সাধন দাস

প্রেমে অপ্রেমে গ্যাসের একটা সিলিণ্ডারেই চলছিলো সংসার। অনেক লড়ালড়ির পর যেদিন দ্বিতীয় সিলিণ্ডার পেলাম, ডেলিভারি বয় বেরিয়ে যেতেই বৌ গণগণে ভরদুপুরে জ্বলন্ত ওভেনের ধারে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। দীর্ঘ নরম চুমুতে ভালোবাসার ঠোঁটে এঁটে রইলো মুখে। সুখে আমাদের চোখ বুঁজে এলো। সরকারি বাঁধনে হলেও অনেকদিন পর বৌকে আরো একটু নিশ্চিন্ত করতে পারলাম! আহা, কী সুখ দ্বিতীয় গ্যাসের ভালোবাসায়! অনেকক্ষণ পর বৌ কানে কানে সেই আদ্যিকালের অনন্ত কথাটা ফিসফিস বললো- ওগো, ভালোবাসি। তোমাকে খুব ভালোবাসি।

কুউউ… ঝিকঝিক, ঝিকঝিক…। হ্রস্বউ এর উড়োর মতো ধোঁয়া উড়ছে দেখলেই ডোবার ধার বেয়ে, জঙ্গল ভেঙে বাবা ছুটতো। ট্রেন আসছে। স্লো হচ্ছে, স্লো হচ্ছে। পাটকাঠির চেরা মাথায় দু’টাকার নোট গুঁজে পতাকার মতো উঁচিয়ে ধরতো। ড্রাইভারকাকু টাকা নিয়ে ইঞ্জিন থেকে কয়লা ফেলতো। কালিঝুলি মেখে ভূত হয়ে কয়লার ঝুড়ি মাথায় বাবা বাড়ি ফিরে এলে মা বলতো- কালো মানিকের বাপ এলো।

বাবার মাথা থেকে কয়লার ঝুড়ি নামিয়ে মা পরম সুখে জড়িয়ে ধরতো বুকে। মানিককা, পটলাদা, কেলোদের হারিয়ে বাবা যতো বেশি কয়লা আনতো মা ততো বেশি সময় ঝুড়ি বুকে চেপে রাখতো। বাবার কেটে যাওয়া, ছড়ে যাওয়া জায়গায় হলুদ টিপে, হাত বুলিয়ে দিতো। আদর করতে করতে একসময় বলতো- সোনা মানিকের বাপ।

আর বাবা তাকিয়ে থাকতো আকাশে, কখন হ্রস্বউয়ের উড়োর মতো ধোঁয়া উড়বে আর ট্রেনের ইঙ্গিতময় হুইসেল বেজে উঠবে একসাথে।

ঠাকুমা বলতো, আমাদের সময় কাঠের জ্বালে রান্না হতো। উনুনের পাড়ে বসে একহাতে জ্বাল দিতাম আর এক হাতে রান্না করতাম। আগুন ছেড়ে ওঠার উপায় ছিলো না। নড়লেই নিভে যাবে। ফুঁ দিয়ে আগুন আনতে মুখে হলকা লাগতো। ধোঁয়ায় চোখ জ্বলতো। ঝলসেও যেতো। হু হু করে জ্বলতো। ছাই উড়ে উড়ে পড়তো রান্নার কড়াইতে। কোনোদিন ভাতের বদলে শাশুড়ির জ্বলন্ত চ্যালাকাঠের খাবার খেতাম। খেতে বসে বাপ মা তুলে গাল পাড়তো শ্বশুর। ঘাড় হেঁট করে চুপচাপ খেয়ে উঠে যেতো তোর ঠাকুদ্দা। কান্না বেরিয়ে আসতো। এখন তোর মায়ের কতো সুখ।

যেদিন তোর ঠাকুদ্দা জঙ্গল থেকে শুকনো কাঠ, পুষ্টজ্বালানি কুড়িয়ে আনতে পারতো, আমার কষ্ট কম হবে ভেবে, তাঁর চোখে সুখের জল আসতো। তোর ঠাকুদ্দার চোখে জল দেখলে আমারও সুখে গা শিরিশিরিয়ে উঠতো। কেঁদে ফেলতাম। সে ভালোবাসার স্বাদই আলাদা। অনেক বেশি স্বর্গীয়।

ঠাকুমাকে চেপ্পে জড়িয়ে বলে উঠতাম- কক্ষণো না, তোমার স্বর্গের চেয়ে মা বেশি ভালোবাসতো বাবাকে।

জামা কাপড়ে ধোপদুরস্ত হয়ে খাবার টেবিলে ভাবতে বসলাম, কাঠের চেয়ে কয়লার ভালোবাসায় সুখ বেশি না গ্যাসে! এই সব ভালোবাসারা তো এক নয়। আলাদা সময়ে, আলাদা মানুষের, আলাদা আলাদা ভালোবাসা! সামনের দেওয়ালে টাঙানো উদাস টিভি চলছে। সত্যজিত রায়ের ‘সোনার কেল্লা’। জন্মান্তরে বিশ্বাস করি না। তবু বার দশেক দেখছি। হয়তো জন্মান্তরে বিশ্বাস করার একটা ইচ্ছা, হাজার যুক্তি, বিজ্ঞান, তর্কের মধ্যেও বুকের ভিতর জিয়ানো আছে! মানুষের জন্মান্তর হয় না, অন্তত আমার তো হয়নি। খামোকা কেনো বিশ্বাস করতে যাবো! তবে আকাশ ভর্তি তারার মতো অভিধানে উজ্জ্বল ঝকঝকে শব্দেরা– ভালোবাসা, সুখ, কান্না আরো আরো অনেক। যুগ যুগ পেরিয়ে তাঁরা অক্ষরে অক্ষয়। উচ্চারণে অমর। একই বানানের শরীরে আত্মার ধুকধুক শুনতে পাই। জন্মজন্মান্তরে আমূল বদলে বদলে যাওয়া নতুন নতুন ধুকধুক। এই মহামহিম শব্দই কি ‘জন্মান্তর’ সৃষ্টির প্রেরণা!

আজ ছেলের বিবাহ বার্ষিকী। বাড়িতে অরন্ধন। ভালোবাসার গান বাজছে ওদের বন্ধ ঘরে। অন লাইনে খাবার আসছে বাড়িতে।

সাধন দাস।

36