ছবি : লেখক

রাজারাম সাহা

বাঙ্গালীদের প্রধান ও প্রাণের উৎসব দুর্গাপূজা। এই পূজাতে ঠাকুরের আসনে স্থান পেয়েছে বিভিন্ন রকমের পশুপাখি। দুর্গা ঠাকুরের বাহন হিসেবে দেখা যায় সিংহকে এবং তার হাতে থাকে সাপ। লক্ষ্মী ঠাকুর লক্ষ্মী পেঁচাকে সঙ্গে নিয়ে আসে আর সরস্বতী ঠাকুরের পাশে দেখা যায় হাঁসকে। কার্তিক ঠাকুরের বাহন ময়ূর আর গনেশের সাথে থাকে ইঁদুর। মহিষাসুরের সাথে স্থান পায় মহিষ। খাদ্য ও খাদক সকলেই একই আসনে বিরাজমান হয় মা দুর্গার সাথে। কিন্তু এই পূজার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা আরেকটি পাখিকে আসনে দেখা যায় না। সেটি হল নীলকন্ঠ পাখি। কথিত আছে দশমীর দিন মা যখন কৈলাসে ফিরে যান তার আগে এই পাখি কৈলাসে গিয়ে দেবাদিদেব মহাদেব কে মার ফিরে আসার বার্তা দেন। এই বিশ্বাস থেকেই আগেকার দিনে বনেদি বাড়িগুলোতে দশমীর দিন নীলকন্ঠ পাখি উড়াবার প্রথা ছিলো। পরবর্তীতে ভারতীয় বন্যপ্রাণ আইন অনুসারে নীলকন্ঠ পাখি ধরা নিষিদ্ধ হবার ফলে এই প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যায়। নীলকন্ঠ পাখি শুধু আমাদের বাঙ্গালীদের সাথেই জড়িয়ে নয় সমগ্র ভারতে বিভিন্ন সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে আছে। উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, সমগ্র হিন্দি বলয়ে এই পাখিকে দেবতার আসনে বসানো হয়েছে। এই পাখি দেখা মানে স্বয়ং ভগবান শিবকে দেখা। কারণ সমুদ্রমন্থনের সময় সমুদ্র থেকে উঠে আসা বিষ পান করে তার বিষের জ্বালায় নীল বর্ণের হয়ে যায়। তাই শিবের অপর নাম নীলকণ্ঠ। নীলকন্ঠ পাখি শরীর নীল বর্ণের হবার ফলে এর নাম নীলকণ্ঠ। নীলকন্ঠ পাখিকে দেখলে মনোবাসনা পূর্ণ হয় এমন গভীর আস্থা ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে রয়েছে।লোকবিশ্বাস, এই পাখির সামনে মনোবাসনা জানালে সে তা পৌঁছে দেয় স্বয়ং রামচন্দ্রের কছে। রামচন্দ্র রাবণ বধের আগে এই পাখির দর্শন পেয়েছিলেন। তারপরই তিনি পরাক্রমশালী রাবণকে বধ করতে সক্ষম হন। অসাধ্যসাধনের আগে নীলকণ্ঠ পাখির দর্শন পাওয়াটা খুবই ভাগ্যের  বলে মনে করেন মানুষজন। এজন্য দশেরার দিন এই পাখি দর্শনের আকাঙ্ক্ষা খুবই প্রবল। এদিন কিছু মানুষ সেই সুযোগে নীলকণ্ঠ পাখি খাঁচাবন্দি করে বাড়ি বাড়ি দেখিয়ে বেড়ায় পয়সার বিনিময়ে। রাবণ বধের পর ব্রাহ্মণ হত্যার পাপে রাম ও লক্ষ্মণ শিবের ধ্যান করেন পাপ খণ্ডনের আশায়। সে সময় শিব উপস্থিত হয়েছিলেন নীলকণ্ঠ পাখি রূপে। এই বিশ্বাসে আজও সেখানকার মানুষজন এই পাখি দেখার আশায় থাকেন। যাকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করছে এক শ্রেণির মানুষ।

নীলকন্ঠ পাখি সম্পূর্ণ ভারতবর্ষে পাওয়া যায়। এর আকৃতি 33 সেমি। সুঠাম চেহারা হয়। মাথা বড় গলা ছোট হয়।
মাথা,পেট,ডানা ও লেজ আকাশী নীল । মুখ,বুক, ও ঘাড় বাদামি রঙের হয়। লেজ ও পিঠের মাঝে নীল রঙের পালক থাকে। ডানার ভিতরের দিকে নীল ও সাদা পালক থাকার জন্য যখন উড়ে দেখতে খুবই সুন্দর লাগে।
গলার মধ্যে নীল ছোট পালক থাকে যা গলা ঘুরালে দেখা যায়।

এরা সাধাণত একা বা জোড়ায় থাকে। প্রজনন কালে পূর্বরাগ প্রদর্শনের জন্য হাওয়ার মধ্যে পাক খেতে থাকে বলে ইংরেজিতে এদের Indian Roller নাম দেওয়া হয়েছে। শুকনো ফাঁকা মাঠে উঁচু গাছের ডালে বা বিদ্যুতের খুঁটিতে, তারে উরন্ত পোকার অপেক্ষায় বসে থাকতে দেখা যায়। বিভিন্ন পোকা মাকর, গিরগিটি, ব্যাঙ প্রভৃতি খেয়ে থাকে। মার্চ মাস থেকে জুলাই মাসের মধ্যে গাছের কোটরে শুকনো পাতা দিয়ে বাসা বানায়। শুকনো ও শুষ্ক পাতাঝরা অরণ্যে উচুঁ উচুঁ গাছেই সাধারণত বাসা বানায়।

I N C U এর তালিকায় এই পাখি নূন্যতম বিপদ গ্রস্ত হলেও এদের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। আগে এদের সংখ্যা বেশি ছিলো বলে আতিন বন্দোপাধ্যায় এই পাখির নামে “নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে” বই রচনা করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানকালে উঁচু উঁচু গাছ কেটে ফেলার ফলে এদের বাসস্থানের অভাব দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি কৃষি জমিতে অধিক পরিমাণে কীটনাশক এর ফলে এদের খাদ্যে অভাব দেখা দিয়েছে। তাই একটি সংখ্যা দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে। এদের বাঁচাতে হলে গাছ কাটা বন্ধ ও কৃষি জমিতে কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে হবে।

53