অভিজিৎ সাহা

বিশেষ প্রতিবেদন নভেম্বর ৮,২০২০: যাবতীয় উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬ তম রাষ্ট্রপতিরূপে নির্বাচিত হলেন ৭৭ বয়সী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন। মার্কিন যুক্তরাষ্টের ক্ষমতার অলিন্দে জো বাইডেনের একটি পরিচিত নাম। এর পূর্বে তিনি ওবামা যখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন তখন তিনি উপ-রাষ্ট্রপতির পদ পুরো ৮ বছর ধরে অলংকৃত করেছিলেন। সিনেটর হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। ফলত প্রশাসন পরিচালনায় তাঁর বিপুল অভিজ্ঞতা এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এই নির্বাচনের আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক এই প্রথম কোনো ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন মুলুকের উপ-রাষ্ট্রপতিরূপে নির্বাচিত হলেন। কমলা হ্যারিস নামক একজন মহিলা এইপদ অলংকৃত করলেন। আবার কমলা হ্যারিস আমেরিকার ইতিহাসে এই প্রথম মহিলা উপরাষ্ট্রপতি রূপেও নির্বাচিত হলেন। সার্বিকভাবে নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে জো বাইডেন এখনো পর্যন্ত সব থেকে বেশি জনপ্ৰিয় ভোট পেয়েছেন যার সংখ্যা হল ৭,৫১,৯৬,১৫৬ । শতাংশের হিসেবে তিনি পেয়েছেন প্রায় ৫০.৬%। মোট ৫৩৮ টি ইলেকটোরাল কলেজের মধ্যে এখন অবধি জো বাইডেনের প্রাপ্তি ২৯০ আর জয়ী হওয়ার জন্য প্রয়োজন ২৭০। অপরদিকে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো পর্যন্ত পেয়েছেন ৭,০৮,০৩,৮৮১ টি জনপ্রিয় ভোট, অর্থাৎ ৪৭.৭%। আর ইলেকটোরাল কলেজের আসনের মধ্যে ২১৪ টি পেয়েছেন। অবশ্য ট্রাম্প শিবির এখনো দাবি করছে যে ট্রাম্পই জিতবেন এবং এই হুমকি দিয়ে রেখেছেন তিনি ভোটে হারলে সুপ্রিম কোর্টে যাবেন। অবশ্য বেশ কিছু রাজ্যে দ্বিতীয় বার ভোট গণনা হচ্ছে যেমন জর্জিয়া। এই লেখা অবধি পূর্নাঙ্গ ফলাফল এখনো পাওয়া যায়নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই বারের নির্বাচনে ট্রাম্প বারবার শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্নটিকে এড়িয়ে গিয়েছেন। নির্বাচনের পূর্বে এবং পরে জনগণের রায়কে মাথা পেতে নেওয়ার মতন সৎ সাহস তিনি দেখাতে পারেননি। বারবার হুমকি দিয়েছেন যে নির্বাচনী ফলাফল তার মনের মতন না হলে তিনি আদালতের মুখাপেক্ষী হবেন। তবে এখনো পর্যন্ত তিনি এই কাজটি করে উঠতে পারেননি। আশার কথা মার্কিন গণতন্ত্র তার পরিপক্কতার পরিচয় শেষ অবধি রেখেছে। আরোও একটি কথা বলার দরকার সেটি হল মার্কিন রাষ্ট্রপ্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে যে মিথ্যা ভাষণ করছিলেন তার প্রতিবাদস্বরূপ মোট চারটি মার্কিন স্যাটেলাইট চ্যানেল তাদের লাইভ সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছিল। এই সব মিলিয়ে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই ফলাফল একটি অসাধারণ নজির স্থাপন করেছে।

এই নিবার্চনে ডেমোক্র্যাট পার্থী হিসেবে জো বাইডেনের জয় লাভ আমেরিকার বিদেশ নীতিতে কি কোনোরূপ পরিবর্তন আনবে? এর উত্তরে বলা যায় যায় যে হয়তো বাইডেন প্রশাসন আগামীদিনে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে পুনরায় প্রবেশ করবে, অভিবাসন নীতিতে হয়তো পরিবর্তন আনবেন বা কিছু নমনীয়তা দেখাবেন, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক লড়াইকে এক নতুন রূপ দেওয়ার চেষ্টা চালাবে। আর অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে বেকারত্ব, বর্ণবাদ, বৈষম্য প্রভৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালাবে। মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষত ইরানের ক্ষেত্রে তার অবস্থান কী হয় এখন সেটাই দেখার। উত্তর কোরিয়া, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে মার্কিন বিদেশ নীতি কী ভাবে তার অতীতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে মানে ট্রাম্পের, না কোনো নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করে কিনা সেটাও দেখার। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে বলা যায় নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে আমাদের দেশের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্টের সম্পর্ক একটি নির্দিষ্ট রূপ নিয়েছে। তবে ধারা ৩৭০ বিলোপ, কাশ্মীর ইস্যু, NRC-CAA প্রভৃতি নিয়ে বাইডেন প্রশাসনের অবস্থান আমাদের দেশের শাসক শ্রেণীর পক্ষে সুখকর অভিজ্ঞতা নাও হতে পারে। কারণ বাইডেন সহ পুরো ডেমোক্র্যাট দল এগুলোর বিরোধতা শুরু থেকেই করছে। আবার প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চটুস্তয়(Squad)এর অন্যতম সহযোগী হিসেবে ভারতরাষ্ট্র সামরিক ক্ষেত্রে আমেরিকার একটি জুনিয়র পার্টনারে পরিণত হয়েছে। অতি সম্প্রতি গত ২৬ অক্টোবর,২০২০ নয়া দিল্লিতে আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে BECA নামক একটি সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ফলে সামরিকভাবে দুই দেশের মধ্যে আরো বেশি পরিমাণে geo-spatial সংক্রান্ত তথ্যের আদান প্রদান ঘটবে। ভারত চীনের সীমান্ত বিবাদে আমেরিকার অবস্থান কি হয় সেটাও দেখার। এর ওপর আমাদের বিদেশ নীতির অনেক কিছু বিশেষত প্রতিবেশী দেশগুলির সাথে সম্পর্ক নির্ভর করছে এমনকি পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের বিষয়টিকেও এই আলোকে দেখতে হবে। আবার চীন ও রাশিয়া ভারতরাষ্টের এই একমুখী মার্কিন নির্ভরতাকেও সন্দেহের চোখে দেখে থাকে। ফলত এই একচেটিয়া মার্কিন আগ্রাসী বিদেশনীতিতে কতটা পরিবর্তন আসবে বা ভারতরাষ্ট্র কতটা পরিমানে বিদেশ নীতির ক্ষেত্রে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারবে এইসব দেখার বিষয়। তবে যায় ঘটুক না কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার পুঁজিবাদী কাঠামো, সাম্রাজ্যবাদী নীতিকে রক্ষা করেই তার বিদশনীতিকে বিন্যস্ত করবে। এই ব্যাপারে বাইডেন ও ট্রাম্পের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, ছিলও না, থাকতেও পারে না। কারণ সারা নির্বাচন প্রচারে বাইডেন কিন্তু গ্রহণযোগ্য বিকল্পের কথা বলেনি। মার্কিন বিশ্লেষকদের মতে, বাইডেন তার প্রচারে নতুন কিছু বলেননি বা বলার মতন ঝুঁকি নেননি। তিনি মূলত ট্রাম্প বিরোধিতার ওপর নির্ভর করে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছেন। এর বেশি কিছু তিনি কিছু করেননি। পুলিৎজার পুরস্কার জয়ী সাংবাদিক ক্রিস হেজেসের মতে, আসলে বাইডেন আমেরিকার পুঁজিবাদী কাঠামোর অভ্যন্তরে এক মধ্যপন্থার নীতি অনুসরণ করেছেন। কোনো বিশদ ও গ্রহনযোগ্য বিকল্পের কথা তার মুখে শোনা যায়নি। আরোও একটি বিষয়ের উল্লেখ করা দরকার সেটি হল ট্রাম্প এই নির্বাচনে পরাজিত হলেন বটে কিন্তু তিনি যে ধরণের বিভাজন, অমানবিকতার, বিদ্বেষের বীজ সহ বপন করলেন, আর্থিক সংকটের মধ্যে আমেরিকাকে ফেলে গেলেন তাঁর প্রভাব থেকেও হয়তো আমেরিকার চটজলদি মুক্তি পাবে না। এইজন্য বাইডেনের সহ সমগ্র ডেমোক্র্যাট দলের আরোও অনেক বড় দ্বায়িত্ব পালন করতে হবে। ট্রাম্পের রেখে যাওয়া এই পঁচা-গলা ব্যবস্থাকে আরো মানবিক করার জন্য বাইডেনকে আরোও বেশি পরিমাণে প্রগতিশীল, মানবিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে যা কিনা সমাজের বিভেদ,দ্বেষের অবসান সহ দেশটিকে আর্থিক প্রগতি মানে আরোও কর্মসংস্থান ও সুযোগের সৃষ্টির দিকে নিয়ে যাবে। আর এটা না করা গেলে উগ্র দক্ষিনপন্থা আবার হয়তো অন্য নামে নিজেকে হাজির করবে। আশা করা যায় বাইডেন প্রশাসন ট্রাম্পের ফেলে যাওয়া, ছিঁড়ে যাওয়া জুতোতে পা গলাবেন না। তৎসত্ত্বেও বিশ্বরাজনীতি ও মানবতার নিরিখে বাইডেনের এই জয়ের তাৎপর্যকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। হয়তো এই প্রেক্ষিতে আগামীদিনে আন্তৰ্জাতিক রাজনীতির নানান সমীকরণ নির্ধারিত হবে।

লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ

252