বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জনজীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

“নদীর পানির শ্যাষ হয়ত আছে নূরী, তোর আমার চোখের পানির শ্যাষ নাই।“(মাটি ছেড়ে যায়, রূপা অ্যান্ড কোম্পানি, পৃ. ১৫) আবুল বাশারের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘মাটি ছেড়ে যায়’(১৩৯৫)। তিনি গল্প জীবনের আরম্ভই করলেন বিপন্ন মানুষদের কথা লিখে। আর সেই জীবন প্রান্তিক মুসলিম জীবন। যে জীবন বারবার ঘাত- প্রতিঘাতে পৃথিবীর ভয়ংকর রূপ দেখেছে। নদী যেমন গ্রামকে লালিত করে তেমনি গ্রামের মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নেয়। গঙ্গার ভাঙন আমরা স্বচক্ষে দেখেছি। ভূতনি, মানিকচকের ( মালদা ) মাইলের পর মাইল জমি গ্রাস করে নিয়েছে গঙ্গা। নদী গ্রাসে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে বহু মানুষ। নদী গ্রাসেরই ভয়ংকর চিত্র উঠে এল আবুল বাশারের ‘মাটি ছেড়ে যায়’ গল্পে। নূরী ও সুলতান দুজনেই ঘর বেঁধেছিল কিন্তু নদীতীরে ঘরবাঁধা কতটুকু সত্য নদীর কাছে ! নদী ও মানুষের সম্পর্ক এখানে যেন বিপ্রতীপ। মানুষ গড়ে, নদী ভাঙে ; আবার মানুষ গড়ে আবার ভাঙে। নূরীর পিতা নাটু হাজী কন্যার বিবাহ দিতে চাইনি সুলতানের সঙ্গে। ঘটক আসগর আলি নানা মন্তব্য ও প্রশংসা করে বিবাহ দিয়েছে। নদী গ্রাসে সুলতানের সব জমি গেছে, বাকি শুধু তিন বিঘা। এবারের বন্যায় তাও গ্রাস করেছে। নূরী ও সুলতান দুজনেই কালো, তাঁদের সন্তান সাহেবও কালো। কিন্তু সাহেব কিছুদিনের মধ্যে অদ্ভুত ভাবে উজ্জ্বল বর্ণ হয়ে যায় – যেন ম্যাজিক। লেখক সাহেবকে হয়ত মৃত্যু মুখে নিয়ে যাবেন বলেই এমন সুন্দর করে তুলেছেন ! একদিকে ক্ষুধা, অন্যদিকে বন্যা – দুইই সহ্য করে বেঁচেছিল নূরীরা। রাতের অন্ধকারে সাহেব বিছানা থেকে জলে পড়ে যায়। যে সন্তানের জন্য পিতা- মাতার এই ভালোবাসা, বিপন্ন হয়ে আজ আর কোন দুঃখ অভিমান নেই। ঐ প্রসঙ্গে পাঠকের তারাশঙ্করের ‘ তারিণী মাঝি’ গল্পের কথা মনে পড়বে। কিন্তু এ গল্পের বিভৎসতা সে গল্পকেও পিছু ফেলে দিয়েছে। আবুল বাশারের সাড়া গল্প জুড়েই একটা থমথমে ভাব বা বিপন্ন মানুষের আর্ত চিৎকারের প্রতিধ্বনি প্রতিফলিত হয়েছে। এ গল্প যেন হেরে যাওয়া মানুষের পরাজয়ের গাথাকাব্য। ভূমি- মাটি হারিয়ে সুলতান ও নূরী চলেছে ত্রাণ শিবিরে-

“ সুলতান ফের থমকে দাঁড়িয়ে চেয়ে দ্যাখে বুকে। মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে কালো মেয়ে মানুষের নূরী। হতশ্রী। শ্যাওলা ভাসছে চোখে মুখে। পেছনে আরো দূরে, যেভাবে প্রথম পৃথিবীর গোষ্ঠীপতি চেয়ে দেখেছিল তাদের আস্তনা, দেখল সুলতান সেভাবেই না, আর চোখে পড়ে না।“(তদেব, পৃ. ১৮)

ভাবতে অবাক লাগে গল্প জীবনের সূচনাতেই তিনি পাঠককে চমকে দেবার মত গল্প লিখেছেন। আর সে চমক এসেছে নিজ সমাজের কাহিনির মধ্য দিয়ে।

আবুল বাশারের ‘অন্য নকশি’ গল্পগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে। গল্পগুলির রচনাকাল ১৯৮৪- ৮৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। এ গ্রন্থের সূচনায় বলা হয়েছে- “ সাধারণভাবে আমরা জীবনকে যেভাবে জানি, তারও বাইরে এবং গভীরে আর এক জীবন বহমান- সেই জীবন ও সত্যের অনুসন্ধান  ‘অন্য নকশি”। এই জীবন মুসলিম প্রান্তিক জীবন। এ গ্রন্থের ‘অন্য নকশি’,’ অনাবিল নয়’,’সফরি’, ও ‘কান্নার কল’ গল্পগুলিতে মুসলিম সমাজ জীবন উঠে এসেছে। ‘কান্নার কল’ গল্পটি বাংলা ছোটোগল্পের ধারায় সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও ভিন্ন স্বাদের। বাংলা ছোটগল্পে এমন গল্প বোধহয় আর লেখা হয় নি ! আর এসব ছোটোগল্পের জন্যই বাংলা ছোটোগল্প বিশ্বসাহিত্যে মর্যাদার দাবিদার। লোককথায় ছিল পূর্বে বহুবিবাহ প্রচলিত থাকায় স্বামীর মৃত্যূর সময় মানুষ ভাড়া নেওয়া হত কান্নার জন্য। কেননা এক পুরুষের বহু নারী, এমনকি সেই পুরুষের প্রতি তাদের তেমন ভালোবাসা নেই। ফলে ভারা করা নারীরা চালের বদলে কান্না করত। আর ছিল- এক রাজার ছেলের কানকাটা। নাপিত বাদে সে আর কেউ জানতো না। কিন্তু নাপিত খুব পেট পাতলা বলে নদীর কাছে গিয়ে সে কথা বলে ফেলে। আর সেই নদীর মাটি থেকে তৈরি মাটির জিনিসপত্র গুলি হাটে নিয়ে বিক্রির সময় ক্রেতা যখন বাজিয়ে দেখতো, তখন শব্দ হত -রাজার ছেলের কানকাটা। প্রচলিত লোককথা দুটির দ্বিতীয়টি গল্পে প্রতক্ষ্য ভাবে এলেও গল্প পড়তে গিয়ে প্রথমটির কথা মনে এল। এ গল্পের সতী তেমনই এক নারী, সে অন্যের বাড়িতে কান্নার বিনিময়ে সামান্য খাদ্য পায়, এটিই তাঁর পেশা। আবুল বাশার হয়ত এই লোককথা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। সুবোধ ঘোষের ‘পরশুরামের কুঠার’ গল্পের কথা এ প্রসঙ্গে পাঠকের মনে পড়তে পারে। কিন্তু তিনি স্বতন্ত্র ভাবে কাহিনি নির্মাণ করেছেন। গোটা গল্প জুড়েই সতীর মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন বিরাট ভাবে লক্ষ্য করা যায়। স্বামী পরিত্যক্ত নারী সতী, কান্নার জন্যই যেন তাঁর জন্ম। কোন বাড়িতে ভালো করে কাঁদতে পারে নি বলে তাঁকে বিদ্রুপও সহ্য করতে হয়েছে। সতী একদিন যায় রাঙাবাবুর বাড়িতে। রাঙাবাবুর স্বামী লেবাস মণ্ডল, বোন নাদিয়া। রাঙাবাবুর দুই বোন। নাদিয়ার বিবাহ হলে সমস্ত সম্পত্তি ভাগ হয়ে যাবে বলে লেবাস মণ্ডল তুক-তাক করে মেরে ফেলে নাদিয়াকে। রাঙাবাবু নাদিয়ার মৃত্যুতে ভাড়া করে এনেছে সতীকে কান্নার জন্য। কিন্তু সতী আজ আর কাঁদতে পারে না, এর জন্য শুনতে হয় ব্যঙ্গ-

ক. “ সবই মনে পড়ছিল সতীর। কিন্তু সে কিছুতেই কাঁদতে পারছিল না। রাঙাবাবু কাছে এসে গা- লাগা বসল। চাপাসুরে বলল – অত হাপুস- হুপুস খাচ্ছিস কেন সতী, নিঃসাড়ে খা। লোকে কী ভাববে ? ভাববে, তুই আমার ভাড়া করা লোক। তা যতটুকুন কাঁদলি, তাতে অমন করে হাপসে পান্তাগেলা ঠিক নয় সতী।“(অন্য নকশি, পত্রলেখা, পৃ. ৮৯)

খ. “সতী ভাত খেতে পারে না। উঠে পড়ে। আশ্চর্য লাগে, রাঙাবাবু কেমন রেগে আছে। এমন করে রাগ করছে কেন ? নিজে কাঁদতে পারছে না বলেই কি এত রাগ ! একাথা লোকে শুনলে মাথা কাটা যাবে। রাঙাবাবু কানে কানে বলল- নে, নাড়িতে জোর এল, এবার আমার মুখ রাখ সতী। কেঁদে কেঁদে আমার স্বামীর পাপ মুছে দে দুঃখী !” (তদেব, পৃ. ৯০)

 বাড়ি গিয়ে সতী দেখে নিজের সন্তান চুন্নু মারা গেছে। সতীর আজ আর কান্না আসে না নিজ সন্তানের জন্য। লেখক অসাধারণ দক্ষতায় গল্পের পরিবেশ সৃজন করেছেন। কাহিনি হারিয়ে গিয়ে চরিত্রের নিজস্ব কথাভুবন ফুটে উঠেছে। এ পৃথিবীতে যেন কান্নার জন্যই জন্ম হয়েছে সতীর, তাই একজন বৃদ্ধ বলে –“ কাঁদ মা, কাঁদ । পরের জন্যি এত কাঁদিস, নিজের বাছার জন্যি চোখে পানি নাই তোর ?”( তদেব, পৃ. ৯৩) তেমনি লেখক জাদুবাস্তবের আশ্রয় নিয়েছেন। সন্তান কবর দেওয়ার পরের রাত্রে সতীর মাতৃগর্ভে কান্না আসে। এ কান্নার দুটি দিক হতে পারে – এক – সন্তান আবার মাতৃগর্ভেই আশ্রয় পেতে চাইছে, দুই – সতীর আবার মা হবার ইচ্ছা। লেখক দ্বিতীয় দিকেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। একটি নারীর গোটা জীবনের ব্যর্থতার ও বেঁচে থাকার মর্মগ্রাহী হৃদয়সত্তা বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। আর সেই বিশ্লষণ করেছেন মায়াবি ভাষায়। সাহিত্য সৃষ্টি তো ভাষাশৈলীরই কৌশল – আর সে কৌশল তৈরিতে আবুল বাশার এক দক্ষ কারিগর – সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। 

    ‘দুই অক্ষরের প্রেম’ দুই প্রজন্মের গল্প, সময়ের পরিবর্তনে নারীর চরিত্র বিবর্তনের কাহিনি। আর এ নারী অবশ্যই মুসলিম নারী। মা যা পারে নি তা আজ পেরেছে কন্যা। মরিয়া ও জাফরের কন্যা নাজিয়া। হিন্দু পাড়ায় থাকে বলে নাজিয়ার সব বন্ধুই হিন্দু। ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে দাঙ্গা, পিতা কন্যার এই মেলামেশা পছন্দ করেন না। এমনকি কন্যা মিথ্যা কথা বলে বাড়ির বাইরে চলে যায় আর তা সমর্থন করে মাতা মরিয়া। মরিয়ারও প্রেমিকা ছিল কিন্তু দাদুর কাছে ভালোবাসার সত্য কথা বলতে না পারায় তা ব্যর্থ হয়েছে। তবে সেই ব্যর্থ প্রেম মরিয়া সারাজীবন মনে মনে বহন করে চলেছে। পরে জাফরকে মেনে নিতে অসুবিধা হয় নি। কে এই জাফর, লেখকের বিবরণ অনুসারে –“আমার নাম কাজী জাফর। পিতা কাজী আকবর। মাতা –আমিনা। দাদাজী কাজী সালাউদ্দিন। বউ-এর নাম মরিয়া। একমাত্র কন্যা নাজিয়া। শুনেছে ভাই, আমি একটি হিন্দু পাড়ায় থাকি। আমার দাদাজী আহম্মক, তিনি সব থাকতে হিন্দুদের মধ্যে অট্টালিকা বানালেন। আর সেই দাদাজীকে গাঁয়ের মুসলমানরাই দাঙ্গার সময় হিন্দুদের দোষ লাগিয়ে শুম করে দিল।“ (নির্বাচিত প্রেমের গল্প, বিকাশ ভবন, প্রথম প্রকাশ ১৯৯২, পৃ. ২৯ ) কন্যা নাজিয়া আজ প্রেম করে করে হিন্দু ছেলের সঙ্গে। মরিয়মের প্রেমিকা ছিল আশিফুল। এই ‘A’ কে জাফর ‘Z’ করতে তাঁর বেশি সময় লাগে নি। তেমনি মাতা ভেবেছিলেন কন্যার প্রেমিকা উৎপল ‘U’ কে ওয়াশেফ ‘W’ করতেও বেশি সময় লাগবে না। কিন্তু সময় পাল্টে গেছে। কন্যার প্রেমিককে পাল্টাতে পিতা –মাতা বহরমপুরে মামার বাড়ি নিয়ে যতে চেয়েছে। কন্যাও রাজি হয়েছে। মাতার সামনে ওয়াশেককে মেনে নিয়েছে। কিন্তু মাতা সকালে উঠে দেখে নাজিয়া সবাইকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে। এ যেন মাতার প্রেমের মুখে এক চাপেটাঘাত। আর লেখক তখনই শুনিয়ে দেন –“হঠাৎ যেন ১৬ বছরের মারিয়ার গালে চড় মেরে কে যেন ব’লছে, বল্‌ ভালোবাসি। বল্‌ ! মিথ্যুক কোথাকার ! বেণী দুলিয়ে কখনও আর ওভাবে মাথা নেড় না ।“ ( তদেব, ) 

    এক সহজাত বিষয় সজ্জা নিয়েই আবুল বাশার গল্পে নেমেছেন। কিন্তু সামান্য বিষয়কেও অসাধারণ করে তোলার ক্ষমতা তাঁর আয়ত্তে থাকে। আবুল বাশারের গল্পের প্লট যে খুব বেশি তা নয়। সামান্য পল্ট নিয়েই, গল্পের কেন্দ্রবিন্দুকে ঠিক রেখেই তিনি নিজস্ব বক্তব্য পরিবেশনে উপনীত হন। গল্প বলা অপেক্ষা লেখকের দৃষ্টিভঙ্গিই প্রধান। এই দৃষ্টিভঙ্গি মুসলিম সমাজের অন্দরমহল ও বহিঃমহলের দিকে। সে সমাজের ধর্মান্ধতার দিকে যেমন নজর দেন তেমনি ধর্মকে অতিক্রম করে চরিত্র কীভাবে নতুন জীবনচেতনায় এগিয়ে যাচ্ছে তা আবিষ্কার করেন। সে সমাজ পিছিয়ে আছে তা লেখক জানেন। আর শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার জন্যই নানা ধর্মান্ধতা আশ্রয় নিয়েছে। তবে সময়ের বিবর্তনে, শিক্ষার প্রসারে সে সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নবীন প্রজন্মের এই এগিয়ে যাওয়ায় নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে, প্রাচীন রক্ষণশীল সমাজ টেনে ধরেছে, তবুও কেউ কেউ অবরুদ্ধ প্রথাকে নস্যাৎ করেই এগিয়ে গেছে। এই দু সমাজের দ্বন্দ্ব, সময়ের বিবর্তনে নতুন প্রজন্মের এগিয়ে যাওয়া, মুসলিম নারীর জীবনযন্ত্রণা ও তা থেকে বেরিয়ে আসার অভিপ্রায় চিহ্নিত করেছেন গল্পে।

60