নিশা

আমি এখানে নষ্ট পাড়ার নিশা,
আমার ভালোবাসা
মুখ পুড়িয়েছে কাঁচা বয়েসটাতে
গল্পেতে গল্পেতে–

পাড়ার রোশন দাদা,
তার সঙ্গেই পড়েছিলাম বাঁধা
হৃৎপিণ্ডের রোগে,
এ’ বয়েসে এমন অনেকে ভোগে;

এ’সব এখন নতুন কিছু নয়
মন থাকলে মনের রোগ তো হয়;
আমারও হয়েছিলো,
তখন ষোলো।

রোশন দাদা আমার থেকে দশ বছরের বড়,
প্রেমের আবার বয়েস হিসেব করো?
মনের মধ্যে উথলে উঠলে ঢেউ
হার্টের রোগে বুড়ো হয় না কেউ।

রাত্রে বাবা মদ খেয়ে ফিরতেন,
গালিগালাজও করতেন
অনেকক্ষণ,
সে’সব ধরণ ধারণ
দেখে পিত্তি জ্বলে যে’ত,
চুন থেকে পান খসলে পড়ে মা শুধু মার খেত;
ভাত জোটে না মদ জুটতো রোজ,
পরিবার কী খেলো তার খোঁজ
কিচ্ছুটি রাখতো না,
আস্তে আস্তে সংসার হ’ল জানা–
চেনার মাঝে অচেনা
এক প্রকাণ্ড জেলখানা।

তাই, তার সঙ্গেই পালিয়ে এসেছিলাম,
কীভাবে যে এই নষ্ট পাড়া পেলাম!
জোর করে সব ভুলেও গেছি আমি
একদমই,
নাম ভুলে এই বেনামি সৈকতে
অন্ধকারের রাতে
বালির চড়ে একাই করি ভ্রমণ,
সামনে অসীম সমুদ্র-গর্জন,
শুন্যতা এসে সব করেছে গ্রাস,
আমার সর্বনাশ
সে’ শুন্যতায় লেখা,
যত্ন করে রাখা!
বেচে দিয়ে যে “মনের মানুষ” কোথায় চলে গেলো,
আর ফিরে না এলো!
ভালোই হ’লো,
ঘর বাঁধবার স্বপ্নও মরে গেলো
পুরোপুরি,
এ’ পাড়াতে আমিই এখন সবচেয়ে সুন্দরী,
নিশার অনেক দাম;
তাই, নামও হারালাম!

কী যেন নাম ছিলো?
ও’সব নাম আজ হারিয়ে যাওয়াই ভালো,
ও’ নামেতে কে আর আমায় চেনে?
পুরোনো কথা টেনে
কীই বা হবে আর!
এখন আমার এই পাড়াতে বিরাট এ’ সংসার,
নেহা, পূজা, জুলি, সীমা অনেক ছদ্মনামে
আমার মতন বিকোয় চড়া দামে;
নিশার নেশায় ভদ্রলোকেরা রাত্রিবেলায় আসে,
ভালোও বাসে–
নরম মাংসপিণ্ড আর নধর সুডৌল শরীর;
বাইরে ওরা নিরামিষাশী বীর,
দুর্গা পূজার উদ্বোধনীর ফিতে কাটতে ডাকে
অনেক জায়গা থেকে!
আমার ঘরের মাটিও নিয়ে যায়,
আর, আমায় না চেনার আছিলায়
মুখ ঘুরিয়ে থাকে,
রুমাল দিয়ে নাকও ঢেকে রাখে–
মনে মনে হাসিও তখন পায়
তবুও গামছায়
ঝুরো ঝুরো মাটি তুলে দি,
যদি
দুর্গা মায়ের পায়ের তলে পাই
এতোটুকুও অবহেলার ঠাঁই
জীবন জুড়োয় তবে
একভাবে!

যা’হোক এবার অন্য কথায় আসি,
এ’ পাড়ার যে সবচেয়ে বুড়ি সন্ধ্যা মাসী
কাল সন্ধ্যে বেলায়
মরণ তাকে হিঁচড়ে নিয়ে যায়
অনেক যুদ্ধ করে,
তারপরে
এ’ পাড়াতেই একটা কোনে কবর দিয়ে তাকে
মাটিতে দিলো ঢেকে
সবাই মিলে,
দাবিদার কেউ ছিলো না কোনো কালে
তার দেহের,
তাই, মুখেতে তার আগুন অন্তিমের
কেউ এলো না দিতে,
ধোঁয়ার সাথে স্বর্গে পেলো না যেতে;
মাটির নীচে ঘুমিয়ে গেলো শরীর
জানতে পেলো না বাইরের কোনো ভীড়!

শেষ ক’টা দিন ভাত জুটেছে রেবা মাসীর ঘরে
তার মেয়ে, ওই যে নেহা, দারুণ রোজগেরে,
কী জানি কবে কার ঔরসেতে
নেহা এসেছিলো পেটে
রেবা মাসীর সেই,

তাই তো তার আর খাওয়ার চিন্তা নেই
নইলে, রেবা মাসী আর সন্ধ্যামাসী খুব ছোটোবড়ো নয়।

তারই কাছে শোনা,
“সন্ধ্যার মতো সুন্দরীদের হাতে যে’ত গোনা”
অনেকটা নাকি আমারই মতন রূপ
দামও পে’ত খুব।

যা’হোক আবার নিজের কথায় ফিরি
তাড়াতাড়ি,
আমার গল্প বেশী লম্বা নয়,
আরেকটু সময়
আমায় শোনো–
এ’ মুখপুড়ি আবারও প্রেমে পড়েছিলো, জানো?
ঝলসানো মন আবারও ঝলসেছি,
কীভাবে যেন ভালোও বেসেছি;
তখন আমার আঠাশ,
সে বোধকরি সাতাস
আমার থেকে ছোটোই খানিক হবে,
তবে
মনের দিকে অনেকখানি বড়ো,
তাইতো এ’ মন তার কাছে পুড়ে গেলো;
এ’ পাড়া থেকে অল্প দূরে দোতলা বাড়ির ছাতে
তাকে দেখতে পেতাম নিয়ন আলোর রাতে,
ছেলেটা রোজ পায়চারি করতো,
সাহস করে এদিকেও তাকাতো;
আর আমি জানালা দিয়ে চাঁদ দেখতাম বসে
সর্বনেশে,

ও’দিকে তারও মন পুড়েছে বোধহয়,
নইলে এমন হয়?
–এক রাত্তিরে ফোন এলো মোবাইলে
দারুণ সাহসী ছেলে
বলে, নিশাকে সে আলো দেখাবে রোজ
সেই সূর্যের খোঁজ
আছে তার ঠিকানায়,
আমাকে ছেলেটি বিয়ে করতে চায়;
বারণও করেছি আমি অনেক বার,
কে শোনে কথা কার!
তবুও রোজ মেসেজ পাঠাতো আমায়
স্বপ্ন দেখার কথা লিখতো ঘোর অমাবস্যায়,
নিষ্পাপ মনে পাপ ছিলো না কোনো,
মন্দ কথাও বলে নি একদিনও,
আমার এই যে বিবস যন্ত্রণা —
সে’ কথাও শুনতো না;

এই ভাবে আর চলতো কতোদিন!
দিয়ে ফেললাম এই মন একদিন,
যখন আস্তে আস্তে দুর্বল হ’লো মন
আর ঝলসানো মন কাঁদলো অনেক্ষণ;

পাপের ভাগী হ’লাম
যেদিন তাকে প্রথম কাছে পেলাম,
একটি বারও সে স্পর্শ করে নি দেহ,
স্পর্শ করেছে পোড়া মনের মোহ,
“নিশা, তোমায় বিয়ে করতে চাই
চলো যাই
নরকযন্ত্রণা থেকে দূরে
অন্য কোনে ভোরে
সূর্য ওঠার দেশে”,
আমি বলেছি হেসে
“এ’ স্বপ্নটা পূর্ণ হবার নয়
তোমার আমার এই যে পরিচয়
এইখানে হোক শেষ
অনিমেষ”;
নাছোড়বান্দা জানতে চেয়েছে কারণ
যতবার করি বারণ,
বললাম অবশেষে
“তোমার বাবা রোজ রাত্তিরে আমার ঘরে আসে,
তোমার নিশার গভীর অন্ধকার
জ্যোৎস্নারও নেই প্রবেশের অধিকার”।

দু’ফোঁটা জল মেঝেতে ফেলে চলে গেলো অনিমেষ;
জানালা দিয়ে দেখলাম আমি শেষ–
দোতলার ছাতে চাঁদ ওঠেনি আর
অমাবস্যার গভীর অন্ধকার
ঘিরে ফেলেছে তাকে
এই ফাঁকে;
আর অকাল বর্ষা আমার চোখে অঝোর ধারার মতো
ঝলসানো বুকে ভিজিয়ে গেলো ক্ষত,
দগদগে হ’লো ঘা,
ক’দিন বাদে খবর দিলো নেহা–
বাপ-বেটাতে তর্কাতর্কি হয়ে
ছেলেটা শুয়েছে ঘুমের বড়ি খেয়ে
আর ভাঙেনি সে ঘুম।

মোচর দিয়ে উঠলো বুকের ভিতর
হে ঈশ্বর,
কোনোদিন তো ডাকি নি তোমাকে আমি,
বলো তুমি,
এ কোন পাপের পাতকী করলে আমায়?
শোনো সময়,
মরণ আমার কপালেও কি নেই?
এইখানেতেই,
আর কতোদিন টানবো দেহের বোঝা?
নিদারুণ সাজা
দিলে তো বিধাতা আমায়,
“নেহা, কাছে আয়
নিজের বলে তো কেউ থাকলো না আর
আমি তো শুধুই চেয়েছি অন্ধকার,
হঠাৎ আলোর ঝলকানি এসে চোখ
বন্ধ করলো অন্ধকারের শোক,
আমাকেও তোরা সন্ধ্যা মাসীর পাশে
মরা শুকনো হলুদ ঘাসে
ওই খানেতেই কবর দিয়ে দিস,
দেখিস, সে’দিন একটুও না ভুলিস।।

89