Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : মেগা প্রবন্ধ : পর্ব ২৯

বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জনজীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

অর্থের জন্য মানবিক মূল্যবোধের অধঃপতন, স্বার্থের জন্য নৈতিক দায়-দায়িত্ব অস্বীকার তেমনই একটি গল্প অমর মিত্রের ‘মা হালিমার সন্তান’। আসলে অমর মিত্র চাকরি সূত্রে গ্রামজীবন খুব কাছের থেকে দেখেছিলেন। তাই গ্রাম জীবনের মুসলিম পরিবারের ভাঙা-গড়ার চিত্র তাঁর নখদর্পণে –

“১৯৭৪ এ এ্রপ্রিলে ট্রেনিং শেষে পোস্টিং নিয়ে যাই ডেবরা থানার করন্ডা নামের একটি গ্রামে। বাস থেকে নেমে কংসাবতী নদী পাড় হয়ে দেড় ঘন্টার উপর হাঁটতে হত। একা একাই হেঁটেছি নির্জন পথে। আমার অফিসটিও ছিল লোকালয়ের প্রায় বাইরে। তার তিনদিকে ধান জমি, বৈশাখে তা রুক্ষ, নেড়া। কিন্তু তার কোথাও কোথাও ছিল ঘন সবুজ মখমলের চিহ্ন। সেখানে শ্যালো টিউবওয়েলে পাতালের জল তুলে উচ্চফলনশীল ধান চাষ। আমি বিস্ময়ে অভিভুত হয়ে গেছি।

বিস্ময়ের অন্ত ছিল না। প্রতিটি দিন প্রতিটি মুহূর্তে নতুন নতুন উপলব্ধির জন্ম হতো যেন আমার ভিতরে। এইভাবে মানুষ বাঁচে ? গ্রাম তাহলে এই রকম !” (‘অলীক এই জীবন’, অমর মিত্রের শ্রেষ্ঠ গল্প, করুণা, পৃ. ১১ )

 এই গ্রামীণ জীবনই লেখককে চিনিয়েছে মানুষের বেঁচে থাকা, লড়াই সংগ্রামের ইতিবৃত্ত। আবার কখনও বলেছেন গ্রাম না চিনলে শহর চিনতে পারতাম না। কিন্তু শহরে এসেও গ্রামের কথা ভোলেন নি, আসলে গল্প রচনা অমরবাবুর কাছে এক বিস্ময়, যে বিস্ময়বোধের কারণেই তিনি গল্পের কাহিনি বুনে চলেন। ‘মা হালিমার সন্তান’ গল্পে রফিকুল আজ পিতৃপরিচয় সন্ধানে অগ্রসর, সে জানে শোভন আলিই তাঁর প্রকৃত বাবা কিন্তু শোভন আলি তা অস্বীকার করে দেয়- নৈতিক মূল্যবোধও নেই শোভন আলির –“তার পরিচয় তো হালিমা বিবির পরিচয়। তার তো এখনও পর্যন্ত পিতৃপরিচয় হয়নি। তার যেন কোন পিতৃপুরুষ নেই, ছিল না। মানুষের পরিচয় যেভাবে হয়, তার বোধ হয় সেভাবে হবে না।“ (‘মা হালিমার সন্তান’, অমর মিত্রের সেরা ৫০টি গল্প, দে’জ, পৃ. ৩২৯)

            জব্বার বৈদ্যর হাটানো ছেলে রফিকুল, ইসলামি নিয়মে বৈদ্যর সম্পত্তিতে রফিকুলের অধিকার নেই, মা হালিমাও আজ নেই, তাই জব্বার বৈদ্যর ওপর কোন অধিকার সে দেখাতে পারে না। সমস্ত পরিচয় হারিয়ে রফিকুল আজ অসহায়। গল্পের কাহিনি কত নির্মম হতে পারে, স্বার্থের কারণে মানুষ কত পাল্টে যেতে পারে, স্বার্থের কাছে প্রেম, ভালোবাসা, স্নেহ, সন্তান সমস্তই অস্বীকার করে মানুষ – এ সমস্ত সমাজ বাস্তব কত গভীর জীবনদ্রষ্টা হলে জানা সম্ভব তা একমাত্র আধুনিক ছোটোগল্পে অমর মিত্রই জানেন। স্বার্থের কাছে আজ মাতৃসত্তা ধ্বংস হতে চলেছে হালিমার – তা কখনই মেনে নেয় না রফিকুল। তাই সে সমস্ত কিছু সম্পত্তি বিসর্জন দেয় শুধুমাত্র মাতার সম্মানের কথা মনে রেখে। যে মাতা তাঁকে দুই বছর বয়সে ভাসিয়ে না দিয়ে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল জব্বার বৈদ্যর কাছে ঘর করতে। গল্পের শেষে নির্মম বাস্তব সত্য লেখককে উচ্চারণ করতে হয়েছে মেয়ে মানুষদের কোন মান-ইজ্জত নেই। কিন্তু লেখকই তো পারেন চরিত্রকে শীর্ষে পৌঁছে দিতে, তাই সমস্ত অপমান যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে হয়ত হালিমার মৃত্যু ঘটেছে। আর সমস্ত আকাঙ্ক্ষাকে বিসর্জন দিয়ে রফিকুল বেঁচে থাকতে চেয়েছে শুধু হালিমার সন্তান হিসাবে –

“সে তো হালিমার ছেলে বটে, তার পেটের ছেলে। এই তো হল সত্য। মেয়ে মানুষ তাই হালিমা বিবি মরার পরেও কলঙ্ক মাখে, পোড়া ইটের ছাই মাখার তাকে শোভন আলি, কিংবা জব্বার বৈদ্য।“ (তদেব, পৃ. ৩৩০)

‘কাঁকুরে মাটি’ গল্পে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ, তথাকথিত সমাজ ব্যবস্থায় ধর্মের নামে নষ্টামি, ধর্মকে ভিত্তি করে মানুষের স্বার্থসিদ্ধি এসবই প্রাধান্য পেয়েছে। অজেত আলি যে ছিল নায়েব, হজ করে এসে সে হয়ে উঠেছে ছদ্মবেশী ধার্মিক। নায়েব অজেত আলি আকর্ষণ অনুভব করেছিল মোশরফের সুন্দরী যুবতী আঞ্জুমানের প্রতি। আঞ্জুমানকে সে জমি, বাড়ির লোভও দেখিয়েছিল কিন্তু সে ফাঁদে আঞ্জুমান পা দেয়নি। শুধু তাই নয় –“অজেত আলি তার বিবির দিকে খারাপ চোখে তাকিয়েছিল। আচমকা তার অসাক্ষাতে বিবির হাত ধরতে গিয়েছিল। আঞ্জুমান খুব কেঁদেছিল, রাগে ফোঁস ফোঁস করেছিল।“ (‘কাঁকুরে মাটি’, তদেব, পৃ. ২৭০) আঞ্জুমানকে বশে আনতে পেরে আসরফ ও মোশরফের দুই বিঘা জমি নায়েব অজেত আলি মিথ্যা রেকর্ড করে দিয়েছিল কেরামত আলির নামে। আজ হজ থেকে ফিরছে অজেত আলি , তাই জমির বিষয়ে আশরফ ও মোশরফ পরামর্শ নিতে চাইলে সে উদাসীন দেখায়। মুখে ধর্মের ন্যায়-নীতি আদর্শের কথা বলে, বাস্তব জীবন সম্পর্কে কোনো বোধ নেই এই কথা প্রচার করে। জমির অর্থ-মূল্য সম্পর্কে প্রার্থক্য দেখা যায় অজেত আলি ও মোশরফের মধ্যে। অজেত আলির কাছে জমি শুধু কাফনের জন্য – ইহ জগতের কোনো মূল্য নেই তাঁর কাছে, কিন্তু মোশরফের মত সাধারণ মানুষের কাছে জমি বেঁচে থাকার অবলম্বন-

“তুমি খতেন, দলিলডা দ্যাখপা একটু, আলফাক কথা রাখ, পেটে ভাত থাকলি ওসব বলা সাজে, আমরা পাপী মানুষ, জমি বলতে বুঝি ধান।“ (তদেব, পৃ. ২৭৩)

শুধু তাই নয় লেখকের ব্যঙ্গ আরও ভয়ঙ্কর ভাবে প্রকাশ পেয়েছে –

“পচাঁত্তর হাজার টাকা খরচ ঘরে এল শুধু এ বাড়িতে এসে কিসসা জোড়ার জন্য, আমারে ভয় দেখাবার জন্য –মানুষ কী না পারে। তীর্থ করে এসে ভয় দেখায়, ভয় দেখানোর জন্য এত ট্যাকা খরচ। হা – আল্লাহা।“ (তদেব, পৃ. ২৭৩)

মানুষের জৈবিক প্রবৃ্ত্তিগুলি কি তীর্থস্থান বা মক্কা মদিনায় মারা যায় ? তা কখনও মরে যেতে পারে না, মরে যাওয়া সম্ভবও নয়। মুখে যতই ধর্মের কথা বলুক না কেন ভিতরে অবদমিত যৌনতা মানুষকে বারবার লালসা জাগায় – এটাই জীবন সত্য। আর সেই জীবন সত্যকেই সাহিত্যিক কলমের রেখায় ফুটিয়ে তোলেন লেখনীতে। এই জীবন সত্য খোঁজার এক নিরন্তর পথের পথিক গল্পকার ফুটিয়ে তোলেন –সচেতন পাঠক মাত্রই তাঁর গল্পপাঠে সে জীবন সত্যের আভাস পাবেন।

মুসলিম অন্তঃপুর নিয়ে লেখা অন্যতম গল্প ‘আশালতা’ গল্প সংকলনের ‘কুলছুমের হাত’। গল্পের গঠনশৈলীটিও পাঠককে সচকিত করে। মুসলিম সমাজে তালাক প্রথা যে কি ভয়ঙ্কর তা এখানে বর্ণিত হয়েছে। দারিদ্র্যতা যাদের নিত্যসঙ্গী সেখানে নারীর রূপ অবহেলিত হয়। নিম্নবিত্ত পরিবার এন্তাজ আলি ও মরিয়ামের। যেখানে মরিয়ম ও কন্যা কুলছুমের রূপে মুগ্ধ হয় লতিফ বিশ্বাস, তাঁদের সে ভোগ করতে চায়, এই জন্য সে নানা ফন্দি করে। ঘরে পরিপূর্ণ বিবাহযোগ্য কন্যা কুলছুমের বিবাহের জন্য পিতা-মাতা চিন্তিত। হাট থেকে ফেরার সময় পাত্র দেখার কথা ভুলে যায় এন্তাজ আলি দুবার তালাক বলেছিল, ফলে মরিয়মের সঙ্গে একটু ঝগড়া হয়, বিতর্কের সময় এন্তাজ আলি দুবার তালাক বলেছিল সেটিকেই নিয়ে লতিফ বিশ্বাস শুরু করে কোন্দল – গল্পের কাহিনি এটুকুই। আসলে দারিদ্র্যতা যেখানে নিত্যসঙ্গী সেখানে কোন্দল স্বাভাবিক – আর সেই সুযোগকেই কাজে লাগাতে চেয়েছিল লতিফ বিশ্বাস। গল্পকার অসাধারণ বর্ণনা ভঙ্গির দ্বারা তা তুলে ধরেছেন। নাট্যধর্মিতা, উপমা ও চিত্রময়তার সাহায্য গল্পের যে রস তিনি তুলে ধরেন তা অমরবাবুর নিজস্বভঙ্গি। সামান্য উদ্ধৃতি দিলেই বোঝা যাবে –

“উঠোনের ওই গাছটা তার নিজের হাতে পোঁতা। কুলছুমের যে বয়স তার চেয়ে বছর দুই বড়ই হবে ও গাছ। মেয়ে বোধ হয় সঙ্গে যেতে পারে হাটানো মেয়ে হয়ে, কোলেরটাও যেতে পারে হাটানো ছেলে হয়ে, কিন্তু গাছটা ? গাছের নিচের মানুষটা ? তিনবার যদি সত্যি বলে হাকে তাহলে তো আর থাকা যাবে না এ ভিটাতে।“ (‘কুলছুমের হাত’, ‘আশালতা’, একটি গুরুচণ্ডালী ৯ প্রকাশনা, পৃ. ৩৭)

কিন্তু লতিফ বিশ্বাসের আশা পূর্ণ হয়নি, সমস্ত আশায় জল ঢেলে দিয়েছে লতিফের স্ত্রী। শুধুমাত্র একটি সাক্ষীতেই এন্তাজ ফিরে পেয়েছে মরিয়ামকে, তবুও মানসিক বিচ্ছেদ ঘটে গেছে এন্তাজ ও মরিয়ামের মধ্যে, মরিয়াম আজ এন্তাজকে সম্বোধন করেছে ‘আপনি’ বলে। মরিয়াম ভাবে এন্তাজ আজ আর কেউ না, কিন্তু এন্তাজ তো ফিরে পেয়েছে স্ত্রীকে, তবুও রয়েছে মানসিক যন্ত্রণা –“দুজনের ভিতর শূন্য পৃথিবী চৈত্রের হাওয়া, দ্বাদশীর জ্যোৎস্না হু হু বহে যাচ্ছে, তবুও অন্ধকার।“ ( তদেব,পৃ.৪১) আধুনিক ছোটোগল্পের অন্যতম শক্তিশালী লেখক অমর মিত্র। আখ্যান নির্মাণে তাঁর শক্তি অনন্ত। কাহিনি নিয়ে তিনি কখনোই লিখতে বসেন নি, আর কাহিনি নিয়ে লিখতে বসলেও সে গল্প সার্থক হয় নি একথা তিনি অপকটে স্বীকার করেছেন। তাই মানুষের সন্ধানে হেঁটে চলেছেন গ্রামের পর গ্রাম। চাকরি জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা এ ব্যাপারে লেখককে সাহায্য করেছে –“প্রফুল্ল দা বলেন, ল্যান্ড অ্যান্ড পিপ্‌ল না জানলে লিখতে পারবে না।“ অমর মিত্র ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন ভূমি রাজস্ব বিভাগের অফিসার। প্রথম দুই দশক শুধু বদলি হয়েছেন এক শহর থেকে অন্য শহরে। ফলে জমি ও মানুষের সম্পর্কে নানা কাহিনি তিনি কাছে থেকে দেখেছিলেন। ফলে প্রথম তিন দশকের বহু গল্পে জমির প্রসঙ্গ এসেছে। সেই বিচিত্র অভিজ্ঞতাই তাঁকে গল্পের প্রেক্ষাপট রচনা করতে সাহায্য করেছে-

“গ্রামে ফিরে দলিল দস্তাবেজ, চাষের জল, ধানের ফলন, অধিগৃহীত জমির ক্ষতিপূরণ না পাওয়া হতভাগ্য চাষীবাসী মানুষের সঙ্গে চায়ে চুমুক দিতে দিতে আলাপ জুড়ি। কীরকম অলীক লাগে সমস্তটা।“ (‘অলীক এই জীবন’, তদেব, পৃ. ১২)

 আবার কখনও বিরূপ সমালোচনাও শুনতে হয়েছে –জমি না ছাড়লে কিছুই হবে না। মুসলিম অন্তঃপুর নিয়ে লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প ‘বছরদ্দি ভূমি ধরিতে যায়’। এ গল্পে বৃদ্ধ বছিরদ্দির হাহাকার যে কোন পাঠকেই স্পর্শ করে। সাহিত্য পাঠককে আবেদন জানাই এ গল্প পড়ার জন্য। কেননা সমালোচনায় এ গল্পের রস পাঠকের কাছে পৌঁছতে গেলে উদ্ধৃতির সংখ্যা বেশি হয়ে যাবে। রব্বানি ও বছিরদ্দি জমি কেনে, কিন্ত বছিরদ্দি সমস্তটাই নিজের নামে কেনে। জমিতে দুই ভাই ফসল চাষ করেছে, কখনোই বলেনি যে জমি তাঁর। কেননা সে প্রয়োজনও হয়নি, শুধু ফসল চাষ করে খেয়ে পড়ে দিন চলে গেছে। আজ বছিরদ্দি বৃদ্ধ, তাই ভাইপো মাইদুল নিজ নামে জমি চায়। কিন্তু বছিরদ্দির মাথায় সে সব হিসাব আসে না –“তারপর মইদুল উধাও হয়ে গেল বছিরদ্দির চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে। ভাইফোটারে সে মানুষ করেছিল না ! রব্বানিতে ফাঁকি দেছে ? সে তো কাগজে, জমিতে মাটিতে নয়। মইদুলের কাছে খাতাপত্তরই বড় হল।“ (‘বছিরদ্দি ভূমি ধরিতে যায়, ‘আশালতা’, তদেব, পৃ. ৯৪)

                    স্বার্থের কাছে পাল্টে যায় মানবিকতা বোধ। তাই আজ মইদুল তাড়িয়ে দিয়েছে বৃদ্ধ বছিরদ্দিকে। শীতের রাতে আজ বৃদ্ধ বছিরদ্দি দিশেহারা। মইদুল বছরদ্দিকে চলে যেতে বলেছে কন্যার বাড়ি। সে আজ অন্তরে ক্ষতবিক্ষত। আজ তো দাদা রব্বানি নেই কাকে বলবে সে দুঃখের কথা। আসলে পাল্টে গেছে সময়, মূল্যবোধ। সেই দুঃখের দিনে জমি কেনাই ছিল প্রধান কথা, কার নামে কেনা হল সেটা বিবেচ্য ছিল না। কিন্তু আজ মইদুল জানে বছরদ্দির মৃত্যু হলে বছিরদ্দির মৃত্যু হলে বছরদ্দির মেয়েরা জমিতে ভাগ বসাবে, তাই সে নিজের নাম করতে চায়। কিন্তু কৃষকের কাছে ‘চাষার জমি চাষার হৃদয়’, তাই বছরদ্দিও নিজের নাম থেকে জমি ছাড়তে চায় না। কিন্তু বছিরদ্দি কি সত্যি স্বার্থপর ছিল ? অবশ্যই না। সে তো মইদুলকে জমি চাষে বাঁধা দেয়নি। আজ দাদা রব্বানি নেই, তাই বছিরদ্দির হাহাকার শোনার কেউ নেই। এই শীতের রাতে বছরদ্দি রব্বানির কবরের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করে-

“রব্বানিরে ফাঁকি দিচ্ছি ! জিগা রব্বানিরে । এই বাগানে মাটিও তো দিচ্ছি ওরে। তবু আমি ঠগ হলাম, রব্বানির গোর নাই এখেনে ? এই দেখ এই দেখ রব্বানি এই মাটির তলে শুয়ে আছে।“ (তদেব, পৃ. ৯৫)  

নিজের চোখে দেখা সমাজ বাস্তব যখন কল্পনার রসে মিশিয়ে দিয়ে পরিবেশন করেন কথাকার তখনই তা সাহিত্য হয়ে ওঠে। সাহিত্য তো জীবনের কথা বলে, সেই জীবনের নানা ধরনের বাঁকের আভাস সাহিত্য দিয়ে থাকে। আধুনিক ছোটোগল্পের অন্যতম চিত্রকর অমর মিত্র। পরিবর্তিত পৃথিবীতে পাল্টে যাওয়া মূল্যবোধের প্রেক্ষাপটে রচিত তাঁর প্রথম পর্যয়ের বেশিরভাগ গল্পই। কিন্তু অভাবী মানুষের কোন কি মূল্যবোধ থাকে ? না তার মূল্যবোধ ধ্বংসের জন্য তাঁকে দায়ী করা যায়। এ পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষই সুখের সন্ধানী, আর সে সুখের সন্ধানে কীভাবে হারিয়ে যায় মূল্যবোধ তারই গল্প হল ‘আবহমান’। এ গল্পের সোনাভান তাঁর আগের পক্ষ রফিক মণ্ডলকে ছেড়েছে অভাবের তাড়নায়। সামান্য সুখের সন্ধানী, সামান্য খাদ্যের জন্য, বেঁচে থাকতে সোনাভান এসেছে মইদুলের সঙ্গে ঘর করতে। মইদুলের পিতা বৃদ্ধ আকবর মণ্ডল চায় শেষ বয়সে একটু সুখ উপভোগ করতে, আর মইদুলের চিন্তা কীভাবে অভাবের দিনে সংসার চালাবে। সামান্য একটি খেঁজুর গাছ নিয়েই বিবাদ ঘটে পিতা-পুত্রের মধ্যে। অভাব থেকে সংসারকে রক্ষা করতে পিতাকে মেরে ফেলতেও পিছপা হয় না মইদুল –

“মইদুল হাঁসফাঁস করতে করতে বলে, পারবিনে তুই ? আগের পক্ষডারে যেমন করি দিইছিস পাগল, হ্যাঁ পাগল। যেমন রফিক ভাইরি, তেমনি পারবিনে বাপেরে -!” (‘আবহমান’, তদেব, পৃ. ১৪৪)

-একে কি মূল্যবোধের আবক্ষয় বলবে ? না অভাব থেকে বেঁচে থাকার জন্য মধ্যবিত্তের কৌশল ! সমান্য বেঁচে থাকতে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে নানা কৌশল, মিথ্যা কথার আশ্রয় নিতে হয়। যে অভাবের জন্য রফিক মণ্ডল পাগল হয়ে গিয়েছিল, সেই অভাবই আজ মইদুলকে স্বার্থপর করে তুলেছে। আসলে মধ্যবিত্ত জীবনে সবচেয়ে বড় বাধার নাম ‘অভাব’, সেই অভাবই মানুষকে যে কোন পর্যায় থেকে কোন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারে তা মানুষ নিজেও জানে না – সে খবর রাখেন শুধু লেখক, তার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ‘আবহমান’ গল্প। মুসলিম সমাজের আইন, তালাক প্রথা, জীবনযাত্রা, এমনকি ভাষা ব্যবহারে লেখকের দক্ষতা সহজেই চোখে পড়ে। ‘আশালতা’ গল্পসংকলনে অমর বাবুর বেশিরভাগ গল্পেই মুসলিম জীবনের কথা এসেছে। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের হাতে যে মুসলিম সমাজের চিত্র উঠে এসেছিল তা সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ও মহাশ্বেতা দেবী বৃহৎ পটভূমিকায় দাঁড় করালেন, আর অমর মিত্র তাঁদেরই উত্তরসূরী হয়ে বহন করে চলেছেন সেই সমাজের জীবনযাত্রাকে। 

93

Leave a Reply