Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : গল্প : চোর ও বিধবা

সাধন দাস

উজান গাঁয়ে সবাই চোর। গাঁ শুদ্ধ লোক অষ্টক্ষণ কাছা এঁটেই থাকে। কখন ছুটতে হয়। চোরচন্দ্র মুখে কালি, গায়ে পাঁক মেখে চুরি করতে বেরিয়েছিলো। বেগোড় বাঁই তাড়া খেয়ে ছুটছে। চোরের আবার পথঘাট! ছুটতে ছুটতে হুমড়ি খেয়ে পড়লো গিয়ে শনি শিগনাপুর গাঁয়ে। এ গাঁয়ে চোর নেই, চুরির বালাই নেই। কারচুপিও নেই। খুল্লম খুল্লা। সহায় সম্পত্তি আছে, পুলিশ নেই। কেউ কাউকে চোর ভাবেও না।  

খবর পেয়ে  চোরচন্দ্র সোজা দাঁড়িয়ে গেলো। এ গাঁয়ে সে আর চোর নয়। মোথলা মালকড়ি বাগিয়ে এনেছে। চোরাই মালও সাদা হয়ে গেলো। সব অচেনা। এক আধজন সহায় পেলেই কেল্লা ফতে। মান অপমানের খোল নলচে পালটে বাহ্যে বসার ভনিতায় জঙ্গলে বসে ছিলো। পথ দিয়ে মানুষেরা আসছে, যাচ্ছে। বেছে বেছে পছন্দসই এক বিধবা সুন্দরীর পিছন ধরলো চোর। তাঁর হিসেব মতো এয়ো, আয়বুড়োদের তল্লাশ আছে। বিধবার হিল্লে নেই। যেতে যেতে দেখলো, ঘরে ঘরে দুয়োর আছে, কপাট নেই। থান আঁচলের ছায়ায় ছায়ায় ঘরে ঢুকে পড়লো। কপাটের আড়ালও নেই। ধরাও পড়ে গেলো। দিলদরিয়া লোক ঘর দুয়োরে যায় আসে। এ গাঁয়ে মানুষে ভয় নেই। সন্দেহ নেই। তবে চমকানো আছে। মুখে কালি, গায়ে কাদা। বিধবা এমন মানুষ দেখেনি। কেঁপে উঠে জিজ্ঞেস করলো- তুমি কে গা? চিনলাম না তো!

ভূতের গলায় চোর খিকখিকিয়ে হেসে উঠলো, ফিসফিসে গলায় বললো- চিনতে পারছো না? চুপ চুপ! আমি তোমার…… ইয়ে… হলো গিয়ে চোর। চুরি করি।

চোরের চোখ বনবন করে ঘরময় ঘুরছে। মালপত্তরের কোনো আগল নেই। এখেনে সেখেনে ছড়াছড়ি।  বিছানায় এক গোছ টাকা পড়ে, কুলুঙ্গিতে সোনার গহনা।  

গাঁয়ে ‘চোর’ শব্দ কেউ শোনেনি। ‘চুরি’ বোঝে না। বিধবা অবাক চোখে জিজ্ঞেস করে- চোর আবার কি? ভূত নাকি? 

– ধরো তুমি ঘুমোচ্ছো। হ্যাঁ, চোখ বন্ধ করো। বিধবা চোখ বন্ধ করে। চোর সুড়ুৎ করে কুলুঙ্গি থেকে হারখানা টেনে নেয়। 

– তোমার হার কৈ? 

– আছে কোথাও।  

চোর পকেট থেকে বের করে দেখায়-এই দ্যাখো। 

বিধবা বলে- হার নিলে কেনো? গা ঘামালেই পেয়ে যেতে। 

– না খেটেই পেয়ে গেলাম। একে বলে চুরি। 

বিধবা এবার চোরের মতো খিকখিকিয়ে হেসে উঠলো। – বেশ মজা তো। আমিও চুরি করবো। 

– তুমি আমাকে চুরি করতে পারো। 

– কেমন করে? 

– হার যেমন পকেটে লুকিয়ে রেখেছিলাম, তুমি আমাকে লুকিয়ে রাখতে পারো। 

– আমাদের গাঁয়ে গোপন  কিছু নেই। 

– একটা সহায় মানুষের গোপন ইচ্ছা তোমার নেই? 

বিধবার মুখ নিচু। উত্তর নেই। 

(বাংলাদেশে উজানগাঁ চোরের গ্রাম হিসেবে পরিচিত। ১৯৯৬ নির্বাচনে গ্রামের মানুষেরা ভোটপত্রের পরিচয়ে পেশা চুরি রেকর্ড করান। দিরাই-শাল্লা উপজেলার সুনামগঞ্জ এলাকায় এ রকম ছ’টি রেকর্ডেড চোর গ্রাম আছে। এখন সম্ভবত পরিচয় পত্রের সংশোধন হয়েছে।

এদেশে মহারাষ্ট্রের আহমেদনগর থেকে ৩৫ কিমি দূরে শনি শিগনাপুর নামে একটি গ্রাম আছে। সে গাঁয়ে চোর নেই। তিনশো বছর ধরে হাট খোলা পড়ে থাকে ঘর বাড়ি। দরজা জানলা থাকলেও কপাট নেই। চুরিও নেই।)

59

Leave a Reply