণি। বাকি সি সি ইউ, আই সি ইউ সর্বত্রই তার অবাধ গতি। সবাই জানে যে, তাকে কিছু বলা মানে চাকরি যাওয়া। তবে রাসমণির একটা গুণ রয়েছে যে, সে মুখে যাকে যা-ই বলুক, ডাক্তারবাবুকে কিছু জানায় না। একবার এক ছোকরা ডাক্তারের অভব্যতার কথাও সে জানায় নি কাউকে। কিন্তু সে বিকেলেই সেই ডাক্তারের চাকরি গেল। রাসমণি না জানালে কী হবে, খবর ঠিক পৌঁছে গেছিল বড় ডাক্তারবাবুর কানে। এমনিতে ডাক্তারদের চাকরি গেলে কিছু নয়। দুদিনেই আর একটা হয়ে যাবে। কিন্তু এই নার্সিং হোমের আর তার মালিকের নাম আলাদা। এখানে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে অনেক ভাল জায়গায়  যাওয়া যায়। নার্স, আয়াদের ক্ষেত্রেও কথাটা খাটে। তাই রাসমণির উৎপাত সহ্য করেও সবাই থেকে যেতে চায় এখানে। তবে রাসমণিরও বয়েস হয়েছে। আগের সেই দাপট কমে এসেছে। কিন্তু একদিনও এমন যায় না যে, রাসমণি নার্সিং হোম ঘুরে বেড়ায় না। বড় ডাক্তারবাবু আজকাল প্রায়ই বেড়াতে যান। তিনি নাকি রাসমণিকেও যাওয়ার কথা বলেন প্রতিবার। কিন্তু রাসমণি নিজের ইচ্ছার মালিক। সে কিছুতেই যায় না। বড় ডাক্তারবাবুর মতো সজ্জন মানুষ কীভাবে রাসমণির মতো মহিলার পাল্লায় পড়লেন ভেবে পায় না কেউ। তাও আবার সেই আমলে। পড়লেন তো পড়লেন, এভাবে রাসমণির সব বন্দোবস্ত করে দেবেন, সেটা ভাবতেও অবাক লাগে। কতজনের সঙ্গেই তো কতজনের সম্পর্ক হচ্ছে! তাই বলে এভাবে কে করে দেয়! তবে এটা ঠিক যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব ব্যাপার থিতু হয়ে গেছে। এখন আর কেউ মাথা ঘামায় না। রাসমণিকে মেনে নিয়েই চলছে সবাই। আগে রাসমণির ব্যবহারে লোকে বিরক্ত হত, এখন বরং মজাই পায়। নার্সিং হোমের এই একঘেয়ে গতানুগতিক জীবনে রাসমণি হল একটু অন্য হাওয়া।

                              ৪

রাত আড়াইটার সময় রাসমণির ঘুম ভেঙে গেল আজ। এখন আর ঘুম হয় না সেভাবে। শরীরে এত জ্বালাযন্ত্রণা নিয়ে ঘুম আসবে ভাবেও না সে। কম তো অত্যাচার হয় নি শরীরের ওপর! আজ না হয় সে অর্থ, নিরাপত্তা সব পেয়েছে। কিন্তু সবসময় তো আর এরকম ছিল না! সেই কবে ডুয়ার্সের চা-বাগান ঘেরা এক ছোট্ট গ্রাম প্রথম ছোবলটা দিয়েছিল। ব্যাপারটা বুঝতে না বুঝতেই আড়কাঠিদের হাত ঘুরে এদিক ওদিক ঠোক্কর খেতে খেতে একদিন এই নার্সিং হোমে কাজ পেয়েছিল নিজের এক কাস্টমারের জন্য। তবে ডাক্তারবাবু তাকে চিনেছিলেন তার কাজের সুবাদে। বাকি এত কিছু সে তো স্বপ্নেও  ভাবে নি! তাই বোধহয় এই শেষ বয়েসে মাথাটা একটু বিগড়েছে তার। সে নিজেও বোঝে সেটা। 

                               ৫

টুকটুক করে নিচে নেমে এলো রাসমণি। এই তলাটা এমনিই ফাঁকা পড়ে থাকে। একটা বিরাট লিভিং রুম, একটা টয়লেট আর একটা ড্রয়িং এখানে। এর নিচের তলা থেকে নার্সিং হোম শুরু। সেই তলায় নেমে রাসমণি দেখল নার্সের ডেস্কে মেয়েটা মনোযোগ দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তাকে আর বিরক্ত করল না রাসমণি। একটা কেবিনে উঁকি দিয়ে দেখল পেশেন্টের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণিমাও ঘুমোচ্ছে। পূর্ণিমার নামটা রাসমণির মনে আছে। ওর মাসি লীলাবতী আর সে কিছুদিন একসঙ্গে কাজ করেছিল। লীলাবতীই রাসমণিকে ধরে বছর পাঁচ সাত আগে পূর্ণিমাকে ঢুকিয়ে গেছে এখানে। তার আমলের আয়াদের মধ্যে ওই এক লীলাবতীর সঙ্গেই যা একটু যোগাযোগ ছিল। এখন আর কেউই নেই। বেশির ভাগই কাজ ছেড়ে দিয়েছে। কয়েকজন তো মারাও গেছে। কে কোথায় ছিটকে পড়েছে কে জানে!

                             ৬

এসব ভাবতে ভাবতে পরের তলায় এল রাসমণি। এই তলায় বেশ কয়েকটা কেবিন আই সি ইউ আর সি সি ইউ-তে ভাগ করা। বেশিরভাগ কেবিনেই দুটি করে বেড। তবে কয়েকটায় একটাও আছে। সেগুলিতে চব্বিশ ঘণ্টা নার্স থাকে। তার পরেরগুলি সেমি সি সি ইউ। সেখানে অবশ্য সবসময় লোক থাকে না। সেমি সি সি ইউ নাইন এফে উঁকি দিল রাসমণি। ফাঁকা। এখানে ডিউটিতে আছে অর্চনা আয়া। সন্ধ্যেবেলা দেখে গেছে সে। কিন্তু এখন গেল কোথায়? এগোল রাসমণি। যা ভেবেছিল ঠিক তাই। ওদিকে যে সিড়িটা দিয়ে পেছনের ছাদে ওঠা যায়, সেই সিড়িতেই বসে আছে অর্চনা। পাশে নশু। এই ফ্লোরের সিকিউরিটি। দুটোর যে কিছু চলছে সেটা অনেক আগেই টের পেয়েছে সে। এত মশগুল দুজনে যে, তাকে দেখলও না। অন্যসময় হলে মজা বোঝাত রাসমণি। কিন্তু আজ এখন আর কিচ্ছু বলল না সে। পেছন ফিরে ওই ঘরটায় টুক করে ঢুকে পড়ল।

                              ৭

লোকটা বেডে শুয়ে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক। মনিটর বিপ বিপ শব্দ করছে। স্ক্রিনে চোখ রাখল রাসমণি। দেখল পালস বিট, হার্ট বিট কত। দুদিন আগের ধাক্কাটা অনেকটা সামলে নিয়েছে তবে! এখন রিকভারি করছে। তবে সাময়িক বিপদ কেটে গেলেও অক্সিজেন দরকার। তা না হলে মুশকিল হতে পারে। লোকটাকে এভাবে একা দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারলো না রাসমণি। অক্সিজেন সিলিন্ডারের নবটা ঘোরাতে ঘোরাতে ঘোরাতে লোকটার মুখ থেকে মাস্কট সরিয়ে দিল রাসমণি। হাত রাখল লোকটার গলায়। অচেতন অবস্থা থেকে যেন জেগে উঠল লোকটা। কোনোমতে চোখ খুলে তাকালো রাসমণির দিকে! সে দৃষ্টিতে ত্রাস। কিন্তু রাসমণির চোখে ভাসছে বড় ডাক্তারবাবুর সেই চোখ, যে চোখে কেবল ঘৃণা আর বিরক্তি। সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে দৃশ্যটা।

বড় ডাক্তারবাবুর সামনে সে দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে প্রায় কিছুই নেই। চোখে স্পষ্ট আহ্বান। কিন্তু বড় ডাক্তারবাবু চোখ ফিরিয়ে নিলেন। গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন,

– তুই এঠো। এঠো কোনও কিছু আমি নিই না। জামাকাপড় পরে নে!

                              ৮

তীব্র অপমান রাসমণির সারা শরীর পুড়িয়ে দিয়েছিল সেদিন। মনে হচ্ছিল সেই লোকটা, সেই লোকটাকে হাতের সামনে পেলে খুন করবে এখুনি। সেই লোকটার জন্যই সে আজ এঠো। সেই লোকটার জন্যই সব পেয়েও কিছুই পেল না! একটা দয়ার জীবন, করুণার পাত্রী সে! আর আজ জুটল চরম অপমান। সেই লোকটা বাড়ি থেকে বের করে না আনলে আর যা হোক এভাবে তাড়িয়ে দিত না কেউ! ওই লোকটাই প্রথম এঠো করেছিল তাকে। তারপর এ সে! বড় ডাক্তারবাবুর নজরে পড়তে সে চেষ্টা করেছিল বেহায়ার মতো। নজরে পড়েও ছিল। কিন্তু তার হিসেবে একটা ভুল হয়ে গিয়েছিল। ডাক্তারবাবু তাকে সব দিয়েছেন, শুধু নিজেকে ছাড়া। লোকে ডাক্তারবাবুকে ভুল বুঝেছে, নিজের মেয়ে পর্যন্ত ডাক্তারবাবুকে ক্ষমা করে নি, কিন্তু ওইসব দেওয়া ছাড়া ডাক্তারবাবু কোনোদিন তার দিকে ফিরেও তাকায় নি। তার এই অপমানের জন্য বিছানায় শুয়ে থাকা এই লোকটা দায়ী। লোকটাকে প্রথম দিন দেখেই সে চিনেছিল। খোঁজখবর নিয়েছিল। জেনেছিল যে, এই লোকটা নিজের এলাকায় আগের মতোই বড় মাতব্বর। নিমেষেই বুঝেছিল যে, ওই মাতব্বরির পেছনে লোকটা কত মেয়েকে বেহায়া বানিয়েছে তার ঠিক নেই। 

                             ৯

লোকটার গলা থেকে নিজের হাত সরিয়ে, মাস্কটা মুখে বসিয়ে সিলিন্ডারের নবটা আবার আগের জায়গায় আনল রাসমণি। নিজের বউয়ের অক্সিজেন সিলিন্ডার এভাবেই আগের জায়গায় এনেছিলেন ডাক্তারবাবু। অস্ফুটে বলেছিলেন ‘নাও, মুক্তি দিলাম’। রাসমণি ছিল সেদিন ডাক্তারবাবুর পাশে। আজ সেও ধীর উচ্চরণ করল, ‘মুক্তি দিলাম সবাইকে। নিজেকেও।’

মনিটরের একটানা শব্দে নশুর হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে তাড়াতাড়ি সেমি সি সি ইউ নাইন এফ-এর দিকে দৌড়ে দিল অর্চনা। তার মনে হচ্ছে আওয়াজটা ওই কেবিন থেকেই আসছে…

132

Leave a Reply