বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

মুসলিম সমাজের এক ভাঙাচোরা মানুষ নিয়ে গড়ে উঠেছে আবুল বাশারের ‘সফর কাহিনি’ গল্প। এ গল্প পড়ে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে হয়। স্তব্ধতাই বোধহয় এ গল্পের শেষ জাদুশক্তি। আর সে জাদুশক্তি আবিষ্কার করতে কেবল আবুল বাশারই পারেন। অসাধারণ বর্ণনার সাহয্যে মায়াবি ভাষায় তিনি এই আখ্যান গড়ে তুলেছেন। আমার পাঠকসত্তা যদি আবুল বাশারের ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ নির্বাচন করে তবে অবশ্যই ‘সফর কাহিনী’ অবশ্যই স্থান পাবে। কেন জানি না ‘দে’জ’ প্রকাশিত ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’এ গল্পটি স্থান পায় নি। গল্পটি স্থান পেয়েছে ‘পুস্প’ প্রকাশিত ‘নির্বাচিত গল্প’এ। সফর এক অকেজো মানুষ, যার নিচের অংশ পঙ্গু হয়ে গেছে। আর এই অকেজো সন্তানের জন্যই মাতা সফুরা বিবি দুঃখিত। সফুরা বিবি অসম্ভব সুন্দর, এজন্যই  তিনি ছেলেকে কলঙ্ক স্বরূপ মনে করেন। গল্পের কথক লেখক। লেখকের বন্ধু সফর। লেখক দুইজনের কথোপকথন ও বর্ণনায় আশ্চর্য কথাভুবন তৈরি করেছেন। সফর মেধাবী ছাত্র, লেখক সফরের দেহের ওপরের অংশকে ফুলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ভারতবর্ষের সমাজ ব্যবস্থায় অকেজো বা পঙ্গু হয়ে জন্মানো যেন অপরাধ ! সেই অপরাধ জীবনের চিত্ত বিক্ষুদ্ধ হৃদয় যন্ত্রণার মর্মভাষ্য এই গল্প। স্বামী কৃষক, সন্তান পঙ্গু তাই এ সংসার সফুরা বিবির ভালো লাগে নি। সে অন্য পুরুষের সঙ্গে যৌন সংসর্গ করেছে। সফর অকেজো বলে উঁচু বারান্দায় উঠতে পারে না, তাই উঠোনে মাতার কলঙ্ক দেখতে হয়েছে। একটি সন্তান কত দুঃখ পেলে নিজের মায়ের কলঙ্কের কথা বন্ধুর কাছে ব্যক্ত করতে পারে তা এ গল্প পড়লেই উপলব্ধি করা যায়। সফরের সেই মর্মবেদনাই লেখকের লক্ষ্য। সফর যেন হেরে গেছে মাতার কাছে লাঞ্ছনা পেয়ে –

ক. “ আমার জগৎ নাই। সে কথার কামাই নাই নাই। দাঁড়াতে পারব না, সে কথার গাওনা ফুরায় না। আমি মায়ের পাপ। মা বলে, তার রৌপের কী দাম ? কী কাজে লাগল অমন চেহারা। এ কথা রোজই কি বলতে হবে ? হরদিন একই ভনিতে, একই পালা।“

খ. “ মায়ের আমি কলঙ্ক দোস্ত। সেই মা বলছে, এই পা মরা। কখনও ভাবতেই পারিনি এমন হবে। দাঁড়িয়ে ওঠার সাধ্য না থাকে,আমি যে পুরুষ, দুই চোখে দেখেছি। মা মাঝে মাঝেই বাপের বাড়ি চলে যায়। বাপকে দেখতে পারে না আমারই জন্যে।“(নির্বাচিত গল্প, পুস্প, পৃ. ২৩)

কিন্তু আবুল বাশার তো পরাজয়ের শিল্পী নন, তিনি সফরের মানস পরিক্রমা জয়ের পথে নিয়ে গিয়েছেন। সফর আজ যৌবনে প্রবেশ করেছে, যৌনতার লক্ষণ স্বরূপ পায়ে লোম ফুটে উঠেছে। সফর আজ বিড়ি তৈরির কাজে নিযুক্ত, বিবাহের স্বপ্ন দেখেছে। সে ভালোবাসে হাসিনাকে। সফর আজ ভারত ভ্রমণে বেড়িয়েছে হাসিনার দাদা বারির সঙ্গে। তাঁর মনে হয়েছে ভারতভ্রমণ করলেই বোধহয় সে যোগ্য পুরুষ হিসেবে বিবেচিত হবে। ভারত ভ্রমণ থেকে এসে সে বিবাহ করে হাসিনাকে। কিন্তু সমাজের অভিসম্পাত দেয় সফরের ছেলেকে নিয়ে, যা আজ প্রবল ভাবে আঘাত করেছে তাঁকে-“ আমি মানুষ নই দোস্ত। ভারতবর্ষ ঘুরেছি অন্যের দয়ায়। গিনি দয়া করে আমাকে বিয়ে করেছে। ওই শিশু জানে আমি বাপ হতে পারিনি !” তেমনি এসেছে জমি বর্গার প্রসঙ্গ। সফরের জমি বর্গাদার ইয়াকূবের নামে যায়। সে জমি হারা হয়ে পাগল হয়ে যায়। নিজের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোথায় থাকবে সেই ভাবনায় ভাবিত হয়। ছেলেকে পিটুলি গাছের ফল পেড়ে দিতে সে কবরে পড়ে যায়, ফলে বাকশক্তি হারায়। কিন্তু হাসপাতাল যায় নি সফর। শুধু মৃত্যুর আগে লিখে রেখে গিয়েছিল-

“ হাসপাতাল যায় নি সফর। মৃত্যুর আগে বাঁকা হাতে কেঁপে কেঁপে সে লিখে গিয়েছিল ; আমি পিতা। আমি স্বামী। আমি সন্তান, হাজী সাহেব। ওই শিশুও আমারই বীজ। তবু কীসের পাপ ! তামাম ভারতবর্ষে সে- কথার উত্তর মেলেনি। তবু মরা পায়ে কেন ওভাবে লোম এসেছিল খোদা !”(তদেব, পৃ. ৩০)

সময়ের সাথে মূল্যবোধ কীভাবে পাল্টে যায় ও অভাব কীভাবে মানুষকে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের শেষ প্রান্তে পৌঁছে দেয় তা ফুটে উঠেছে ‘ ফাউ’ গল্পে। পঁচিশ বছরের ব্যবধানে ক্ষয়িষ্ণু পৃথিবী কত পাল্টে গেছে, স্বার্থমগ্ন ও আত্মসুখচরিতার্থ মানুষদের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে লেখকের দৃষ্টি সেদিকে। দরিদ্র মানুষকে কত কৌশল অবলম্বন করে বাঁচতে হয়, বাঁচার জন্য নানা মিথ্যা প্রতরণার অবলম্বন নিতে হয়-  তবুও মানুষ বাঁচে। বিবর্তিত পৃথিবীতে পাল্টে গেছে মানুষ, মানুষের স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা। আসলে সময় পরিস্তিতির কাছে তো বিসর্জন দিতে হয় স্বপ্ন ও ইচ্ছাগুলিকে- সেই ইতিবৃত্তই এই গল্প। এ গল্পের কথা পড়তে গিয়ে প্রথমেই মনে পড়বে রবীন্দ্রনাথের ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পের কথা। এ গল্পে মুসলিম আবিদ খেজুর বিক্রেতা। জিনিসের বদলে সে খেজুর দেয়। শাবানের স্ত্রী আতরি সন্তানের জন্য খেজুর কিনে দিতে পারে নি। কিন্তু ছেলে খেজুরের জন্য শুধুই আবদার করে। শেষে আবিদ জানায় সামান্য ভাত দিলে সে খেজুর দিতে পারে, ফলে আতরি ভাত দেয় কিন্তু আবিদ ভাত খেয়ে খেজুর না দিয়েই পালিয়ে যায়। আবিদ যেতে গিয়ে ঈশ্বরতলায় বিশ্রাম নেয় লাল মিঞার আমগাছতলায়। লাল মিঞা জানায় গাছ থেকে পড়া সমস্ত আম সাধারণ মানুষের, সেখানে লাল মিঞার কোন অধিকার নেই। লাল মিঞার এই সহানুভূতিবোধ দেখে পাল্টে যায় আবিদের চরিত্র। প্রতারক আবিদ হয়ে ওঠে সহনশীল, রাতের অন্ধকারে শাবান মুনসির বাড়িতে খেজুর দিয়ে আসে-

“ আবিদ কোনক্রমে বলে – এই দ্যাশে কাহিনী বলে মনিষ্যি। সেই কাহিনীর ভিতর বাস করে তেনারা। ই খানে পাপ করতে নাই। পাখির যা দয়ামায়া, আমার তা নাই শাবান ভাই।কুকুর আগলালো ছোট খোকা তারে আমি খেজুর দিই নাই। তামাম রাত এই মাথাডা কাঁই কাঁই করে কাঁসির পানা কাঁদে। পরানডা ডুকরায়। দ্যান, খুকারে খেজুর দ্যান। আমি পালাই।“( তদেব, পৃ. ১৩৬) 

 এ ঘটনার পর কেটে গেছে পঁচিশ বছর। গ্রামে আবার এসেছে দ্বিতীয় আবিদ। গল্পের প্রথম অংশের প্রক্ষাপট ছিল মুসলিম জনজীবন। দ্বিতীয় অংশে একই কাহিনি থাকলেও হিন্দু সমাজের মধ্যে কাহিনি গড়ে উঠেছে। দ্বিতীয় আবিদও খেজুর বিক্রতা, জিনিসের বদলে খেজুর দেয়। চম্পাবতীর বাড়িতে কিছু না থাকায় সামান্য ভাতের বিনিময়ে খেজুর দেওয়ার প্রসঙ্গ আসে। প্রথমে আবিদ ভাত খেয়েই পালিয়ে গিয়েছিল কিন্তু দ্বিতীয় আবিদ খেজুর দেয়। কিন্তু হেমলতার ছেলে খেজুরের লোভে পিছু নেয়। গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে দ্বিতীয় আবিদ দেখে সব পাল্টে গেছে। সেই আমগাছ আছে ঠিকই কিন্তু গাছ মুকুল অবস্থাতেই বিক্রি হয়ে গেছে। এমনকি নৌকায় দ্বিতীয় আবিদ অসুস্থ হয়ে পড়লেও কেউ সাহায্য করে না- তখন তাঁর মনে হয় সবই বানানো গল্প-‘সব ঝুট হ্যায়’। আসলে বিবর্তিত সময়কেই লেখক ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। শতাব্দীর শেষ লগ্নে এসে মানুষ কীভাবে ক্ষুদ্র পরিসীমার মধ্যে গণ্ডিবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, সংকটময় সময় মানুষকে পরিস্তির দাসে পরিণত করেছে তা উঠে এল এ গল্পে। আজ মহান লাল মিঞা হয়ত নেই কিন্তু সেই গাছ আছে, লাল মিঞার বিদায়ের সাথে সাথে তাঁর পিতার নীতি- আদর্শ গুলিও যেন বিদায় নিয়েছে। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আত্মসুখই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে।

        নিম্নবিত্ত মুসলিম জীবন নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘ছাড়ান’ গল্প। এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে প্রয়োজন খাদ্য ও অর্থ, সেখানে ভালোবাসার কোনো দাম নেই।ঘরে অর্থ না থাকলে ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায় – সেই সত্য আবার পরিস্ফূটিত হল ‘ছাড়ান’ গল্পে। চাষি শুকদ্দি ও স্ত্রী সিতারার দারিদ্র্যের সংসার। আবুল বাশার প্রান্তিক মুসলিমজীবন ফুটিয়ে তুলতে এক দক্ষ কারিগর। কেননা এ জীবন তিনি চেনেন, এ জীবন তাঁর চোখে দেখা। বর্তমানে নগরে থাকলেও প্রান্তিক মুর্শিদাবাদেই তাঁর শৈশব কেটেছে। সেই অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করেই তিনি গল্প গড়ে তোলেন। শুকদ্দির সংসার দারিদ্রে ভরা। বৃষ্টি নামলে আবার ফসল হবে, কাজ হবে – সেই আশাতেই সে বসে আছে। সংসারের অভাব ঘোঁচাতে সে কিন্তু বসে থাকে নি, নানা সময় নানা কাজ করেছে। সিতারা স্বচ্ছল পরিবারের মেয়ে, শুকদ্দির সংসারে এসে সে সুখের মুখ দেখেনি। সে বিবাহিত জীবনে কিছুই পায় নি। সিতারার ‘নাই’ এর তালিকা অনেক বৃহৎ-

“ আমি ফুরিয়ে যাচ্ছি। বড় ভাইয়া আমার কাপড় নাই। ব্লাউজ নাই। আশমানতারা সেমিজ নাই ( যা ছেলেবেলায় পরেছে সিতারা, মনে পড়ে)। মুনশীগঞ্জী জামা নাই। সোনাপট্টির সায়া নাই। জনকপুরী খয়ের নাই। হাসানপুরি ছাঁচি পান নাই। বাবুগঞ্জের সুপারি নাই। চ্যাটার্জীর জিয়াগঞ্জী জর্দা নাই। ‘বৌদি’ তরল আলতা নাই। তেহরানী আতর নাই। কাসাই থেকে কেনা ঠোঁটের পালিশ নাই। কপালে চন্দ্রপানা টিপ নাই।“(তদেব, পৃ. ১৬৭)

 চরম অভাবে ক্লান্ত সাতিরা আজ তালাক চাইছে। শুকদ্দির প্রতি তাঁর যে ভালোবাসা নেই তা নয়- পেটের জ্বালায় অভাবের চরম সীমায় পৌঁছে সে আজ বিচ্ছেদ চাইছে। এক পরাজিত নায়ক শুকদ্দি। তাঁর সংসারে অভাব আছে ঠিকই কিন্তু বুকভরা আছে ভালোবাসা। শুকদ্দি আজ আর কোনো প্রতিবাদ করে নি। সে মেনে নিয়েছে নিজের ভবিতব্য। কোনো প্রতিবাদ নয়, পরাজিত মানুষের মরমি ভাষ্য রচনা করেছেন লেখক। শুকদ্দি তাই একটি বাক্যও উচ্চারণ করে নি, পরাজিত মানুষেরা বোধহয় নীরবতাকেই শ্রৈয় মনে করে। তাঁরা বুঝি শুধু চেয়ে থাকতেই পারে আর মনে মনে অভিশাপ হানে বিধাতার প্রতি। শুকদ্দির নামই তো ছিল মুস্তাফা নবী। নবী জীবনের আদর্শ সে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছে। সাতিরা বিচ্ছেদ চেয়েছে কিন্তু অন্তরে ক্ষত বিক্ষত হয়েছে-

“ সিতারা স্বামীর চোখে চোখে রেখে শক্ত করে চাইল। ভীষণ দৃঢ়স্বরে বলল, তালাক দাও। বৃষ্টির দোহায় কত দেবে ? দাও তালাক ! ধমক দিয়ে উঠল সিতারা। বলল – যখন চাইব , তখনই দেবে। তুমি আমাকে ভালোবাসো বলেছিলে। আজ বৃষ্টি হবে না। মিথ্যুক কোথাকার ! দাও বলচি। তিন মাস ধরে কত স্তোক শুনালে। এক এক ছক ছোঁদা পানিতে কারো মন ভেজে বুঝি ! ভাঙলা মুনিশ! ছোটলোক !”(তদেব, পৃ. ১৭০)

নক্শাল আন্দোলনের ফলে লেখকরা ভূমি মাটি মেশানো মানুষের কাছে গিয়েছিল। ফলে প্রান্তিক ভারতবর্ষের প্রকৃত চেহারা উঠে এসেছিল।মাটি মাখানো ভূমিজ কৃষকের কথা  উঠে এসেছিল। তেমনই একটি গল্প হল আবুল বাশারের ‘আবালিস নয়’। এ গল্প পড়তে গিয়ে পাঠকের শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পের কথা মনে পড়তে পারে। গফুর ও আমিনা চটকলে কাজ করতে গিয়েছিল, সামান্য খাদ্যের জন্য লড়াইয়ের চিত্র সেখানে আমরা দেখেছিলাম। এ গল্পেও নিজাম শা ও কন্যা সাহেদা গ্রাম থেকে সমস্ত হারিয়ে শহরের পথে পা দিলেও জমির আকর্ষণ তাঁদেরকে স্তব্ধ করে দেয়- এভাবেই দুটি নরনারীর আলেখ্য লেখক তুলে ধরেছেন। গল্পের কাহিনি এমন- নিজাম শা ঘাসুড়ে, তবে চোর বলে তাঁর বদনাম আছে, কন্যা শাহেদা ফসল কুড়ানি। শাহেদের বিবাহ হয়েছিল বৃত্তশালি জমিরের সাথে। কিন্তু সে স্ত্রীকে ফিরিয়ে দিয়ে গেছে শ্বশুর চোর বলে। নিজাম আজ ভূমিহীন ক্ষেতমজুর, কিন্তু কুসুমঘাতা অঞ্চলে সমস্ত জমি নিজামের পিতার ছিল। বর্গা আইন, টিপ ছাপ ও সুদের ফলে সব জমি হাতছাড়া হয়েছে। বুলবুলি পাখি ফসল নষ্ট করে বলে নিজামের পিতা সন্তানদের হাতে তুলে দিয়েছে ‘খটখটি’। ‘খটখটি’ হল অদ্ভুত শব্দের যন্ত্র, যে শব্দ শুনলে পাখিরা পালায়। আজ জমি চলে গেলেও পাখি তাড়ানোর অভ্যাস যায় নি-

“ সেই অভ্যেস তো যায়নি, সোনার ধান-জমি হাত ফসকে চলে গিয়েছে। কী করে যে গেল, কিছুতেই বোঝা গেল না। জমি নেই, অভ্যাস আছে। লোকে সে কথা বোঝে না। নাদির শা- বাপ বলত, -নাদির শা চলে যায়, নাদিরের স্বভাব থাকে। ইংরাজ যায়, ইংরাজের স্বভাব থাকে, বর্গী যায়, বর্গী পাখি থাকে। বাপ বলত এইসব ভারী ভারী কথা। বলত- তাড়াবি, যার পাবি তাড়াবি, সেইডে পুণ্য বাপজান, নেকি।তা সেই কারণেই খটখটি বাজানো। লোকে ভাবছে পাগল মতলববাজ।“( তদেব, পৃ. ১০৫)

শাহেদার কখনও মনে হয়েছে স্বামীর কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইবে কিন্তু যায় নি। নান্নু প্রথমে প্রহার করেছিল নিজামকে, কিছুদিন পর নিজাম সে প্রতিশোধ নেয়। ফলস্বরূপ নিজামের ঘর পুড়িয়ে দেয়। সমস্ত হারিয়ে নিজাম ও শাহেদা ভিখারি হতে শহরের স্টেশনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। গ্রামে তো আর ভিক্ষা করা চলে না তাই নিজামের এই যাত্রা। পথভুলে তাঁরা প্রথমে জমিরের বাড়িতে এসে পড়ে। জমিরের মা ভিখারি ভেবে সামান্য চাল দেয়। রাতে জমিরের বাড়িতে থাকলেও ভোর রাতে জমির বলে চোরের কন্যাকে সে স্ত্রী হিসেবে রাখতে পারবে না।জমিরের এই কথায় এক ভয়ংকর উত্তর দেয় শাহেদা-

“ জমির কোন জবাব করতে পারে না। জমির দাঁড়িয়ে পড়ে। বাপ মেয়ে আর দাঁড়ায় না। শেষবারের শেষ কথাটি বলে শাহেদা। পিছনে ফিরে স্বামীকে অতর্কিতে কথা গুলি ছুঁড়ে দেয়- দেহ দিইছি, বিনি মাগনা জমির শা। বদলে বাপ মেয়ে ভাত গিলছি। শোধবোধ হয়েছে। সালাম আলেকুম। এর চেয়ে বেবুশ্যা কি খারাপ ? বাপু গো ! খারাপ নাকি ?”( তদেব, পৃ. ১১৪)

মূল্যবোধের অবক্ষয়ের এক নিষ্ঠুর সত্য এখানে উঠে এল। পথে বেড়িয়েও তাঁরা স্টেশনে যায় নি। জমির প্রতি আকর্ষণ ও ভালোবাসাই নিজমকে আবার পাখি তাড়াতে উদ্যত করেছে। নিজাম চোখের সামনে ফসল নষ্ট হওয়া মেনে নিতে পারে নি, তাই জমিতে নেমে গেছে। গফুর কৃষক থেকে শ্রমিকে পরিণত হয়েছিল কিন্তু নিজাম জীবিকা পাল্টায় নি। জমির প্রতি আকর্ষণেই থেকে গেছে। হোক না পরের জমি, কোনদিন তো নিজেরই ছিল। গফুর আত্মসম্মান বিশিষ্ট কৃষক, নিজামের আত্মসম্মান নেই- চুরিই তাঁর বৃত্তি। এ চুরির জন্য কোনো গ্লানি বা অপরাধবোধ নেই, বরং আনন্দ আছে কেননা এ জমি তাঁর পূর্বপুরুষের। অমর মিত্রের ‘দানপত্র’ গল্পে সাহেবমারি বাস্কে তাঁর জমি উত্তরপুরুষকে দিয়ে যাচ্ছে দানপত্র লিখে, এ দানপত্র থাকে বাক্সে, কিন্তু জমি দখল করে নিয়েছে শতপথি বাবুরা। অথচ চাষ আবাদ সাহেবমারি বাস্কের উত্তরপুরুষ করে যাচ্ছে। নিজামের  আজ জমি নেই কিন্তু পূর্বপুরুষের জমির প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আছে, সেই ভালোবাসা থেকেই সে পাখি তাড়ায়। হোক না সে মানুষের জমি, পাখি তাড়ানোই যেন তাঁর সত্তায় জড়িয়ে আছে।

32