ডাঃ দেবব্রত রায়

নভেম্বর ১৪,২০২০: কাগজ কলমে রাজ্যে এবং দেশে করোনা সংক্রমণ আপাত দৃষ্টিতে নিম্নমুখী হলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয়বারের জন্য উর্ধমুখী সংক্রমণ প্রবণতার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত আমাদের রাজ্যের রাজধানীতে সরকারী হিসেবে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় এক লক্ষ। দেখা যাচ্ছে যে কোন কোন অঞ্চলে হঠাৎ হঠাৎ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে প্রচুর সংখ্যক মানুষ সংক্রমিত হচ্ছেন ।
এই প্রসঙ্গেই সম্প্রতি একটি শব্দ খুব শোনা যাচ্ছে– ‘সুপারস্প্রেডার ‘।চিকিৎসা শাস্ত্র মতে অতি অল্প সময়ের মধ্যে যাঁরা অতি দ্রুত সংক্রমণ অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারেন তাঁরাই ‘সুপারস্প্রেডার’।জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এই ‘সুসুপারস্প্রেডার’ রা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই শব্দটি যে কেবল সাম্প্রতিক সময়েই ব্যবহৃত হচ্ছে তা কিন্তু নয়। যে কোন সংক্রামক রোগের মারী থেকে মহামারী বা অতিমারী হয়ে ওঠার পেছনে এই ‘সুপারস্প্রেডার’দের অবদান থাকে।
দেখা গেছে যেসব আক্রান্ত মানুষদের শরীরে ভাইরাসের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি তাঁরাই প্রাথমিকভাবে এই গোত্রের হ’ন। আবার এই ভাইরাসের সংখ্যা বা ভাইরাল লোড নির্ভর করে ব্যক্তিবিশেষের নিজস্ব আভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটির উপর। এই প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হয়ে গেলে যেমন আক্রান্তের শরীরে ভাইরাস লোড অপেক্ষাকৃত বেশি হয় তেমনি প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি হলে আক্রান্ত উপসর্গবিহীন বা মৃদু উপসর্গ যুক্ত হয়ে থাকেন। মনে রাখা দরকার উপসর্গহীন হলেও সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষেত্রে এই ধরনের সংক্রমিতরা মারাত্মক ভূমিকা নেয়। এই দুই পরিস্থিতিই বিপজ্জনক। যার শরীরে ভাইরাসের সংখ্যা যত বেশি থাকবে সে তত বেশি মাত্রায় সংক্রমণ ছড়াতে থাকবে যদি নির্ধারিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলেন। আবার পর্যাপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি সম্পন্ন সংক্রমিত উপসর্গহীন বা মৃদু উপসর্গ যুক্ত হয়ে থাকেন বলে বেশির ভাগ সময়ই আচরনে শিথিলতা দেখান।ফলে এঁরা অন্যদের মধ্যে খুব দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে দেন নিজেদের অজান্তেই। এভাবেই তৈরি হয় ‘সুপারস্প্রেডার ‘।আবার দেখা গেছে যে যাদের সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষমতা অপেক্ষাকৃত বেশি অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা নিজেরা যে ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন আর যখন তা অন্যদের মধ্যে যাচ্ছে তাতে ভাইরাসের কিছু চারিত্রিক পরিবর্তন ঘটছে । সেই কারনে সুপারস্প্রেডারদের নিয়ে দুশ্চিন্তা অনেক বেশি। ‘নিউ নর্মাল ‘ যত এগুচ্ছে এঁদের নিয়ে চিন্তা ততই বাড়ছে। চিকাগোতে একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে একমাত্র সেখানকার রেস্টুরেন্টগুলো যদি স্বাভাবিকভাবে খুলে দেওয়া যেত তবে অন্তত অতিরিক্ত ৬ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হতেন যা স্বাভাবিক অবস্থা থেকে প্রায় তিন গুন বেশি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন – এই সুপারস্প্রেডার কোন পরীক্ষায় ধরা যায় কিনা। যেহেতু প্রাথমিকভাবে মনে করা হয় যে আক্রান্তদের শরীরে ভাইরাসের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি সেইসব মানুষদের ‘সুপারস্প্রেডার’ হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে । এখনো পর্যন্ত আমাদের দেশে সর্বত্র করোনা সংক্রমণ নির্ণয়ের জন্য যেসব পরীক্ষা চালু আছে তাতে কেবল সংক্রমণের অস্তিত্বই ধরা যায়, অন্য কিছু নয়। ভাইরাল লোড বোঝা যায় না। অবশ্য এ ব্যাপারে সম্প্রতি ক্যুইন্সল্যান্ডের একটি কোম্পানি আশার কথা শুনিয়েছে। তাঁরা দাবি করেছেন যে তাঁরা একটি পরীক্ষা পদ্ধতি বাজারে আনতে চলেছেন যাতে একই সঙ্গে শরীরে ভাইরাস লোড জানা যাবে। ফলে একই সঙ্গে বলে দেওয়া যাবে সংক্রমিত ব্যক্তির ‘ সুপারস্প্রেডার ‘ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কতটা।আমরা এখন দিন গুনছি ভ্যাকসিন এসে পৌঁছানোর। ভ্যাকসিন আসাটা যেমন জরুরী সমভাবে প্রয়োজন ‘সুপারস্প্রেডার ‘ চিহ্নিতকরণ যাতে সংক্রমণ হলেও তা’ নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

124