সোমা সরকার

আজ প্রায় দের মাস। পৌলমির শরীরটা ঠিক নেই। সব সময় ক্লান্তি। তারপর কাজের চাপ। তাই ছুটি নিয়ে কলকাতা নিজের ফ্ল্যাটেই আছে। সকাল বিকেল মায়ের ফোন। কেমন আছিস? খাবার খেয়েছিস? মিনতি কে আজ এটা রাঁধতে বল। শরীর কি খুব খারাপ?? আমি যাবো?? সকাল বিকেল মায়ের চিন্তা মূলক হাজার প্রশ্ন। সাথে দাদা ও বৌদি তো আছেই। কিন্তু এতো ফোনের মাঝেও পৌলমি অপেক্ষা করে স্পেশাল কারোর ফোনের। সেও পারে করতে। তবে সেই জন পৌলমি থেকেও ব্যস্ত। ফোন করলে কথা হয়। তবে সময় নিয়ে নয়। তাই সে অপেক্ষা করে কখন সেই জন ফোন করবে। সে মানে রাহান। পৌলমির গোপন বর। গোপন মানে পরিবারের অমতে লুকিয়ে বিয়ে। যদিও চাকরি সূত্রে একজন বর্ধমান আর একজন কলকাতা। ওদের কথা মূলত রাত ১০ টা থেকে শুরু হয়। আর থামাটা নির্ভর করে রাহানের ডিউটির গতিবিধির ওপর। তবে কখনো কখনো হয়তো কাজের চাপে কথাটাও হয় না। রাহান বারবার পৌলমিকে বলেছে ছুটির কদিন বর্ধমানে গিয়ে থাকতে। ওর ছুটি নেই। আর রোজ কলকাতা থেকে গিয়ে পুলিশের ডিউটি করাটা খুব একটা সহজ না। পৌলমি রাজি হয়নি। কারন বিনা নোটিশে ওর মা যখন তখন আসতে পারে অসুস্থতার কথা শুনে। পৌলমি এর জন্য অবশ্য ওর কাকাতো বোনকে সকাল বিকেল খুব গালায়। একদিন তো কুট্টিকে বলেই দিলো, হ্যাঁরে শয়তান আমার কপালে বিচুটি ঘষে দেওয়ার কি খুব দরকার ছিলো?? কি কারনে বলতে গেলি আমার শরীর ভালো না?? শয়তান তোর জন্য আমি রাহানের কাছে যেতে পারছি না। কুট্টি তোকেও দাড়া মজা বোঝাবো। তুই সব জানিস। তারপরও…… বেচারা কুট্টি যে ভুল করেছে তা বুঝতে পারছে। রাহান বললো হঠাৎ করে অফিসে জ্ঞান হারালে। ফোন পেয়ে কুট্টি গেলো। আমি যাবার আগে ও বেচারাও তো ভ্যাবাচেকা খেয়েছিলো। যদি উঁচুনিচু কিছু হয় তাই হয়তো ফোন করেছে.. আজও কুট্টি ফোন করেছিলো। ও বলছে এবার অন্তত বাড়িতে আমরা সব জানাই যাতে। বলছে এতোবছর হলো। জেঠুও ৩ বছর হলো মারা গেছে। জেঠুর সাথে ওনার দেওয়া কথাও চিতায় গেছে৷ এখন জেঠিমা, দাদাকে সব বলেদে। নইলে আর কবে বলবি??জেঠিমারও তো বয়স অনেক হলো।তারপর হার্টের রুগী। অন্যর কাছ থেকে জানলে যতটা কষ্ট পাবে তোর মুখ থেকে শুনলে হয়তো না। রাহান বললো ঠিক বলেছে। তুমি কি ভাবছো পৌলমি?? কিন্তু সে তো চুপ। কথা নেই আর। বাড়িতে জানানোর প্রসঙ্গ আসলেই সে চুপ। কি জানো একটা চাপা ভয় ওকে চেপে ধরে।তারপর ইদানিং ওর মায়ের হার্টের সমস্যা। জানাতে গেলে যদি উল্টোপাল্টা হয়…. কিছু সময় চুপ থেকে পৌলমি রাহানকে বললো তোমার জন্য একটা ভালো খবর আছে। আগে তোমাকে বলবো। তারপর এবার বাড়িতে জানিয়ে দেবো। রাহান বললো ঝুলিও না৷ অপেক্ষা করিও না। বলো কি কথা?? পৌলমি বললো তুমি আসলেই বলবো। রাহান নাছোড়বান্দা । ওকে জানতেই হবে। অবশেষে পৌলমি বললো আমরা মা বাবা হতে চলেছি রাহান। একটু নিস্তব্ধতা। কথাটা রাহান বিশ্বাস করতে পারছে না । তাই হয়তো একবার,দুবার কয়েকবার একি প্রশ্ন সত্যি পৌলমি? আর একবার বলো.. আর একবার… দুজনেই আনন্দে আত্মহারা। তার মানে তুমি জানতে পৌলমি?? পৌলমি বললো পিরিয়ড মিস হয়েছিলো। এর আগেও হয়েছে। পরে আবার ঠিক হয়েছে। এবার ঠিক হয়নি। একটু সন্দেহ হলো। টেস্ট করলাম পজিটিভ। ভুল না ঠিক যাচাই করতে দু দুবার টেস্ট করলাম প্রতিবার পজিটিভ। রাহানের এবার একটু রাগ হলো। তুমি তাহলে কয়দিন আগেই জেনেছো। আর আমাকে আজ বলছো?? না, মানে তুমি রবিবার আসলে সারপ্রাইজ দিতাম। সে রাতে অনেক গল্প। নতুন ভবিষ্যত নিয়ে।ছেলে হলে কি নাম, মেয়ে হলেই বা কি নাম….. পৌলমির প্রশ্ন রাহান প্রথম বেবি কি হলে তুমি খুশি হবে??? রাহান বলে যেই আসুক সুস্থ ভাবে আসুক। তাও বলো না রাহান। প্লিজ প্লিজ। রাহান বলে মেয়ে…… একটু চুপ পৌলমি। চোখে খুশির জল। রাহানকে সে বললো আমি আমার বাবা মায়ের দ্বিতীয় সন্তান ছিলাম। আমার বোধ হবার পর বাবা প্রথম যেটা বলেছিলো, তুমি মেয়ে। পরিবারের সন্মান রক্ষার দায়িত্ব তোমার। দাদা যা পারে তুমি তা কখনোই পারো না করতে৷ তুমি পরের ঘরের সম্পত্তি। তাই সেই বুঝে চলবে। ভাবছি মানসিকতায় কত তফাৎ। ৩টে নাগাদ রাহানকে ওর এলাকায় একটা গন্ডগোল লাগার কারনে যেতে হয়। ডিস্ট্রিক সুপারেনট্যানডেন্ট অফ পুলিশ বলে কথা। আনন্দ নিয়ে মনে পৌলমি ঘুম।ভোর ৫ টা থেকে হঠাৎ করেই পৌলমির পেটে অসহ্য যন্ত্রণা। মনে হচ্ছে তলপেটটা ফেটে যাবে। ছটফট করছে। গোংরানির আওয়াজ শুনে নিয়তি দি পাশের ঘর থেকে ছুটে এসে পৌলমিকে ডাকছে। ওর যন্ত্রণা, চোখের জল, গোংরানি দেখে নিয়তি দিও কাঁদতে শুরু করেছে। একটাই প্রশ্ন। কি হয়েছে দিদি?? পৌলমি কাঁদতে কাঁদতে খালি বলেছে কুট্টিকে ফোন করো। কথা বলবো। ভোরে ফোন করলেই যে সবাই সাথে সাথে ধরবে সেটা ভাবাও ভুল। কয়েকবার ফোন করার পর কুট্টি ফোন ধরে ঘুমের ঘোরেই বলছে বলরে আমলা তোর আবার কি হলো? মিনতির কান্না জড়ানো কথায় ওর ঘুমের ঘোর কাটে। পৌলমির কাছে শুনে ও কিছু সময়ের মধ্যেই ওষুধ নিয়ে উপস্থিত হয়। পৌলমির ছটফটানি দেখে কুট্টি ওকে শান্ত করে ওষুধ দেয়৷ আসলে পৌলমির বোন গাইনি।পৌলমির যে মিসক্যারেজ হয়েছে তা ও পৌলমির কাছে ফোনেই শুনেছে। যতটুকু চিকিৎসা দরকার বোনের কারনে বাড়িতেই হয়। তারপর প্রায় ১২ পর্যন্ত পৌলমি ঘুমায়। এর মাঝে কয়েকবার রাহানের ফোন আসে। রাত জেগেছে। তাই হয়তো ঘুমাচ্ছে ভেবে বিরক্ত করেনি রাহান। তারপর নিজের চাপ। ১২ টায় ঘুম ভেঙে রাহানকে প্রথম ফোন পৌলমির। কাঁদতে কাঁদতে সব বলে সে। রাহানেরও মনটা খারাপ হয়ে যায়। পৌলমি বারবার বলে আজ তোমাকে কাছে চাই। একটু হলেও আসো প্লিজ। আমার ভালো লাগছে না৷ কিন্তু রাহানের পা বাঁধা। ও চাইলেও আসতে পারবে না ডিউটি ছেড়ে এই পরিস্থিতিতে। পৌলমি বারবার অবুঝের মতো জেদ করছে। আর চোখের জল মুছে চলেছে। পৌলমি ভেবেছিলো রাহান রাত হলেও অন্তত একবার আসবে। আসবেই। কিন্তু রাহান আসতে পারলো না৷ ফোন করে শান্তনা দিয়েছে।বুঝিয়েছে। বারবার ফোন করেছে। পৌলমি নিজেকে নর্মাল দেখিয়েছে। হেসেছে। কথা বলেছে। কিন্তু মনের কোনে অভিমান, দুঃখ পুষতে শুরু করে দিয়েছিলো সে ঐ দিন থেকেই৷ পৌলমির কেনো জেনো মনে হয়েছিলো রাহান চাইলেই সেই দিন কয়ঘন্টার জন্য আসতে পারতো। কিন্তু আসেনি। কিছু দিন পর পৌলমি কাজে যোগ দিলো। কাজের চাপ, কলিগ, বন্ধু দের সাথে সময় কাটাতে শুরু করলো। নিয়ম মাফিক রাতে রাহান। রোজ গল্প। এটা ওটা। অনেক কিছু। কিন্তু বাচ্চা হারানোর কথা আর কোনোদিন মুখে আনেনি।মিসক্যারেজের যন্ত্রণা আর মনে করতে চায়নি। এর মধ্যে রাহান এসে তিন দিন থেকে গেছে। পৌলমির হাসি মুখে আগের মতোই। সব স্বাভাবিক। এর মধ্যে ডাক্তার দেখাতে পৌলমির মা দাদা বৌদি আসবে। এবার শুরু আসল লুকোচুরি। রাহানের যাবতীয় জিনিস ব্যাগে ভর্তি হয়ে সব কুট্টির বাড়িতে। ওখানে চাপ নেই। কুট্টির বর আছে যে। এমন সুন্দর ভাবে পৌলমির ফ্ল্যাট টিপটপ করে দিতো নিয়তি পৌলমি আর কুট্টি যে স্বয়ং ফেলুদা আসলেও হয়তো ফ্ল্যাট দেখে সত্য উদঘাটন করতে পারবে না। সেখানে মালদা থেকে দূরে গ্রামের এক মা আর তার ছেলে কি করে সেই সত্য উদঘাটন করবে? হতে পারে মুখার্জি বাড়ির প্রতিপত্তি বিশাল। বিষয়-আশয় প্রচুর। তবুও….. আনন্দ হুল্লোড় সব করে কয়দিন পার হলো। যাবার আগের দিন পৌলমির মা বললো এবার বিয়েটা করতেই হবে তোকে। এরপর আর কেউ বিয়ে করবে না। আমি বেঁচে থাকতে থাকতে তোর বিয়ে দেবো। পৌলমি বলে বুড়িকে আবার কে বিয়ে করবে? আমার বিয়ের বয়স আছে নাকি আর… বলেই সেই হাসি… মা একটু চোখ পাকিয়ে উঠে গিয়ে রান্না ঘরে মিনতিকে রান্নার পদ বলছে। আর মাঝে মাঝে গোপন কিছু আছে কি না… থাকলে তথ্য পাওয়া যায় কি না খোঁজ করে। তবে মিনতি রাহান দাদা বাবুর ফ্যান। আর পৌলমির নেওটা। তাই নমক হারামি সে করবে না কখনোই। দাদা বৌদির গল্প,খুনসুটি । পৌলমির সাথে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি বৌদি শ্রীতমার। মুর্শিদাবাদের মেয়ে। কল্যানিতে মাস্টার ডিগ্রি করা। এখন মালদাতে একটি স্কুলে পড়ায়। ননদের কারনে খুব গর্বিত। তবে হেব্বি কিপটা। যাকে এককথায় মক্ষী চুষ বলে। তবে ওটা নিন্দুকেরা বলে। বৌদি ননদের কাছ থেকে ২ হাজার টাকার জিনিস নিলে ২০০ টাকার জিনিস অবশ্যই ননদকে দেয়। এতটা উদারতা আছে তার। পৌলমির বাড়ির লোক ৭ দিনের কথা বলে এসেছিলো। কিন্তু ২১ দিন পার। ওদিকে রাহান অস্থির পৌলমির জন্য। পৌলমির এবার একটু মজাই হচ্ছে। থাকুক আরো কিছু দিন। ভালো লাগছে। ওর অভিমান এখন চাপা রাগে পরিনত হয়ে গেছে। সব বুঝেও নিজের অভিমান তার পর রাগ পৌলমি কন্ট্রোল করতে পারেনি। অবশেষে ২২ দিনের দিন দাদা বললো আমরা কাল যাবো। টিকিট হয়ে গেছে। কুট্টি পৌলমিকে সেদিন বারবার বললো রাহান দাকে ডেকে নে। আজ সব বলেদে। আর লুকিয়ে রাখিস না। তোরাও তো এতে চাপ মুক্ত হবি। প্লিজ বলে দে। পৌলমি পারলো না। সবাই ব্যাগ নিয়ে নামছে। টয়লেটে থাকার কারনে শ্রীতমার নামতে একটু দেরি হলো। তবে যাবার আগে বলে গেলো আগামী মাসে সম্পত্তি কাগজ তৈরি হবে। দাদার নামে তোমার ভাগ লিখে দিও। তাহলে তোমার গোপন গল্পে ওবাড়ির কেউ মাথা ঘামাবে না। আর তোমার মনে চেপে থাকা সেই আতঙ্ক তোমার রাহান খানকে ছুঁতে পারবে না। আসি। ভালো থেকো।

52