বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

২৫ )

 আবুল বাশারের ‘কাফননামা’ গল্পটি সুন্দরবন অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে লেখা।মধুবাস, মির, সুধান চরিত্রগুলিকে লেখক অসাধারণ নৈপুণ্যের সঙ্গে গড়ে তুলেছেন। সুন্দর মধুবাস বাঘের থাবার মুখে পড়ে হয়েছে কুৎসিত। এই কুৎসিত চেহারাই তাঁর জীবনে ট্র্যাজেডি ডেকে এনেছে। নিজের অন্তরে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে নিজের রূপের জন্য। মধুবাসের স্ত্রী জাহিরা অসাধারণ রূপবতী। এই রূপের জন্য সে স্বামীর কুৎসিত রূপ মেনে নিতে পারেনি। যা মধুবাসকে জীবনের শেষ প্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে মিরের স্ত্রী ছিল কুরূপা, ফলে সে জাহিরার সঙ্গে অবৈধ প্রণয়ে মত্ত হয়। জাহিরাও মিরের রূপে সহজেই মুগ্ধ হয়। এই অবৈধ প্রণয়ই মধুবাসের আত্মহত্যার জন্য দায়ী। স্ত্রী হীন জীবন এ পৃথিবীতে হয়ত সর্বশূন্য ! তাই মধুবাস কাফন সঙ্গে নিয়েই থাকে-“এই নৌকায় মধুবাস কাফন কোলে বসে থাকত ওই ও পারে তাকায়ে, দেশত্যাগী মানুষ। একদিন খেত দিতে দিতে ঝুপ করে পানিতে পড়ে গেল, বাস। নৌকায় খোলে রয়ে গেল কাফন। ডাঙায় কবর নসিবের ব্যাপার। হল না। লোকে বলল, কাফন বুকে নিয়া নাও ভাসছে মির সাহেব। কী করবেন ?” (শ্রেষ্ঠ গল্প, দে’জ, পৃ. ১৮৪) তবে মধুবাস আজ স্বপ্ন দেখিয়েছে মিরকে। সে আজ নিজের কাফন প্রত্যাশা করেছে। তেমনি চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব লেখক আশ্চর্য ভাবে দেখিয়েছেন। মির নৌকায় একটি ডায়েরি রেখে গেছেন। সে ডায়েরি পড়তে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় সুধান-“ আমার বিবি কুরূপা। মধুবাসের  বেওয়া জাহিরা রূপবতী, অকাট্য আগুন। জিনার পাপে আমি জিসম- এ খুয়াইসের গম্বুজ খাড়া করেছি। মধু গুঁড়ি কাদাকার ছিল। মানা কি যায়, কাদাকারের বিবি অত রূপসী হবে। ইচ্ছা, জাহিরাই আমার লাশে গোসল দিবে।“(তদেব, পৃ. ১৮৬) মুসলিম সমাজের নানা তত্ত্বকথা, ধর্মীয় লোকাচার, ধর্মের নানা গলিপথ তিনি আবিষ্কারে মত্ত। সেখানে কোনো হিন্দু লেখকের প্রবেশ সম্ভব নয়। তিনি সহজ-সরল কাহিনি ফাঁদেন না। নানা মিথ, রূপকথা, প্রচলিত বিশ্বাস- অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব বারবার তাঁর গল্পে ফিরে আসে। তাই তাঁর গল্পের সঙ্গে অন্য কারো গল্পের তুলনা মেলা ভার। এমনকি তিনি নিজেই বলেছেন-‘ আমি বহির্বাস্তবের তথাকথিত নিবিড় ডিটেলিং পছন্দ করি না।“( ‘গল্পের সমস্যা’) তাই কাহিনির রস বা গল্পের স্বাদ খুব সহজেই উপলব্ধি করা তাঁর গল্পে সম্ভব নয়। মুসলিম ধর্ম, রীতি-নীতি, লোকাচার, কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস – এক কথায় গোটা মুসলিম জীবনের সামগ্রিক বোধ নিয়েই তাঁর গল্পে প্রবেশ জরুরি – তাহলেই হয়ত পাঠক পাবেন তৃপ্তির স্বাদ।

‘কেন যে লিখি’ শীর্ষক অংশ থেকে আবুল বাশারের কিছু মন্তব্য তুলে ধরলে পাঠকের ধারণা স্পষ্ট হবে আবুল বাশারের সাহিত্য সম্পর্কে। উদ্ধৃতি একটু বৃহৎ হলেও পাঠকের কাছে লেখকের জীবনদর্শনের ধারণা দেওয়া জরুরি –

ক. “ কী লিখেছ ? কারা পড়বে এসব ? এমন অবজ্ঞা যখন দেখতাম, মনে মনে বলতাম, কী যে লিখি ছাই মাথা ও মুণ্ডু, আমিই কি বুঝি তার কিছু ?’ অবশ্যই আপন মনে বলা। কেউ সেকথা শুনতে পেত না। শুনতে পেলে আর রক্ষে ছিল না ! অবজ্ঞা মুহূর্তে ব্যঙ্গে পরিণত হতে পারত !কমরেডদের মুখের ওপর নজরুলের মতো কাব্যি করার জো ছিল না। নজরুল যেভাবে পরিত্রাণ খুঁজেছিলেন, আমার রাজনৈতিক দলের কাছে সেই কৈফিয়ৎ ছিল একজন স্রষ্টার, একজন লিখিয়ের নয়। আমি তখন মকশদারিতে দিনপাত করছি। ফলে তাত্ত্বিক নেতা যখন অবজ্ঞা না করে সহসা প্রশ্নকে গুরুতর যাচাইয়ের মধ্যে নিক্তিদণ্ড চড়াতেন, তখন সেই পার্টিঅফিস হয়ে উঠত বিচারসভা। স্রষ্টার জন্য সসম্ভ্রম প্রশ্ন নয়, একজন লিখিয়ের চর্চাকে সংশয়িত করা। ভেবে দ্যাখো, কারা তোমার রচনার পাঠক, কী বস্তু প্রণয়ন করেছ ?”

খ. “ দুঃখিনী দেশ ভারতবর্ষ আমার একটি অক্ষরকেও যে কখনও গণ্য করেছে তেমন প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। তবু লিখি। আমার কথা কেউ শোনে না, তবু আমি লিখে যাই। চৈতন্যের ক্ষরণ যদিন রুদ্ধ হবে, সেদিন আমার কথা থেমে যাবে, তার আগে নয়। বুকে একটা ভার চেয়ে আছে, কী সেই ভার, কেমন পাষাণ, আমি বর্ণনা করতে পারি না। মানুষ যতদিন মানুষকে অপমান, অনাদর ঘৃণা করবে, একজন অন্যকে পথে বসাবে, অন্যের রক্ত শুষে নেবে আপন হৃৎপিণ্ডে আর মুখে, যতদিন সে মারবে, পোড়াবে, কণ্ঠ থেকে গরল প্রবাহিত করবে বাতাসে, বোধিপিণ্ড ততদিন নিষ্পিষ্ট হবে – আমার মুক্তি হবে না। কেন যে লিখি, এই নিরন্তর জিজ্ঞাসা চলতেই থাকবে।“

গ. “আমার এই মহত্তম মাতৃভূমি, যেখানে কাজ পায় না মানব –মানবী ! অফিস আদালত রাইটার্স বিল্ডিং – এ একপয়েন্ট পাখা ঘুরছে, কাজ আছে কি নেই বোঝা যায় না – কলকাতার মহামহিম প্রদর্শনী যানজটে স্তব্ধতা – গ্রামে ভূমিবশ্য মানুষ শেয়াল –কুকুরের মতো পড়ে আছে, ভোট দেয় আর হাই তোলে, হামেশা ভূমিরাজনীতির জিঘাংসায় লিপ্ত থাকে পঞ্চায়েত –রাজ। অথচ প্রশ্ন করা হয়েছিল কী লিখছ ? তখন বাতাস ছিল অন্য রকম। একটি সোনার ছেলে শুধু আদর্শের জন্য প্রাণ দিয়েছিল অবলীলায়। একটি নয় অসংখ্য তারা। কেন আছি ? – এই যন্ত্রণার উত্তর দিতে কত প্রাণ গেছে। এভাবে প্রাণ গিয়েছে, জীবন শুধু ভুল মন্ত্রেও বিরান হতে – কিন্তু প্রাণের আকুতি মিথ্যা ছিল না।“

ঘ. “যে মানুষ কখনও ভালো করে মাথা তুলতে পারল না, কোমর যার সিধে হতে দিল না এই দেশ, কথায় কথায় যাকে অপমান সইতে হল, তার থেঁতো অপারগ জীবন, এবং তথায় ভাঙা –ছেঁড়া অসম্পূর্ণ মানুষের মধ্যেই জীবনটা আমারও গুঁজড়ে রয়েছে, সেখানেই ঘষড়াচ্ছি বারবার, তারই তৃষ্ণা আর আগুন, তারই সমগ্র যাপনের ভিতরে আমার মর্তভূমির সাড়ে তিনহাত জমি দখল রাখার চেষ্টা, সেই আপ্রাণ যুঝবার শক্তি জোগায় যে জীবন, তাইই আমার উৎস – সেই থাকা আর লেখার একটি সমীকরণ আছে। বাইরের প্রশ্ন দু’টিতে নয়, ভেতরের জিজ্ঞাসায় উপরে বর্ণিত মায়ের মতো আমি প্রতারণা করি এবং নিজেও প্রতারিত হই, কিন্তু সমীকরণ শেষ হয় না, থাকার সঙ্গে লেখার যে একটা দ্বন্দ্বও আছে। সেই দ্বন্দ্বের ঘর্ষণে যতটুকু উত্তাপ আর আলো পাই, সমীকরণে যে আনন্দ মেলে, প্রতারণায় যে আশ্বাস ভরে ওঠে, তাই –ই আমার বিষয় –আশয়।“ (কেন লিখি, মিত্র ও ঘোষ, জানুয়ারি ২০০০, পৃ. ২৪৭ – ২৫১)

                মাতা ও সন্তানের আশ্চর্য সম্পর্ক তুলে ধরেছেন ‘চোর’ গল্পে। সন্তান বাৎসল্যের কাছে আজ সমস্ত সত্য প্রকাশ করতে হয়েছে মাতাকে। মাতা ও সন্তানের সম্পর্ক পৃথিবীর সমস্ত সম্পর্ক গুলির মধ্যে বোধহয় নিকটতর- তাই অসম্ভব বিপদেও তা অস্বীকার করা যায় না- যা পারে নি আফলাতুন্নিসা বিবি ছাহেবা। গল্পের প্রক্ষাপট এমন – নজর আলি খেতমজুর। সাদিখাঁর দিবার থেকে নজর আলি ও তাঁর দল এসেছে হটে সরানের কালু মণ্ডলের বাড়িতে খেতমজুরি করতে। কাজ শেষ হলে নজর আলিয়া বাড়ি ফিরে যায়। কিন্তু বিদায়ের দিনে পথে নজর আলির থলেতে একটি থালা খুঁজে পায় কালু মণ্ডলের ছেলে আলতাফ। এই থালাতেই খেতে দেওয়া হত নজর আলিকে। চুরির জন্য নজর আলির ওপর অনেক প্রহর করা হয়। তবুও নজর আলি থালা ছাড়ে না। এই সামান্য চুরির জন্য গগন, শারাফৎ অনেক ভৎসনা করে নজরকে। এক সময় তারা থালা ফিরিয়ে দিতে বলে। নজরের ওপর অত্যাচারের সীমা চরমে পৌঁছে গেলেও সে সিদ্ধান্তে অনড়, শুধু বলে যায়-

“ দম নিয়ে নজর বলে ওঠে, বুলুক মা !তুই যেমুন মায়ের পোলা, আমিও মায়ের পোলা ! মাকে ডেকে লিয়ে আন, মা গায়ে হাত দিয়্যা কসম করুক,আমি তার কেউ লই, বুলুক ! আমারই এঁটো মাই চুষে তুই শালা আলতাফ এত বড়ডা হইচিস।… এ দুধ- থালি আমার। আমার পূব্ব জন্মের মুখ-দেখানী চেন্নাই। মুখ ভাসানী রোশনীদার ফুল- কাঁসার আরসি। মুই ছাড়ব না। ই হকের দান। নানীজানের দান।“(শ্রেষ্ঠ গল্প, পৃ. ১৪)

 একসময় নজর অজ্ঞান হয়ে পড়লে কালু মণ্ডলের ছেলে ইমানুল থালা নিয়ে ঘরে আসে। ঘরে এসে দেখে মাতা ( কালু মণ্ডলের তৃতীয় পক্ষ) আফলাতুন্নিসার প্রথম পক্ষের সন্তান। সে সময় বিনা দোষে তালাক প্রাপ্ত হয়ে আফলাতুন্নিসা কালু মণ্ডলের ঘরে আসে, সঙ্গে নিয়ে এসেছিল থালাটা। সেই থালায় নাম লেখা ছিল নজর আলির – এ থালার প্রকৃত মালিক নজর আলিই। সামান্য চুরির ঘটনায় লেখক মাতা – পুত্রের সম্পর্ক যেমন আবিষ্কার করেছেন তেমনি আছে নিম্নবিত্তকে জিতিয়ে দেওয়ার পালা। প্রকৃত সত্য চাপা থাকার ফলে নিম্নবিত্তকে কীভাবে শোষিত হতে হয় তা যেমন দেখিয়েছেন তেমনি প্রকৃত সত্য কিছুতেই চাপা থাকতে পারে না তাও উন্মুক্ত করেছেন।

23