বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

সেলিনা হোসেনের ‘বাড়ি ফেরা’ গল্পে প্রতিবাদ আছে, ধর্ষিতা হয়েও প্রতিবাদ করেছে মেঘলা। এই সমাজের বৃহৎ কালো গোহ্বর থেকে বাঁচতে হলে নারীকে নিজের হাতেই হাতিয়ার তুলে নিতে হবে, সেই বাঁচার লক্ষেই এগিয়ে গেছে মেঘলা। ধর্ষণের জন্য কোনো ঘৃণা নেই, অনুশোচনা বোধ নেই, সে জানে এই সমাজে ধর্ষণই বিধেয় কিন্তু তবুও বাঁচতে হবে। আর বাঁচার জন্য নারীকে সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে হবে। এ গল্পে আছিরুদ্দীনের অভাবের সংসার। সে অসুস্থ। দীর্ঘদিন পায়ের ক্ষত ঠিক হয়নি। ফলে আজ আছিরুদ্দীন বড় মেয়ে মেঘলাকে নিয়ে শহরে গেছে ডাক্তার দেখাতে। ফেরার পথে কিছু যুবক দ্বারা মেঘলা ধর্ষিত হয়। এই ধর্ষণের জন্য পিতৃহৃদয়ের আর্তনাদ আছে কিন্তু মেয়ের কোনো অনুশোচনা নেই। সে জানে এ পৃথিবীতে এভাবেই বাঁচতে হবে। সন্ধ্যায় ধর্ষিত হয়েছে মেঘলা, রাতে গ্রামে ফেরার গাড়ি নেই, ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে পিতা ও কন্যাকে। এক যুবক বলেছিল ভোরে আবার ধর্ষণ করতে আসবে, ফলে ফাঁদ পেতে  রাখে মেঘনা –“ভোররাতে আধো অন্ধকারে ছেলেটি আসে। ঘুমজড়ানো চোখ। গুলতানি মারার ভঙ্গিতে মেঘলার কাছে বসে ওর গায়ে হাত দেবার আগেই পাশে জড়ো করে রাখা ইঁট দিয়ে ছেলেটির মাথা বাড়ি মারে। ছেলেটির মাথা ফাঁক হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে। ও টুকরো টাকরা ইটের ফাঁকে মুখ থুবরে পড়ে যায়।“( তদেব, পৃ. ২১৫) এবার পিতাকে নিয়ে বাড়ির পথে যায়। আসলে মেঘলারা প্রতীকি চরিত্র। আজকের সমাজে সমস্ত মেয়েকেই মেঘলা হয়ে উঠতে হবে নয়ত বাঁচার পথ হারিয়ে যাবে সুস্থ সমাজ থেকে। এই অসুস্থ সমাজের বুকে কদাচারের হাত থেকে নারীকে রক্ষা করাই আজকের দিনে লেখিকার বড় জিজ্ঞাসা। তিনি জানেন না কবে নারীরা স্বাধীন মনন ও জীবনবোধ নিয়ে বাঁচতে পারবে। সেই জীবনবোধ থেকেই এ সব গল্প লেখা।

                    এক আদর্শ স্কুল শিক্ষকের জীবন নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘নুন-পান্তার গড়াগড়ি’ গল্পটি। মাস্টার আরজ আলি আদর্শ গৃহ শিক্ষক হয়েও সংসারের অভাব দূর করতে পারেননি। বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজের দারিদ্রকে লেখিকা বড় করে তুলেছেন। আরজ আলির দুই ছেলে শহরে কাজ করে, কন্যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে কিন্তু এবারের পরীক্ষার ফিস তিনি দিতে পারেননি। তেমনি ঘরে আছে বিধবা বোন জোহরা সহ দুই কন্যা। বোনের কন্যাদের তিনি অর্থের জন্য লেখাপড়া শেখাতে পারেননি। পরীক্ষা ফিসের টাকা রোকেয়া আজ নিজেই জোগাড় করে নিয়েছে, কিন্তু কীভাবে নিয়েছে তা তিনি জানেননি। মূল্যবোধগুলি কীভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ঘূণধরা সময়ে কীভাবে নতুন প্রজন্ম বড় হয়ে উঠছে তা লেখিকা দেখিয়েছেন। তাই শিশুরা আজ আদর্শ মানুষ হতে চায় না বা ‘কাননে কুসুম কলি সকলি ফুটিল’ র ফুটতে চায় না। শিশুরা তাদের ভবিতব্য জানে তাই কেউ জেলে, কেউ কুলি, মজুর হতে চেয়েছে। আজ আরজ আলিরা বেসরকারি শিক্ষকদের সরকারি করণে চলেছে শহিদ মিনারে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। কিন্তু সেখানে পুলিশের হাতে অত্যাচারিত হতে হয়েছে। পুলিশ বা রাষ্ট্র শিক্ষকদের মর্যদা দেয়নি। বর্তমান সময়ের এক কঙ্কালসর রূপের কাছে লেখিকা আমাদের দাঁড় করিয়ে দেন। যে সময়ের কাছে আদর্শ শিক্ষা বলতে কিছুই নেই, যে সময় জানে শুধু পীড়ন করতে। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে আজ আর ব্যক্তি অধিকার ঘোষণার কোন পথ নেই, রাষ্ট্র যেন কণ্ঠ রুদ্ধ করতে সদা ব্যস্ত। তেমনি এই ঘূণধরা সময়ে নিজেকে তিল তিল করে বিসর্জন দিয়ে বাঁচতে হবে। নিজের ইচ্ছা, অধিকার বোধ বিসর্জন দিয়ে টিকে থাকতে হবে, তাই রোকেয়া নিজের নারীসত্তা বিসর্জন দিয়েও টিকে আছে। তেমনি আছে সময়, সমাজের বিরুদ্ধে লেখিকার চাবুক। স্কুল মাস্টারের বেতন থেকে স্কুল ইন্সপেক্টরের বেতন অনেক বেশি।  ইন্সপেক্টর কুকুর পোষে, সে কুকুর রোজ মাংস খায়, এদিকে মাস্টারের নুন পান্তা জোটে না। তাই ছাত্ররা আজ নেড়ি কুকুরের রচনা লিখতে চেয়েছে। সময়ের ক্ষত লেখিকা তুলে ধরেন এভাবে –

“আরজ আলি অনুভব করেন, তাঁর বুকের উপর পুলিশের  বুট চেপে আছে। চাপ বাড়তে থাকে। তাঁর দম ফুরিয়ে আসছে বোধহয়। তিনি বলেন, মা রোকেয়া তোমার পরীক্ষার ফিসের টাকা আমার আর দেওয়া হল না। আমি ওই টাকা জোগাড় করব বলে অধিকারের দাবি নিয়ে ঢাকা শহরে এসেছিলাম। বুটের চাপ খানিকটা হালকা হয়। তিনি বড় করে শ্বাস ফেলেন। তিনি শুধু জানতে পারেন না যে তাঁর মেয়েটি তাঁকে কখনও বলেনি, বাবা আমি আর কুমারী নেই।“ (পঞ্চাশটি গল্প, আনন্দ,প্রথম প্রকাশ ২০১৪, পৃ. ২১ )

সীমান্ত অঞ্চলে গরু পরাপার করে অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করে। এ কাজে ঝুঁকি আছে কিন্তু এ পথ ছাড়া ভিন্ন পথে যাওয়ার উপায় নেই। আসলে দরিদ্রতার চরম সীমায় পৌঁছে গিয়ে মানুষ এই অপরাধ প্রবণ কাজে যুক্ত হয়। মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় বন্দি করে জীবনসমুদ্রে ঝাঁপ দেয়। ‘জলরঙের ছবি’ গল্প এক মুসলিম পরিবারের বিপর্যয়ের ছবি। সন্তানদের নিয়ে জয়তুন বেওয়ার কষ্টের সংসার। স্বামী সন্তান নিয়ে দারিদ্র হলেও বেশ হাসি খুশিতেই সংসার চলছিল। কিন্তু অর্থ উপার্জনের জন্য স্বামী বেঁছে নিয়েছিল সীমান্ত থেকে নদী পথে গোরু চালানের কাজ। সে কাজে বিপদ আছে তা জানত জয়তুনরা কিন্তু অধিক অর্থও আছে। সেই গোরু চালান করতে গিয়েই বি.এস. এফের হাতে ধরা পরে মৃত হয় স্বামী। স্বামীর মৃত্যুর পর জয়তুনের সংসারে অভাব আরও বৃদ্ধি পায়। জয়তুন আজ নদীতীরে বসে থাকে, যেন নদীর কাছেই নিজের দুঃখ জানায়। ইতিমধ্যেই ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে। তাদেরকে নিয়ে জয়তুন দুঃখ ভুলেছে। বড় ছেলে আল আমীন সামান্য রোজগার করে সংসারের ক্ষুধা নিবারণ করেছে। এই উপলক্ষে আল আমীন ইন্ডিয়ার চরে কম দামে মাংস আনতে গিয়েছিল। কিন্তু ফেরেনি। আজ নদীর সমানে গোটা পরিবার অপেক্ষা করছে। স্বামীর মৃত্যুতে জয়তুন নদীতীরে একা অপেক্ষা করত আজ পুত্র আল আমীনের মৃত্যুতে গোটা পরিবার অপেক্ষা করে আছে। পমত্ত পদ্মা সন্তানকে ফিরিয়ে দেয়নি। সেলিনা হোসেন এই সব গল্পে বাস্তব পটভূমির ওপর জোড় দিয়েছেন। নদীতীরবর্তী মানুষের জীবনযন্ত্রণার ভাষ্য উপলব্ধি করেছেন। আর তা উঠে এসেছে এক মায়াবি ভাষায়। নদীর স্রোতের মতই গল্প এগিয়ে গেছে। নদী যেমন কাঠকুটোকে ভাসায় আর ডোবায় তেমনি পাত্রপাত্রীরা ভেসেছে আর ডুবেছে। নদীর বুকে ভেসে চলার আনন্দ আছে, কিন্তু সে আনন্দ ক্ষণিক। সেখানে মৃত্যু বা পতনই অনিবার্য। এ মৃত্যুর জন্য পদ্মার কোনো দুঃখ নেই, দুঃখ আছে নদী তীরবর্তী মানুষের। আর সে গল্পই লিখেছেন সেলিনা হোসেন।

                হাসিরুণ বিবির জন্ম-মৃত্যুকে সামনে রেখে গড়ে তুলেছেন ‘সন্ধিক্ষণ’ গল্পটি। একটি নারীর জীবনসংগ্রাম, আত্মযন্ত্রণা যেন তিনি পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চার করে দিয়ে যাচ্ছেন। আসলে নারী মানেই যেন যন্ত্রণা, সে যন্ত্রণা বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় আরও ভয়ংকর। সেই তীব্র জীবনস্পন্দনের গল্প লেখিকা শুনিয়েছেন। অনেকগুলি পাখির মৃত্যুর দুইদিন পরে হাসিরুণের জন্ম হয়েছিল।  গল্পের শেষও হয়েছে দুটি কাকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হাসিরুণের মৃত্যু ঘোষণায়। এই মৃত্যু যেন ইঙ্গিতবাহী। হসিরুণ ফসলের বীজ রাখার কুঠরি তৈরি করত। এই কুঠরিতে বীজ রাখলে পোকায় কাটে না, পরবর্তী ফসল ভাল হয়। কিন্তু সমাজ পরিস্তিতি পরবর্তী প্রজন্মকে কোন বীজ দিয়ে যাবে ! হাসিরুণের নাতনি ফয়জুন্নেসাকে নিয়ে তাঁর স্বপ্ন ছিল। কিন্তু আজ ফয়জেন্নুসার প্রেমিক সন্ত্রাসবাদীদের হাতে নিহত হয়েছে। এমনকি পিতা মাতা আগেই নিহত হয়েছে। ফয়জেন্নুসা পেটে জন্ম বীজ পেয়েছিল কিন্তু প্রেমিক জুয়েল মৃত হতেই তা কেমন করে তা বহন করবে। এই জন্মবীজই আজ যেন মৃত্যুবীজ হয়ে ওঠে। হাসিরুণরা ফসলের বীজ রাখার কুঠরি তৈরি করতে পেরেছে কিন্তু মাতৃগর্ভে প্রকৃত মানবের জন্ম নেবার বীজ কবে তৈরি হবে। সময় পরিস্তিতির চাপে মনবতা আজ ধুলোয় লুটিয়েছে ! আর সে শোষণে সবচেয়ে বেশি অত্যাচারিত হতে হয়েছে মুসলিম নারীদের। সেই দূর্বিসহ জীবনযন্ত্রনণার কথা লেখিকা লিপিবদ্ধ করেন।

            তিনি নারীর জীবনযন্ত্রণা যেমন দেখেন তেমনি সেখান থেকে উত্তরণের পথও আবিষ্কার করেন। ‘জেসমিনের ইচ্ছাপূরণ’ এক নারী স্বাধীনতার গল্প। জীবনের অতি দহন থেকে বেরিয়ে এসে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছে। আর এ স্বপ্ন দেখিয়েছিন লেখিকা নিজস্ব জীবনভাবনায়। প্রতিটি লেখকই নিজস্ব রীতিতে আখ্যান পরিক্রমা করেন, সেই পরিক্রমায় ব্যক্তি জীবনদর্শন বড় কাজ করে। সেলিনা হোসেন সংসারের যাঁতাকলে পিষ্ট এক নারীকে সামনে রেখে নতুন প্রজন্মের নারীরা কীভাবে নিজের পথ নিজেই করে নেবে তা দেখিয়েছেন। তিনি জানেন এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের অত্যাচর কোনদিনই শেষ হবে না, ফলে নারীকে নিজস্ব পথে একাকি এগিয়ে যেতে হবে। যেমন গিয়েছে এ গল্পের জেসমিন। বাল্যকালে বিবাহ হয়ে শ্বশুরবাড়িতে অত্যাচারিত হতে হয়েছিল তাঁকে, এমনকি সন্তান প্রসবের সময় কেউ ছিল না। ফলে জরায়ু থেকে সন্তান ছিন্নের সময় জরায়ু এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। স্বামী নতুন বিবাহ করায় সে গ্রাম থেকে সন্তান নিয়ে ঢাকা শহরে চলে এসেছিল। সেখানে পরিচারিকার কাজ করে জীবননির্বাহ করে। আজ জেসমিনের জরায়ু বাদ না দিলে বাঁচার কোন উপায় নেই। কিন্তু এই জরায়ু কেটে ফেলায় জেসমিনের এক আনন্দ আছে। কেননা সে তবে আর মা হতে পারবে না। সে জানে বহুত্বকামী পুরুষের সঙ্গে যেকোন মুহূর্তেই নারী জড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেই সন্তানের ভার পুরুষ নেবে না। আর পেটের সন্তানকে মাতা কখনই পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে পারেনা ফলে সে সন্তানের ভার মাতাকেই নিতে হবে। আজ জেসমিন আনন্দের সঙ্গে হসপিটালে গেছে, জরায়ু কাটাতে তাঁর অপার আনন্দ –“এই জীবনে যা কিছু পাইনি, তার সব এখন আমার চাই। আমার সব ইচ্ছা পূরণ হবে। হাঃ আমি আর মা হব না।“ (তদেব, পৃ. ৩৮০) আসলে জীবনের কোন চাহিদাই তাঁর পুরণ হয়নি। পূরণ করার সাহসও পায়নি কেননা পুরুষের লালসার কাছে নারী শুধু ভোগ্যপণ্য ছাড়া কিছু নয়। আর এই শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই এই প্রতীকি প্রতিবাদ। তাই জেবুন্নাহারের মনে হয়েছে – 

“বাল্যবিয়ে, সন্তানের জন্ম, নিজের শরীরের বিপুল ক্ষতি, স্বামী পরিত্যক্ত নারী হিসেবে সামাজিক পরিচিতি, অন্যের বাসায় কাজের মেয়ে হিসেবে জীবিকা নির্বাহ এসব কিছুর বিরুদ্ধেই কি ওর এমন প্রতিবাদ ? “ (তদেব, পৃ. ৩৭৭ )

-হ্যাঁ প্রতিবাদই। আজ জেসমিন এক সমান্য রিকশা চালকের হাত ধরেছে। সেই রিকশা চালক জমিরকে মনে হয়েছে প্রকৃত মানুষ। জসমিনের জীবনে আজ আর কোন আক্ষেপ নেই, কেননা সে জানে পুরুষের মুখোশ যেকোন মুহূর্তে খুলে গেলেও সন্তান হবার সম্ভবনা নেই। আর এই স্বাধীন জীবনবোধ নিয়েই সে নারী জীবনের সমস্ত চাহিদা পূর্ণ করতে চেয়েছে। 

                            ‘চিঠি’ গল্পে নারীজীবনের তিন প্রজন্মের ইতিবৃত্ত রচনা করেছেন। অভাব, পুরুষের অত্যাচারের মধ্য দিয়েও নারীর যে এগিয়ে যাওয়া তা দেখিয়েছেন। তবে সব পুরুষই যে অত্যাচারী তেমন নয়, আসলে নিম্নবিত্ত জীবনে  লড়াই উভয়কেই করতে হয়। নারী বলেই শোষিত যেমন বেশি হতে হয় তেমনি সংসারের জন্য নারীরই বেশি ভাবনা। সেই ভাবনা থেকেই নিম্নবিত্ত নারীর আত্মলাঞ্ছনা ও সামাজিক নিস্পেষণের বীজ তৈরি হয়। এ গল্পে লেখিকা একটি মুসলিম পরিবারের তিন প্রজন্মের নারী জীবনের যন্ত্রণার ভাষ্য রচনা করে নারীর উত্তরণের পথ আবিষ্কার করেছেন। নূরজাহানের কন্যা স্বামী ঘর থেকে বাড়ি চলে এসেছে কন্যা সহ। নূরজাহানের সংসারে এমনিতেই অভাব , কন্যার আগমনে সে অভাব আরও বৃদ্ধি পায়। তবে ভালোবাসার অভাব ছিল না। এ অভাবের সংসারের হাত থেকে বাঁচতে কন্যা কামিলা বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। ইতিমধ্যে নূরজাহান উপজেলা পশু দপ্তরে ট্রেনিং নিয়ে টিকাকরণের চাকরি পেয়েছে। আজ সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরেছে কিন্তু কন্যা নেই বলে পিতামাতা চিন্তিত। তবে সে যন্ত্রণা ভুলিয়েছে নাতি রুণু। কন্যার যন্ত্রণা নাতির মধ্য দিয়েই ভুলতে চেয়েছে নূরজাহান। এই রুণুকে লেখিকা গড়ে তুলেছেন নতুন জীবনস্বপ্ন নিয়ে। এই প্রজন্মের নারীরা ব্যক্তি স্বাধীনতা নিয়েই এগিয়ে যাবে লেখিকার লক্ষ সেদিকে। তাই নিজের ভবিষ্যৎ জীবনের চিঠি রুণু শুনিয়েছে সবাইকে, যার মধ্যে লুকিয়ে আছে লেখিকার জীবনভাষ্য –

“আমার আদরের নানিজান, আপনি আমার শতকোটি কদমবুছি নিবেন। আপনি আমাকে ইস্কুলে পাঠাইয়া পড়ালেখার সুযোগ করিয়া দিয়াছেন। আপনি আমাকে আব্বা-আম্মার না থাকার দুঃখ ভুলাইয়া রাখেন। আপনি আমাকে বাঁচিতে শিখাইয়াছেন। নানি, আমি আপনার মতো হইতে চাই। আপনি হাঁস-মুরগি-গোরু-ছাগলের টিকা দেন। আমি বড় হইয়া ডাক্তার হইব। আমি মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিব।“ (তদেব, পৃ. ১৯০ )

‘স্মৃতি’ গল্প দুইনারীর আত্মস্মৃতির ভাষ্য। সত্তর অর্ধ দুই নারী আজ নিজের স্মৃতিচারণায় অতীত জীবনে ভেসে গেছে। একজনের দুঃখের স্মৃতি, একজনের সুখের স্মৃতি। বিপরীতার্থক শব্দ ব্যবহারে নারীজীবনের এক অনন্য স্মৃতি রোমান্থনে লেখিকা পাঠককে ডুবিয়ে দিয়েছেন। তবে দুজনেই বেঁচেছে, নতুন জীবনস্বপ্ন নিয়ে লড়াইয়ে এগিয়ে গেছে। আজ সাহানা ও মেরিনা প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে। দুইনারী আজ নিজের বিবাহিত জীবন, স্বামীহীনতা, অত্যাচার, লড়াইয়ে টিকা থাকার গপ্প নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে। তবে জীবন যে বড় মধুর নয়, এখানে নিজের দাবি নিজেকেই প্রতিষ্ঠা করতে হয় তা সাহানা, মেরিনারা বুঝতে পেরেছে। গল্পকথন ভঙ্গিমায় এ গল্প স্বতন্ত্রের দাবি করে। এ রীতি নতুন নয় তবুও যেন পাঠককে ভাসিয়ে নিয়ে যায় –

“স্মৃতি নিয়ে দুই বান্ধবীর নস্টালজিয়ার শেষ নেই। একজন সুখের স্মৃতিচারণ করে। অন্যজন দুঃখের। একজনের কাছে জীবন মধুরতম জায়গার বড় কিছু, অন্যজনের কাছে দুঃখ বিলাস হয়ে ওঠে।

একজন বলে, যা পেয়েছি তা ভুলে শেষ করতে পারব না।

অন্যজন বলে খ্যাঁকশেয়ালের জীবন কাটিয়েছি। ভুলে শেষ করতে চাই না।

একে অপরের স্মৃতি মনোযোগ দিয়ে শোনে। শুনে মজা পায়। শুনতে শুনতে পান-সুপারির বাটা শেষ করে। তারপরও তারা শোনার আবেগ কাটিয়ে উঠতে পারে না।“ (তদেব, পৃ. ২০০ )

‘ল্যাংড়াটা খুন হয়েছে’ গল্প ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ভাষা আন্দোলনে শহিদ হওয়া নূরুদ্দিন আজ খুন হয়েছে সন্ত্রাসবাদীদের হাতে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক আবস্থা কোন পর্যায় থেকে কোন পর্যায়ে নেমে যাচ্ছে লেখিকা তা দেখান। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে মুনাফা লুটছে আর প্রকৃত স্বদেশপ্রেমিকের দিন অতিবাহিত হচ্ছে কষ্টে। ভাষা আন্দোলনে নূরুদ্দিন পা হারিয়েছে। সন্তান জমিরুদ্দিনের চাকরিও চলে গেছে। এ অবস্থায় সংসারের দায়িত্ব নিতে হয় নাতি খলিলকে। স্বভাবতই খলিল সন্ত্রাসবাদের পথ বেঁছে নিতে বাধ্য হয়। এই সন্ত্রাসবাদের পথ তৈরি হয় প্রবল অভাব থেকে। আজ নূরুদ্দিনের সংসারে নিদারুণ অভাব বিদ্যমান। গল্প গড়ে উঠেছে দাদু নূরুদ্দিন ও নাতি খলিলকে কেন্দ্র করে। দাদু জানেন নাতির পথ ভুল তবুও আজ কিছু করায় নেই। অভাবী মানুষের কাছে শেষ সত্য ক্ষুধা। আর এই ক্ষুধা নিবারণের জন্য মানুষ যেকোন পথে নেমে যেতে বাধ্য হয়। এই সন্ত্রাসবাদের পরিণতি কী ? নূরুদ্দিন খবরের কাগজে প্রতিনিয়ত খুনের খবর দেখে। গোষ্ঠীচক্রে একটি খুনকে কেন্দ্র করে ঘটে একাধিক খুন। আজ খলিল বাড়ি ফেরেনি। সেও অপর গোষ্ঠীর হাতে খুন হয়েছে। আজ বাড়ি এসে বিরোধী পক্ষ খলিলের অস্ত্র উদ্ধারে এসেছে, তা না পেয়ে খুন করে গেছে নূরুদ্দিনকে। একজন শহিদের এই করুণ পরিণতি দেখিয়ে লেখিকা অবগত করে দেন একটি দেশের বর্তমান পরিস্তিতির কথা। বাংলা ভাষার জন্য শহিদ হওয়া একটি দেশ আজ কোন পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের ভবিতব্য , সরকারি কার্যকলাপের উদসীনতা, সংকটকালীন সময় –সমস্তকে লেখিকা এক সূতোয় বেঁধে এক বিদ্ধস্ত সময়ের মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করিয়ে দেন। অথচ তাঁদের কিছু করার নেই। মুক্তচিন্তার মানুষকে মৌলবাদীরা ধ্বংস করতে অগ্রসর হয়েছে। ফলে গল্প উপন্যাসেই প্রতিবাদের চিত্র রেখে যান। গভীর আক্ষেপ থেকে হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন ‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’ নামক গ্রন্থ। যৌবনের স্বপ্নাকাঙ্ক্ষা ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে। তাই এ গ্রন্থের উৎসর্গপত্রে এক বেদনা থেকে লেখেন –

‘’তোমাকে মিনতি করি কখনো আমাকে তুমি বাঙলাদেশের কথা তুলে কষ্ট দিয়ো না।

জানতে চেয়ো না তুমি নষ্টভষ্ট ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইলের কথা ; তার রাজনীতি

অর্থনীতি, ধর্ম, পাপ, মিথ্যাচার, পালে পালে মনুষ্যমণ্ডলি, জীবনযাপন, হত্যা, ধর্ষণ,

মধ্যযুগের দিকে অন্ধের মতোন যাত্রা সম্পর্কে প্রশ্ন করে আমাকে পীড়ন কোরো না ;

আমি তা মুহূর্তও সহ্য করতে পারি না,- তার অনেক কারণ রয়েছে।“

সে দেশের সমস্ত স্বপ্ন কীভাবে নষ্ট হয়ে গেল তা তিনি পর্যায়ক্রমে লিপিবদ্ধ করেছেন। ‘ছবি ও বুলেট’ গল্প বর্ডার, সীমান্তরক্ষীদের অত্যাচার, অত্যাচারিত মানুষের আত্মযন্ত্রণা, তাদের বেঁচে থাকা ও স্বপ্নাকাঙ্ক্ষা নিয়ে গড়ে উঠেছে। সীমান্ত অঞ্চলের মানুষ মৃত্যুকে হাতে বন্দি করে, মরণকে শ্যাম সমান ভাবে দিন কাটাতে হয়। সুখের মধ্যে যেকোন সময়ই নেমে আসতে পারে দুঃখের বর্ষা। আর এই অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি শোষিত হতে হয় নারীকে। বৃদ্ধ সাকিনা বানুর আজ দিন কাটে নাতি পারুলকে নিয়ে। নাতির সঙ্গে নানা প্রেম ভালোবাসার কথা, সীমান্ত মানুষের সমস্যা, অত্যাচারের ইতিবৃত্ত গল্পে দেখতে পাই। এই সীমান্ত অঞ্চল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। কিন্তু এই মনোরম বনভূমিতে মাঝেমাঝে নেমে আসে বন্দুকের আর্তনাদ। শ্যামল বনভূমি রক্তপলাশের রঙে রাঙা হয়ে ওঠে। তবুও মানুষকে এভাবেই বাঁচতে হয়। সাকিনার আজ অন্য কোন ভাবনা নেই, একমাত্র ভাবনা নাতি পারুলকে নিয়ে। এই বিভীষিকাময় পরিস্তিতিতে তিনি একজন নারীকে বিপন্ন সময়ের কাছে একা ফেলে রেখে যেতে চান না। বনে শাক সংগ্রহে এলে শুরু হয় গুলি বর্ষণ। আজ হত হয়েছে পারুলের প্রেমিক খোকন। আর এইসব ঘটনা যেন ছবির মত ফুটে ওঠে। গল্পকারের চোখ তো আসলে দূরবিনে রাখা দর্শকের চোখ। তিনি নির্দিষ্ট কিছু বিন্দুতে আলো ফেলেন। সে আলো হয়ে ওঠে ছবি, আর তার সঙ্গে জুড়ে দেন সময়রে ক্ষতকে, ফলে গর্জে ওঠে বন্দুকের নল-

“দু’জনে পরস্পরের দিকে মুখ ফেরায়। সেটিও একটি অসাধারণ ছবি হয়। ছবিতে পাথরের গাঁথুনির মাটির স্তর আছে – কালচে শ্যাওলার মধ্যে সময়ের  হিসেবে আছে –আতঙ্কিত মানুষের কম্পনরত শরীর আছে।

শুধু সেই ছবিতে বুলেট নেই।

তখন মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ ভেসে আসে। দু’জনে মুখোমুখি হয়। নাতনি নানির গলা জড়িয়ে ধরে। সাকিনা বানুরও  মনে হয় পারুলকে জড়িয়ে ধরার সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরের কাঁপুনি থেমে গেছে। তার কেমন জানি লাগছে। মনে হচ্ছে কোথাও কিছু ঘটেছে। আচমকা চেঁচিয়ে বলে, একটি বুলেট যেন কার বুক ফুটো করে দিল। ও পারুল রে আমার মনে হয় –“ (তদেব, পৃ. ১২৩ )

 একজন নারী হিসেবে সেলিনা হোসেন নারীর ক্ষতগুলি চিহ্নিত করণের চেষ্টা করেছেন। সে নারী মুসলিম নারী। তাঁর গল্প নির্মাণের  ভাষা স্বচ্ছ। এক সহজাত ভাষাগুণেই তিনি গল্পকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। যাপনের সত্যকথনই তাঁর গল্পে উঠে এসেছে। যে আশা নিয়ে, স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল সে আশা, স্বপ্ন পূরণ হয়নি। সেই সময়যন্ত্রণাকেই তিনি লিপিবদ্ধ করে চলেন। একজন কথকের কাছে আমাদের সেটাই বড় আকাঙ্ক্ষা। যিনি লিখেছেন ‘ঘুমকাতুরে ঈশ্বর’, তিনি মানুষের যন্ত্রণার ভাষ্যকেই বড় করে তুলবেন তা বলায় অনুমেয়।

43