বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জনজীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

আটের দশকের শুরুতেই আমরা পেয়েছিলাম তরুণ লেখক আফসার আমেদকে। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র লিখতে এসেছেন নতুন। পড়তে পড়তেই দেখলেন নিজের সমাজের কথা সাহিত্যে কোথায় ? ভিতরের এক অচেতন বোধ থেকেই কলম তুলে নিলেন। ভালোমন্দ যাই হোক না কেন লিখে যেতে হবে সে সমাজের কথা। ‘লিখতে হয় লিখে যেতেই হয়’ বয়নে পাই-

‘’আমার লেখার প্রয়োজন ফুরিয়ে যেত, যদি আমি তৃপ্ত থাকতাম অন্য আর সব সমকালীন লেখার ভিতর। যাঁরা শিল্পের চর্চা করেনম তাঁকে তো সে চর্চা করে যেতেই হয়, ব্যর্থতা বা সফলতার কথা ভেবে তার কলম থামিয়ে বসে থাকলে চলে না। লেখা চালিয়ে যেতেই হয়। লিখে যাওয়াই বুঝি আর এক মুক্তি। পাঠক তাকে মনে রাখবে কি রাখবে না, সে অন্য প্রশ্ন, অন্য ঘটনা। কালে কালে তো অনেক কিছুরই রদবদল হয়, অনেক কিছুর গ্রহণ-বিসর্জনও হয়, সে সব সতর্ক হয়ে বা প্যাঁচ কষে কোনো সাহিত্যিকই লিখতে বসবেন না। নিজে যা বলতে পারি, লিখতে পারি সেটুকুই বুঝি বা তার অর্জন, সে কাজটুকু করে যাওয়া ছাড়া তার উপায়ও নেই, নিস্তারও নেই। আর আমার পক্ষে তো না লিখে থাকা অসম্ভব। লিখতে হয়, লিখে যেতেই হয়। তাছাড়া আর অন্য কোনো প্রাণের কাজের সন্ধান আমার জানা নেই।‘’ ( কেন লিখি, মিত্র ও ঘোষ, পৃ. ২৯৩)

 ক্রমাগত লিখে যাওয়ার ফলেই আমরা আফসারের হাত থেকে বহু উপন্যাস ও গল্প পেয়েছি। এমনকি তা বাংলা কথাভুবনে নতুন। আখ্যানের দিক থেকে, স্টাইলের দিক থেকে। মনে করা যেতে পারে দেবেশ রায়ের ‘উপন্যাসের নতুন ধরনের খোঁজে’ গ্রন্থের কথা, সেখানে তিনি আফসারের কথাভুবনের নতুনত্ব বিচার করেছেন। স্টাইলে দেশজ রীতি ও আখ্যানে মুসলিম জীবন নিয়ে তাঁর কথাভুবন পরিক্রমা সমাপ্ত হয়েছে। “মুসলিম সমাজ নিয়ে কাজ করেছি, যা অনালোচিত ও আনালোকিত,- এই চেষ্টার পথশ্রমটুকু সাক্ষী হয়ে থাক।“ (গাধা পত্রিকা, আফসার আমেদ সংখ্যা, পৃ. ২৩২) লেখক নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন তিনি একটি সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সে সমাজের ভাঙা –গড়া, সমাজ শোষণ, অবক্ষয়, বেঁচে থাকা ও শ্রেণি সংগ্রামের নানা বিষয় তাঁর গল্প উপন্যাসে ছড়িয়ে আছে। আফসার আমেদ জন্মগ্রহণ করেন হাওড়া জেলার কড়িয়া গ্রামে। গ্রামজীবন ও মুসলিম সমাজ সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে গল্পে। সাতের দশকের শেষের দিকে তিনি গল্পে প্রবেশ করেন। তাঁর গল্পে প্রবেশের আগে সমালোচক রুশতি সেনের একটি মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য –“ চরম প্রতিবাদের সুরকে যখন প্রতিবাদহীনতার পরম ছলনায় গেঁথে দেওয়া যায়, তার থেকে যথাযথ আর কীই বা হতে পারে আজকের বাংলা সাহিত্যে ? সাতের দশকের শেষের দিকে সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ আফসার আমেদ যখন প্রথম এসেছিলেন পাঠকের কাছে, সেদিনের দুনিয়ায় প্রতিরোধ –সহিষ্ণুতা, আস্থা –অনাস্থা, বিশ্বাস –অবিশ্বাস, সংস্কার –মুক্তি, প্রেম –অপ্রেম, সত্যি –মিথ্যা  – এইসব ভেদরেখাই আজকের থেকে স্পষ্ট ছিল। নিশ্চিত সেই ভেদরেখার ভিত তেমন পোক্ত ছিল না। অনেক দ্বিধা সন্দেহ গ্লানি মলিনতা তার তলায় চাপা ছিল। তবু তাকে চোখ ঠেরে এগনোর মতো কিছু অবলম্বন আফসারদের লেখালেখির অনুষঙ্গ থেকে একেবারে শূন্য হয়ে যায়নি।“ (সমকালের গল্প- উপন্যাসে প্রত্যাখ্যানের ভাষা, পুস্তক বিপণি, প্রথম প্রকাশ ১৯৯৭, পৃ. ৭৬ ) ‘জিন্নাত বেগমের বিরহমিলন’ ( পরিচয় ১৯৮১ ) গ্রামীণ জীবনের পটভূমিকায় লেখা কতগুলি নারী জীবনের আশাভঙ্গ ও জীবন সংগ্রামের কাহিনি। শ্রমিক শ্রেণির মানুষেরা কর্মের তাগিদে গ্রাম থেকে যায় শহরে। শহরের কর্ম ব্যস্ততায় ভুলে থাকে গ্রামের সন্তান স্ত্রী সহ পরিবারের কথা। গ্রামে থাকা সেই বঞ্চিত নারীদের নিয়েই এ গল্পের বৃত্তটি গড়ে উঠেছে। জিন্নত, রওশন, কুলশন সেই বঞ্চিত নারীদের প্রতিনিধি। তাঁদের জীবনে চাওয়া-পাওয়া, স্নেহ-ভালোবাসা বলে কিছু নেই ; আছে শুধু দারিদ্র ও জীবনে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই সংগ্রামের অধিকার। মানুষকে কতভাবে শোষিত হতে হয়, বঞ্চিত হতে হয়, তবুও মানুষ বাঁচার স্বপ্ন দেখে – যেমন দেখেছে জিন্নত , রওশন ও কুলশনরা। কুলশন সন্তান সম্ভবা, দুইবার কন্যা সন্তানের জন্ম হয়েছে বলে শুনতে হয়েছে শাশুড়ির বিদ্রুপ। সন্তান সম্ভবা হলেও আসেনি স্বামী, এজন্য স্বামীর প্রতি যেমন ব্যঙ্গ রয়েছে তেমনি রয়েছে ক্ষুধার তাড়না। ক্ষুধার যন্ত্রণায় সে আজ সন্তান জন্ম দিতে ব্যর্থ, ফলে এগিয়ে এসেছে প্রতিবেশী আগমনী। এ গল্পের কেন্দ্রীয় আকর্ষণ অবশ্যই জিন্নত। সমালোচকের ভাষায় –“ In any given human society, at any given moment, love as we have seen, is the result of the interaction of the unchanging instinctive and physciogical meterial of sex with the local converntion of morality and religion , the local laws , prejudices of ideals. (Aldos huxly) –  এর এই মন্তব্যের উদাহরণ জিন্নত বেগমের চরিত্রটি।“ (গাধা পত্রিকা, আফসার আমেদ সংখ্যা, পৃ. ৫৯) সে এক ভাগ্যবঞ্চিত নারী। দেহে যৌনতার লক্ষণগুলি স্পষ্ট কিন্তু স্বামী ভিনদেশী। যৌবনের তাড়নাতেই নারী চরিত্র ভ্রষ্ট হয় , জিন্নতও সেই পথে গিয়েছিল কিন্তু কোন পুরুষকে পায় নি। জিন্নতের যৌবনতাড়িত লাবন্যের কিছু দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক-

ক. “জিয়াদ শুকটির হুই দূর –অবদি আলুখেত। দূরে ভটভটি চালিয়ে পানি দিচ্ছে খেতে। নালা ধরে পানি গড়িয়ে যায়। কাপড় তুলে খালি ছাকনি দিলে কে দেখবে ? দেখবে ? দেখলে, ফরশা জাং দেখবে ,আর কী দেখবে ? জিন্নতের শরীর। পানির ভেতর ভুবে। হুই গাংতাড়া মাছ ভাসছে না ? লঙ্কা পেঁয়াজ দিয়ে খাব। মাথার উপর চিল উড়ছে। তারুই –তারুই, মাছরাঙা, তোরও জিভে নুন এল, পানির ওপরে ঝটপটি করিস। (আফসার আমেদের সেরা ৫০টি গল্প, দে’জ, পৃ. ৩২ )

খ. “মরদ গায়ে হাত দিলা , হেসে ফেললো কেঁদে ফেল্‌লা। আর দেখুম নাই। শরীল জিন্দা রইছে। কপাল কাটল রক্ত ঝইরল গো। সোহাগ করিতে দেখলে সোহাগ খায়তে মন যায়রে। জান হু হু কইরবে। পায়ে হাতের দড়ি যেন ছিঁড়ছিঁড়ি কইরব। কেঁদে ফেলব। কান্না যেন সব কষ্টে সাঙাত –সই।“ (তদেব, পৃ. ৩৭)

গ. “কে মোরে লিয়ে যাস ? মোরে লদীতে ভেসসে দে তো । ঝোপের পানে লিয়ে যাস নি। বাঘের চোখ। বাঘের থাবা পারা ধইরেচিস কে মোর হাত শরীল। গায়ে হাত দিবে লিয়ে যাস নি। বাঘের চোখ। বাঘের থাবা পারা ধইরেচিস কে মোর শরীল। গায়ে কাঁটা ফুটতেছে।“ (তদেব, পৃ. ৪২)

ভালোবাসার অপর নাম বোধহয় অপেক্ষা করা ! যে অপেক্ষা করতে জানে না সে হয়ত ভালোবাসার সারমর্ম উপলব্ধি করতে পারে না। জিন্নত, কুলশন, আসমানি প্রত্যেকেই অপেক্ষা করেছে। রওশনিরা অপেক্ষা করতে জানে, কিন্তু ধৈর্যের বাধ ভেঙে গেলে প্রিয়জনের প্রতি অভিশাপ হানে। রওশানির সন্তানরা আজ তিনদিন অভুক্ত। কোলের সন্তান স্তনবৃন্তে আঘাত আনলে সে অভিশাপ দেয় –“এক্কেবারে সদ্য গোরে দিয়া দিমু।“ সন্তানের প্রতি মাতার এই আভিমানী বাক্য পরিস্তিতির সৃষ্টি – সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তেমনি জিন্নত রাতের অন্ধকারে অপেক্ষা করে আছে স্বামীর জন্য – জিন্নতের এই অবস্থা বোধহয় গীতিকার পালার কথাই স্মরণ করায়।

                নারী জীবন নিয়ে লেখা একটি অসামান্য গল্প হল ‘দুইনারী’। ‘দুইনারী’ নামে রামকুমার মুখোপাধ্যায় ও অমর মিত্রের গল্প আছে। তবে সে গল্পগুলি থেকে আফসার আমেদের গল্পটি স্বতন্ত্র। অমর মিত্রের ‘দুইনারী’ গল্পে দেখা যায় সধবা আর বিধবা দুইনারী – অন্নদারানি ও সুন্দরীদাসী। দুজনেই দারিদ্র্যক্লিষ্ট, জীবনে ব্যর্থ। দুজনেই বেরিয়েছে সুখের সন্ধানে। অন্নদা ভাবে সুন্দরী বেশি সুখী আর সুন্দরী ভাবে অন্নদা বেশি সুখী – দুজনেই অভিনয় করে ছলনাকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকে। গল্পের পরিণতি আশ্চর্য জাদুবাস্তবের মাধ্যমে মিলিয়ে দিয়েছেন লেখক। নদী থেকে স্নান করে উঠে পাল্টে যায় দুজনের কাপড়। সধবা-বিধবার কোন প্রার্থক্য রাখেননি লেখক। আফসার আমেদের ‘দুইনারী’ গল্পটি প্রকাশিত হব ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে শারদীয় ‘কালান্তর’ পত্রিকায়। তবে এ গল্পের স্বরূপ ভিন্ন। মৌলনার স্ত্রী নাসিরা ও মোলনার চাচিকে নিয়ে এ গল্প গড়ে উঠেছে। দুজনের বয়সের প্রার্থক্য রয়েছে, তবুও তাঁরা মিলেছে- ভালোবেসেছে। তবে লেখকের লক্ষ্য ছিল ভিন্ন – মুসলিম পরিবারের একটি নারী কীভাবে ধর্মীয় আবরণে শোষিত হতে হতে প্রথা ভেঙে বেড়িয়ে এল তা দেখানো। কিন্তু ইসলাম ধর্মে প্রবল জ্ঞান বলেই সবাই তাঁকে ডাকে মৌলনা বলে। মৌলানা নামের চাপে প্রকৃত নামটি হারিয়ে গেছে –

“কোরান হাদিস আত্যধিক চর্চা করার ফলে, লোকে তার জ্ঞান ও ইসলামি আদব কায়দা অত্যধিক পালন করতে দেখে, মৌলনা বলেই ডাকে, সম্মান দিয়ে থাকে। এই এলাকার মধ্যে যধেষ্ট সম্মানিত তার স্বামী। মৌলানা নামের চাপে, নিজের নামটা চাপা পড়ে গেছে। নাসিরাও ভুলে থাকে তার স্বামীর নাম।“ (তদেব, পৃ. ১৭৪ )

মৌলনার স্ত্রী বলেই তাঁকে বাড়তি রীতি নীতি পালন করতে হয়। তেমনি রয়েছে মুসলিম ধর্মের মিথ্যা প্রথার প্রতি অবিশ্বাস। মৌলানার বউ বলে টিভি দেখা নিষেধ, বাজারে বোরখা পড়ে যেতে হয়। কিন্তু এই ঘুনধরা সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছে সে। সেই সঙ্গে আছে নারী জীবনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত। নাসিরা বাজারে গেলে বোরখা দেখেই চিনে যায় মৌলনা। মৌলনা চেনে বোরখাটাই, স্ত্রীর রূপ সে দেখে নি। তাই বোরখা ছাড়া বাজারে গেলে মৌলনা দেখলেও বুঝতে পারে না – আর এখানেই জয়ী হয় নাসিরা। আর সে লক্ষে পৌঁছতে সাহায্য করেছে চাচি। নাসিরার ঘর থেকে বাহিরে উত্তরণে সেই সাহায্য করেছে। সামান্য তরমুজের জন্য জীবনের সমস্ত ঝুঁকি নিতে সে রাজি হয়েছে। লেখক নাসিরা ও চাচির সম্পর্ক অসাধারণ ভাষায় বর্ণনা করেছেন –‘দালান চাচি হাঁ করে বসে থাকে। নাসিরার দিকে তাকিয়ে থাকে। নাসিরা ও চাচি দুই মেয়েতে ভালো পটে। বেশ বোঝাপড়া। দুজনের মধ্যেই এমনই ভাবসাব যে একে অপরের সান্ত্বনা সহায়তা নিয়ে একে অপরের বাঁচে। দুজনের মধ্যেই ববসের তফাত যথেষ্ট হলেও দুজনেই এক্ষেত্রে নারী।“ (তদেব, পৃ. ১৮১) মৌলানার বউ নয় সে স্বাধীন ভাবে বাঁচতে চেয়েছে। এজন্যই তাঁর মনে হয়েছে রিকসাওয়ালার বউ বেশি সুখী। নাসিরার এই স্বাধীন জীবনে উত্তরণেই লেখক গল্পের উপসংহার টেনেছেন।

                ‘আমি তো মুসলিম সমাজ নিয়ে লিখি।“(গাধা পত্রিকা, পৃ. ২৩৮) এমনকি নিজেই বলেছেন মেয়েদের অসহায়াতার দিক গুলি তাঁকে বেশি নাড়া দেয়। তাই নারীর বিপন্নতাই  তাঁর গল্প উপন্যাসে বেশি করে আসে। আসলে মুসলিম সমাজে সবচেয়ে বেশি ক্ষত-বিক্ষত হতে হয় নারীকে। ধর্মীয় শাসন ও সামাজিক শাসনে নারীর জীবনের ভাঙা-গড়ার ইতিবৃত্ত আমরা দেখেছিলাম আফসার আমেদের  ‘অন্তঃপুর’ উপন্যাসে। তেমনই একটি গল্প হল ‘সমুদ্র নিলয়’। এখানেও নারী জীবনের সাতকাহনই প্রধান। আলেয়া, লালমন, মাসুরা ও নাদিয়াকে কেন্দ্র করেই গল্পপাঠ সম্পূর্ণ হয়েছে। গহর আলির প্রথম পক্ষ লালমন। লালমনের সন্তান সংখ্যা চোদ্দটি। গহর আলি পঞ্চাশ বছর বয়সে বিবাহ করে আলেয়াকে। মাসুয়া লালমনের বড় মেয়ে আর নাদিয়া হল লালমনের পুত্রবধূ। সমস্ত সংসারের মালিক লালমন, সেই সংসারে প্রথমে সে আলেয়াকে ভাগ দিতে রাজি ছিল না, এমনকি অত্যাচারও করেছিল। কিন্তু যখন দেখে সমস্ত সংসার চালাতে সে ব্যর্থ, প্রয়োজনে তখন আলেয়াকে মেনে নেয়। আলেয়াই এ গল্পের ঘটনা নিয়ন্ত্রক। সংসারে সে ‘ছোটমা’ নামে পরিচিত। মাসুয়ার সঙ্গে নিবিড় ভালোবাসা আলেয়ার। গহর আলির সঙ্গে বয়সের প্রার্থক্য থাকলেও মন বাধতে আলেয়া সক্ষম। আলেয়ার প্রতি ভালোবাসা ছিল গাজির। আলেয়া গাজিকেই হৃদয় দান করতে চেয়েছিল। কিন্তু গাজি শহরে চলে গেছে তাই পরিবারের কথা মত গহরকেই বিবাহ করে। তবে এ বিবাহে আলেয়া সুখী, এমনকি মনে হয়েছে গাজির ওপর প্রকৃত প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে এ বিবাহ করে। নাদিয়া গহর আলির বড় পুত্রবধূ। কিন্তু নাদিয়ার ওপর প্রচন্ড অত্যাচার করে লালমন। ফলে নাদিয়া পৃথক সংসার গড়তে বাধ্য হয়েছে। এই নাদিয়ার প্রতি ভালোবাসা ছিল আলেয়ার। তেমনি মাসুয়া আজ যৌবনে পা দিয়েছে। এই মাসুয়াকেই প্রেমে উন্মত্ত করেছে আলেয়ার প্রাক্তন প্রেমিক গাজি। গাজির এই চরিত্র মেনে নিতে পারে না আলেয়া-

“বসে বসে দাগ আনুভব করে আলেয়া। একটি মুহূর্তে সব কিছু তছনছ করে দিয়েছে গাজি। গাজি মাসুয়ার সঙ্গে কেন প্রেম করবে ? এটা ঘটতে দেয়া যেতে পারে না। অন্য কেউ নয়, সে তো গাজি। গাজি তার পূর্ব – প্রেমিক। এখনো কি দেখার টান ছিল না উভয়ের মধ্যে ? যেটুকু অবশেষ ছিল, সেটুকুকেই গোপনে টিকেয়ে রাখতে চেয়েছে। সেখানে ঢুকে পড়েছে মাসুয়া। মাসুয়াকে ভুলিয়ে ফেলেছে গাজি। এই অসহায় বিপন্নতা এসে আলেয়াকে আলোড়িত করে। গাজি অন্যায় করেছে। তার প্রতি অন্যায় করেছে। তারই ঘরের মেয়ে মাসুয়া। মেয়ে সম্পর্ক।“ (তদেব, পৃ. ১০৭)

নারীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নীড়, আর সেই নীড়ের সৌন্দর্য সাধনে সর্বস্ব ত্যাগ করতে হয় নারীকে। যৌবনে পা দেওয়া একটি মেয়ে সংসারে শুধু দায়িত্ব – এই কর্তব্যপরায়নাতার মধ্য দিয়েই লেখক গড়ে তুলেছেন আলেয়াকে। আসলে লেখকের লক্ষ ছিল মুসলিম সমাজ মানস ফুটিয়ে তোলা। তিনি বারবারই একটি সমাজের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে নিজেকে মনে করেন। সেই সমাজের অকথিত ভাষ্যের কথাকার তিনি। সত্যি তো স্বাধীনতার পর বা আগে এপার বাংলার কথাসাহিত্যে মুসলিম সমাজের কথা তেমনভাবে উঠে আসে নি। প্রশ্ন জাগে স্বাধীনতার পর মুসলিমরা এবঙ্গে সংখ্যালঘু জাতিতে পরিণত হয় বলেই কি সাহিত্যেও বঞ্চিত ! আর মুসলিম চরিত্র বা জীবন উঠে এলেও সম্প্রদায়ের কথা উঠে আসেনি – ব্যতিক্রম মুসলিম কথাকাররা। একটি চরিত্রকে রক্তমাংসসহ ফুটিয়ে তোলার জন্য প্রয়োজন চরিত্র অনুযায়ী ও সমাজ অনুযায়ী জীবন্ত ভাষা। সেই সমাজের, গৃহস্থের অন্তঃপুরের ভাষার সঙ্গে নিবিড় পরিচয় ছিল আফসার আমেদের – ফলে চরিত্রগুলি জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

54