বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

আবুল বাশারের সাহিত্যে জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল হনন-আত্মহননের মধ্য দিয়ে। কবিতা দিয়েই সাহিত্যজীবন শুরু করেছিলেন। কিছুদিন রাজনীতিতে যোগদান ও রাজনৈতিক মতাদর্শে বিক্ষুব্ধ হয়ে কথাসাহিত্যে প্রবেশ করেন । এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর নাম- তিনিও কবিতা দিয়েই সাহিত্যজীবন শুরু করেছিলেন পরে কথাসাহিত্যে প্রবেশ করেন। মুর্শিদাবাদ থেকে যেসব কথাকার উঠে এসেছেন তাঁরা হল- সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ, আবুল বাশার ও নীহারুল ইসলাম। প্রথম দুজন কর্মসূত্রে কলকাতায় চলে গেলেও নীহারুল  স্বদেশভূমিতেই থাকেন। আবুল বাশারের প্রথম কাব্য ‘ জড় উপড়ানো ডালপালাভাঙা আর এক সেতু’ প্রকাশিত হয় মাত্র উনিশ বছর বয়সেই।তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘মাটি ছেড়ে যায়’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে। অর্থাৎ যৌবনের একদশক তিনি সাহিত্য থেকে বিচ্যূত হয়ে রাজনীতিতে অংশ নেন।‘যদিও স্বপ্ন স্বপ্নহীন’ প্রবন্ধে তিনি সেই কলঙ্কিত জীবনের ইতিহাস ব্যক্ত করেছেন। গল্পজীবনে প্রবেশে স্ত্রী সাহানার ভূমিকা অনেকখানি। সেই সঙ্গে আছে ‘রৌরব’ পত্রিকার বন্ধুদের উৎসাহ ও প্রেরণা। আবুল বাশার যে শক্তিশালী লেখক ও মেধা সম্পন্ন তার পরিচয় পাওয়া যাবে মাত্র পাঁচ বছরের ইতিহাসে। আশির দশকে গল্প জীবনে প্রবেশ। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘মাটি ছেড়ে যায়’,( ১৯৮৮, মে)। এরপর একে একে ‘সিমার’( ১৯৮৮, জুন), ‘অন্য নকশি’( ১৯৮৯), ‘অমৃত বারিধি’(১৯৯০)  ‘একই বৃন্ত’( ১৯৯১)। ঐতিহ্যকে সঙ্গী করে নিজ সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে প্রান্তিক গ্রাম্যজীবনের ভাষ্যকার রূপে গল্প জীবনে প্রবেশ করেন। নিজেই বলেছেন –“ আমরা জীবন চর্চা করি সাহিত্যে। সাহিত্য আর জীবন আলাদা কিছুই নয়। সাহিত্যিকের ব্যক্তিগত জীবন আর তাঁর ব্যক্তিগত শিল্প পৃথক নির্মাণ হতে পারে না।“(‘যদিও স্বপ্ন স্বপ্নহীন’, পত্রলেখা, প্রথম প্রকাশ ১৯৮৯, পৃ.১৭) – এ জীবন নিজের চোখে দেখা মুর্শিদাবাদের প্রান্তিক মুসলিম জীবন। সেই সমাজের ধর্ম- ধর্মবিশ্বাস, লোকাচার, সামাজিক প্রথা – এক কথায় – Total life ই তাঁর সৃষ্টির প্রেক্ষাপট। ব্যক্তিগত জীবনে রাজনীতিতে জড়িত থাকলেও গল্পে রাজনীতি বিশেষ ভাবে উঠে আসে নি। আসলে লেখকের লক্ষ ছিল মানুষের সামগ্রিক জীবনবোধ- সেই জীবনচেতনা সঞ্চারেই তিনি ব্রতী হয়েছেন। মুসলিম জীবন ভিক্তিক গল্পে নারী শোষণের ইতিহাস প্রবল ভাবে উঠে এসেছে। মনে পড়ছে আবুল বাশারের ‘নারী তুমি অর্ধেক আকাশ’ প্রবন্ধের কথা। দুটি মন্তব্য তুলে ধরি-

ক. ’‘কৈশোরের প্রেমে তো আবার অভিশাপও থাকে। সেগুলো তো সব হারিয়েও গেছে। কেন হারিয়ে গেল, কেন পাওয়া গেল না তা স্পষ্ট করে বোঝাও গেল না। আলো- আঁধারির মধ্যে অস্ফুট হয়েই রয়ে গেলল এই সব স্মৃতিই তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় পূর্ণপ্রেমের আশায়। এইভাবেই সম্ভবত মানুষ একটা প্রেমকেই সারা জীবন খুঁজে বেরাচ্ছে। নানা পর্যায়ে, নানা রূপে, ধাপে- ধাপে।“

খ. “মানুষের নীতিবোধ তো পাল্টায়। প্রেম ভালোবাসা সম্পর্কে আধুনিক এবং আরও অগ্রসর চিন্তা ভাবনার হাদিস পাবো বলে আশা করি। আমার মধ্যে লালিত সেই পুরনো প্রেম সম্পর্কিত ধারণাটা যদি বদলে ফেলার মতো যৌক্তিক কিছু পাই, তাহলে বদলে ফেলব। আর যদি দেখি নতুন ভাবনটা ক্ষতিকারক পুরনো ধারনাটাই শ্রেয়, তাহলে আর নতুনের প্রতি কোনও আসক্তি থাকবে না আমার।“(‘যদিও স্বপ্ন স্বপ্নহীন’,তদেব, পৃ. ১০৮)

 এই নতুন- পুরাতনের দ্বন্দ্ব, প্রথা- সমাজের বিভেদ, ঐতিহ্য না নতুনত্বের খোঁজ, ধর্মান্ধতা না মানবধর্ম, মূল্যবোধ- মূল্যবোধের অবক্ষয়, প্রেম সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা ও সমাজকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা- এগুলিই লেখকের লেখার মূল বিষয় বলে আমার মনে হয়েছে। আর এই বিষয় গুলি মুসলিম জীবনকে কেন্দ্র করে কীভাবে গড়ে উঠেছে তা দেখে নেবো কিছু গল্প অবলম্বনে। গ্রামের এক সাধারণ ছেলে সাহিত্যচর্চা করতে এসেছেন, সে জীবন অতি তুচ্ছ, তা লেখকের কথনে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে –

“আমার লেখক জীবন খুব তুচ্ছ। সংসার জীবনও অতি সাদা –মাঠা, অর্থভৈববহীন, মানসিক ঐশ্বর্যশূন্য, সাধারণ। দারিদ্রের অভিশাপ আমার সাহিত্যের গললগ্ন ছিল যখন কবিতা লিখে প্রথম কাগজটার ছাপা-জোখার বউনি করি ছেলেবেলায়। ১৯৬৮ সালে আমার প্রথম কবিতা ছাপা হয় বন্যা ও দূর্ভিক্ষের বছর। কুত্তি –বজরার খিচুরি আর ভুট্টার আটার রুটি খেয়ে মাথা –ঘোরা ব্যামো ছিল চির –রুগ্নতার সহচর। আমার ধারণা, দারিদ্রের চাপে আমার মানসিক গঠন কখনও মানুষের মতন সম্পূর্ণতা পায়নি। মানুষ হিসেবে আমার যে আত্মগত সাহস শক্তি সামর্থ লাগে, নিজেকে পুরোপুরি মানুষ মনে করার জৈব দাবী দেহ গঠনের জন্য যা যা জৈব উপাদান খাদ্যাভ্যাস থেকে পূরণ করতে হয়, করতে হয় প্রকৃতি ও মাতৃগর্ভ থেকে তা কখনই ষোল আনা পাইনি।“ (যদিও স্বপ্ন স্বপ্নহীন, তদেব, পৃ. ১০ )

মুসলিম ধর্মজীবন নিয়ে লেখা একটি অসাধারণ গল্প হল আবুল বাশারের ‘অন্য নকশি’। এ গল্পটি শারদীয় ‘দেশ’ পত্রিকায় ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। এ গল্প লিখতে অনন্ত শক্তির প্রয়োজন। এজন্যই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘বাংলা গল্প সংকলন’( সাহিত্য অকাদেমি ) বইতে আবুল বাশারের এই গল্পটি নির্বাচন করেছেন। এ গল্প সম্পর্কে তিনি লিখেছেন-

“ আবুল বাশার –এর ‘অন্য নকশি’ এক জটিল মানসিকতার কাহিনি। ধর্মীয় গোঁড়ামি মানুষের মধ্যে কেন এত দূরত্ব আনে, জ্বালিয়ে তোলে হিংস্রা, এর দ্বারা মানুষ কেন স্বেচ্ছায় অন্ধ হতে চায়, সেসব প্রশ্নের উত্তর আজও পাওয়া যায় নি। একদিকে এক ফকির, অন্যদিকে মৌলবাদী। যে মৌলবাদীরা সাইকেলের চাকায় ‘এক রিমে ভারতবর্ষের কাদা, অন্য চাকায় বাংলাদেশি কাদাড় ন্যাড়।‘ তবু হাজার মৌলবাদীদের আক্রমণেও ফকিররা শেষপর্যন্ত হার মানে না।“( ‘ভূমিকা’,পৃ. ৫))

সেই হার না মানা কাহিনি এ গল্প। গল্প ব্যাখ্যায় এর কাহিনি পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া অসম্ভব- শ্রেষ্ঠ প্রন্থা গল্পপাঠ। গোটা গল্প ধরেই তত্ত্বকথা, ধর্মীয় নির্দেশ, ধর্মীয় শাসন ও ধর্মের অপব্যাখ্যা রয়েছে। গল্পের কাহিনিবৃত্তটি একটি দ্বন্দ্বের কাহিনি। একদিকে মৌলবি মিজানজির অন্যদিকে রহুল ফকির। হিন্দুশাস্ত্রে যা বাউল নামে পরিচিত মুসলিম শাস্ত্রে তাই ফকির। ধর্ম সম্পর্কে উদার মানবতাবাদের পরিচয় দিয়েছে ফকিররা। মানবপ্রেম ও মানবসেবাই তাদের মূল লক্ষ্য। কিন্তু সমাজে মৌলবি সম্প্রদায় এখনও বর্তমান। মৌলবিদের কাছে ফকিরদের ধর্মবাণী কিভাবে শোষিত হয় তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রহুল ফকির। আসলে একদল মৌলবি কোরানের অপব্যাখ্যা করে সমাজকে শোষণ করতে চায়, তাদের সে পথে যে বাধার সৃষ্টি তাকেই তারা লাঞ্ছিত করে, তাই ফকিররা মৌলবিদের কাছে চক্ষুশূল। তেমনি আছে তালাক প্রথার মাধ্যমে নারীকে কিভাবে শোষিত করা হয় সেই ইতিহাস। এ বড় আশার কথা তালাক প্রথা আজ উঠে গেছে। হাজমত শেখ বারেবারে স্ত্রী তনুকে তালাকের ভয় দেখায়। আসলে মিথ্যা কৌশল। আসলে তালাকের প্রশ্ন আসলেই নারী ভয় পায় আর সে কৌশলে নারীকে নিজের ইচ্ছা মতো ব্যবহার করাই হল রীতি। তেমনি আছে মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে তালাকের রীতি-পার্থক্য-“ হাজমত ফরাজি। তিনমাসে তিন তালাক দেবে তনুকে। ফরাজিদের হাদিস হানাফিদের মতো হাল্কা নয়। একমুখে এইসব কারণেই হয়তো ফরাজিদের মধ্যে তালাকের চল কম। কিন্তু অনুশাসনের ফরাজিরা হানাফিদের চেয়ে বেশি দড়।“ (বাংলা গল্প সংকলন, সাহিত্য অকাদেমি, পৃ.২২২) আসলে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে বিশদে পরিচয় না থাকলে এই তত্ত্ব ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। আর ধর্মের বিশদ জানেন বলেন বলেই নিরন্তর লিখে যেতে পারেন। তেমনি রয়েছে মুসলিম ধর্মের নঞর্থক দিকগুলির প্রতি ব্যঙ্গ। ভারতবর্ষের এক বিশাল সম্প্রদায়ের মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। তেমনই এক মুচি সম্প্রদায়ের কথা উঠে এল এ গল্পে। শুধুমাত্র গরুর মাংস খাওয়ার দ্বারাই মুসলিম হওয়া যায় না তা অসাধারণ ভাবে তুলে ধরলেন লেখক-

“ এই গোরু নিয়ে হিন্দু- মুসলমানে বিবাদ করে বলেও খেতে ঘেন্না হয়। গোরুর মাংস জোর করে খাইয়ে কারুকে মুসলমান করা যায় মনে করেন আপনারা, এইজন্যই আরও খাই না। মুচিরা এত গোরু খেয়ে বেড়াচ্ছে ভাগাড়ে ভাগাড়ে, তবু ওরা মুসলমান হতে পারল না। মুসলমানের শর্ত পেল না। দেখেছি আমার গাঁ স্বরূপপুরে কোরবানির সময় ওরা মুসলমানের মাংস ভিক্ষেও করে বেড়ায় কেউ কেউ। তবু আপনারা দয়া করলেন  না। হিন্দুরাও তাড়িয়ে দিল।“( তদেব, পৃ. ২৩০) 

তেমনি গোটা গল্প জুড়েই ফকিরদের উদার ধর্মমতের পরিচয়-

                                                                “ এবার স্বাধীনতা পেলি বাবা

স্বাধীনতার গুঁতায় গরিবের প্রাণ যায়

এখন বল কোথা যাবা

কোথার বল হাওবা খাবা

হিন্দুস্থানে না পাকিস্তানে বাবা

বাসা এখন বাঁধিবা।“( তদেব, পৃ. ২২০)

 আজ তনুর কাছে এসেছে ফকির সাহেব উদার ধর্মের পরিচয় দিতে। মৌলবিরা আজ ফকিরকে মুসলিম ধর্মে রূপান্তরিত করতে ব্যস্ত। ইসলাম পবিত্র ধর্ম, মাংস খাইয়ে  বা মাথা নেড়ে করে দিলেই যে মুসলিম করানো যায় না , তা বোঝে না মৌলবিরা। তনু মৌলবিদের এই অত্যাচার মেনে নেয়নি। সে জানতো এই অত্যাচার অবশ্য স্বীকার্য তাই সে গরুর মাংস আগেই ফেলে দিয়েছিল। হজমত গরুর মাংস না পেলে তনুকে আঘাত করে সংজ্ঞাহীন করে দেয়। ফকিরকে বেঁধে ফেলে দেয় সীমান্তে। আদর্শের, ধর্মের জয় যুগে যুগে। তাই ফকির, তনুরা হেরে যায় নি। অত্যাচারের দ্বারা মানবতার কন্ঠরোধ করা যায় না- তাই শত অত্যাচার সহ্য করেও বেঁচে আছে ফকির। গল্পের নাম থেকে মন পড়ে জসীমুদ্দিনের ‘নকসী কাঁথার মাঠ’ নামক কাহিনিকাব্যের কথা। সে কাব্যে রূপাই আর সাজুর মৃত্যকে কেন্দ্র করে নকসীকাঁথার মাঠ, মাঠ-মানুষের চিরন্তন বিরহের কাব্য সেটি। কিন্তু আবুল বাশার বিরহের মধ্যে শেষ করেন নি- মৃত্যুই জীবনের শেষ কথা হতে পারে না- তাই ফকির ও তনু নব জীবনের সন্ধান পেয়েছে, সত্যের পথে এগিয়ে গেছে-

“ ফকির পুব দিগন্তে সূর্যোদয়ের পথে হাঁটছে। তনুর রক্তমাখা পায়ে তার জামা-ধুতি ঘষা লেগে ভিজে যাচ্ছে। বাঁ বুকের কাছে যেখানে কালবুল মোমিনা আরশইলাহে তালা, খোদার সিংহাসন, সেখানে নুরের বাতি উদ্ভাসিত। টলতে টলতে ফকির এগিয়ে চলছে। কাঁধে তার দোতারা ধরে আছে প্রকৃতি। পুব দিগন্তে উষার কুসুমে ভোর হয়ে আসছে।“ (তদেব, পৃ. ২২৩)

35