চিরচেনা জয়গাঁ ও ফুন্টশেলিং-এ আবার একবার

শৌভিক রায়

‘ডুয়ার্স’ শব্দটি আমরা হামেশা উচ্চারণ করি ঠিকই, কিন্তু অনেকেই জানিনা যে, শব্দটি কথা থেকে এসেছে। আসলে অতীতে ভুটান পাহাড় থেকে সমতলে আসবার জন্য মোট ১৮টি গিরিপথ ছিল। ইংরেজরা সেই গিরিপথ বোঝাতে door (বহুবচনে doors) ব্যবহার করতো, আবার হিন্দুস্থানী ‘দ্বার`(দরজা)-এর সাহায্যেও এই পথগুলিকে অভিহিত করা হত। এই doors বা দ্বার থেকেই সৃষ্টি হয়েছে ‘ডুয়ার্স’ শব্দটি। আঠারো দুয়ারের অন্যতম ছিল পাশাখা। 

পাশাখা

বক্সার খুব কাছের এই দুয়ার না জানি কত না ঘটনার সাক্ষী! যেমন ধরা যাক বক্সা নামটি। শব্দটি এলো কথা থেকে? একটু পেছন ফিরে তাকাই। ভুললে চলবে না যে, পাশাখার খুব কাছে বক্সার মধ্যে থাকা আজকের জয়ন্তী কিন্তু অতীতের আন্তর্জাতিক ব্যবসাকেন্দ্র। এখান থেকেই অত্যন্ত শক্তিশালী ও বেগবান ট্যাঙ্গন ঘোড়া হাত-বদল হয়ে চলে যেত রংপুরের (অধুনা বাংলাদেশ) হাটে। কুসংস্কারবশতঃ, সেই হাত-বদলের আগে ঘোড়ার লেজের খানিকটা অংশ কেটে নেওয়া হত। ইংরেজরা বখশিস দিয়ে দিয়ে সেই প্রথা বন্ধ করে। বখশিস থেকে বক্সা শব্দটির সৃষ্টি। 

বক্সার কাছে পাশাখা আধুনিক ভুটানের শিল্পকেন্দ্র। আর তার কাছের ভুটান সীমান্ত শহর ফুন্টশেলিংকে সবাই কমবেশি জানেন। ভারত সীমান্তের জয়গাঁ আর সীমান্তের ওপারের ফুন্টশেলিং যমজ ভাইয়ের মতোই। 

গুম্ফা, ফুন্টসিলিং

ডুয়ার্সের অন্যতম প্রধান ব্যবসাকেন্দ্র জয়গাঁর হৈ চৈ পেরিয়ে ফুন্টশেলিং-এ প্রবেশ মাত্রই ঠান্ডা বাতাস জড়িয়ে নেবে পথশ্রমে ক্লান্ত শরীরকে। পাহাড়ের ঢালে বাড়ি-ঘর, স্কুল, হাসপাতাল, চুখা জেলার সদর দপ্তর ইত্যাদি সব নিয়ে ঝকঝকে ফুন্টশেলিং কখন যেন নিজের হয়ে যায়! 

পাহাড়ি পথে সামান্য উঁচুতে (আনুমানিক ৪০০মি) কারবান্দি মনাস্ট্রি পর্যন্ত বিনা অনুমতিতে চলে যাওয়া যাবে যখন তখন। প্রাচীন এই মনাস্ট্রিতে পূজিত হচ্ছেন রিনপোচে ও শাক্যমুনি। মনাস্ট্রির আটটি স্তুপ আর তার সঙ্গে জয়গাঁ-ফুন্টশেলিং-এর প্যানোরামা এককথায় অনবদ্য। ফুন্টশেলিং-এ আমো ছু ক্রোকোডাইল ব্রিডিং সেন্টার, জ্যাঙটো পেলরি লাহখাং মন্দির, জ্যাঙটো পেলরি লাহখাং পার্ক, ফুন্টশেলিং পার্ক, তাশি মার্কেট, বৌদ্ধ স্কুল পালদেন তাশি চোলিং ইত্যাদিও দর্শনীয়। যমজ শহর দুটির পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে তোর্ষা নদী। এখানেই তোর্ষার সমতল স্পর্শ করা আর ভারতে প্রবেশ। জয়গাঁ উপকণ্ঠে সবুজ তোর্ষা চা-বাগানের পাশ দিয়ে তাকে যেতে হবে অনেকটা দূর, ব্রহ্মপুত্রের ডাকে সাড়া দিতে। তুলনায় জয়গাঁ অনেক বেশি ঘিঞ্জি ও নোংরা হলেও শহরটি উত্তরের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যকেন্দ্র। তাই অনেক প্রয়োজনীয় সামগ্রী অন্যত্র না পাওয়া গেলেও মিলতে পারে এখানে। সত্যি বলতে, শহরটি মিনি ভারতের রূপ নিয়েছে। সম্ভবত ভারতের সব সম্প্রদায়ের মানুষকেই এখানে দেখা যায়। অভাব নেই হোটেলের।    

দলসিংপাড়া, হাসিমারা, কালচিনির মতো ডুয়ার্সের প্রাচীন জনপদগুলি জয়গাঁ-ফুন্টশেলিং-এর একদম কাছে। নিজস্বতায় ও সৌন্দর্যে এই জায়গাগুলির প্রতিটিই অত্যন্ত সুন্দর। চা-বাগানকে ঘিরে গড়ে ওঠা জায়গাগুলিকে না জানলে ও না চিনলে সত্যিকারের ডুয়ার্সকে কোনোদিনই বোঝা যায় না। মিশ্র সংস্কৃতির এই জায়গাগুলি আক্ষরিক অর্থেই কসমোপলিটান। এখানে একটি কথা না বলে পারছি না যে, জয়গাঁ বা ফুন্টশেলিংকে ঘিরে থাকা এই অজস্র চা-বাগানগুলি কিন্তু এবারের পুজোয় আমাদের গন্তব্য হতে পারে। কেননা সাবেক জলপাইগুড়ি (বর্তমান আলিপুরদুয়ার) জেলার বহু প্রাচীন দুর্গাপূজা দেখতে হলে চা-বাগানগুলির তুলনা হয় না। যেমন ধরা যাক, দলসিংপাড়া চা-বাগানের পুজো। এই পুজো শুরু হয়েছিল গত শতকের চল্লিশের দশক থেকে। হাসিমারার বেশ কিছু পুজোর বয়স ১০০ ছুঁই ছুঁই। সুভাষিণী চা-বাগানের পুজোর বয়স প্রায় ৮০। ডুয়ার্সের বিভিন্ন শহরের দুর্গাপূজার মতো এই পুজোগুলিতে জাঁকজমক নেই ঠিকই, সেটা আশা করাও বৃথা। বন্ধ চা-বাগান আর স্বল্প বেতনের শ্রমিকদের পুজোয় সেটা সম্ভব নয় কখনোই। কিন্তু যে উদ্দীপনা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তারা পুজো করেন, তাতে প্রাণ রয়েছে। আমাদের মতো শহুরে বাবুরা সেখানে যে আপ্যায়ণ পান তা কোনোদিনই নিজের জায়গায় সম্ভব নয়। ফুন্টশেলিং ভ্রমণের একটি অঙ্গ হতে পারে এই অঞ্চলের পুজো দেখা।

কালিখোলা, ভুটান

ফুন্টশেলিং শহরের ভুটান গেটের কাছে থাকা অফিস থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে চলে যাওয়া যায় প্রায় ১৫০ কিমি দূরের পারো বা থিম্পুতে। সত্যি বলতে ফুন্টশেলিং আসলে ভুটানের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই শহরটির নিজস্বতা সবসময়ই আলাদা করে চোখে পড়ে। পরিষ্কার ঝকঝকে রাস্তার ফুন্টশেলিং শহরে হেঁটেও মজা। তাশি বিল্ডিং এখন খানিকটা ম্রিয়মান হলেও ভুলে চলবে না যে, ভুটান-সহ উত্তরবঙ্গের এই অঞ্চলের প্রথম ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের ধারণা কিন্তু এই বিল্ডিং থেকেই এসেছিল। শহরে নির্বিশেষে ইতস্তত ঘুরে বেড়ান ভুটানি পুরুষ-নারীরা। তাদের পোশাক, মিষ্টি ব্যবহারও ফুন্টশেলিং ভ্রমণের উপরি পাওনা।

19