অঞ্জন রক্ষিত

চোখের সঙ্গে আরামে কানও যেন মুদে আসছিলো।শোনার কোন কসরতও ছিল না। স্বপ্নার আওয়াজ ক্রমশ যেন ঘনীভূত হল। চোখ খুলতেই দেখল স্বপ্না মাছের ব্যাগ নিয়ে এসে দরজার সামনে রুদ্রাণী হয়ে আছে।
-কি এনেছ এসব? মেয়েটা যে বলল কইমাছ খাবে, কোথায়? ভুলে গেছ তো? জানি তো ,চায়ের আড্ডায় কি আর কিছু মাথায় থাকে?
প্রাণেশ কিছু বলল না।মারাত্মক একটা ভুল হয়ে গেছে।শুধু বলল,
-এসব নামিয়ে এক্ষুনি ব্যাগটা দাও।
স্বপ্নাও গজগজ করতে করতে রান্নাঘরে চলে গেল। প্রাণেশ আবার প্যাচপ্যাচে ভিজে জামাটা গায়ে চড়িয়ে সাইকেলটা নিয়ে বাজারে চলল।মায়ের গলার আওয়াজ পেয়ে ইতিমধ্যে সুরমাও বেরিয়ে এল।মাকে জিজ্ঞাসা করলো কি হয়েছিল। স্বপ্নার কাছে সব শুনে হাসতে আরম্ভ করলো বাবার কীর্তি দেখে। ওর বাবার স্বভাবটাই ওরকম,প্রায়দিনই কিছু না কিছু ভুল করবে আর মায়ের কাছে বকা শুনবে। প্রাণেশের চরিত্র এটা।কেউ ভুল করলে যেমন এক ইঞ্চি ও ছাড়ে না তেমনি নিজে ভুল করলেও ঠিক উল্টোটা, পাথর হয়ে যায়, কোন টুঁ শব্দও করে না।
সুরমা এরপর রান্নাঘরে চলে গেল,মায়ের সাথে এটা ওটা করে দিচ্ছে।কিছুক্ষন পরেই প্রাণেশ বাজার থেকে এলো। গেট থেকেই হাঁকতে আরম্ভ করেছে যেন বিশ্বজয় করে ফিরেছে। এতক্ষণ নিজের ভুলের জন্য যে কথাগুলো আটকে ছিল সেগুলো যেন একবারেই গড়গড় করে বেরোতে চাইছে। স্বপ্না আর সুরমাও বাইরে বেরিয়ে এল।দুজনেই অবাক,এত্ত মাছ দিয়ে কি হবে! স্বপ্না এবার ও প্রাণেশকে বকতে আরম্ভ করলো। কিন্তু এবার প্রাণেশও যেন হারকিউলিসের মতো স্বপ্নার সব বাক্যবাণ প্রতিরোধ করলো হাসি দিয়ে। জ্যান্ত কইগুলো প্রচণ্ড লাফাচ্ছে। সুরমাও বেশ খুশী। কিন্তু এত কইমাছ,আর আগের আনা রুইমাছ তো আছেই! ঠিক হল দুটো কই শুধু সুরমার জন্য রান্না হবে বাকিগুলো হাঁড়িতেই জিইয়ে রাখা হবে। প্রাণেশও স্বপ্নার কথামতো তাই করলো। দুপুরে বেশ হৈ হৈ করে শেষ হল দত্তবাড়ির লাঞ্চ।
খাবার পর দুপুরে বাবা মা ঘুমোলেও সুরমা ঘুমায়নি। সুরমার মনটা পরে আছে কালো জলজ প্রাণীগুলোর দিকেই। কেমন এঁকে বেঁকে জাচ্ছে।মনে হয় কখনো গোল্লাছুট বা কখনো দারিয়াবান্দা খেলছে ওরা। একটু পরপর ঢাকনা তুলে তুলে দেখছে। তাদের মধ্যে একটি কই খুব সুন্দর। পেটের কাছের সোনালি রঙ টা যেন সারা শরীরের ভাষা হয়ে উঠেছে ।মাঝে মাঝে পৃষ্ঠ পাখনাটি উঁচিয়ে উঁচিয়ে বাকিদের যেন বলে দিচ্ছে নিজের স্বঘোষিত কর্তৃত্ব। বিকেলে প্রাণেশ ঘুম থেকে উঠলে সুরমা বলল ওই মাছটা শুধু আলাদা করে কাচের জারে রাখতে।মেয়ের আবদার, প্রাণেশ আর কি করে! সন্ধ্যা হলে সুরমা জারটাকে নিজের ঘরে নিয়ে রাখল যাতে মাছটাকে দেখতে আর বাইরে আসতে না হয়। মাছটার চোখ খুব সুন্দর। বারবার যেন সুরমার দিকে তাকিয়ে আছে। জারটির কাছে গিয়ে সুরমা লক্ষ্য করলো এক অপরূপ সৌন্দর্য,চোখের গভীরতা সাগরের মতো, বডি ল্যাঙ্গুয়েজে একটা ডোন্ট কেয়ার মনোভাব।ভাগ্যিস কোন ছেলে নয় নাহলে নির্ঘাত কোন মেয়ে প্রেমেই পড়ত।রাতেও সুরমার মাছটিকে পর্যবেক্ষণ করা শেষ হল না। প্রাণেশ আর স্বপ্না বারবারই বলে চলেছে,
-কি রে পাগল হলি নাকি?
সুরমা কিছু বলে না। মাছটার চোখদুটো বারবারই সমিতের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল।এরকমই ছিল ও। চোখে প্রেমের গভীরতা, যেন বারবারই ডুবে আসা যেত। পোশাকে অগোছালো কিন্তু অসীম সাহস আর বুকে একটা স্পার্ক ছিল।অদম্য জেদ আর হার না মানা অ্যাটিটিউড। অসামান্য বাগ্মীতা যেন চুম্বকের মত কাছে টানত। কিন্তু ও যে কেন আমাকে এভাবে নেগলেক্ট করলো আজও বুঝলাম না। ও কেন পালিয়ে গেল,নাকি কোনদিন কাছে আসতেই চায়নি,অন্য কোন লোভ ছিল হয়তো। ইমোশন গুলো নিয়ে এভাবে খেলে গেলো? ছিঃ ছিঃ নিজেকেই কেমন ঘেন্না করে,আমি এতবড় ভুল করলাম কি করে!
ভাবনাগুলো যেন সিঙ্গারার পুরের মতো মাছটা সুরমার ভেতর ভরে দিচ্ছিল। রাতে সহজে ঘুমও আসছিলো না। অনেকক্ষণ লাইটটা জ্বালানোই ছিল। ওঘর থেকে বাবা মা বারবারই বলছিল,কি রে মাছটা তোকে কি করলো বা কখন ঘুমোবি ইত্যাদি ইত্যাদি। সমিতের সঙ্গে যখন একটা ক্রাইসিস চলছিলো বাবা-মা বেশ বন্ধুর মতোই পাশে দাঁড়িয়েছিলো। এমনকি শেষ যেদিন সমিত বাড়িতে এলো স্বপ্না তো বারণ করতেই চেয়েছিল।তবুও সমিত এলেও স্বপ্না আর দেখা করেনি, ওপরের ঘরে চলে যায়। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুমিয়ে পরে। ভোরের দিকে ঘরে ঢুকে স্বপ্না লাইট অফ করে দেয় ।
পরেরদিন সুরমা তাড়াতাড়িই ঘুম থেকে উঠে যায়। এত সকালে সে সাধারণত জাগে না। তবুও ঘুম ভেঙ্গে যায়।স্বপ্না শুনতে পায় ওঘরে সুরমা বলছে,
-কি রে ব্যাটা খাসনি যে কিছু। এতগুলো মুড়ি দিলাম তবুও মুখে রুচলো না? কি খাবি তাহলে রাগ করে আছিস নাকি?
সমিত এমনটা ধাঁচেরই ছিল,রাগ হলে খেত না।পেটে খিল মেরে বসে থাকবে তবু কুটোটিও কাটবে না।সকাল থেকেই সুরমা ফের মাছটাকে নিয়ে পড়লো। প্রথমেই জারটিতে যে উচ্চতায় জল আছে সেখানে একটা দাগ দিলো। সুরমা ভাবল মুড়ি তো খায় না জল খায় নাকি। কিন্তু দুপুর অবধি সেই রেখায় কোন নড়চড় হল না।আজ আবার নিজেই একটা কাঠি নিয়ে নাড়িয়ে নাড়িয়ে দেখছে মরে গেল কিনা। তলায় চুপ করে বসে থাকতেও দিচ্ছে না। সাঁতার না কাটলেই কাঠিটা দিয়ে নাড়িয়ে দিচ্ছে। মাছটা চুপ করে থাকলেই পুরনো কথা মনে পরে যায়। সমিতও কিছু বলতো না। আনন্দ বা দুঃখ দুইয়েরই প্রকাশ কম।কাছে কাছে থাকতে ভালোবাসতো , একটা ছটফটানিও ছিল ভেতর ভেতর কিন্তু মুখে বলতে চাইত না।সেদিন ওর তো কোন কাজ ছিল না। তবে কি বাড়ির কাজ ফেলে শুধু আমাকেই বাসে তুলে দেবার জন্য………নাকি অন্য কিছু।কি জানি অতও ভাবতে পারবো না। মুড়িগুলো জলের ওপর ভাসছে। প্রাণেশ জারটি দেখল। মেয়ের অবুঝের মতো কাণ্ড দেখে হেসে উঠলো।
-আরে বোকা ওরা কি মুড়ি খায় কোনদিন?
-তাহলে কি খায়?
-কিছু দিতে হবে না। এমনিই অনেকদিন থাকবে।জলটা পালটে দিতে হবে। দে পালটে দিচ্ছি।
প্রাণেশ এই বলে জারটা নিয়ে গেল। সুরমার মনে পরে গেল ক্লাস টেন- এ পড়েছিল কইমাছের একটি বিশেষ শ্বাসযন্ত্রের কথা যার দ্বারা সে জল ছাড়াই অনেকক্ষণ বেঁচে থাকে। সুরমা ছুটে চলে গেল বাবার কাছে কল পাড়ে।প্রাণেশ মাছটাকে জল থেকে বের করে জলটা ফেলে দিল।সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত কলপাড়ে ছড়িয়ে গেল মুড়িগুলো। মাছটা একটাও খায়নি। সুরমা ভালবেসেই তো দিয়েছিল।তবুও একটাও মুখে তুলল না।,সুরমার মনটা একটু খারাপ হয়েই গেল।
-বিশ্বাস করো আমার পেট সত্যিই ভালো না,আমি আজ কিছুতেই খেতে পারবো না।তুমি খাওয়াবে বলে পেট খারাপের মধ্যেও বিরিয়ানি খেতে হবে এসব পেটি সেন্টিমেন্টালিটি তোমাকে মানায় না। তুমি যথেষ্ট ম্যাচিওর এবং এটা বোঝার যথেষ্ট বুদ্ধি তোমার আছে।আর বিশ্বাস না হলে এই দ্যাখ প্রেসক্রিপশন।
সমিতের কথাগুলো সেদিন কানে তোলেনি। সুরমার অভিমান হয়েছিল।মনে হয়েছিলো সুরমাকে এড়ানোর জন্যই সমিত সেদিন রেস্টুরেন্টে যেতে চায়নি। বুঝতে পারছে না কেন পুরোনো কথা গুলো ঘুরেফিরে মনে পরছে।বাবাকে বলল,
-জল দিতে হবে না,ছেড়ে দাও তো দেখি কতক্ষণ থাকে।পরে নাহয় দিয়ে দিও। প্রাণেশও মেয়ের কথামতো তাই করল।সুরমা জল ছাড়াই কইমাছটি শুধু জারে করে এনে ঘরে রাখল।এবার মাছটি আর সাঁতার কাটছে না।কিন্তু তবুও সুরমা মাছটিকে নিয়েই পরে আছে। একটু পরপর মাছটি নড়ে নড়ে উঠছে। কাঁচের জারে তখন ফটফট করে আওয়াজ হচ্ছে। যদি অনেকক্ষণ ধরে এই শব্দটা কানে না আসে সুরমা কাঠিটা দিয়ে নাড়িয়ে দেখে যে মাছটি জ্যান্ত আছে কিনা। বক্ষপাখনাদুটো টানটান করে যেন চরম প্রত্যাখান অপেক্ষা করছে। এদিকে প্রাণেশ এসে বলল ভুলু ,মানে ওদের কুকুরটা কাল রাতে বাড়ি ফেরেনি।অন্য পাড়ায় গেলে তো আরেক বিপত্তি।এরকম তো কতবারই হয়েছে।কিন্তু তাড়াতাড়ি ফিরেও এসেছে। যখন ফিরে এসেছে তখন হয়তো ঘাড়ে বা পিছনের পায়ে একটা বড় ক্ষত বা রক্ত ঝরছে। নাজানি আবার কোন বিপত্তি ঘটে তাই প্রাণেশ ভুলুকে খুঁজতে বেরিয়েছে। সুরমা লক্ষ্য করছে যে মাছটার ছটফটানি যেন একটু একটু করে কমে আসছে। বাবার কাছে একবার জিজ্ঞাসা করতেও চাইলো একটু জল দেবে কিনা।কিন্তু ঠিক তখনি জারটা ফটফট শব্দে নড়ে উঠলো।
-এই তো সাবাশ বেটা।জিও,জিও।
সুরমা মাছটার জীবন যুদ্ধ যেন চেটেপুটে উপভোগ করছে। একটা অদ্ভুত নেশা চেপে বসেছে। জীবনটা সত্যই অদ্ভুত। যে সমিতের সঙ্গে দিনে ঘন্টার পর ঘণ্টা কথা হত এখন দিনে দু একটা মেসেজ ছাড়া আর কিছুই হয় না। তবুও খুব দরকার পড়লে। কেমন যেন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে সমিত।
-ও কি তাহলে সত্যিই আমাকে ভুলে গেল? ও এরকম করবে কোনদিনই ভাবিনি।
সন্ধ্যে প্রায় হয়ে এল। মাছটার নড়াচড়া কমে গেছে।এখন ঘনঘন কাঠি দিয়ে খোঁচাতে হচ্ছে নাহলে নড়ছে না। উদ্দীপনাও কম। চোখে আর সেই তেজ নেই।কিন্তু জীবনীশক্তি তো শুধু অবর্ণনীয়ই নয় শিক্ষণীয়। কাঁচের দেয়ালগুলো নোংরা হয়ে পড়েছে যেন।শুকিয়ে যাচ্ছে যেন সবকিছু। মাছটার শরীরটাও যেন জেল্লা হারিয়েছে।ভুলু সারাদিনও বাড়িমুখো হল না। সুরমা কাঠি দিয়ে মাছটিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
-ওই ওঠ।কি রে ওঠ, ওঠ।
যেই মাছটা নড়ে উঠলো অমনি হাত তালি দিয়ে উঠলো সুরমা।
-এই তো বেঁচেই আছে, ব্যাটা ভান করছিলো যেন জলের মধ্যে রাখি; সহজে আর জল পাবি না। আজ দেখব তোর কতো দম।
সুরমা আবার ভাবে,
-সমিত বোধহয় আমাকে পুরোপুরি ভুলে যায়নি। নিশ্চয়ই ওর মনের মধ্যে একটু হলেও কোথাও আমি আছি।নাহলে ও মেসেজ গুলো পাঠায় কেন।নাকি আমারই কোন খামতি ছিল। ওকে তো অনেকবার বলেছি ঠিক করে ভালবাসতে না পারলে অন্য কোথাও চলে যাব, যেখানে ভালবাসা পাবো। এভাবে বলা কি ঠিক হয়নি তাহলে! উঃ! জানিনা অতো মাথা ঘামাতে পারবো না।আমি জানি আমি ঠিক।
এসব আরও বহু কথা ভাবতে ভাবতে সুরমার চোখ বুজে আসছিল।আগেরদিন রাতেও ঠিক করে ঘুম হয়নি। হাত থেকে কাঠিটা কখন যেন জারের ভেতরে পরে যায়,বুঝতেই পারেনি। সম্বিত ফিরে পেতেই ঝট করে উঠে তাকিয়ে দেখল যে রাত বারোটা বাজে। জার থেকে কাঠিটা বের করতে ভয় ভয় লাগছে। ভেতরে হাত দিলে যদি নড়ে ওঠে। বক্ষ পাখনাটা যেন শানিয়ে রেখেছে,এক্ষুনি প্রতিশোধ নিয়ে নেবে। এই বুঝি বিঁধে গেল।না এখন তো অনেক ঝিমিয়ে রয়েছে। বের করবে কাঠিটা নাকি করবে না,ঠিক করতে পারছে না,খুব ভয়। কপালটা যেন ঘামঘাম দিয়েছে। অনেকক্ষণ ভেবে ঠিক করলো যে কাঠিটা বের করবে। একটা ভয় নিয়েই জারের ভেতরে হাতটা ঢোকাল। অতি সন্তর্পণে কাঠিটা নিয়ে এলো। ব্যস । একটা চিন্তা দূর হল।
-সমিতের কাছেও এভাবে যাওয়া কি ঠিক হবে? যদি আবার সেই চরম আঘাত আসে? না, এটাই ভালো। দূরত্বটা প্রয়োজন। সমিতের কাছে আঘাত ছাড়া আমার আর নতুন করে পাওয়ার কিছুই নেই।না,এক্ষুনি যাব না। এত সহজে নরম হওয়া ঠিক হবে না।
ভাবতে ভাবতে আবার চোখ বুজে আসছিলো। শুতে যাবার আগে আরেকবার কাঠিটা দিয়ে নাড়িয়ে দেখল মাছটা নড়ছে কিন্তু অনেকক্ষণ পরে। যাকগে তবুও তো বেঁচে আছে। শুয়ে পরতেই কখন যেন ঘুমিয়ে গেল।
সকালে উঠে দেখল মাছটা কেমন যেন চোখ মুখ উল্টে পরে আছে। কিছুক্ষণ কাঠিটা দিয়ে খোঁচানোর পরও নড়ল না।
-কি রে সকাল সকাল মুরগী বানাচ্ছিস নাকি?এরকম অনেক ঠকেছি। ঘুম থেকে উঠবি না? ভালোই তো, না ওঠ; আরেকটু সময় দিলাম, একটু পরে নাহলে আবার খোঁচা খাবি।
সুরমা ভাবছে সকালের আড়ষ্টতা কাটতে বোধহয় সময় নিচ্ছে।পরে আবার আগের মতোই চনমনে হয়ে উঠবে। জারটায় ফটফট করে শব্দ হবে।ঘর থেকে বেরিয়েই মায়ের কাছে শুনল ভুলু বাড়ি ফেরেনি।সুরমা ব্রেকফাস্ট করেই পাশের পাড়াগুলোতে ভুলুকে খুঁজতে বের হল।
-দুদিন পর শেষমেশ অবসর দিল।
স্বপ্না আর প্রাণেশ বলে বলে হাসছে তাদের মেয়ের কাণ্ড দেখে। দুঘণ্টা পরে সুরমা বাড়ি ফিরে এলো বিধ্বস্ত হয়ে। কিন্তু তন্নতন্ন করে খুঁজেও ভুলুকে পাওয়া গেলো না কোথাও। ফ্যানের নিচে বসে মার কাছে একগ্লাস জল চাইলো। একঢোকেই পুরোটা শেষ করে লক্ষ্য করলো জারটা আর ঘরে নেই। এদিক ওদিক দেখার পর স্বপ্নাকে ডাকল,
-মা, ও মা মাছটা কি হল।
-ওই দ্যাখ গিয়ে।
-কি?
-যা ঘরের পেছনে।
সুরমা গিয়ে দেখল ভুলু ফিরে এসেছে। প্রাণেশের হাতেই রয়েছে জারটি।সুরমা কাছে যেতেই প্রাণেশ বলল,
-মরে গেছে রে।ভুলুকে দিয়ে দিলাম। দুদিন কি না কি খেয়েছে!
সুরমা কিছু বলতে পারলো না। গলায় কি যেন একটা আটকে এসেছে।জল এসেছে চোখের কোণে। একছুটে বিছানায় চলে গেল। সব কৌতূহল শেষ। টিং টিং করে মোবাইলটাও বেজে উঠেছে। কোম্পানির মেসেজ। হোয়াটসঅ্যাপে গিয়ে দেখল চারদিন ধরে সমিতের কোন মেসেজ নেই। মাছটার চোখ দুটো সুরমার সামনে ফুটে ওঠে। ভুলু তখনও মাথাটা খায়নি, চোখগুলো অক্ষতই ছিল। মোবাইলটা নিয়ে সমিতকে ফোন করলো।
-কি ব্যাপার কোন খবর নেই যে।
-আমি হাসপাতালে।
আর কোন শব্দ মুখ ফুটে বেরোল না। ফোনটা কেটে দিয়েই মাকে বলল,
-মা আমি আসছি।
বলেই একছুটে চলে গেল হাসপাতালে। এখানে সমিতের বন্ধুরা ছিল। সুরমা জানতে চাইল কি হয়েছিলো।
-তেমন কিছু না। মাইল্ড অ্যাটাক,এসো। বলে প্রশান্ত ভেতরে নিয়ে গেল।
-একবার জানানোর প্রয়োজন মনে করলে না?
-আমি কাউকেই কিছু জানাইনি শুধু প্রশান্ত ছাড়া।
-সবাই কি একই শ্রেনির?
-তোমাকেও জানাতে হবে,সে শ্রেনির যে ভাবিনি। আমার অনুপস্থিতি টা তুমি টের পেয়েছ। আমার আর কিছু লাগবে না।
বলার পর সমিত সুরমার গুটিয়ে থাকা হাতটা ধরল।সুরমা কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠেছে,সমিতকে অনেক ভালবাসতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু পারছে না কেন যেন,জানা নেই। ভেতরের দহন দু-ফোঁটা এসে পড়লো সমিতের তর্জনীতে,
এ কি! হোয়াট হ্যাপেন্ড? প্লিজ।

পূর্ব প্রকাশিত (ঊষার আলো )

18