প্রিয়রঞ্জন পাল

আজ যাই কাল যাই করে শেষ পর্যন্ত একবছর বাদে শিবকান্তি বাবুর বাড়ীতে যাওয়ার সময় পেলাম । শিবকান্তিবাবু আমার বন্ধু তবে সমবয়সী নন মোটেই । গত বছর আশিকে বাসি করেছেন । অসম বয়সেও যে বন্ধুত্ব করা যায় আমাকে দেখিয়েছিলেন তিনিই ।  পিতৃব্যতুল্য মানুষটিকে বারংবার অনুরোধ করেও কিছুতেই আমাকে আপনি বলা ছাড়াতে পারি নি । তুই-তোকারি ছাড়া আপনি-আজ্ঞেতেও যে বন্ধুত্ব হতে পারে তার প্রমানও মিলেছিল ,বন্ধুই হয়ে উঠেছিলাম আমরা । রেডিওতে তার কথিকা আছে – ফোন করে ঠিক মনে করিয়ে দিতেন । পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে তার কপি ঠিক পৌঁছে দিতেন । আসলে যৌবন ও প্রৌঢ়ত্বের পুরোটা প্রবাসে কাটিয়ে অবসরের পরে বার্ধক্যের শুরুতে যখন তিনি এ শহরে ফিরলেন তখন তার বন্ধুরা প্রায় সকলেই হয় বিদেশবাসী নয়তো স্বর্গবাসী । অগত্যা অসমবয়সীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব । তবে তার এই বন্ধুত্ব মরসুমি । 

শিবকান্তিবাবু সারা বছর আমাদের ছোট শহরটিতে থাকেন না । বছরের কমাস তিনি কাটান রাজধানীতে । অধিকাংশ সময় যাওয়াটা হয় নিঃশব্দে আর আসার পরে শুরু করেন হাঁকডাক । বহুদিন সাড়াশব্দ না পেয়ে এটাই ভেবেছিলাম হয়তো নিঃশব্দেই সরে পড়েছেন তিনি । নিজেও পেশা-সংসার-শখ আরও হাজার রকম কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম হয়তো অন্য সময়ের তুলনায় একটু বেশীই । তার মধ্যে বিপর্যয়ও ঘটেছে কয়েকটি , একটি মোবাইল ফোন হারানো । হ্যান্ডসেটটির দামে দুর্মূল্য ছিল না কিন্তু অমূল্য সব নম্বর মজুত ছিল তাতে । সেগুলির একটি শিবকান্তিবাবুর নম্বর । সিম কোম্পানি , থানা-পুলিস ইত্যাদিতে নানা কাঠখড় পুড়িয়ে নিজের আগের নম্বর পুনরুদ্ধার করলাম পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের আশা নিয়ে । 

দুষ্প্রাপ্য অনেক নম্বর থেকে ফোন এল শিবকান্তিবাবু ছাড়া । 

-ঐ বুড়ো মানুষটিই কি সব সময় তোমার সঙ্গে আগে যোগাযোগ করবে ? তুমিই না হয় কর এবার ।  ফোন উদ্ধার হলেও নম্বর উদ্ধার হয় নি একথা না জেনেই বৌ আমাকেই ভর্ৎসনা করে বসে । 

বৌয়ের গঞ্জনার শিকার হয়ে সিদ্ধান্ত নিই মহম্মদ পর্বতের কাছে না এলে পর্বতই মহম্মদের কাছে যাক । সেটাও হচ্ছে হবে করে দেরিই হল যথারীতি ।

প্রায় একবছরের জমানো গল্প । সাহিত্য-রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজ ইত্যাদি নিয়ে বহু কথা জমে পেট ফুলে আছে  প্রায় , শিবকান্তিবাবুরও তেমনই থাকার কথা । হাতে সময় নিয়েই গেলাম । 

শহরের প্রান্ত সীমায় শিবকান্তিবাবুর বাড়ী ঘোরানো প্যাঁচানো এক গলির ভেতরে । দোতলা বাসা । উপরতলায় থাকেন তিনি । তিনি ও তার স্ত্রী । নীচে বিভিন্ন ঘরে ভাড়াটেরা । 

কমন দরজার পাশে উপর-নীচ চিহ্নিত করা পাশাপাশি দুটো কলিং বেলের সুইচ । আগে যতবার এসেছি সুইচ টিপেছি , উপর থেকে পরিচয় জানতে চেয়ে প্রশ্ন হয়েছে , সাড়া দেওয়ার পরে উদাত্ত আহ্বান , ‘উপরে চলে আসুন’।

সেই উপরে এবার নিজেই যেতে শুরু করেছি, সুইচ টিপিনি , ফলে পরিচয় জানতে চাওয়া হয় নি , আহ্বান আসে নি , অনাহূতের মতই আমি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকি ,শিবকান্তিবাবুকে চমকে দেব এই ভাবনায় বেশ মজা লাগে। 

মাটি থেকে মাত্র খানকয়েক সিঁড়ি , তার পর ছোট ল্যান্ডিং দিয়ে ডান দিকে ঘুরতে হবে , এরপর সিঁড়িতে অনেকগুলো ধাপ। সেখান থেকে বারান্দা , তারপর দরজা ।  ল্যান্ডিংয়ে পৌঁছে খেয়াল হল সিঁড়ি যেন ধূলিধূসরিত । পায়ের নিচের ধুলোই শুধু নয় চোখে পড়লো মাকড়শার জালও । প্রতিদিনের লোকচলাচলের রাস্তায় পদধূলিতেও ধুলো জমতে পারে কিন্তু মাকড়শার জাল বস্তুটি থাকতে পারে না । খেয়াল করলাম উপরের দিকে জালের ঘনঘটা আরও বেশী । দাঁড়িয়ে গেলাম । ইতিমধ্যেই কলিং বেলের সুইচের নাগাল পেরিয়ে  এসেছি । অগত্যা কণ্ঠবলই ভরসা । 

শিবকান্তিবাবু আছেন নাকি ?  শিবকান্তিবাবু । দোতলা নিরুত্তর । ফলে আবার ডাকলাম , আরও একবার । নিজের কানেই নিজের ডাক গুলোকে শোনালো নিচু ক্লাসে ইংরেজি পাঠ্যবইতে ‘লিসেনারস’ কবিতায় পড়া সেই পথিকের ডাকের মত । সাড়াহীন-শব্দহীন সে সিঁড়িঘরে নিজের ডাকই ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হল ।  

মাথায় মাকড়শার জালের চটচটে স্মৃতি হাতড়াতে হাতড়াতে নীচে নামছি আর ভাবছি এবার শিবকান্তিবাবুরা একটু বেশী দীর্ঘ সময় রাজধানীতে আছেন। তিনি বলতেন , ‘ হাঁফিয়ে উঠি , বুঝলেন । ঐ শহরের ধরণধারণে দুতিনমাসের মধ্যেই হাঁফিয়ে উঠি , প্রাণটা আনচান করে ওঠে এখানে আসার জন্য । ‘

– সেই আসা এবার এত দেরী কেন ? অসুখ-বিসুখ করে নি তো ? ভাবছি আর ধুলোমাখা সিঁড়ির ধাপে ধাপে নিজের না দেখা পায়ের ছাপ ফেলতে ফেলতে নামছি । 

আমি মাটিতে পা দিয়েছি উল্টো দিকের দরজা খুলে গেল । এই তো জানা যাবে শিবকান্তিবাবুর খবর ! ভেতরে ভেতরে উৎসাহিত হই । 

-ওরা কেউ নেই ? উপরের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে জিঞ্জেস করি দরজার ওপারে থাকা একজনকে । 

ভেতর থেকে নারীকণ্ঠে কেউ একজন স্পষ্ট অথচ ক্ষুদ্রতম উত্তরে জানায় -না । 

-ওদের ফোন নম্বরটা দিতে পারেন ? কুণ্ঠিত কণ্ঠে আবার প্রশ্ন করি ।

-লিখুন , নাইন ফোর থ্রি ফোর —–অবগুণ্ঠনবতী বলতে থাকেন আর আমি আমার মোবাইলের কি প্যাডে টিপতে থাকি একটি একটি করে দশটি নম্বরের বোতাম । 

সবগুলো নম্বর তুলে মোবাইলের সবুজ বোতামে চাপ দিয়ে ফোনটি কানে তুলে নিয়ে পায়ে পায়ে বেরিয়ে আসি বাড়ীর বাইরে । শুনতে পাচ্ছি অপর প্রান্তের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে , রিংটোনে বাজছে হেমন্ত-কণ্ঠের কালজয়ী গান’আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’ ।

গান শেষ , যান্ত্রিক কণ্ঠ জানান দিল ,’আপনি যাকে ফোন করেছেন তিনি উত্তর দিচ্ছেন না । , আমি আবার সবুজ বোতামে চাপ দিই ,  মোবাইল কানে ঠেকাই আর তারার গান শুনতে থাকি । হঠাৎ গান থেমে যায় , অপরপ্রান্তে থাকা একজন ফোনটি ধরেন , শিবকান্তিবাবু নন , মহিলা কেউ , সম্ভবত তার স্ত্রী ।

-শিবকান্তিবাবু আছেন ?

আমার প্রশ্নের উত্তরে ক্ষণেকের নীরবতা , তারপর ব্যথা জড়ানো কণ্ঠে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন , আপনি কিছু জানেন না ? 

আমার আশংকা আর অস্বস্তি পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে । ক্ষীণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করি , কি জানবো ? 

-ওর না থাকার খবর ? 

-কবে ? নিজের কানেই প্রশ্নকে শোনায় আর্তনাদের মত ।

-মানে ? 

-উনি তো নেই , মারা গেছেন ।

-গত জানুয়ারিতে । 

আরও কিছু বলে চলেন ভদ্রমহিলা , সে সব অস্পষ্ট হয়ে যায় আমার কানে , মনে মনে দশমাসের সঙ্গে দুমিনিটের অনুপাত কষতে থাকি । 

কি আশ্চর্য দশমাস আগে গত হওয়া শিবকান্তিবাবু দু মিনিট আগেও তার সবটুকু অস্তিত্ব নিয়ে মৃত নক্ষত্রের আলোর মতই আমার কাছে  রীতিমত জীবন্ত ছিলেন !  

105