বক্সা ফোর্ট

শৌভিক রায়

ব্রিটিশ আমলে আন্দামানের সেলুলার জেলের পরেই ছিল দুর্গম ও দুর্ভেদ্য, বক্সা ফোর্ট, ডুয়ার্সের তো বটেই, উত্তরবঙ্গের গর্ব। হিংস্র শ্বাপদের গা ছমছমে বক্সা জঙ্গলের উত্তরে, সিনচুলা পাহাড়ে, ২৮৪৪ ফিট উচ্চতায়, কে বা  কারা ফোর্টটি নির্মাণ করে সে বিষয়ে স্পষ্ট জানা যায় না। কারো মতে ফোর্টটি তিব্বতিদের তৈরী, কেউ কেউ মনে করেন কামরুপীরা ছিলেন এর নির্মাণের পেছনে। আবার ভুটিয়ারা এই ফোর্টের নির্মাতা এরকমটাও মনে করেন ঐতিহাসিকেরা। আরও ওপরে ৪৫০০ ফুট উচ্চতায় রয়েছে রোভারস পয়েন্ট। মাত্র ১১ কিমি দূরে ভুটান। সিনচুলা গিরিপথ পেরোলেই অসামান্য রূপম উপত্যকা। 

বক্সা ফোর্ট কবে তৈরী সে নিয়ে বিতর্কের মাঝে কিছু তথ্য জরুরী। মনে করা হয়, ১৬৬১ সালে প্রাণভয়ে ভীত কোচবিহার-রাজ প্রাণনারায়ণ এই ফোর্টে এক বছর কাটিয়ে ছিলেন। ফোর্টটি তখন ‘জং’ নামে পরিচিত। পরবর্তীতে ‘জং’-এর অধিকার নিয়ে লড়াই বেঁধে থাকতো ভুটান ও কোচবিহারের। প্রথম ইঙ্গ-ভুটান যুদ্ধে, ইংরেজ ক্যাপ্টেন জোনস ১৭৭৩ সালে বক্সা অধিকার করলেও, ১৮৬৫ সালে সিনচুলা চুক্তি অনুসারে ফোর্টটি পাকাপাকিভাবে ব্রিটিশদের দখলে আসে এবং ‘জং` বা দুর্গের দখল নেয় তারা।

বক্সা ফোর্টের দখল নিয়ে ব্রিটিশরা  কিছু সংস্কার করেছিল। ফোর্টটি পাথরের দেওয়ালে মুড়ে ফেলা হয়, টিনের ছাদ দেওয়া হয়। নির্মিত হয় অফিসারদের থাকবার ঘর, পোস্ট অফিস। জলের ব্যবস্থাও করা হয়। বক্সাকে দেওয়া হয় মহকুমার মর্যাদা। ১৮৭৩ সালে সেনা মোতায়েন-সহ তিনটি পিকেট বসানো হয় বক্সায় এবং পরের বছর বক্সাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় মহকুমার মর্যাদা। ১৯০১ সালে রাজাভাতখাওয়া থেকে জয়ন্তী পর্যন্ত মিটার গেজ রেলপথ চালু হলেও ফোর্টের দুর্গমতা কিন্তু একই থেকে যায়। ১৯১৪ থেকে ১৯২৪ অবধি মিলিটারি পুলিশের ছাউনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল ফোর্টটি। অবশেষে স্বাধীনতা আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে থাকলে ১৯৩০-এ জেলখানায় বদলে যায় ফোর্ট। দুর্গম এই ফোর্টে বন্দি হয়েও সেদিনের স্বাধীনতা-সংগ্রামীরা দমে যাননি। তবে এই ফোর্টে নেতাজি সুভাষকে বন্দি রাখা হয়েছিল বলে যে কথা শোনা যায় তা ঠিক নয়। স্বাধীনতা-সংগ্রামী তৈলক্যনাথ চক্রবর্তীকে অন্য বন্দীরা ‘নেতাজি’ সম্বোধন করতেন। সম্ভবত সেখান থেকেই নেতাজি সংক্রান্ত বিপত্তি। এই ফোর্ট থেকেই ১৯৩১ সালে বন্দিরা রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তিতে তাঁকে অভিনন্দনপত্র পাঠিয়েছিলেন। বিশ্বকবি প্রত্যুত্তরও দিয়েছিলেন। ফোর্টে প্রবেশের মুখে খোদাই করা দুটো পত্রই দেখা যায় আজও। স্বাধীনতার পর নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের এখানে বন্দি হিসেবে রাখা হয়েছিল। সেই বন্দিদের মধ্যে ছিলেন পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ও। ১৯৫৯ থেকে ১৯৭০ অবধি তিব্বতি রিফিউজি ক্যাম্প ছিল ফোর্টে। ১৯৭১-৭২ সালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা শরণার্থীদেরও  আশ্রয় দেওয়া হয় এখানে এবং শেষ অবধি ১৯৭৬-৭৭ সালে পরিত্যক্ত হয় ফোর্ট। 

১৯৮০ সালে জাতীয় স্মারকের ঘোষণা হলেও, আজ কিন্তু বড্ড অবহেলায় পড়ে রয়েছে আজকের বক্সা ফোর্ট। বক্সাকে নিয়ে প্রবন্ধ-উপন্যাস-গল্প-কবিতায় বহু লেখালিখি হলেও বর্তমান বক্সা ফোর্টের চারদিকে ধ্বংসস্তুপ কেবল! সান্ত্রাবাড়ি থেকে এখনও পাঁচ-ছয় কিমির উঁচু-নীচু পাহাড়ি  হাঁটা পথে যেতে হয় ফোর্টে। অপূর্ব নৈসর্গিক পরিবেশে, ফোর্টের বিপরীতে দেখা মেলে নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার, ফরেস্ট রেস্ট হাউস, পোস্ট অফিস ও কিছু বাড়িঘরের। কিন্তু ফোর্টের ভগ্নদশায় মন খারাপ হয়ে যায়। ইতিহাসের এক অমূল্য সম্পদের প্রতি এই অবহেলা সত্যি অকল্পনীয়। কে বিশ্বাস করবে যে, কয়েক দশক আগেও লোহার গেট, পাহারাদার, দেওয়াল, আংটাবেড়ি ইত্যাদি দেখা যেত এই দুর্গে। কাঁটাতারে ঘেরা থাকত এলাকা। কাকপক্ষীও ঢুকবার সাহস পেত না। বক্সা ফোর্ট নিয়ে আলোকপাতের অবকাশ আজও রয়ে গেছে। বারংবার দৃষ্টি আকর্ষণ সত্ত্বেও অজানা কারণে বক্সা ফোর্ট অবহেলিত। জানা নেই কবে ঘুচবে এই অন্ধকার, কবে যোগ্য মর্যাদা পাবে ইতিহাসের বক্সা ফোর্ট। ফোর্ট থেকে আরও অনেকটা ওপরে, চার কিমি হাঁটাপথে চলে যাওয়া যায় লেপচাখায়। চাঁদনি রাতের পাহাড়ি লেপচাখা থেকে বহু নিচের বক্সা টাইগার রিজার্ভের অসামান্য নৈসর্গিক দৃশ্য সত্যিই ‘লাইফটাইম এক্সপিরেয়েন্স’। আকর্ষণ করে লেপচাখার বৌদ্ধ মন্দির, চোর্তেন, নয়নাভিরাম প্রকৃতি আর অতি অবশ্যই হাসিমুখের পাহাড়িয়া মানুষেরা। 

এমনিতে বক্সা অঞ্চলের অধিবাসীদের অধিকাংশই ড্রুকপা ও নেপালি। দারিদ্র তাদের নিত্যসঙ্গী। আধুনিক সমস্ত রকম সুযোগসুবিধা বিচ্ছিন্ন কোন এক নেই রাজ্যের বাসিন্দা তারা। অতীতে যখন পাম্প ঘর, বনবিভাগের অফিস, পি ডব্লু ডি অফিস ইত্যাদি ছিল, তখন তবু এখানকার বাসিন্দাদের রুটিরুজি ছিল। কিন্তু পরিবর্তিত সময়ে আজ সবকিছুই অতীত। সেই সান্ত্রাবাড়ি বা জিরো পয়েন্ট থেকে মাথায় করে গ্যাস সিলিন্ডার বা পিঠে চাপিয়ে প্রয়োজনীয় সামগ্রী ওপরে নিয়ে যাওয়ার কষ্ট কবে বন্ধ হবে কেউ জানে না। রাস্তা তৈরির কোনও পরিকল্পনা আজ অবধি শোনা যায় নি। এমনিতেই ১৯৯৩ সালের বন্যা এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশকে অনেকই পাল্টে দিয়েছে। নতুন করে তাই কবে কী হবে সবই অজানা। কষ্ট তাই এখানকার মানুষদের গা সওয়া। তবু এত কষ্টের মধ্যেও মুখে লেগে থাকে সরল হাসি। সদরবাজার, লাল বাংলো ও দাঁড়াগাঁওয়ের বক্সাদুয়ারে আজকাল সমবায় প্রথায় পর্যটনের দিকে নজর রেখে গাইডের কাজ করেন বহু মানুষ। অবশ্য প্রয়োজনের তুলনায় তা নিতান্তই সামান্য। তবু কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে তাদের হাসিমুখ আর বক্সাকে চেনাবার অদম্য ইচ্ছে পর্যটকদের খুশি করে বৈকি!    

উত্তরবঙ্গের অন্যতম আকর্ষণ বক্সা অনন্য। তবে দুর্ভাগ্য এটাই যে, আমরা অধিকাংশই বক্সার সমৃদ্ধ ইতিহাস জানি না। আমাদের পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে কোনও কিছুতেই এই বিষয়ে কিছু জানানোও হয় না। ভাবতে খুব খারাপ লাগে যে, একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ইতিহাস ও কৃষ্টি শুধুমাত্র অজ্ঞতার জন্য হারিয়ে যেতে বসেছে। বক্সা ফোর্টে প্রত্যেক বছর স্বাধীনতা দিবসে যে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান হয় তা টেক্কা দিতে পারে অনেক নামী উদযাপনকে। কিন্তু ক’জন তার খোঁজ রাখি? বক্সার পরিচয় যেন আজ টাইগার রিজার্ভ, কিছু হোম স্টে আর ট্রেকিঙের একটি পথের মধ্যেই সীমাবদ্ধ! 

46